হিয়েরোগ্লিফিক্স

অনিতা অগ্নিহোত্রী
প্রথম প্রথম ঘুমজড়ানো অন্ধকারে মনে হত যেন অনেক দূর থেকে আসছে ডাকটা।

‘জ্যোতিষ্মান! জ্যোতিষ্মান!’

যমুনার বানভাসি অঞ্চলের কাছাকাছি দিল্লির এই এলাকায় নভেম্বরে শেষের দিকে বেশ শীতই। কম্বলে মানায় বলে তারা লেপ বার করে নিয়েছে বক্স খাটের পেটের ভিতর থেকে। লেপগুলোতে সোঁদা, আঁশটে গন্ধ, বদ্ধ জায়গার প্রাণীর গায়ে যেমন হয়।

তবু তাপ তো আছে, পুরনো ভালো তুলো।

বাবা দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়েছিল, সামনে না দাঁড়ালে নাকি ওরা নতুন লেপে শ্মশানের তোশকের তুলো ভরে দেয়। মায়ের ওই রকম ধারণা।

হয়তো অত সকাল নয়, সাতটা তো বেজেছেই, তবু আধো ঘুম মনে হত, রাত যেন আকাশ ছাড়েনি।

"জ্যোতিষ্মান! জ্যোতিষ্মান!"

মহিলার গলা সতেজ, ধারালো, যেন রাগের ধার ঘেঁষা।

‘জ্যোতিষ্মান! জ্যোতিষ্মান!’

সব জানলা-দরজা শীতের ভয়ে বন্ধ, কিন্তু বাথরুমের জানলার ওপরটা জাল দিয়ে ঢাকা। ওখান দিয়েই ভেসে আসে মহিলার গলা। তারপর ওদের শোবার ঘরে ঢুকে পড়ে।

একটা ফ্লোরে চারটে ফ্ল্যাট, তাদেরটা নিয়ে। কারও সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়নি। এক সপ্তাহ খুব অল্প সময়। নতুন রং করা ফ্ল্যাট দেখে বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। বিশেষত যখন তুখোড় দালাল আঁটো শার্ট আর জিন্‌স পরে কথার তুবড়ি ছোটাচ্ছে।

শিফ্‌ট করার পর বোঝা গেল, ভিতরের সবক’টা দরজার লক আর হাতল খারাপ, রান্নাঘরের মডিউলার কিচেনের পাল্লা ঢিলে, বাথরুমের হাত-শাওয়ার অকেজো। এসব কিছুতেই আগে চোখে পড়বে না, দালাল কেমন এক মেঘরঞ্জনী মায়া তৈরি করে দেয়। বরুণও তো একটু মন দিয়ে, খুঁটিয়ে দেখতে পারত। উঁহু, তার মন এসব জাগতিক ব্যাপারে নেই।

তখন তাদের হাতে সময় ছিল না। একটা বাড়ি ছেড়ে অন্য একটাতে আসা। একটা লিজ এগ্রিমেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অন্য বাড়ি দেখে লিজ এগ্রিমেন্টের কাগজপত্র তৈরি করা। দেরি হয়ে গেলে মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে যাবার ভয়। তাড়াহুড়ো করলে, দু’জায়গায় ডবল ভাড়া গোনার খরচ। দালালরা তাদের হাজার হাজার অ্যান্টেনা বার করে খুপরি অফিসে বসে আছে। কেবল তাদের হাতে গিয়ে পড়ার অপেক্ষা।

প্রথম প্রথম বুঝত না মহিলা কাকে ডাকছেন। দু-তিনবার ডাকের পর ধুপধাপ পায়ের আওয়াজে বোঝা যেত দৌড়ে আসছে জ্যোতিষ্মান। গলার টাই বাঁধা হয়নি। হাতে ব্লেজার, হয়তো জলের বোতল বাড়ির ভেতর ফেলে এসেছে। তার মা দাঁড়িয়ে আছে প্যাসেজে, লিফ্‌টের সামনে। লিফ্‌টের বোতাম টিপে ধরে রেখেছে যন্ত্রটাকে। দেরি হলে স্কুলবাস চলে যাবে। তখন আবার পৌঁছনোর অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এ শহরের যা দস্তুর। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের ছেলেকে ডাকা, পড়শির ঘুম ভাঙিয়ে। কী যে সব অদ্ভুত ব্যাপার।

"পনিটেলে বাঁধা চুল। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক।"

তিন চার দিন দুপুর নাগাদ দরজায় বেল, একবার, দু’বার। আরে, শিখা কি উড়ে আসবে না কি দরজা খুলতে? ঘরের মধ্যে ড্রিল মেশিনের তার, কলের মিস্ত্রির যন্ত্রপাতি, ছুতোরের টুল কিট। পা ফেলতে হয় সাবধানে। একসঙ্গে তিন-চার রকম কাজ চলছে। ডিশ অ্যান্টেনার জন্য ছাদের চাবি চাইছে একজন, ফোন করে। নতুন কাজের লোক জল থই থই রান্নাঘরে আধখোলা হাঁ নিয়ে দাঁড়িয়ে, কোমরে ধুলোটে ঝাড়ন গোঁজা।

লিফ্‌টটা ওদের সদর দরজার খুব কাছে। ডান দিকে লম্বা একটা প্যাসেজ। কোন অংশটুকু কার, তার অলিখিত আইন থাকে। ওই প্যাসেজে শিখা তার শখের টবের গাছগুলি রেখেছে। দু’পাশের দেয়াল ঘেঁষে সারি সারি সাজিয়ে। যেহেতু সামনের খোলা টেরেসে তারা কিছু রাখতে পারবে না, এমনই নির্দেশ মকান-মালিকের। প্ল্যান্টগুলো আগের বাসায় ছেড়ে আসতে পারেনি। যদিও প্যাকার মুভারদের হাতে কয়েকটা টব ভেঙেছে। আজ সকালেই একজন অচেনা মালিকে ডেকে তাদের পরিচর্যা করিয়েছে, জল না পেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছিল চারাগুলি।

‘স্যরি টু বদার ইউ!’

সেই তেজালো, খর, রাগের ধার ঘেঁষা গলা। এই তো, ইনিই জ্যোতিষ্মানের মা!

আঙুল দিয়ে প্যাসেজের শেষটা দেখালেন মহিলা। ‘আপনাদের প্রতিবেশী, ওই ফ্ল্যাটে থাকি।’

গোলাপি-কমলা ডিজাইনার সালোয়ার-কামিজ, পুলোভার। পনিটেলে বাঁধা চুল। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক।

শিখা একটা খাদির কুর্তা-পাজামা পরে আছে। না আঁচড়ানো চুল আর ধুলোমাখা হাত-পা।

‘প্যাসেজের জলটা মুছে দিতে হবে।’

সারা সকাল ধরে বাড়িতে মিস্ত্রিবাহিনী তাণ্ডব করছে। এর মধ্যে বরুণ অফিস চলে গেছে, মেয়ে মিষ্টি উর্ফ নাতাশা স্কুলে। শিখার মুখ দেখে চুপচাপ ঠান্ডা দুধে সিরিয়াল ফেলে খেয়ে গেছে ওরা। কিছু বায়না করেনি। স্নানের কোনও আশা নেই, চাও খায়নি শিখা।

‘এখুনি মুছতে হবে না কি? কোনও তাড়া আছে?’

নিজের অজান্তেই ভুরুটা কুঁচকে আছে ওর।

"আপনাদের প্রতিবেশী, ওই ফ্ল্যাটে থাকি!"

‘তাড়া তো আছেই। আমার ছেলে এখুনি ফিরবে স্কুল থেকে। জলে ওর পা পিছলে যেতে পারে।’

‘তাই বুঝি! আচ্ছা, দেখছি।’ বলে দরজাটা ভেজিয়ে ভেতরে চলে আসে শিখা। একেবারে বন্ধ করে না। এখনও দিল্লি স্টাইল রপ্ত হয়নি ওর।

মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন লিফ্‌টের কাছে। ছেলে ফিরলে জল বাঁচিয়ে ঘরে নিয়ে যাবেন।

কত রকম উদ্ভট যে মানুষ হয়! পনের-ষোলো বছরের ছেলে জল বাঁচিয়ে চলতে পারে না! পা পিছলে যাবে?

‘আপনাদের প্রতিবেশী, ওই ফ্ল্যাটে থাকি!’

মহিলা আঙুল তুলে নাম্বার প্লেটটা দেখাতে বুকের মধ্যে একটা শিরশিরানি বয়ে গেছিল শিখার। গুগলের ভিডিওতে ওই নাম্বার প্লেটটার ওপর ক্যামেরার জুম করা দেখে দেখে নম্বর, রং, আকারপ্রকার সব মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল তার।

কোন ফ্ল্যাটের ভেতর কারা থাকে এই ফ্লোরে, আসার পর জানাই হয়নি।

এখানে শিফ্‌ট করার পনেরো দিন আগে থেকে ক্রমাগত চাপ দিয়েছে সে বরুণকে, না ওখানে আমরা যাব না। তুমি এগ্রিমেন্ট বাতিল করে দাও। বরুণের অজান্তে দালালকে ফোন করে শাসিয়েছে, ‘কী ভেবেছেন, লুকিয়ে আমাদের দিয়ে এগ্রিমেন্ট করেছেন বলে ওখানে চলে যাব আমরা! যাব না। আর, এক পয়সাও পাবেন না আপনি।‘

নির্লজ্জ লোকটা রাগেনি। রাগলে ওদের বাজার থাকে না। ফোনের ভেতর হে হে করে হেসে বলেছে, ‘মুঝে ভি ক্যায়া মালুম থা, ম্যাডাম! য়ঁহা লোগ হমেঁ কুছ বতাতেঁ নহি হৈ!’

ফ্ল্যাট যেদিন ওরা দেখতে যায়, এক দালালের বক্তিমে ননস্টপ শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে সে দেখেছিল, উইন্ডো এসি খুলে নেওয়া ফোকর দিয়ে অজস্র ধুলো ঢুকে জমে আছে বেডরুমের মেঝেতে।

‘এই ফ্ল্যাট কি অনেকদিন খালি ছিল?’ দু’বার জিজ্ঞেস করে দায়সারা উত্তর পেল, ‘মাসখানেক হবে হয়তো!’

‘মাসখানেকে এত ধুলো!’ বিড়বিড় করছিল সে। বারান্দা থেকে তাকে চেঁচিয়ে ডেকেছিল বরুণ।

‘ধুলো ধুলো না করে এখানে এসে ভিউটা দ্যাখো!’

দুপুরের রোদে ঝলমল করছে চারদিক। দৃশ্য আর এমন কি মনোরম, ছোট-বড় বাড়ি, ইতস্তত হাইরাইজ, একটা স্কুলের খেলার মাঠ, এসব কংক্রিটের পিছনে ঘুমিয়ে থাকা পঙ্কিল, ধূসর, যমুনা নদী, আর মেট্রো রেল চলেছে জোড়া লাইনের উপর দিয়ে। অনেকটা উঁচু মেট্রো পথ। সুন্দর দেখায় ট্রেনের যাতায়াত।

"যেন চিকেন পকোড়ার ওপর চিলি সস।"

ফ্ল্যাটের মালিক সময় দিয়েছেন বিকেলে। তার আগে দেখে নেওয়া একবার। সবটাই কেমন তাড়াহুড়ো! মেয়েটা স্কুলে, ওকে দেখাতে পারলে ভালো হত, কিন্তু সময় কোথায়?

বাড়িভাড়ার অঙ্কটা শুনে বরুণের মতো খুশি হতে পারে না সে। বরং মুখ গোমড়া করে বসে থাকে। ‘তিরিশ হাজারে রাজি হল— এত বড় ফ্ল্যাটটা দিতে?’

‘আরে তাই তো! চল্লিশ বলল, আমি বললাম, তিরিশ— হার্ড বার্গেন করব বলে, ও এককথায় রাজি!

এম এ-র পর ওপেন ইউনিভার্সিটিতে আইন পড়া শিখা এতে খুশি হয় না। সন্ধেবেলা বসে বসে গুগল সার্চ করে ও বার করে ফেলে নিজের সন্দেহের শিকড়। সাত মাস, ঠিক সাত মাস আগে টেলিভিশনের নিউজ অ্যাঙ্কররা শিউরে উঠে, উত্তেজিত হয়ে খবরটা পরিবেশন করছিল যেন চিকেন পকোড়ার ওপর চিলি সস। বারবার দেখাচ্ছিল ফ্ল্যাটের বাইরেটা— ৬৭৬এ। চৌকো বাহারি কাঠের প্লেটে লেখা ইংরাজি অক্ষর। বাসিন্দাদের নাম নেই।

সাত মাস আগে। পাশের ফ্ল্যাট। মানে ওদের এই ৬৭৫ নম্বর ছ’মাস খালি ছিল। তাই কি? তাই অত ধুলো! দালাল বলেছিল, এক শর্মাজি থাকতেন, প্রাইভেট কোম্পানির অফিসার। তিনি অন্য কোম্পানিতে চলে যান। অফিস বদল না ভয়ে পালানো? পুলিশ, খবরের কাগজের লোকে থই থই করছিল এই ফ্লোর, তা নিশ্চয়ই দিন পনেরো ধরেই হবে। প্রাণ অতিষ্ঠ হবার পক্ষে যথেষ্ট।

‘আমি যাব না ও বাড়িতে।’ শেষ চেষ্টা করতে বেঁকে বসে সে। তার কথা কেউ শুনতে রাজি নয়। না বাপ, না মেয়ে।

মেয়ের স্কুল কাছে। অটোতে মিনিট পাঁচ। এক একদিন বরুণও ছেড়ে আসে মেয়েকে। বরুণও বদলেছে তার বিশ্ববিদ্যালয়। যমুনা পার হয়ে নিজের গন্তব্যের আরও কাছে এসে গেছে সে। বাকি রইল শিখা। সে শিফ্‌টিং সুপারভাইজ করবে, ঘরদোর পরিষ্কার করাবে, কলের মিস্ত্রি, কাঠের ও বিজলির মিস্ত্রিদের ডেকে আনাবে, মৃতপ্রায় গাছেদের বাঁচিয়ে তুলতে মালি খুঁজবে, সর্বোপরি রান্নার ও কাজের মাসি— কিন্তু তার আপত্তি যুক্তিগ্রাহ্য নয়।

‘এসব আজকাল আকছার হচ্ছে। বেশি ভাবলে মাথা খারাপ হবে তোমার।’ বলে তার গালে টোকা দিয়ে বরুণ চলে যায় পড়াতে।

বাবা-মেয়ে নাস্তিক। সেও আধা নাস্তিক। পুজোআচ্চার মধ্যে নেই। অষ্টমিতে অঞ্জলি দেওয়া ছাড়া তার কোনও হাজিরা নেই দেবদেবীদের কাছে। তবু এক বন্ধুর কাছে খোঁজখবর নিয়ে দুপুরবেলা খালি বাড়িতে এসে স্বস্ত্যয়ন করায় কাছের কালীবাড়ির বাঙালি পুরোহিতকে দিয়ে। বাড়িটার, পাশের বাড়ির বৃত্তান্ত বলে।

জবাফুলে গঙ্গাজল নিয়ে সব ঘরে, বারান্দায় ছেটাতে ছেটাতে বলেন পুরোহিত। ‘না, বউমা, আমার তো সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না। উত্তর-পুবমুখো বাড়ি। বেশ শুদ্ধ।’

‘সেরকম কিছু হলে আপনি জানতে পারতেন?’

"ওদিকেও একটু শান্তি জল দিন, ঠাকুরমশাই!"

‘পারতাম না?’ নাক উঁচু করে বাতাসে ঘ্রাণ নেন পুরুত। ‘আমরা চৌকাঠে পা দিয়ে ঘরের নাড়িনক্ষত্র টের পাই।’ তৃপ্ত হাসেন তিনি।

সব ঘরে জল ছেটানো হলে চুপি চুপি ওঁকে বারান্দায় ডাকে শিখা, হাতছানি দিয়ে।

‘ওদিকেও একটু শান্তি জল দিন, ঠাকুরমশাই!’

এ বারান্দা থেকে পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দা দেখা যায়। অনেক টিনের ও কার্ডবোর্ডের বাক্স জড়ো করা। বিষণ্ণ তারে জামাকাপড় ঝুলছে সদ্য কাচা।

‘দেব? অন্যের বাড়ি যে!’

‘দিন না।’

যেন বিষবাণ ছোড়ার মতো নিষিদ্ধ কাজ করছে, এমন ভাবে জল ছেটানোর পর্বটা সারে শিখা। মিষ্টি, বরুণ বাড়িতে থাকলে এসব করতে পারত শিখা? যা করেছে জিনিসপত্র আসার আগেই খালি বাড়িতে। ক্লিনারদের দিয়ে ভালো করে তুলিয়ে দিয়েছে বাতাসে বয়ে আসা সমস্ত ধুলো।

ওই মহিলা! মিসেস প্রতিভা সান্ধু! ওর এত আস্পর্ধা, দু’বার বেল বাজিয়ে বলছে, এখুনি প্যাসেজের জল মুছতে হবে!

নতুন কাজের মহিলাকে যতটা হাঁদা মনে হয়েছিল, ততটা নয় দেখা যাচ্ছে। ঝাড়ু-ন্যাতা নিয়ে বাইরে চলেছে, বলছে, ‘চা করেছি, পি লিজিয়ে, আমি মুছে আসছি।’

মাথা টিপ টিপ করে রাগে, শিখা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।

আজ রোদ অতটা ঝলমলে নয়, প্রথম দেখতে আসার দিনের মতো। যেন অনেকটা কুয়াশা ছড়িয়ে আছে সামনে লুটিয়ে থাকা শহরের ওপর। মেট্রো রেল চলছে রোজকার মতন। স্কুলের মাঠ থেকে হাসি আর খেলার ভাপ উঠছে। মন না চাইলেও চোখ চলে যায় পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দার দিকে। তারে মেলে দেওয়া স্কুল ইউনিফর্ম, টাই, মোজা— নিশ্চয়ই জ্যোতিষ্মানের। আজ এখনও ফেরেনি স্কুল থেকে। বাইরে ওর মা দাঁড়িয়ে, পাছে ছেলে জলে পা পিছলে পড়ে। ওদের বারান্দায় জামাকাপড় উলটেপালটে দিচ্ছে এক বুড়িমানুষ। পিঠ নুয়েছে বয়সে, হলদেটে পাকা চুল ছড়িয়ে আছে কাঁধে, পিঠে। ভুরু তুলে হাসেন। কপালে বলিরেখা বেড়ে যায়। হাসিতে কুণ্ঠা মিশে আছে। নমস্কার করতে ইচ্ছে হয় শিক্ষার। কিন্তু করে না শেষপর্যন্ত।

কাঠ ও কলমিস্ত্রি চলে গেছে। টিভির কাজ করছে কেব্‌ল যুবক। বাড়ি অনেকটা ধাতস্থ। ঘরগুলি এক এক করে ঝাঁট দিয়ে মুছে দিচ্ছে ধনোরী। ওদের নতুন কাজের দিদি। বাইরের জল মুছে, ন্যাতা কাপড় ধুয়ে এসে তার কিছু আত্মবিশ্বাস বেড়েছে তখন। বলে, ‘শর্মাসাহেব থাকত এখানে। তোমাদের এই ফ্ল্যাটে। হাদসার পর ক’দিন খুব হই হট্টগোল, পুলিশ, কাগজের লোক। সে তো পালাল। আমি আজ করতাম ৬৭৬-এ। ছেড়ে দিলাম কাজ। কে জানে পুলিশ কাকে কখন ডাকে। সান্ধু ম্যাডাম হাত ধরে বলেছিল, ধনোরী, যাস না তুই। তবু পালালাম। আগে নিজের প্রাণটা তো ! ওই সময় কী দিন গেছে সান্ধু ম্যাডামের। গল্‌ফ কলোনিতে বাড়ি তুলছিল, সে কাজ থেমে গেছে। এ ফ্ল্যাট তো ভাড়ার। বাড়িওলা বলছে, এখুনি বাড়ি ছাড়ো। আমি বদনাম হয়ে যাচ্ছি। বলে, ছেলে, শাশুড়ি নিয়ে এখন কোথায় যাব? তখন কী চেহারা এখন দেখলে বুঝতে পারবে না। চোখের নীচে কালি, আলুথালু চুল, পোশাকে ইস্ত্রি নেই। তারপর তো হল আর এক বিপদ!’

‘কী বিপদ?’ শিখার সাদা হয়ে যাওয়া মুখে কথা আটকে যায়। মাইক্রোওভেনে গরম চা জুড়িয়ে যাচ্ছে।

"সেই শেষ বার।"

‘ছেলেটাকে ছাড়িয়ে দিল স্কুল। বলে, ও এখানে পড়লে অন্য ছেলেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী? শুনেছি সান্ধু ম্যাডাম স্কুলে গিয়ে পা জড়িয়ে ধরে প্রিন্সিপালের, ক্লাস টিচারের। আমার ছেলের দোষ কী? ওর জীবনটাকে কেন বরবাদ করবে? স্কুল কমিটির মিটিং বসে। তাই তো ওরা রেখে দেয়।’

‘জ্যোতিষ্মানকে?’

‘ওই, কী যে নাম ছেলেটার। এখন দ্যাখো বলছে জলে পা পড়লে ছেলে পিছলে যাবে। আরে পা পিছলোনোর আর বাকি কী! কী ছিলি ক’মাস আগে, সব ভুলে গেলি নাকি!’

শিখার মনে পড়ে, সে বরুণকে না জানিয়ে অটো নিয়ে দালালের অফিসে গিয়ে হম্বিতম্বি করে এসেছিল— ‘ওদের বাড়িতে লুকোনো ওয়েপন নেই, আপনি জানেন? যদি থেকে থাকে? যদি কেউ ব্যবহার করে ওদের মধ্যে? আপনি গ্যারান্টি দেবেন আমাদের জীবনের? টাকা নিয়েই তো খালাস।’

সেই শেষ বার।

এ বাড়িতে ঢোকার তিন দিন আগে।

ভদ্র, হাসিমুখ দালাল সত্যি বিরক্ত হয়েছিল। মাথার ওপর হাত তুলে আড়মোড়া ভেঙেছিল চেয়ারে বসে। বলেছিল, ‘ওদের বাড়িতে আছে তো একটা বুড়ি, একটা ছোট ছেলে আর ছেলের মা। এদের মধ্যে কে ব্যবহার করবে রিভলভার, যদি থাকেও! আরে ম্যাডাম, দিল্লির মতো শহরে জানের গ্যারান্টি কে দেবে? এখানে ঢুকে এখনই যদি কেউ মার্ডার করে দেয় আমায়— কোনও গ্যারান্টি আছে?’

কলকাতা থেকে আনা সিদ্ধ চালের ভাত হতে সময় লাগে। ভাত ফুটছে। এলোমেলো বাড়ি ঠিক হতে লেগেছে। স্নান সেরে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে পিঠ দিয়ে শিখা ভাবছে, এভাবে জীবন গেছিল তারই মতো একজনের, একটা বেলার মধ্যে।

এক বিছানায় শোয়া, আঠেরো-উনিশ বছরের বিয়ের সম্পর্ক। দাম্পত্যের মধ্যে কি সত্যিই এত স্তব্ধতা থাকে? বরুণ কি জানে না শিখাকে, তার শরীরের মতনই তন্ন তন্ন করে— অথবা শিখা বরুণকে? না কি নিতল, নিরুদ্দেশ কিছ থাকে যা কোনও সম্পর্কই পেরোতে পারে না।

"বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই জানতাম না।"

ইন্টারনেট খুলে দেখা টিভির আর কাগজের খবরগুলো তো মুখস্থই হয়ে গেছে শিখার। তার সঙ্গে কাজের লোকেদের টুকরো টুকরো রিপোর্ট। জগজিৎ সান্ধু। নাম করা প্রোমোটার। কয়েক কোটির ব্যবসা বাজারে। বন্ধু অমিত অরোরা। প্রাণের দোসর। একসঙ্গে স্কুলে পড়ত। গল্‌ফ কলোনিতে তিনতলা বাড়ি উঠছে। মাঝে মাঝে সবাই গিয়ে দেখে আসে। এই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে ওরা, বাড়ি হলেই চলে যাবে।

সান্ধু ভদ্রলোক। হাসিমুখ। ওদের রেসিডেন্সিয়াল সোসাইটির ছোট শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা সবার প্রতি সুন্দর ব্যবহার।

ব্রেকফাস্টের পর বেরিয়েছে এক রবিবার। অমিতের বাড়ি থেকে আসছি। অমিতের বাড়িতে প্রায়ই যায় জগজিৎ। প্রাণের দোসর। ওর বউ নাকি দারুণ রাঁধে। প্রতিভা সান্ধুর থেকে অনেক বেশি লবাবদার।

বেলা বারোটায় থানা থেকে ফোন। ‘থানায় আসুন। আপনার স্বামী গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে হাসপাতালে।’

‘আপনারা ভুল করছেন।’ প্রতিভা বলেছিল, ‘আমাদের দুটো গাড়িই বাড়িতে। চাবি আমার কাছে। স্বামী গাড়ি নেবেন কী করে?’

‘তবু আসুন। আসতে হবে আপনাকে।’

অমিতের বাড়ির দরজা খুলেছিল ওদের সবসময়ের কাজের লোক। নমস্কার করার জন্য হাত তোলার আগেই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি। সামনেই অমিতের বউ। গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। এবার অমিত। গর্জন করে জাপটে ধরেছে বন্ধুকে। অমিত মারা যায়নি। ভীষণ জখম হয়ে হাসপাতালে। গুলি বেকায়দা ছুটে গিয়ে মারা গেছে অমিতের বড় ছেলেটা। আধঘণ্টা সময়। তিনটে মার্ডার। একটা সিরিয়াস ইনজুরি।

‘এরপর আপনার স্বামী নিজের মাথায় গুলি করেন।এখন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। খুব সিরিয়াস কন্ডিশন। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চলছে। দেখতে যাবেন?’

‘না। যাব না।’ প্রতিভা সান্ধুর সামনে সব ঝাপসা। দুলছে। জ্যোতিষ্মানের কচি মুখটা ভেসে উঠছে কুয়াশা ভেঙে। চোদ্দো বছরের ছেলে।

‘আপনি কিছুই জানতেন না? আঁচ করেননি? অমিত অরোরার সঙ্গে ব্যাবসা নিয়ে কোনও টেনশন চলছিল? টাকাপয়সার ব্যাপার? ওদের বাড়ি যাবার আগে আপনাকে কিছু বলেছিলেন? মার্ডার ওয়েপন কোথায় রাখা ছিল আপনি জানতেন?’

‘বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই জানতাম না।’

সন্দেহভাজন নয়। তবু ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রিলিং। স্টেশন হাউস অফিসার। ইন্সপেক্টর। এসিপি। ডিসিপি।

"রোজ সকালে প্রতিভা সান্ধু লিফ্‌ট ধরে থাকে।"

‘আমি কিছুই জানতাম না বিশ্বাস করুন।’ একটাই সেনটেন্স বারবার বলে গেছে প্রতিভা। তার উকিল তেমন বলে দিয়েছিল।

ওরা কেউ হাসপাতালে দেখতে যায়নি জগজিৎকে। প্রতিভা, জ্যোতিষ্মান কেউ না। জগজিতের মা, ওই নুয়ে পড়া বৃদ্ধা আকুল হয়েছিলেন যাওয়ার জন্য। পেটের ছেলে তার। প্রতিভা বলেছিল, ‘যদি যান, এ বাড়িতে আর ঢুকতে পারবেন না।

ভরপেট জলখাবার খেয়ে রবিবার সকালে একজন পরম বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে চলে গিয়েছিল। তার সঙ্গে দুটো রিভলভার, একটা ছোরা। কেউ জানত না। তিনটে খুন। একটা সিরিয়াস জখম। ভদ্র, শান্ত, হাসিমুখ, জ্যোতিষ্মানের বাবা। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে মাসখানেক লড়ে সে মারা গিয়েছিল, একা একা।

রোজ সকালে প্রতিভা সান্ধু লিফ্‌ট ধরে থাকে। জ্যোতিষ্মানকে ডাকে। কখনও চেঁচায়, রেগে যায়। জ্যোতিষ্মানের রোজই কেন যে দেরি হয় স্কুলের জন্য তৈরি হতে। বোধহয় যেতে চায় না স্কুলে।

একটা গোলাপের গাছে নাকি কাঁটা ছিল। প্রতিভা সেটা সরিয়ে দিয়েছে। জ্যোতিষ্মানের প্যান্টে কাঁটা বিঁধে যাবে। এখনও প্যাসেজে জল পড়লে হইচই। জ্যোতিষ্মান পড়ে যাবে পা পিছলে।

শিখার এসব অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এখন ভোরে ঘুম ভেঙে গেলেও সে বিরক্ত হয় না। ঘুমন্ত বরুণের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে মাঝে মাঝে কী যে দেখে! কত লিপির পাঠোদ্ধার আজও হয়নি। তবু চেষ্টা করতে থাকে পড়ার।

অঙ্কন - মৃণাল শীল
পাঠ - শ্রাবণী খাঁ
অডিও - রাজা সেনগুপ্ত
শেয়ার করুন: