চার নম্বর আমি

শমীক ঘোষ
একের পাতায় নীচের দিকের খবরটাতে চোখ আটকে গেল!

পারেও বাবা লোকে! এক ভদ্রলোকের পোষা বেড়াল হারিয়ে গেছে। আর তিনি সেই বেড়াল খুঁজতে পুলিশে ডায়রি করেছেন। পুলিশ খুঁজে দিতে পারেনি। তাই তিনি আদালতে পুলিশের নামে কেস করেছেন। আচ্ছা! পুলিশও কি বেড়াল নাকি যে লোকের বাড়ির পাঁচিল, কার্নিশ, গাড়ির তলা, আস্তাকুঁড়ের সুলুকসন্ধান জানবে?

এই বেড়াল পোষা লোকগুলো বেয়াক্কেলে হয়। অবশ্য বেড়াল জন্তুটাই বা কী? আমার মাথাটা বেশ গরম হয়ে গেল! আমি কটমট করে লালুর দিকে তাকালাম।

লালু টি-টেবিলটার ওপরে লেজ ঝুলিয়ে বসে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। কিন্তু ভয় পাওয়া দূরের কথা, লালু পালটা আমার দিকে খুব বিরক্ত হয়ে তাকাল। ইয়ার্কি হচ্ছে না কি? বাড়িতে আমার কোনও প্রেস্টিজ থাকবে না। আমি চোখদুটো আরও বড় করলাম। লালুও চোখগুলো পালটা বড় করল। তারপরেই হঠাৎ লাফ দিয়ে টেবিল থেকে নেমে অবিকল মানুষের মতো ‘মা মা’ বলে দু’বার ডেকে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

শুনতে পেলাম মা ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলার মতো আধো আধো গলা করে বলছে, ‘এয়েচ লালুবাবু! এচো! দুধ খাবে!’

"তোমার মেসেজ পেয়ে চমকে গেলাম!"

হুঁ! আদিখ্যেতা! আমি সকালবেলা ছ’নম্বর কাপ চা চেয়েছি বলে মুখ ঝামটা দিল। আর লালুকে জিজ্ঞাসা করছে দুধ খাবে কিনা। হায় মানুষজন্ম! এর থেকে বেড়াল হলে ভালো হত।

লালু হল মায়ের আদরের ছোট হুলো। একদম লালচে বাদামি রং। গায়ের ওপর আরও ঘন বাদামি ডোরা কাটা। আমার সঙ্গে সব সময়েই খুব খারাপ ব্যবহার করে। স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় আমাকে ও মোটেও পছন্দ করে না।

মায়ের অবশ্য ধারণা লালু আমাকে ভয় পায়। জানে তো আর না এই এতক্ষণ ধরে আমাকেই পালটা চোখ পাকাচ্ছিল। একমাত্র বড় হুলো ছাড়া লালুর কাউকে ভয় পায় না।

খবরের কাগজটা আবার তুলে নিলাম। চা তো আর দেবে না! হঠাৎ পাশে রাখা মোবাইলটা সামান্য একটু নড়ে উঠল। টুং করে আওয়াজ। আজ সকাল থেকেই মেসেজ আসছে। আরও আসবে। গতরাত্রে ঝাড়া তিন ঘণ্টা ধরে আমার কনট্যাক্ট লিস্টের প্রায় হাজার দেড়েক লোককে বিজয়ার শুভেচ্ছা মেসেজ করেছি। তারই উত্তর।

এই মেসেজটায় নাম দেখাচ্ছে না। শুধু নম্বর। ইংরিজি হরফে বাংলা লেখা। ‘তোমার মেসেজ পেয়ে চমকে গেলাম! আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম তুমি আর যোগাযোগ করবে না। আমাকে ভুলেই গেলে তুমি!’

সত্যিই তো, এই কনট্যাক্ট লিস্টের দেড় হাজারের ওপর লোকের অর্ধেককেই আমি চিনতে পারিনি। তারপর কয়েকটা নাম তো অদ্ভুত ভাবে সেভ করা। যেমন একটায় লেখা চৈতালী বয়ফ্রেন্ড থ্রি। এটা কি চৈতালীর তিন নম্বর বয়ফ্রেন্ড? না কি তার তিন নম্বর নম্বর? যদি তাই হবে তাহলে প্রথম দুটো নেই কেন?

উত্তর দিলাম এস এম এসটার। নম্বরটা চিনতে পারছি না। ‘একটু বলবেন আপনি কে?’

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জবাব এল। ‘আমাকেই ভুলে গিয়েছ। নম্বরের আর দোষ কী!’

আমি একটু ভড়কে গেলাম। ভুলে তো আমি কনট্যাক্ট লিস্টের কত লোককেই গিয়েছি। এর তো নম্বরই সেভ্‌ড নেই। কে হতে পারে? কেউ ইয়ার্কি মারছে নিশ্চয়। ভাবতে বেশি পারলাম না। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম। শেষ শরতের মিঠে কড়া রোদ।

"নমস্কার। আচ্ছা আপনিই কি আমাকে এসএমএস করেছেন?"

আবার এস এম এস এল। এবার আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। লেখা – ‘আমার সাথে এত কিছু করার পরও সত্যিই তুমি আমাকে ভুলে গেলে?’

‘করা’ শব্দটায় আমার চোখ আটকে গেল। করা। কী করেছি? আজকাল দিনকাল খারাপ। তাছাড়া আমার ইদানীং একটু নাম-টাম হচ্ছে। কিন্তু প্রথমেই কেচ্ছা। ফেঁসে যাব না তো?

ডাইনিং টেবিলে রাখা বোতলটা থেকে ঢক ঢক করে খানিকটা জল খেয়ে নিলাম। আবার টুং করে শব্দ। এই টুংটা অন্যরকম। ফেসবুক মেসেঞ্জারের। ফোনের এক কোণে এক মহিলার ছবি। অরুন্ধতী সেন। দেখতে বেশ ভালোই বলা চলে।

‘নমস্কার।’ এই কি এস এম এস করছে? আচ্ছা আমার ফেসবুক প্রোফাইলে ফোন নম্বরটা হাইড করেছি তো? দেখলাম। না করাই আছে।

‘নমস্কার। আচ্ছা আপনিই কি আমাকে এসএমএস করেছেন?’

ভদ্রমহিলাকে টাইপিং দেখাচ্ছিল। থমকালেন। আবার টাইপিং।

‘কই না তো। আমি তো এই প্রথম কথা বললাম। আসলে...’

‘আসলে?’

‘আসলে অনেকদিন ধরেই আপনি আমার ফেসবুক বন্ধু। কিন্তু একটা কথা বলব বলব করে কিছুতেই বলা হচ্ছে না।’

আমার ফেসবুক প্রোফাইলে চার হাজার আটশোজন বন্ধুর মধ্যে আটশোজনকেও আমি চিনি কিনা সন্দেহ!

‘কী?’

"দেখুন এসব কী বর্বর কাণ্ড হচ্ছে। এত বর বর করেছেন কেন?"

‘আসলে না আপনাকে অবিকল, মানে কী বলব, ভুল ভাববেন না...’

কী ভুল ভাবব? আমাকে অবিকল... কী?

‘আপনি না অবিকল আমার বরের মতো...।’

‘অ্যাঁ!’ কথাটা মুখ থেকে বেরোল। ভড়কে গিয়ে।

বাকিটা এবার এল। বাক্যের মাঝখানেই বোধহয় এন্টার মেরে ফেলেছেন, ‘...দেখতে!’

তাও ভালো বরের মতো দেখতে বলছে! কিন্তু এই কথাটারই বা মানে কী? বর কি সত্যিই আছে? না কি হবু বরের কথা বলছে? মানে এটা কী প্রেম প্রস্তাব? প্রোফাইলে দেখলাম ম্যারেড লেখা। যাক! তাহলে বরের মতো দেখতে হলেও সমস্যা নেই। পৃথিবীর কোনও মহিলাই বিয়ের পর তাঁর বরকে সহ্য করতে পারেন না। নিশ্চয় বরের মতো দেখতে কারও সঙ্গে তিনি পরকীয়া করতে চাইবেন না।

সাহস করে উত্তর দিলাম। ‘দেখুন এসব কী বর্বর কাণ্ড হচ্ছে। এত বর বর করেছেন কেন?’

তারপরেই হঠাৎ আমার একটা উদ্ভট কথা মনে হল। আচ্ছা, এই ভদ্রমহিলার স্বামী পালিয়ে যাননি তো? কী সাংঘাতিক! যদি কোথাও প্রক্সি দিতে বলে? কিংবা জোর জবরদস্তি আমাকেই বর বলে চালাতে চায়!

‘আপনি শেষ কবে আপনার বরকে দেখেছেন?’

‘দু’মাস আগে।’

যাহ! যা ভেবেছি তাই। ‘সে কী! কেন? উনি কি পালিয়ে গেছেন?’

কতগুলো হাসির স্মাইলি এল। ‘আপনি পারেনও বটে। না উনি এখন মুম্বাইতে পোস্টেড।’

‘দেখুন অনেকদিন না দেখে আপনার নিশ্চয় ভুল হচ্ছে। আমাকে আপনার বরের মতো দেখতে নয়। কিছুতেই নয়।’

‘ধুর মশাই।’ ভদ্রমহিলা অফলাইন হয়ে গেলেন।

বাঁচিয়েছে। উফ, একদিকে এস এম এস, আর একদিকে বরের মতো দেখতে। উঠে পড়লাম। দেখি লালু রান্নাঘরের দরজা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। আমাকে দেখেই পেছন ফিরল। তারপর ল্যাজটা তুলে দিল সোজা। প্রচণ্ড অপমানিত হয়ে আমি স্নান করতে ঢুকে পড়লাম।

আজকে পুরো দিনটাই ঘেঁটে গিয়েছে। ইচ্ছা করেই দাড়ি কাটলাম না। কোনওমতে জলটা ঢেলে বেরিয়ে এসেছি। দেখি ফোন বাজছে। আরে এ যে সেই এস এম এসের নাম্বার। তুলব না তুলব না করতে করতে তুলেই ফেললাম!

‘হ্যালো।’

"দেখুন, আপনি কোনও ভুল করছেন।"

‘আমি ভাবিনি তুমি ফোনটা তুলবে।’ ইংরাজি মাধ্যমে পড়া একটু সাহেবি কেতার বাংলা উচ্চারণ। এই গলাটা আমি শুনিনি কখনও।

‘দেখুন, আপনি কোনও ভুল করছেন।’

‘ভুল! আমি তো তোমাকে ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি আমার কোনও মেসেজেরই উত্তর দাওনি। আজ এই নম্বর থেকে মেসেজ এল... তুমি সত্যিই এত কিছুর পর এমন করতে পারলে? তোমার...’ গলাটা ধরে এল। ফোনটাও কেটে গেল তারপর।

‘করা!’ ‘এত কিছুর পর!’ কী করেছি আমি? করে ভুলে গেলাম না কি? আমার কি ডিমেনশিয়া হয়েছে? এ তো পুরোই কেস খাওয়াবে। আমি স্পষ্ট খবরের কাগজটা দেখতে পেলুম। আমার ছবি ছাপা হয়েছে। প্রথম পাতায় তিন কলাম। আমার কোমরে দড়ি পড়ানো। নীচে বড় বড় করে হেডলাইন। সহবাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার। না না, এ হতে পারে না। কেউ আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। এ নিশ্চয় ওই অরুন্ধতী।

ভদ্রমহিলাকে ফোন করলাম আবার।

‘বলো।’ একটু কান্না কান্না গলাটা।

‘আপনি অরুন্ধতী তাই না...’

কথাটা শেষ হল না। ‘কে অরুন্ধতী?’ রাগত গলা ভেসে এল।

‘আপনি অরুন্ধতী নন?’

‘তুমি এই ভাবে আমাকে অপমান করছ! তুমি আমার নামটাও ভুলে গেলে? নাকি ইচ্ছে করে আমাকে এইভাবে...’

‘শুনুন আমার নাম শমীক। আমি লেখালেখি করি...’

‘জানি তো। সেই জন্যই তো মেসেজ করেছিলাম। তোমার মেসেজের নীচে নাম লেখা ছিল।’

আমি পুরোই ঘাবড়ে গেলাম, ‘মানে...’

‘তুমি ম্যাগাজিন কর না?’

আমি ঢোক গিললাম। ‘করতাম তো। কিন্তু এখন আর করি না।’

‘ওহ সেইজন্যই! আচ্ছা দেখ জীবনে অনেক ফেলিওর আসে। তাছাড়া ম্যাগাজিন উঠে যাওয়াটা জীবনে কোনও ফেলিওর নয়।’

‘দেখুন, ম্যাগাজিনটা আমিই তুলে দিয়েছি। উঠে যায়নি।’

"টাকা ধার করেছিলাম না কি?"

‘কিন্তু আমাকে তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ কেন? ওই ম্যাগাজিন নিয়ে কত প্ল্যান ছিল তোমার। কিন্তু তারপর তুমি মুম্বাই চলে গেলে। আচ্ছা, তুমি এরকম পারলে কী করে।’

আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এও মুম্বাই! সত্যিই তো, ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে দিয়ে আমি মুম্বাই চলে গিয়েছিলাম।

‘টাকা ধার করেছিলাম না কি?’ যা হচ্ছে, এটাও জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম আমি। সাবধানের মার নেই।

‘টাকা! টাকার জন্য ফোন করেছি না কি আমি? তুমি আমাকে কী ভাব...’ গলাটা আবার ধরে এল। ‘না তোমাকে অনেকবার দিতে চেয়েছি। কিন্তু টাকা তুমি নাওনি। তোমার সঙ্গে আমার কি শুধু টাকার সম্পর্ক? তুমি ভাবতে পারলে এইভাবে আমি টাকার জন্য...’

টাকারও ঊর্ধ্বে সম্পর্ক! আমি খুব নার্ভাস হয়ে গেলাম। সাবধানে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। বলা যায় না এসব শুনতে পেলে মা...

‘আপনার নামটা একটু বলবেন? আমার মনে হচ্ছে কোনও ভুল হয়েছে।’ খুব সাবধানে কথাটা বললাম।

‘ওহ নাম! নামও জানেন না। আচ্ছা আমিও আপনিই বলছি তাহলে। আমার নাম সুরঞ্জনা। আচ্ছা আপনার নিশ্চয় এটাও মনে পড়ছে না যে জ্ঞানমঞ্চে নাটক দেখতে গিয়ে আমাদের আলাপ হয়েছিল। তুমি... আপনিই কথা বলেছিলেন। সব ভুলে গেলে এইভাবে। পারলে...’

ফোনটা কেটে গেল। আমি বিছানায় বসে পড়লাম। জ্ঞান মঞ্চে নাটক দেখতে অনেকবার গিয়েছি আমি। কিন্তু আমার তো কোনও সুরঞ্জনার সঙ্গে আলাপ হওয়ার কথা মনে পড়ছে না। আমি লোকের নাম ভুলে যাই। একবার নিজের ফোন নম্বর দিতে গিয়ে এক বান্ধবীর নাম্বার দিয়ে দিয়েছিলাম ভুল করে। আসলে নিজের নম্বর তো ডায়াল করা হয় না কখনও। ওইটাই বারবার ডায়াল করতে করতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে একটা গোটা সম্পর্ক ভুলে যাব?

চুপচাপ বসে মনে পড়ল, ক’দিন আগে অরণ্যদা আমাকে বলছিলেন, ‘এসব তোর ব্যাপারে কী শুনছি? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?’ অরণ্যদা নামি লেখক। আমি ভেবেছি লেখার কথা বলছে। টাকা না দিলে লেখা দেব না বলেছিলাম এক সম্পাদককে। কিন্তু আসলে কি তবে লেখার কথা না বলে অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল অরণ্যদা? সেদিন এড়িয়ে না গিয়ে ব্যাপারটা খোলসা করে নিলেই হত।

"শুধু সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গোঁজা মাত্র আবার ফোন এল।"

দুপুরবেলা খেতে দিল মা। পুজোর রেশ আছে বলে এখনও বেশ ভালো খাবারদাবার। অন্তত সেইরকমই হবার কথা। কিন্তু আমি কিছুই টের পেলাম না, কী খাচ্ছি। ভাবলাম মাকে একবার জিজ্ঞাসা করি, আমার মধ্যে পাগলামো বা স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে কিনা। করতেও গিয়েছিলাম। মুখ তুলে দেখলাম, মায়ের পায়ের কাছে লালু বসে আছে। আর মা মাথা নিচু করে ওকে দেখছে। আমি কিছু বলার আগেই মা বলল, ‘আচ্ছা লালু তোকে কেন এত ভয় পায় বল তো।’

আবার লালু! উফ! পাগলামোর কথা-টথা আর জিজ্ঞাসা করার সাহস হল না। কী দরকার। যদি মা বলে বসে,\ ঠিকই তো, এইজন্যই লালু তোকে দেখে ভয় পায়। আমি সন্তর্পণে উঠে পড়লাম। মুখ-টুখ ধুয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। সিগারেট টানলে মাথা খোলে। আমার খুলল না। শুধু সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গোঁজা মাত্র আবার ফোন এল। সেই সুরঞ্জনার।

‘হ্যালো।’

‘আমি কিছু মনে করিনি।’

আমার মুখ থেকে হতাশার অভিব্যক্তি বেরিয়েই গেল। সামলাতে পারলাম না।

‘তুমি তো বলেছিলে, ছোটবেলায় অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তুমি অনেক কিছুই মনে রাখতে পার না। মেমরির প্রবলেম আছে।’

বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। আরে আমি ছোটবেলায় খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। মা বলে। তারপর বহুদিন আমি যখন তখন অজ্ঞান হয়ে যেতাম। পরে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেরে যায়। আচ্ছা তাহলে কি আমি ধীরে ধীরে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছি? কিন্তু আমি তো একটু আগেই খেলাম। কী খেলাম? মনে করতে পারছি না তো। হে ভগবান!

‘খা... মানে কী অ্যাক্সিডেন্ট একটু বলবেন...’ এমনভাবে বললাম যাতে আমার নিজেরই মনে হল সুরঞ্জনা আমার থেকে আমার সম্পর্কে অনেক বেশি জানে।

‘ওই যে পড়ে গিয়েছিলে... বাস থেকে।’

বাস! যাক!

আমার আবার সাহস ফিরে এল। ‘দেখুন আমার মনে হচ্ছে আপনার ভুল হচ্ছে। আমি বাস থেকে কোনওদিন পড়িনি।’

‘তাহলে কোথা থেকে পড়েছিলে... ছিলেন?’

‘ইয়ে... বলছি কি, একবার দেখা করবেন? তাহলে আমার ধারণা আপনার ভুল ভাঙবে।’

‘দেখা! তুমি দেখা করবে? সত্যিই? সাড়ে পাঁচটায় পার্ক স্ট্রিটে? পারবে?’ উচ্ছ্বাস ঝরে ঝরে পড়ছে গলায়।

‘হুম! মেট্রো স্টেশনের সামনে?’

"অরুন্ধতীকে প্রায় জড়িয়ে বসে আছেন ওঁর হাজব্যান্ড।"

‘ডান। দেখা করো। যদি মনে পড়ে আমায়।’

আমার মনে পড়ল আমার সকাল থেকে দাড়ি কাটা হয়নি। বহুদিন আগে শ্যাম্পু করেছিলাম। চুলগুলো উসকোখুসকো। মনে হল এইভাবেই যাই। সুরঞ্জনা নিশ্চয় এই অবস্থায় আমাকে দেখার পর আর ফোন করবেন না। কী মনে হল, ফেসবুকটা খুলে ফোন নম্বর দিয়ে সার্চ দিলাম। সুরঞ্জনা বোস। বাঃ। বেশ দেখতে তো। বেশ স্মার্টও। সুবেশা তরুণী। আমার থেকে ছোটই হবে।

থাক। আর একবার স্নান করেইনি। ঘণ্টাখানেক পরে বেরোলেও হয়। শ্যাম্পু, দাড়ি কাটা সব হয়ে যাবে। বলা যায় না, এইভাবে একটা প্রেম...। একটা পালিয়ে যাওয়া শমীকের বদলে না-পালিয়ে দেখা করতে আসা শমীককে কি ভদ্রমহিলার ভালো লাগতে পারে না?

আবার টুং। ফোনের স্ক্রিনে এইবার সেই অরুন্ধতীর মুখ। মেসেজ করেছে।

‘বিশ্বাস করছিলেন না তো? এই দেখুন আমার হাজব্যান্ডেরর ছবি।’

অরুন্ধতীকে প্রায় জড়িয়ে বসে আছেন ওঁর হাজব্যান্ড। সত্যিই আমার মতো দেখতে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মুখটা দেখতে লাগলাম। প্রায় একই রকমের চোখ। একই রকমের নাক। হেয়ারস্টাইলটাও আমারই মতো। ডানদিকে সিঁথি করে। কিন্তু লোকটা খুবই আনস্মার্ট টাইপ দেখতে। তারপরেই মনে হল আরে লোকটাকে তো আমারই মতো দেখতে। তার মানে আমিও আনস্মার্ট? নার্ভাস হয়ে লোকটার ছবি আবার দেখতে লাগলাম। খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। না, এবার একটু যেন স্মার্ট লাগছে। বিশেষ করে বাঁদিক দিয়ে দেখলে। স্মার্ট, স্মার্টই তো!

তবু কেমন যেন কনফিডেন্সের অভাব মনে হল। আলমারিটা খুললাম। কোন শার্টটা পরা যায়? নাকি টি-শার্ট? একটা জ্যাকেট চাপিয়ে নেব ওপরে?

টি-শার্টেই স্মার্ট দেখাবে। সঙ্গে কালো জিন্‌স। কী মনে হল, মামাতো বোন প্যারিস থেকে একটা আফটার শেভ এনে দিয়েছিল। সেটাও বার করলাম।

আচ্ছা, সুরঞ্জনার পালিয়ে যাওয়া শমীক কি খুব স্মার্ট ছিল? আমাকে যদি ওর খুব আনস্মার্ট লাগে?

লটবহর নিয়ে বাথরুমে ঢুকছি। সেই লালু এবং মা। দুজনের চোখেই বিস্ময়।

‘তোর কি স্মৃতি-টিতি লোপ পেল?’

"মা বলছে, ‘পাগল!’"

‘মানে?’ আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম।

‘স্নান করলি তো একবার!’

‘বেরোতে হবে।’

আমি দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করতে করতে স্পষ্ট শুনলাম, মা বলছে, ‘পাগল!’

দাড়ি কাটলাম। শ্যাম্পু করবার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিতে আয়নার সামনে আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরালাম। আহা, এই নরম রোদে পার্ক স্ট্রিট দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা দুজন। আমি আর সুরঞ্জনা। বোস আর ঘোষ, কী চমৎকার পদবীর মিল। যেন ছন্দ। পালটি ঘরও। লোকে অবশ্য ভাবতে পারে আমি জাতপাত মানি। উফ। সে ভাবুকগে। আমি কি আজকেই আবার দেখা করার কথাটা পাড়ব? আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে দেখতে আবার অরুন্ধতীর বরের কথা মনে পড়ল। কী সাংঘাতিক! মহিলা পার্ক স্ট্রিটের দিকে থাকেন না তো? হয়তো সুরঞ্জনার সামনেই আমাকে এসে বললেন, এই তো আপনি। একদম আমার বরের মতো। হে ভগবান! অরুন্ধতী কোথায় থাকেন একবার জিজ্ঞাসা করব না কি?

পৃথিবীতে নাকি সাতজন মানুষকে একইরকম দেখতে হয়। আচ্ছা সুরঞ্জনা কি আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে ফেসবুকে সার্চ করেনি? পলাতক শমীককেও যদি আমার মতো দেখতে হয়? সুরঞ্জনাকে একবার ফোন করে আইডিয়াটা দেব? আবার অরুন্ধতীর হাজব্যান্ডের মুখটা মনে পড়ল। থাক। দেখে যদি আর না-ই দেখা করে? অন্য শমীককে কেমন দেখতে আমি জানি না।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে, সেজেগুজে, মুখে ফরাসি আফটার শেভ ঘষছি। হঠাৎ কী মনে হল। আবার সুরঞ্জনার প্রোফাইল খুললাম। দেখি তো অন্য ছবিগুলো। মেয়েটা কিন্তু বেশ। একটা ছবিতে এসে আমার চোখ আটকে গেল। হাসি হাসি সুরঞ্জনার পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের কোম্পানির রিজিওনাল হেড। সাত্যকি বোস। নীচে লেখা পাপা অ্যান্ড মি।

এবার আমি সত্যিই কেমন হতোদ্যম হয়ে পড়লাম। রিজিওনাল হেডের মেয়ের পালিয়ে যাওয়া স্মৃতিভ্রষ্ট প্রেমিক। কী সব করার পর!

স্পষ্ট দেখতে পেলাম সাত্যকি বোসের মুখটা। রাগে লাল হয়ে আছেন।

‘তুমি একটা স্কাউন্ড্রেল!’

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, স্যার!’

‘প্রোমোশন হবে না তোমার! কিছুতেই হবে না তোমার... আমি দেখে নেব কী করে হয়...’

আমি মাথা নাড়লাম। ‘প্লিজ স্যার!’

‘প্লিজ স্যার! তুমি... তুমি আমার মেয়ের সঙ্গে... আমার... আমার মেয়ের সঙ্গে... তুমি একটা গুড ফর নাথিং ইডিয়ট, একটা ফালতু কিচ্ছু না করতে পারা...’

সম্বোধনগুলো অনেকক্ষণ চলল। আমি আবার মাথা হেলিয়ে, গলায় মায়া এনে, সব কিছু মেনে নেওয়ার ভঙ্গিতে কাচুমাচু হয়ে বললাম, ‘স্যার!’

‘ইউ আর ফায়ার্ড। তোমাকে রাস্তায় বসিয়ে দেব আমি।’ সাত্যকি এবার চিৎকার করছেন।

সাত্যকি বোসের কেবিনে আর নেই আমি। বসে আছি পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায়। চট পেতে। সামনে থালায় খুচরো পয়সা। দূর থেকে হেঁটে আসছে সাত্যকি আর সুরঞ্জনা। আমার সামনে এসে দাঁড়াল সুরঞ্জনা। পার্স থেকে একটা দশ টাকার কয়েন ছুড়ে দিল থালাটায়। কয়েনটা পড়ল। ঠং...

"মাথা খারাপ হয়ে গেছে।"

‘নাহ!’ চিৎকার করে উঠলাম আমি।

ঘরের বাইরে থেকে মা চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ডাকছিস?’

আমিও পালটা চেঁচালাম। ‘চুপ করে থাকো।’

মাও চিৎকার করল, ‘মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’

উত্তর দিলাম না। এখন এসবে মাথা দেওয়া যাবে না। আবার ফোনটা তুললাম। ডায়াল করলাম।

‘হ্যালো, আসছ তো...’ সুরঞ্জনার গলায় একরাশ হাসি।

‘ম্যাম! মানে শুনুন... মানে আসলে ম্যাম... আপনি সাত্যকি স্যারের কেউ... মানে...’

‘তুমি পাপাকে চেন না কি? ওহ মাই গড! তুমি পাপাকেই মেসেজটা পাঠিয়েছিলে।’

‘বিশ্বাস করুন ম্যাম, আমি জানি না আপনার নম্বর আমার কাছে ছিল না তবু কী করে যে আপনি আমার মেসেজটা...’

‘ওহ! আরে পাপা তো মুম্বাইতে। ফোনটা ফেলে গিয়েছে। আমার ফোনটা খারাপ তাই ডুয়াল সিমে আমার সিমটা... আমার দেখা উচিত ছিল। আই অ্যাম সো সরি... আপনিও কী শমীক পাল?’

‘না না দেখুন! আমি শমীক ঘোষ। কিন্তু সাত্যকি স্যারকে কিচ্ছু বলার দরকার নেই। আর দেখা করারও দরকার নেই। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ... মানে ম্যাম আমি... মানে ক্ষমা... মানে...’

এইবার থেকে আর কাউকে শুভেচ্ছার মেসেজ পাঠাব না। বিজয়া, নিউ ইয়ার হোলি, ক্রিসমাস, ঈদ – কিছুতেই না। যদি বা পাঠাই, তাহলেও পুরো নামটা লিখব।

প্রথমে ফেসবুকে ঢুকে ওই অরুন্ধতীকে ব্লক করলাম। বরের মতো! হুঁ! তারপর দেখব বর আমার অফিসের কার নাতজামাই! জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। পিঠের কাছ থেকে নরম কী একটা হুশ করে সরে গেল। লালু।

"...আরে না, সত্যি বলছি, ও বড় হুলো বেড়াল নয়, না রে, সত্যি না... আরে ও মানুষ..."

‘মা! তোমার লালুকে সামলাও।’ আমি গর্জে উঠলাম।

মা এসে লালুকে নিয়ে বসার ঘরে গিয়ে সোফাসেটে বসে আহ্লাদ করতে লাগল।

চুপ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর কী মনে হল। কান পাতলাম। মা এখনও লালুকে আদর করতে করতে কী সব বলে যাচ্ছে।

‘...আরে না, সত্যি বলছি, ও বড় হুলো বেড়াল নয়, না রে, সত্যি না... আরে ও মানুষ...’

আমি ঘাবড়ে গিয়ে উঠে বসলাম। একজন আমাকে তার পলাতক প্রেমিক ভেবেছে, একজনের বক্তব্য আমাকে তার বরের মতো দেখতে। আর আমার মায়ের সাধের বেড়ালের ধারণা আমি একটা হুলো বেড়াল!

ধীর পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চুলটা ঘেঁটে গিয়েছে। চোখদুটো বড় বড়। নাকটা একটু ফোলা। মুখের চামড়া এবড়োখেবড়ো। আচ্ছা আমি কি সত্যিই আমি?

অঙ্কন - জয়ন্ত বিশ্বাস
শেয়ার করুন: