৩৭৭ অথবা কথায় কথায়

সেবন্তী ঘোষ
‘আরে, তুই-ই বল, ফেবুতে পেয়ে গেলাম বলে! তুই, তুই যোগাযোগ রাখতিস না কি যে আমাকে বলছিস? বিয়ে করলে বুঝছিস, দু’দিকে বাঁশ, হা, হা, বাম্বু, বাম্বু... আরে নম্বরটা পেয়েই তো তোকে ধরলাম, নিনা, চান্দুর খবর সব জানিস? আর স্বাগতা?

আরে স্বাগতা রে, তুই চিনিস, ওই সমরেশদার সঙ্গে গঙ্গামুক্তি আন্দোলনে গেল, ভাগলপুরে সেই, মনে নেই? শ্রীকান্ত উপন্যাসে গঙ্গার জেলেদের কথা আছে না? ওই যে লগির এক ঘায়ে মাথা ফাটিয়ে দিতে পারত, এমন খুনি স্বভাব। ওরাই তো গঙ্গা দখল করে রাখে গায়ের জোরে, আমাদের দেশে বলেই সম্ভব! তো স্বাগতার বাবা ছিলেন বিদেশের কোন ব্যাঙ্কে। হোস্টেলের কমনরুমে ওর বাবা এলেই দুটো সেন্ট্রি আসত, ঠকাস করে দুটো স্যালুট মারত, বাপরে! স্বাগতা তখন বেলবট্‌স আর স্কিন টাইট গেঞ্জি, কেমন ছেলেদের মতো, তোর জানার কথা নয়, তুই তখন বিদেশে, কত সুইস চকলেট পেয়েছি, ও মা, বছর ঘুরতে ঘুরতেই ওই সমরেশদার সঙ্গে আলাপ। ওই রূপমার মাধ্যমেই বোধহয়, রূপমাদের একটা গ্রুপ ছিল না? স্টাডি সার্কেল গোছের, দিয়া ঠাকুর, ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, যেমন হয়, ওর মা ডেনিশ, যা দেখতে ছিল না! ওদের বাড়ির মতোই স্বর্গীয় রূপ! রূপমা, প্রিয়া, রিখি আর শ্রীরাধা, তোদের যাদবপুর রে, ও তো পরে গিয়েছিল ওখানেই, ভাগলপুরে, গঙ্গামুক্তি নিয়ে উপন্যাস লিখল না শতলোকে? সমরেশদার সঙ্গে স্বাগতার হেবি প্রেম তখন, অনসূয়া আর আমার কলিগ ছিল সিটিতে, পরের দিকে ওখানেই পারমানেন্ট হল, যদি নেটটা করে রাখতাম। মা যা রাগ করেছিল, চাকরি ছাড়া বিয়ে করায়। আমিও তেমন ছিলাম, আচ্ছা বল, দু’বার নয়, দশবারে পেতাম? কাউকে দোষ দিই না, যা দোষ আমার... বউভাতের দিন তো অনিমেষ হাজির, দেবরূপকে খুব পছন্দ করতেন, আমি তো ওঁকেই দেখেছি... কত যে কাণ্ড! অনসূয়ার ছোটবেলার বন্ধু, একেবারে নার্সারি থেকে, ও-ই বলল, স্বাগতার সঙ্গে অনিমেষদার... সে আমলে তো ভাবাই যেত না... অনিমেষদা তখন পঁচাত্তর তো হবেই... অনিমেষদার সঙ্গে ভাগলপুর ফেরত স্বাগতা জিন্‌স-টিন্‌স ছেড়ে গোড়ালির ওপর ক্রমশ তাঁতের শাড়ি, ঢলঢলে ব্লাউজ, চুল কাকের বাসা, ছিরিছাঁদ নেই— পরে একবার দেখা হয়েছিল, ততদিনে অনিমেষদার কেসটা শেষ, শুনেছি ওঁর দুই ছেলে, দুজনেই স্বাগতার থেকে বড়, মারতে বাকি রেখেছিল! তখন স্বাগতা নিখিল সাহুকে বিয়ে করে নকশালবাড়িতে... কেন যে বিয়ে করল! আমার কিন্তু মনে হত ওর সমস্যা আছে... নিখিল বোধহয় আন্ডারগ্রাউন্ডে, কত ফ্যাকশন ওদের। কোনও একটায় ছিল। আমি সুমনাদি চন্দনা গেলাম, সেই স্বাগতা! তখন ও আবার ননীলাল সেনগুপ্তের শিষ্য, প্রতিক্রিয়াশীলের গান্ধীবাদী স্ত্রী! তা করে তো দেখাল। টিনের চালে সারারাত বৃষ্টি। জীবনে তো অমন ঘরে থাকিনি। রাতে বাথরুম করা ওই উঠোনেই, বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে। অত দূরে কে যাবে অন্ধকারে। কী থ্রিলিং ভাব? দুটো চৌকি, মরা বাল্‌ব আর একটা ঘড়ঘড়ে টেবিল ফ্যান। কিন্তু ক্ষমতা আছে রে ওর, যা দেখেছি না! পার্টি অফিসেই থাকতেন জীবন মজুমদার, নাম শুনেছিস তো? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই যে মাও সে তুং-এর সঙ্গে পাহাড় ডিঙিয়ে গিয়ে দেখা করেছিলেন যিনি, উনিই রাঁধতেন, টক পালং খেলাম। খাওয়া দূরস্থান, নামও শুনিনি টক পালঙের। আমরা ঘুরতাম আর ওঁর রান্না খেতাম... একটা বাড়ি দেখেছিলাম তখন, বাড়ি বলা যায় কিনা ভাবতে পারিস, শ্রমিক মহল্লায় স্কুল, স্বাগতাই চালাত, ওই বাড়িতে খোঁজ করতে গিয়েছিলাম, কী যেন নাম। লোকাল মেয়ে, ভাবতে পারবি না দারিদ্র্য কাকে বলে! ও-ই একা স্বাগতার স্কুলের টিচার, দু’দিন আসেনি বলে স্বাগতার সঙ্গে গেছি খোঁজ নিতে, ফাঁকা মাঠে কাঁচা একটা বাড়ি, বেড়াগুলোও ফাঁকা ফাঁকা, বৃষ্টিতে সব ভিজে, মেয়েটা কাঁচা মেঝেতে বসে আছে। মেঝে আর বাইরের মাটি প্যারালাল, খোলা মাঠে বাস করা মেয়ে, বর তাড়িয়ে দিয়েছে... স্বাগতা বলল পড়ার কী আগ্রহ। নিজে পড়ে, অন্যদের পড়ায়... কুলি লাইনে বাঁশ আর বাসক পাতার ঝাড়ের সঙ্গে সরু সরু কাদা রাস্তা সব জলে জলাক্কার। একজনের দালান মানে, ওই ক’টা ইট গাঁথা, ক্লাস চলছে, দুটো হ্যারিকেন স্বাগতাই দিয়েছে, আমরা তো বই-টই দিয়েছি পরে, কীভাবে ওদের সঙ্গে মিশে গেছিল স্বাগতা—যেন ঠিক বাড়ির মেয়ে!

"এত গাঁইয়া আমার শ্বশুরবাড়ি, ভাবতে পারবি না, মিডিওক্রিটি..."

এরপর বুঝলি বহুদিন গ্যাপ, আমিও অন্য শহরে, ও তখন গ্রাম ছেড়ে শহরে থাকছিল, খবরের কাগজে চাকরি নিয়েছে, তখনও বই জোগাড় করত চেয়েচিন্তে। ওর ভাই নিউজিল্যান্ডে, ফ্রেঞ্চ বিয়ে করেছিল, স্বাগতার তখনকার বর মানে নিখিল সাহু, সে আবার বড় হয়েছে শৌলমারিতে, ওই যে শৌলমারির সাধুই ফিরে আসা নেতাজি। মনে নেই? তো সেই সাধুর আশ্রমে নিখিলদা ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। ক্যান ইউ ইম্যাজিন, নিখিল বিশ্বাস করত দ্যাট সাধু ইজ রিয়েল নেতাজি? সেই নিখিলদা এলেন অতি বামে। নেতাজি টু অ্যানার্কি! বাঙালি লড়াই ছাড়া আসলে কিছু বোঝে না, এক রক্ত থেকে আরেক রক্ত। স্বাগতার সঙ্গে ওর কী হয়েছিল জানি না, মানে তখন তো সাউথ সিটি ছেড়ে দিয়েছি। ওই পার্টটাইম আর ক’টা টাকা। দেবরূপ হেবি অশান্তি করত— দু’টাকার কাজের নামে নাকি সংসারের কাজ করি না। কাজগুলো করতে নাও তো করত না। যাকগে, স্বাগতা কিছুদিন নিউজপেপারে ছিল বুঝলি। শুনতাম এদিক ওদিক। তারপর ক’বছর খবর নেই, মানে খবর নিতাম না। জানিস তো কত হাজিবাজি কাজে জড়িয়ে থাকতাম। কিছুদিন আগে হঠাৎ শৌরসেনীই বোধহয়, বলল, স্বাগতা কলকাতায় চলে এসেছে। কিছু করছে না। সেই বিপ্লবী স্বাগতা! আমরা সবাই হতাশ। দু’বছর পর শুনি একটা সরকারি স্কুলে পড়াচ্ছে। আমার মনে হত এমন আলাদা ও, সবার চেয়েই আলাদা, ওই কিছু কিছু মানুষ যাদের ভূতে ধরে... যেমন দেবরূপ ছিল, ও কী কিছু করবে না? চুপ করে থাকতে পারবে? যা ভেবেছি। হঠাৎ দেখি খবরের কাগজে লিখছে। শিশু শিক্ষা, মিড ডে মিল— এসব নিয়ে, কিছু তো করবেই ও, আমরা আর কী করলাম জীবনে? ছাগল চরাই, হ্যাঁ হ্যাঁ ছাগল তাড়িয়ে বাড়ি ফিরি, আবার সকালে বেরোই, কী জীবন চাইলাম, কী পেলাম রে... শ্বশুর-শাশুড়ির দায় না থাকলে দেখিয়ে দিতাম। এত গাঁইয়া আমার শ্বশুরবাড়ি, ভাবতে পারবি না, মিডিওক্রিটি... তেমন আলসে... ঠাকুরের জলটা অবধি আমার ঘাড়ে। সহ্য হয় না বুঝলি। প্রিয়া ঠাকুর, ওই যে বললাম না স্বাগতার সঙ্গে ছিল। ও তো ক্যানাডার সাসাকচুয়ানে, লোকাল পিপলদের জন্য কাজ করেছে... সাদারা ওদের আরও বরফের দিকে ঠেলে দিয়েছে, ওরা যে কীভাবে দিন কাটায়। প্রিয়ারা হেল্প করছে, ওর মা তো মন্ট্রিয়ালের না? হ্যাঁ রে, রূপমার খবর জানিস? মানে চিনতিস না কি? হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোদের শ্রীরাধাও তো অনিমেষদার ক্ষমতা ছিল রে! আর আমাদের জীবন! আমি যে মুক্ত এটা ভাবতেই দেয় না কেউ, সবসময় খাঁচায় আটকে থাকতে থাকতে অভ্যেস— কারও একটা গোয়ালে গরু হতেই হবে... ওনারশিপ... ঠিক, ঠিক ওই ওন করাটাই আর ভালো লাগে না, একদম নিজের মালিক নিজে, কে ভাবতে দেবে বল? চারপাশের ভাবটা এমন, সমাজ তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, তুমি আনুগত্য দাও, এদের দেখলে অন্যরকম ভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে... হ্যাঁ রে বাবা, আমাকে তুই চিনিস না... হ্যাঁ হ্যাঁ। সুযোগই পেলাম না। বাপ-মা ডাক্তার পাত্রের নিরাপত্তা দেখল, আমার সাহস হল না মানা করার— অ্যাঁ! কী বলিস! যাঃ! দূর! এমন হয় না কি? এ তো যা ইচ্ছে তাই? মনে হল তাই বদলে গেল! ও তো পুরুষালি ছিল বটে, তাই বলে বিয়েও তো করল, অ্যাফেয়ার, প্রথমে অনিমেষদা আর ওর বর নিখিল সাহু! না, না, মানে এতটা তো আমিও বুঝিনি... মেয়েই তো পুরোপুরি! যাঃ, এরকম হলে তো চূড়ান্ত গোলমাল! মনে মনে মেয়ে ছিলাম, শরীর পুরুষের, তখন চেঞ্জ করে নিলাম, এ তো শুনছি... তাই বলে খেয়াল হল বলে বেফালতু ছেলে হতে হবে? যা তুই গোলাচ্ছিস... স্বাগতা রে, স্বাগতা চক্রবর্তী, ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়নে... তুই ঠিক ধরতে পারিসনি। কী বললি? কী! যাঃ! আই ডোন্ট বিলিভ ইট... হতেই পারে না। স্বাগত চক্রবর্তী ইজ ইওর বয়ফ্রেন্ড? সর্বনাশ! কী সর্বনাশ! এ তো অনাছিষ্টি!

ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ! কী করলি তুই? শেষ অবধি এইসব? একটা সুস্থ ছেলে পাওয়া গেল না জগৎ জুড়ে? গা ঘিনঘিন করছে আমার! এই, আমি রাখছি! পরে কথা বলব, শাশুড়ির খাবার সময় হল তো, রাখি রে...

অঙ্কন - জয়ন্ত বিশ্বাস
শেয়ার করুন: