অনীশ ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড

অরিন্দম বসু
এক সোমবার অফিস টাইমে এসি মেট্রোয় বেমক্কা আটকে পড়ে দমবন্ধ অবস্থায় অনীশ আবিষ্কার করল সে কারও হাসিমুখ মনে করতে পারছে না।

আরও অনেক নির্দোষ মানুষের মতোই রোজ মেট্রোয় চেপে অফিসে যাওয়া-আসা করে থাকে অনীশ। চুরাশিতে শুরু হওয়ার পর চৌত্রিশ বছর ধরে কোনওরকম বেগড়বাঁই ছাড়াই সময় মেনে মেট্রো চলবে এমন আশা তারাই করতে পারে যারা ইতিপূর্বে মেট্রোর সামনে লাফিয়ে পড়েছে। অনীশ এখনও পড়েনি। মেট্রোকে সে সম্মান করে। থার্ড রেলে পাওয়ার চলে যাওয়া, লাইনে আগুনের ফুলকি, গেট খোলা-বন্ধ হওয়ার গোলমাল, রেক খারাপ হয়ে যাওয়া, সিগন্যালের সমস্যা— এমন বিবিধ কারণ সামলে রোজ প্র‌ায় আঠাশ কিলোমিটার দৌড়োনো তো চাট্টিখানি কথা নয়।

কথা হল এই যে এর আগে কোনওদিন অনীশ গুহরায়কে কাচে ঘেরা এসি কামরার ভেতরে আটকে পড়তে হয়নি। কেন যে হয়নি তা পরমাশ্চর্য। যাইহোক, চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। সেদিন দরজা খুলছিল না। আলো নিভে গিয়েছিল। জানলাগুলো তো বন্ধই থাকে। ভাল করে শ্বাস নিতে পারছিল না অনীশ। বদ্ধ কামরায় একসঙ্গে অনেক ফুসফুস চালু থাকলে যা হয়। অক্সিজেন তো কাউকে দানও করা যায় না। মিনিট আটেকের মধ্যেই চোখে-মুখে অন্ধকার। নাকের ফুটোয় ঠান্ডা ভাব। মাথায় ঝিমঝিম। জুতোর ভেতরে কড়ে আঙুলটা কাঁপছিল। সপ্তাহের একেবারে গোড়ায়, দিনের শুরুতেই মরে যেতে হবে ভেবে ভয় করতে লাগল অনীশের। আর কারও কি তার মতো হচ্ছে? সে আশেপাশে তাকাল। ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না। হয়তো তার মতো সবার মুখই ফ্যাকাশে। এত সহজে কি মানুষ মরে যায়? অনীশ তখন চেনা মানুষদের মুখগুলো মনে করার চেষ্টা করছিল। আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে তাদের হাসিমুখ ভাবতে চাইছিল। পারল না।

সেই শুরু। কামরার আলো জ্বলে উঠেছিল। এসি চালু। ট্রেন নড়ে উঠল। স্টেশনে দাঁড়াল। দেরিতে হলেও অনীশ অফিসে পৌঁছল। কিন্তু সে খেয়াল করে দেখতে পাচ্ছে যারা তার একান্ন বছরের জীবনের কক্ষপথে ঘুরছে কিংবা সে যাদের কক্ষপথে— তাদের হাসিমুখ যে কেমন তা মনে আসছে না।

"হ য ব র ল-এর বেড়ালটার মিচকে হাসি মনে পড়ে যায়।"

এমন তো নয় যে তারা হাসে না। মানুষ কেন হাসে তার জবাব খোঁজা ততটাই অর্থহীন যতটা মানুষ কেন কাঁদে তার উত্তর পাওয়া। সুতরাং হাসি তো আছেই। কিন্তু হাসিমুখ তো তা নয়। নরকরোটি দেখলে বোঝা যায় তার দাঁত ছিরকুটে থাকাটা পারমানেন্ট হয়ে গেছে। তাকে কি হাসিমুখ বলবে কেউ? ওই যে ভিক্টর হুগোর গোয়েনপ্লেন। দ্য ম্যান হু লাফ্‌স। লোকটার মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকত। আসলে তার মুখ বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল ছোটবেলায়। কিন্তু হাসিমুখ তো কোনও বিকৃতি নয়। সামাজিক ঘটনা। তাহলে তাদের মনে থাকে না কেন?

পনেরো বছর বয়সে স্কুল থেকে এক্সকারশনে পুরীতে গিয়ে সমুদ্রের অসভ্য ওলটপালট ঢেউয়ে লুটোপাটি খেতে হয়েছিল অনীশকে। তলিয়ে যেতে যেতে গবগব করে জল ঢুকছিল মুখ দিয়ে। খোলা চোখের সামনে সবুজ জল ও মৃত্যু। হাঙরের ঢেউয়ে খেয়েছিল লুটোপুটি— জীবনানন্দের এই লাইন তখন তার জানার কথা নয়। মৃত্যুভয় এত কাব্যিক ছিল না তখন। স্নানরত একটি লোকের লুঙ্গি মুঠোয় ধরে ও তাকে প্র‌ায় বিবস্ত্র অবস্থায় পৌঁছে দিয়ে অনীশ সে যাত্রায় পায়ের তলায় বালি পায়। উঠে পড়ে কাশতে থাকে। আশ্চর্য ঘটনা যে পনেরো উল্টে দিলে একান্ন হয়। মাঝখানের ছত্রিশ বছর পার করে মেট্রোয় এই দ্বিতীয়বার মরে যেতে বসেছিল সে।

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় মেট্রোয় উঠতে ভয় পেয়েছিল অনীশ। পরে দীর্ঘদিনের সহবাসের অভ্যেসে বাধ্য হয়। শুধু আসার সময় হ য ব র ল-এর বেড়ালটার মিচকে হাসি মনে পড়ে যায়। এক চোখ টিপে তার সেই হাসিমুখ। সে ফ্যাচ ফ্যাচ করে হাসতে হাসতেই পালিয়ে গিয়েছিল। তবে কিনা ওটা রুমাল থেকে বেড়াল। এবং ভাইসি ভার্সা। অনীশ রুমাল ব্যবহার করে না। ছোট চিরুনিও নয়। যদিও তার মাথায় এখনও অনেক চুল এবং দিনে একবারই আঁচড়ায় সে।

তারপর থেকে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের সেই বেড়ালটার মতো হতে পারে। হাসতে হাসতে চোখের সামনে যার শরীরটা মিলিয়ে যায়। ভেসে থাকে শুধু মুখ ও তার হাসি। তারপর মুখও অদৃশ্য হয়ে যায়। আবছা হয়ে রয়ে যায় হাসিটা। সেইরকম ভাবেও তো অনীশের চোখের সামনে চেনা মুখগুলোর কেউ হেসে ভেসে থাকতে পারত।

ঘটনাটা ভুলল না অনীশ। সে বুঝতে পারল চেনা কারও হাসিমাখা মুখ মনে করার দরকারই পড়েনি এতদিন। আসলে সে অনেকদিন আগেই তা ভুলে গিয়েছে। মেট্রোয় দম আটকে না গেলে ভাবতেই হত না।

এবার সে চেষ্টা করতে শুরু করল। ওই হাসিমুখ খোঁজা আর কী। ওয়ান্ডারল্যান্ডে ঘুরে বেড়াতে লাগল অনীশ।

যদিও প্রথম চেষ্টাটাই যথেষ্ট কঠিন। অনীশ বউয়ের হাসিমুখ মনে করতে চাইছিল। বিয়ের বিশ সাল বাদ সেটা মোটেই হাসির ব্যাপার নয়। একসময় চৈতালী হাসত বটে। তন্বী, শ্যামা, শিখরদশনা ছিল না তবে অনীশের মতো মাঝারি মাপের লোকের পক্ষে মানানসই। সংসারের কাজে ঢিলে দেয়নি কোনওদিন। এখন সে সেখানেই এঁটে বসা একটি স্ক্রু। চুল পেকেছে, মেদ বেড়েছে। জেদও। ছেলের ক্লাস এইট থেকে তার ভবিষ্যতের চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে চৈতালী। মাধ্যমিকের রেজাল্ট একটু টসকে যাওয়ায় খুবই মুষড়ে পড়েছিল। আপাতত মিশন হায়ার সেকেন্ডারি ও জয়েন্ট এন্ট্রান্স। বিভিন্ন প্র‌কার টিউশন ও তার প্রয়োগ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চৈতালী ভালবাসে। ছেলের পড়ার সময় পাহারায় বসে থাকে। ফল পাকলে গাছ পাহারা দেওয়াই নিয়ম অবশ্য। দীপ্তেন্দু কো-এড স্কুলে পড়ার দরুণ তার গার্লফ্রেন্ডদের ব্যাপারেও সতর্ক নজর চৈতালীর। ছেলের চোখ এড়িয়ে মোবাইলে মনিটরিংও চলে।

অনীশ থাকে বর্ডারের এধারে। মাঝে মাঝেই চিৎকার চেঁচামেচি কানে আসে ওধার থেকে। ছেলে হাত-পা ছোড়ে, মা কাঁদে। মাধ্যমিকের পর দীপ্তেন্দু হিউম্যানিটিজ নিয়ে পড়বে বলায় চৈতালী এমন হাহাকার করে উঠেছিল যেন তার চেয়ে বেশি হিউমিলিয়েশন আর কিছু হয় না। অনীশকে বলেছিল, ‘তুমি কিছু বলবে না?’

‘কী বলব? ও পড়তে চাইলে পড়ুক না।’

‘হ্যাঁ, তুমি তো তাই বলবে। ভুলে যাচ্ছ যে আমাদের সময় আর এদের সময় এক নয়। কম্পিটিশনে টিকে থাকতে না পারলে কেউ তোমার ছেলের দিকে তাকিয়েও দেখবে না। কিচ্ছু করতে পারবে না জীবনে।’

অনীশ চুপ করে যায়। সত্যিই তো, বেঁচে থাকাটা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো হয়ে গেলে মুশকিল। তার তবু দেওয়াল আছে। অনেকের তো তাও নেই বলেই মনে হয়।

এই সমস্ত পূর্বনির্ধারিত ও পরবর্তী কারণবশত অনীশ বউয়ের হাসিমুখ মনে করতে পারে না। ছেলেরও নয়। সপ্তাহে আধঘণ্টা গিটার বাজানোর সময়েও দীপ্তেন্দু গম্ভীর থাকে।

ফলে এখন চৈতালীকে গ্র‌াইফন ও ছেলেকে নকল কাছিম ভেবে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না অনীশের। কচ্ছপটা রোজ স্কুলে যেত। রৈখিক নিয়ম, কুটিল মগ্নাংশ, খড়গমূল ও বমিকরণ পড়ত। এরকমই বলেছিল সে অ্যালিসকে। আর গ্র‌াইফন পাখি বলেছিল কচ্ছপের কোনও দুঃখ নেই।

"কী ব্যাপার তোমার? কাল রাতে ঘুম হয়নি না কি? বিশেষ কাজে ছিলে? ছেলে তো বড় হয়ে গেছে।"

সামাজিক ঘটনাচক্রে অনীশ একটি চাকরি করে। নেতাজি স্টেশন থেকে মেট্রোয় উঠে শোভাবাজারে নেমে অটো কিংবা বাস ধরে উল্টোডাঙা। অল্প হাঁটলেই অফিস। যে টেবিলে সে বসে তার নাম এসট্যাবলিশমেন্ট। স্টাফ ও অফিসারদের মাইনেপত্তর, ছুটিছাটা, প্র‌ভিডেন্ট ফান্ড, গ্র‌্যাচুইটি, পেনশন ইত্যাদি নিয়ে ফাইল নাড়ানাড়িই তার কাজ। আগে আরও কয়েকজন ছিল এই কাজের জন্য। কমতে কমতে এখন অনীশ একা কুম্ভ। এমন আরও কিছু টেবিল আছে অফিসে। সেখানেও একজনকেই সামলাতে হয় সব। কোনও স্টাফ রিটায়ার করলে তার জায়গায় নতুন কেউ আসে না। ছাঁটাই তো নেই, সংকোচন। এলে আসে অফিসাররা। তারা সব ইঞ্জিনিয়ার। দাপটই আলাদা। এখানে এখন স্টাফ কম, অফিসার বেশি। অফিসটা বাঁটুল দি গ্রে‌ট। বড় মাথা, ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি, লিকলিকে পা।

তবু চাকরি অতি বিষম বস্তু। তাকে স্নেহ না করলে চলে না। তার মধ্যেই অনীশ ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখ বুজে ফেলে। সহকর্মীদের অনেকদিন ধরে দেখছে সে। কোনও একজনের হাসিমুখ মনে আনার চেষ্টা করে।

‘কী ব্যাপার তোমার? কাল রাতে ঘুম হয়নি না কি? বিশেষ কাজে ছিলে? ছেলে তো বড় হয়ে গেছে।’

চোখ খুলতে হয় অনীশকে। পাশে মেইনটেনেন্সের টেবিল থেকে প্রদ্যোত তাকিয়ে রয়েছে চশমার ফাঁক দিয়ে।

‘না ভাই, আমি ঘুমোচ্ছিলাম না।’ এটুকুই বলতে পারে অনীশ।

প্রদ্যোত উঠে আসে। মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে সামনে মেলে ধরে। তার ফেসবুক খোলা। ‘এরা মাইরি কী যে পাঠিয়ে যাচ্ছে! এই ভিগো। মাঝে মাঝেই ছোট ছোট ক্লিপিংস পাঠাচ্ছে। ঘরের বউ-মেয়েরা নিজেদের সামনে-পিছনের ভিডিও তুলে পোস্ট করেছে নাকি এখানে! দ্যাখো।’

অনীশের ফেস আছে, বুকও। ফেসবুক নেই। তাই দেখে। সত্যিই এক মহিলা নানা অ্যাঙ্গেল থেকে অঙ্গভঙ্গি তুলেছে মোবাইলে। তবে এরমধ্যেও খেয়াল করল, তার মুখে কোনও হাসি নেই।

‘আমাকেই পাঠাচ্ছে কেন বলো তো?’

‘পাঠাচ্ছে, কেন না তুই যে পর্নো দেখিস সেটা ওরা জানে। বেছে বেছে তাদেরই পাঠায়।’ পেনশনের মেডিকেল বিলিং করে দেবাশিস। সে পিছন থেকে এসে প্রদ্যোতের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল।

‘ভ্যাট।’ ঝটকা দিয়ে কাঁধ সরিয়ে নেয় প্রদ্যোত। ‘আমি কী দেখি না দেখি, ওরা কী করে জানবে!’

হেসে ওঠে দেবাশিস। ‘জানা যায় বস। তুমি কে, কার সঙ্গে চ্যাট করছ, কী বলছ, কোন সাইটে ঢুকছ-বেরোচ্ছ— সব। তোমার কম্পিউটারর আই পি অ্যাড্রেস নেই! ওটাই তো। তুমি মোবাইলেও যা যা কর সেসবের নোট নেওয়ার জন্যও কোনও চিত্রগুপ্ত খাতা খুলে বসে আছে। তোমার আইডেন্টিটি প্যান কার্ডে, ভোটার কার্ডে আছে, আধার কার্ডে তোমার আঙুলের ছাপ, চোখের মণি রয়েছে। পালাবে কোথায়! একেই বলে স্টেট মেশিনারি। যতই তোমার ভোট দেওয়ার ক্ষমতা থাক, তুমি আসলে ওদের হাতের পুতুল।’

"দঙ্গল-দৌড় চলছে।"

‘যা তো, বড় বড় কথা বলিস না। সে তো তুইও।’

‘অবশ্যই। সেইজন্যেই তো কোনও ট্যাঁ ফ্যোঁ করতে পারি না। দেবাশিস আঙুলে কর গুনতে লাগল। গ্যাসের দাম বাড়ুক, পেট্রলের দাম বাড়ুক, নেতারা ঘুষ খাক, কলেজে ভর্তির জন্য দাদারা টাকা নিক, পঞ্চায়েত ভোটে লাশ পড়ুক, রাম-রহিম বাবা জেলে যাক, রেপ চলতে থাকুক, অযোধ্যায় মন্দির হোক কি মসজিদ, গরুর মাংস রেখেছে বলে পিটিয়ে মেরে দিক, পরকীয় বৈধ না অবৈধ, দেশের টাকা মেরে কেউ বিদেশে পালিয়ে যাক, সুইস ব্যাঙ্কের টাকা দেশে আসুক না আসুক, চাষিরা আত্মহত্যা করুক, বেকাররা চাকরি পাক না পাক— আমরা কথা না বললেই হল। শুধু মনে রাখলেই হবে, সারে জাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা।’

সরু চোখে তাকাল প্রদ্যোত। ‘বলতে কী বাকি রাখলি!

‘অনেক বাকি আছে বস কিন্তু মন কি বাত বলা যাবে না। বলছে কেউ কেউ, তাদের গর্দান যাচ্ছে।’

এইসময় অনীশ ফস করে বলে বসল, ‘দঙ্গল-দৌড় চলছে।’

ঝুঁকে এল প্রদ্যোত। ‘দঙ্গল? আমির খানের?’

অনীশ মাথা নাড়ল। বিড়বিড় করে বলল, ‘না সে অন্য জিনিস। যে যেমন খুশি দৌড়বে, যতক্ষণ না ভিজে গা শুকিয়ে যায়। ওয়ান্ডারল্যান্ডে অমন হয়।’

দুজনেই অনীশের দিকে তাকিয়ে রইল। কস্মিনকালেও এদের হাসিমুখ দেখেছে বলে মনে করতে পারছিল না অনীশ। আর কী অদ্ভুত ব্যাপার! কোনও সম্পর্ক নেই অথচ শয়ে শয়ে পোস্টার ও ফ্লেক্স তাসের মতো কেউ যেন বেটে দিচ্ছিল তার চোখের সামনে। সেখানে হরতন, ইস্কাবন, রুহিতন, চিড়েতনদের হাসিমুখ ভেসে উঠছিল। ওরা জনগণের সামনে হাসবে বলে মুখিয়ে থাকে। সকলকেই চেনে সে কিন্তু কেউ তার চেনা নয়।

এরপর অনীশ তার বাবা ও মায়ের হাসিমুখ মনে করার চেষ্টা করে। তারা অন্য ফ্ল্যাটে থাকে। একটি ছাত্রকেও প্র‌াইভেট টিউশন না পড়িয়ে বাবার স্কুল মাস্টারের জীবনের বড় সাফল্য হয়তো ওই দুটো খুপরি যা ভাড়াবাড়ি থেকে মুক্তি দিয়েছিল। মায়ের পায়ে স্টিলের রড ও বাবার বুকে পেসমেকার বসানোর পরও বুড়ো-বুড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। অনীশ ও চৈতালীর তত্ত্বাবধানে থাকে। এ ছাড়া উপায় কী। ভাগ্যিস অনীশ বেশি লেখাপড়া করেনি। ধাঁ করে ব্যাঙ্গালোর কিংবা অ্যামেরিকা চলে গেলে কী যে হত!

অফিস থেকে ফেরার পথে গিয়ে অনীশ দেখতে পেল মা খাটের ওপর পা ছড়িয়ে বসে। টিভিতে কোনও একটা সিরিয়াল চলছে।

‘কী রে, এসেছিস। বোস। জল খাবি?’

‘খাব। নিয়ে নিচ্ছি।’ অনীশ ডাইনিং টেবিলের ওপর থেকে বোতল তুলে নেয়। তারপর বলে, ‘আমার দিকে একবার তাকাও তো দেখি।’

মা তাকায়। ‘কিছু বলবি?’

‘না, ঠিক আছে। দ্যাখো যা দেখছিলে।’

‘এটা একটু পরেই শেষ হয়ে যাবে। চলে যাস না। একটা সন্দেশ দেব।’ মা চোখ ঘুরিয়ে নেয়। অনীশ টিভির দিকে তাকায়। সেখানে পর পর অনেক মুখ আসছে-যাচ্ছে। সকলেই গম্ভীর। ব্যাকগ্র‌াউন্ডে টানা মিউজিক। সকাল না রাত বোঝা যাচ্ছে না। ডায়লগে বোঝা যাচ্ছে সংকটময় কোনও পরিস্থিতি। তবে বাড়িটা খুবই সাজানোগোছানো আর সবাই বেশ দামি জামাকাপড় চাপিয়েছে। এরা কারা? দেখে তো হাসি পাওয়ার কথা। মা’র মুখে হাসি নেই তো। চৈতালীর মাও হয়তো এই সময়ে এই সিরিয়ালটাই দেখছে।

"মহাভারতটাই আবার পড়ছি।"

অনীশ পাশের ঘরে যায়। ঢোকার সময় বাবা দরজা খুলে দিয়েছিল। এখন খাটে শুয়ে শুয়েই বই পড়ছে। ছোট টেবিলটার ওপরে রাখা ওষুধের ফয়েল, শিশি নেড়েচেড়ে দেখে নেয় অনীশ। ‘সব আছে তো?’

বাবা উঠে বসে। ‘হ্যাঁ আছে। যতদিন থাকে।’

‘এরকম বলছ কেন?’

‘আর কী বলব! পেনশনের টাকায় চলছি। ব্যাঙ্ক তো খালি করে ফেলেছি। যেটুকু আছে তার ইন্টারেস্টের যা বহর! এরপর তো বলছে ব্যাঙ্ক ফেল মেরে গেলে টাকাও নাকি ফেরত দেবে না। তোমার মা’র বা আমার যদি বড় কিছু হয় তাহলে আর কোনও চেষ্টা কোরো না। এমনিই যেতে দিও।’

‘কী বই পড়ছিলে?’

‘এই মহাভারত। টিভি আর দেখি না। দেখবই বা কী। কিছু হলেই একগাদা লোক টেবিলে বসে অসভ্যের মতো ঝগড়া করে। খবরের কাগজটা একটু চুপচাপ এই যা। তবু মাথা ধরে যায়। মহাভারতটাই আবার পড়ছি। দেখলাম কুরুক্ষেত্রে বড় বড় আঁকশি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাতে আঠা লাগানো। যুদ্ধের সময় সৈনিকদের চুল ধরে টানবে বলে। মানে তোমায় বিরক্ত করবে আর কী। মন অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেবে। হয়ে গেল তোমার যুদ্ধ করা। যা নেই ভারতে তা নেই ভারতে। ফেলে তো দেওয়া যাচ্ছে না কথাটা।’

অনীশ ফিরে আসে এবং তারপর ভারতবর্ষের বাজার যায়। হাসিমুখের খোঁজে। ওখানে কয়েকজন চেনা লোক আছে তার।

সবজির বাজারে প্র‌ায় সবাই মাসি। মেসোও আছে। কম। অনীশ গুটিগুটি তার নিজস্ব মাসির কাছে গিয়ে দাঁড়াতে সে চোখ তুলে চায়। ‘কী গো, আমি ভাবলুম তুমি বুঝি অন্য কোথাও থে বাজার নে চলে গেছ।’

বাজারে খুব কম্পিটিশন। এই যে তার এতদিনের বাঁধা খদ্দেরটি আর কোথাও চলে যায়নি সেজন্য কি একটু হাসতে পারত না সে? এই চিন্তায় থাকে বলেই কি?

‘না, কোথায় আর যাব।’ বলে অনীশ নানা রঙের সবজির ওপর চোখ বোলাতে থাকে। দেখতে বেশ ভালো লাগে। দাম জিজ্ঞেস করার আগে পর্যন্ত এটাই মধুর সময়।

‘বলো, কী দেব?’

অনীশ এমনভাবে দাম জানতে চেষ্টা করে যাতে বাজারদরের ওঠাপড়া সহজে গায়ে না লাগে। কিন্তু ঝিঙে, পটল, টমেটো, বেগুন, চিচিঙ্গে, গাঠিকচু, কাঁচালঙ্কা, ঢেঁড়শ, পুঁইশাকের পরিক্রমা শেষে তাকে বলতেই হয়, ‘কী নেব?’

‘আড়াইশো করে দি সব? গায়ে লাগবে নে। কী করি বলো, আমাদের তো হাত-পা বাঁধা। দাম একেবারে সেই ওপর থেকে চড়ে আছে।’

ওপরটা ঠিক কোথায় তা জানে না অনীশ। এই মহিলাও জানে বলে মনে হয় না। অনীশের হৃদয়ে যাতে ধাক্কা না লাগে তাই সে অল্প ওজনের একটা সহজ সমাধান দিতে চেয়েছিল। এরকম আগেও তো হয়েছে। এই পথেই হয়তো পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।

"ফড়ে, দালাল, উঠতি নেতা, মিনি গুন্ডাদের ছাউনি এগুলো।"

‘পিঁড়িতে এমনি করে বোস থেকে থেকে দুটো হাঁটুই গেছে। হপ্তায় তিনটে করে সুঁই ফুঁড়ে দিচ্ছে ডাক্তার। তাই নে রোজ অ্যাত্‌খানি রাস্তা উজিয়ে আসতে হয়। উপায় নেই তাই এসে বসি, বুঝলে। না হলে খাব কী!’

থলে হাতে হাঁটা দেয় অনীশ। এরা না এলে তারাই বা খাবে কী? রীতিমতো বৈধ সম্পর্ক। তবু হাসিমুখ মনে পড়ে না।

ফোনে টুং টাং। মেসেজ এল। ক্রেডিট কার্ডের অফার। মেট্রোর স্মার্ট কার্ড ছাড়া আর কিছু নেই অনীশের। বাকিগুলোর ব্যাপারে সে আনস্মার্ট। ফোন পকেটে ফিরিয়ে দিল।

হাঁটতে হাঁটতে লটারির দোকান, চায়ের ঠেক, সাইকেল স্ট্যান্ড, ঝালাইয়ের দোকান পেরিয়ে যায় অনীশ। সব জায়গাতেই চাকবাঁধা লোক। ফড়ে, দালাল, উঠতি নেতা, মিনি গুন্ডাদের ছাউনি এগুলো। জমি, বাড়ি ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে মানুষ অবধি হাতবদল হয়ে যায়। প্র‌কৃত অর্থে এরা মানুষের পাশে থাকতে চায়। অনীশ প্র‌কৃত অর্থে পৌঁছতে চাইছিল মুরগিদের কাছে।

চেনা মুরগিওয়ালা। একরকম সারা গায়েই রক্তের ছিটে নিয়ে বসে। অনীশ চাইছিল সে তাকে দেখে একটু হাসুক। কিন্তু সে শুধু চোখ নাচাল।

‘কী ব্যাপার, তোমার হেল্পার নেই কেন? পারবে একা সামলাতে?’ অনীশের সামনের লোকটি বলেছে কথাটা।

মুরগিওয়ালা বঁটিতে কচাং করে একটা মুরগির মুণ্ডু আলাদা করে ফেলল। সেটা যতক্ষণ ডানা ঝাপটাচ্ছে সেই ফাঁকটুকুতে সে বলতে লাগল, ‘আর বলবেন না। হেল্পার বাড়িতে, শরীর খারাপ। হাত-পা কাঁপছে নাকি। রোববারের বাজারে পুরো ফাঁসিয়ে দিয়েছে আমায়।’

আবার লোকটার কথা শুনতে পেল অনীশ। ‘কাঁপবেই তো। ওর কী হয়েছে জানি। রাতে যখন ঘুমোয় তখন সারাদিন ধরে যত মুরগি খুন করেছে সেগুলো ওকে তাড়া করে। ও ভয় পায়। তুমি বলো, তোমাকেও তাড়া করে না? কী?’

মুরগিওয়ালা এমনভাবে তাকাল, মনে হল তার চোখেও যেন এখন রক্তের ছিটে। ‘ও, আমরা খুন করি, আর আপনারা যে খান!’

অনীশ চমকে উঠতে গিয়েও সামলে নিল। নাঃ, মুরগি কিংবা পাঁঠা জবাই করাকে খুনের মধ্যে ধরা যায় না বোধহয়। লোকটা হাসির কথা বলছে। হাসছেও। পরে কি এর মুখ আর মনে করতে পারবে অনীশ?

কথা শেষ হয়নি মুরগিওয়ালার। সে বলে যাচ্ছিল, ‘এখন তো আবার ওই ভাগাড় কাণ্ডের পর থেকে টাটকা কেটে না দিলে কাস্টমার নিতেও চাইছে না।’

লোকটা বলল, ‘ভাগাড় নিয়ে ভেবে লাভ নেই। যা খাওয়ার খাওয়া হয়ে গেছে। ধরে নিতে হবে রিসাইক্‌ল হয়েছে। আমরা লোভে পড়ে খেয়েছি, ওরা লোভে পড়ে খাইয়েছে। আমরা তো ভাগাড়েই রয়েছি।’

‘আঃ, এখানে এসব কথা বলবেন না তো।’ পাশে এক মহিলা বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছেন। নাকে এমন হাত চাপা দিয়েছেন যেন ভাগাড়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

এইসময় পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘আরে মন্টু, কথা বন্ধ করে হাত চালাও। না হলে বলে দাও, অন্য কারও কাছে চলে যাচ্ছি। তাড়া আছে, একদম সময় নেই, খুব দেরি হয়ে গেছে আমার, বাড়িতে গেস্ট আসবে।’

অনীশ ভেবেছিল পিছন ফিরলেই একটা খরগোশ দেখতে পাবে। না, একটা লোক দাঁড়িয়ে। তবে তার কানদুটো বেশ লম্বা আর খাড়া। ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘড়ি দেখছে। পারলে এক্ষুনি কোনও গাছের গর্তে ঢুকে পড়ে।

মাছের বাজারের দিকে যেতে যেতে অনীশ তার ছোটমাসি, মেজকাকা, বড় শালির হাসিমুখ মনে করার চেষ্টায় ছিল। এরা তো তার আত্মীয়স্বজন। যদি জানতে পারে অনীশ ভুলে গেছে, তাহলে আঘাত পেতে পারে। জানতে পারবে না যদিও। এদের চেয়ে সে অনেক বেশিবার দেখতে পায় সেই ছেলেটিকে যে গ্যাস সিলিন্ডার দিতে আসে। আচার ও পাঁপড় বিক্রি করতে আসে যে সে তো হাসিকে রীতিমতো অপরাধ বলে মনে করে বোধহয়। কিছু না কিনলেও যে কাশ্মীরি শালওয়ালা শুধু দেখাই করতে আসে প্র‌তিবছর, তার হাসিমুখও কি মনে করতে পারবে না অনীশ? না, পারবে না। কারণ তার মুখে চিনার গাছ থেকে খসে যাওয়া পাতার ছায়া পড়ে।

"খোকা ইলিশ পাশশো, খোকা ইলিশ পাশশো। কে খাবে খাও। কচি মাথা চিবিয়ে খাও।"

এক একদিন সকালে কলিংবেলের শব্দে ঘুম থেকে উঠে অনীশকেই ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে যেতে হয়। দেখে, কোলাপসিবলের ওপাশে সুজাতা দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে পায়েসের কোনও বাটি নেই। আঙুলে প্যাঁচানো কাপড়ের ব্যাগের হাতল, ভেতরে ছাতা। কোনওদিন বলে, ‘অটোয় আট টাকা ভাড়া, জান দাদা, তাই হাঁটি। চল্লিশ মিনিটি হাঁটলে পরে পৌঁছে যাই।’ কোনওদিন বলে ‘মন্ত্রীর ছবি দেখিয়েছিল গো, বললে টাকা রাখো, কিছু হবে নে। ডবল হবে। আমিও লোভ করলুম। তা সে সব গেল। মেয়ের বাপকে বলতে পারিনি। জানলে আমায় পিটবে।’ কোনওদিন বলে, ‘এত বিষ্টি, হাঁটুর ওপ্‌রে জল। রাস্তাঘাট কে সারায় বলো দিকি। গরমেন্টের লোকগুলো সব পয়সা মেরে পেটমোটা হচ্চে। কাল ঘরে অবদি জল ঢুকে গেচিল।’

এতসব হাস্যকর কথা বলার সময় সে হাসে। তবে কাজের মেয়ের হাসিমুখ মনে করতে ভয় পায় অনীশ।

‘খোকা ইলিশ পাশশো, খোকা ইলিশ পাশশো। কে খাবে খাও। কচি মাথা চিবিয়ে খাও।’ চেঁচাচ্ছিল চেনা মাছওয়ালা। দুটো বাঁশের খুঁটির মাঝখানে খদ্দেরদের ঘাড় নিচু। জুলজুল করে তাকিয়ে রয়েছে রুপোলি বাচ্চাগুলোর দিকে। ওরা তো আর কোনওদিনই বলতে পারবে না, আমায় আনলি কেন, ফিরিয়ে দে। তাই অনীশ কোনওমতে মাথা গলিয়ে বলল, ‘এগুলো কেন এনেছ প্র‌শান্ত!’

প্র‌শান্ত খ্যাঁক করে ওঠামাত্র অনীশ বুঝতে পারে তার হাসিমুখ দেখার সম্ভাবনা বিলুপ্ত হয়ে গেল। ‘এ কি আমি ধরেছি নাকি! চালানে পেয়েছি, এনে বেচছি। দামে কম। ঘর ঘর পৌঁছে যাবে।’

অনীশের ডানপাশের লোকটি বলল, ‘জেনেশুনেই তো ফরম্যালিন দেওয়া অন্ধ্রের মাছ খাচ্ছি। এতে তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? বড় ইলিশ কিনতে পারব আমরা? হাজার-বারোশোয় উঠে যাবে। ওসব অন্যদের জন্য। যা পাওয়া যায় তাই তো খেয়ে নিই আগে।’

অনীশের বাঁপাশের লোকটি বলল, ‘আমরা তো শুধু ইলিশের মাথা খেতে চাইছি। তার চেয়ে বেশি কিছু তো নয়।’

ফরম্যালিনকেই বরণ করে নেয় অনীশ। হাঁটা দেয়। মুদির দোকান থেকে কয়েকটা জিনিস নেওয়ার আছে। সেটা বাসস্থানের কাছেই। তাছাড়া অন্তত আরও একটা সুযোগ হিসেবে দোকানির হাসিমুখ দেখার চেষ্টা করবে অনীশ। কিন্তু দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখে বাইপাস সার্জারির কথা ভুলে গিয়ে হালদারদা চেঁচাচ্ছে।

‘বাজে কথা বললি কেন তুই? দশ টাকার চিপ্‌সের প্যাকেটগুলো দিয়ে বলছিস কুড়ি টাকার দিয়েছিলি! ভাগ্যিস দুটো প্যাকেট রেখে দিয়েছিলাম। না হলে বলতিস আমি সব বেচে দিয়ে এখন মিথ্যে বলছি! যা, তোর বিল মেটাব না আমি। কোম্পানির লোককে দেখা করতে বলবি।’

"সোমবার অনীশ আবার মেট্রোয় চড়ে। অফিসে যেতে হবে তো।"

যাকে বলা হচ্ছে সেই ছোকরা কাঁচমাচু মুখে বলল, ‘আচ্ছা, আমি মাপ চাইছি কাকু। টাকা না নিয়ে গেলে চাকরি চলে যাবে।’

দোকানি টাকা গুনে ছুড়ে দিল তার দিকে। ‘যাঃ, আমার সঙ্গে আর কখনও এরকম চালাকি করবি না বলে দিলাম।’

ঝগড়ার ঠেলায় কয়েকজন খদ্দের প্র‌স্তরমূর্তিবৎ দাঁড়িয়ে। তবে তারা যেতেও পারবে না। সওদা করেই ফিরতে হবে সকলকে। অনীশ একটু সময় নেবে বলে খানিক দূরে চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রবিবারের মজলিশ চলছে। সেখানে সিনেমা বনিতাদের তুলনা, অনলাইনে জিন্‌সের দাম, সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জন্য শোকজ্ঞাপন, বিদেশি শিভাস রিগালের সঙ্গে কীভাবে স্বদেশি মদ মেশানো হচ্ছে, পারসোনাল লোনের ইন্টারেস্ট রেট, বিপত্তারিণীর তাগা বাঁধার সুফল ও গাড়োয়াল হিমালয়ের ট্রেকিং রুট সম্বন্ধে আলোচনা শোনার পর চায়ের গেলাস নামিয়ে অনীশ আবার মুদির দোকানে ফেরত যায়।

‘কী হয়েছিল হালদারদা?’

‘আরে ভাই কী বলব! আমরা ছোট দোকান, কোনও বড় কোম্পানির সেলস্‌ম্যান আমাদের কাছে আসে না। তারা সব চেন শপ, শপিং মলে যাবে। কিছু বলার নেই। ডিস্ট্রিবিউটারের লোক আমাদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে নেয়। করে কী, কোথাও থেকে দুটো প্যাকেট সরিয়ে রাখল, আমাকে বেচে দিল। আমার এখান থেকেও সরাতে পারে, অন্যকে বেচবে। আর নয়তো কম দামের মাল দিয়ে পরে বলবে বেশিরটা দিয়েছিলাম। ব্যস্ত সময়ে কত খেয়াল রাখব! তাছাড়া সবাই তো চেনা লোক। এই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলোকে দোষও দিতে পারি না। এদের মাইনে তো খুব কম। কী করবে? চুরি করে।’

অনীশ হতাশ হয়ে ফ্ল্যাটে ফেরে। আর কখনও মৃত্যুভয়ের সামনে পড়লেও কোনও হাসিমুখ যে ভেসে উঠবে না তা সে বেশ বুঝতে পারছিল।

বাজারের ব্যাগ নামিয়ে রেখে অনীশ ঘরে যায়। বিছানার ওপর খবরের কাগজটা পড়ে আছে। দেখতে ইচ্ছে করে না। চশমাটা খুলে রাখে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এলোমেলো চুল। কপালে, গলায় ঘাম চিকচিক। জামার ওপর দিকটা সেঁটে বসে রয়েছে গায়ে। ওই যে অনীশ গুহরায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মুখোমুখি, তাকে দেখে কেউ বলতে পারবে না তার প্রেশার কত, অর্শ আছে কিনা, কোন সাবান মাখে। এমনকী লোকটা শিক্ষিত কিনা তাও বোঝার উপায় নেই। সবচেয়ে বড় কথা, উলটোদিকে তাকিয়ে থেকেও অনীশ কিছুতেই মনে করতে পারছে না তার নিজের হাসিমুখটা কেমন।

আয়না ছেড়ে সরে যায় অনীশ। ফলে দেখতে পায় না যে, সে আয়নার সামনে থেকে চলে যাওয়ার পরেও আর একজন অনীশ আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়েই থাকে। সোজা বাইরের দিকে তাকিয়ে। সেই অনীশ দাঁত বের করতেই গালের দু’পাশের মাংস ফুলে ওঠে, চোখ কুঁচকে ছোট হয়ে যায়, চিবুক ছুঁচলো হয়ে আসে। সে হাসে। তারপর আস্তে আস্তে, একটু একটু করে পায়ের দিক থেকে মিলিয়ে যেতে থাকে। হাঁটু, কোমর, বুক, গলা— সব মুছে যায়। নেই হয়ে যায় মুখটাও। পড়ে থাকে শুধু হাসি। একসময় সেটাও ফুস করে উবে যায়।

সোমবার অনীশ আবার মেট্রোয় চড়ে। অফিসে যেতে হবে তো। তারপর থেকে রোজই যায়। কোথাও কোনও গণ্ডগোল নেই। ট্রেন সময়ে আসে। সময়েই পৌঁছে যায় সে। কোনওদিনই কারও হাসিমুখ মনে করার দরকারই পড়ে না অনীশের। তবে তার হাসিমুখ কেউ মনে করতে চায় কিনা তা জানার আপাতত কোনও উপায় নেই। যদি অন্য কোথাও অন্য কোনও অনীশ থেকে থাকে, সে অবশ্য আলাদা কথা।

অঙ্কন - জয়ন্ত বিশ্বাস
শেয়ার করুন: