করোনেশন ব্রিজ থেকে ঝুলছি, গুলিটা বুকে লাগলেই সেদিন...

তাঁর ছোটদের উপন্যাস পড়ে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যায়। অথচ সেই তিনিই ছোট থেকে বিষাদগ্রস্ত। আত্মহত্যা অবধি করতে চেয়েছিলেন। ছোটবেলায় জ্যোতিষী বলেছিল এই ছেলে সন্ন্যাস নেবেই। মৃত্যু, পাগলামো, ধর্ম, নারী - অকপট শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি শমীক ঘোষ

“আমার সামনে বিশাল একটা ব্রহ্মপুত্র। প্রবল স্রোত। কাকভোর। সবে সূর্য উঠেছে। ভালো করে দিনের আলো ফোটেনি তখনও। জলে নেমে আমি দণ্ডিটা ভাসিয়ে দিয়েছি। গেরুয়া একটা বস্ত্র খরস্রোতা জলে ভেসে দূরে চলে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে যেন একটা সন্ন্যাসীর শবদেহ ভেসে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে মনে হল যে গৈরিক আলোয় চারদিক ঢেকে যাচ্ছে। ভোরের আলোয় মিশে যাচ্ছে গেরুয়া রং। আবছা আলোয় সামনে আদিগন্ত পাহাড়। বিরাট আকাশ। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মুহূর্তে যেন সংসার জগৎ সব ভুলে গেলাম। কোথায় ফিরব আমি আর? কেন ফিরব? শেকড় ছিঁড়ে যেন উঠে এসেছি। হোয়াই শ্যুড আই গেট ব্যাক টু মাই হোম?”

একটানা কথা বলে যাচ্ছেন শীর্ষেন্দুদা। উপন্যাসের ভাষাই যেন উঠে এসেছে তাঁর মুখের বয়ানে। বাইরে ঝাঁ ঝাঁ রোদ। কাক ডাকছে। ঘরের ভিতর এদিকে ওদিকে ছড়ানো পুরস্কারের স্মারক। সোফায় বসে শীর্ষেন্দুদা কথা বলে যাচ্ছেন। তাঁর মুখ চোখে আশ্চর্য প্রশান্তি। সেটাই যেন ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা ঘরে।

"হঠাৎ করে আমার মনে হত যেন সব কিছু অবাস্তব।"

“তারপর?”

“ওই গেরুয়ার মধ্যে যেন আশ্চর্য বিষাদ। আমি সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছি। বাহ্যজ্ঞানহীন। মন্ত্রমুগ্ধ। আমার জ্ঞাতিভাই তারাপ্রসাদ দাঁড়িয়ে ছিল পাড়ে। আমি উঠছি না দেখে আমাকে ডাকনাম ধরে ডাকছে, রুনু! রুনু! কিন্তু আমি যেন শুনেও শুনতে পাচ্ছি না। উঠে আসতে পারছি না। জলে নেমে ও-ই আমাকে হাত ধরে টেনে তুলল।”

“অথচ এই বিষাদের জন্যই তো আপনার মা পৈতের ব্যবস্থা করেছিলেন?”

“হ্যাঁ। তবে ওই বিষাদটার তো কোনও বাস্তব কারণ ছিল না। এটা আমার একদম ছোটবেলা থেকেই। ছয় সাত বছর বয়স থেকে। হঠাৎ করে আমার মনে হত যেন সব কিছু অবাস্তব। আমার চারপাশে যা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তার সঙ্গে যেন আমার কোনও সম্পর্কই নেই। আমি যেন একটা মূর্তিমান এলিয়েন। এখানে সব কিছুই খুব অচেনা আমার কাছে। এইগুলো কেন? এইগুলো কী? সব কিছু কারণহীন, যুক্তিহীন হয়ে যেত। অদ্ভুত টালমাটাল। মাথার মধ্যে সবকিছু যেন ঘোঁট পাকিয়ে গিয়েছে। আমি দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম। খুব বেশিক্ষণ এটা হতো না। বড়জোর পাঁচ মিনিট।”

“আচ্ছা!”

“মা ভয় পেয়ে জ্যোতিষী ডাকলেন। তাঁরা এসে নানা কথা বলতেন। আইএসসিতে ভর্তি হলাম। বিজ্ঞান পড়ছি। পড়তে পড়তে অণু-পরমাণু এইসব জানলাম। ভাবতে ভাবতে মনে হল, তাহলে কি আমরা পরমাণুময়? গোটা পৃথিবীটাই শুধু পরমাণুর সমষ্টি? আবার বিষাদে চলে গেলাম। এমন অবস্থা হস্টেল থেকে বাড়িতে ফিরে আসতে হল। সেই সময়ে আমরা অসমের আমিনগাঁওতে থাকি। আমার নাকি কুষ্টিতে একটা সন্ন্যাস যোগ ছিল। মানে ওই সপ্তম ঘরে পা দিলে সন্ন্যাসযোগ ইত্যাদি কী সব ছিল। ফলে ছেলেকে তো আটকাতে হবে। মা, আমার পৈতে দিয়ে দিলেন।”

“যাঁদের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি হয়, তাঁদের এই ধরণের কিছু অভিজ্ঞতা থাকে বলে শুনেছি...”

“আমি নিজেকে কিন্তু খুব একটা আধ্যাত্মিক লোক বলে মনে করি না,” বলে উঠলেন শীর্ষেন্দুদা। “শুধু বেঁচে থাকার জন্য, অস্তিত্বের জন্য যে লড়াই আমি সারাজীবন করেছি, তাতে আধ্যাত্মিকতা কতখানি কী হয়েছে আমি জানি না। ঠাকুরের (শ্রী শ্রী অনুকূলচন্দ্র) সন্ধান আমি পেয়েছি অনেক পরে। প্রায় আঠাশ-উনত্রিশ বছর বয়সে। ঠাকুর আমাকে মহা সর্বনাশ থেকে রক্ষা করেছেন।”

“আপনি নাকি সেই সময় সুইসাইড করবেন বলে ঠিক করেছিলেন?”

“তার কারণও ওই বিষাদ। বিএ পড়ার সময়েও একবার হয়েছিল। মারাত্মক। সেটাও প্রায় এক মাস ছিল। খেতে পারতাম না। ঘুমোতে পারতাম না। সবসময় একটা চিন্তা ঘুরছে মনে। টিংটিঙে রোগা হয়ে গিয়েছিলাম মনে আছে। তার পর আবার ওই আঠাশ উনত্রিশ বছর বয়সে। সেই চূড়ান্ত বিষাদগ্রস্ততা। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার পক্ষে আর বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না। আমি বুঝতে পারছিলাম অস্তিত্বটাই আমার কাছে একদম বিবর্ণ – ছাইবর্ণ হয়ে গিয়েছে। সেই সময় আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম, আই হ্যাভ টু কমিট সুইসাইড।”

"কিন্তু আপনি তো তখন নাস্তিক। কী করে বুঝলেন উনিই গুরু?"

গলা উঠছে না একদম। একটানা ধীর লয়ে কথা বলে যাচ্ছেন তিনি। সোফায় তাঁর মাথার একটু বাঁদিকে বিরাট একটা ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকুলচন্দ্রের ছবি টাঙানো।

“ওঁর কাছে গেলেন কী ভাবে?”

“আমার এক বন্ধু ছিল ঠাকুরের শিষ্য। সেই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। আমি সে সময় নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছিল যদি ভালো না লাগে আর যেতে হবে না। খুব অনিচ্ছার সঙ্গে গিয়েছিলাম। তখন আমার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাঁচার তো একটা জৈবিক তাগিদ থাকে। সত্যিই মৃত্যু চাই না। আসলে বাঁচতেই চাই। জীবনকে আঁকড়ে ধরতে চাই। আর পাঁচটা লোক বেঁচে আছে হেসে খেলে। কিন্তু আমি পারছি না। ওখানে গিয়ে জীবনটা বদলে গেল!”

“কিন্তু আপনি তো তখন নাস্তিক। কী করে বুঝলেন উনিই গুরু?”

“আধ্যাত্মিক কোনও সন্ধানে তো যাইনি। ঈশ্বরের সন্ধান করতেও নয়। গিয়েছিলাম শুধু জানতে ইজ দেয়ার এনি ওয়ে টু লিভ? ঠাকুরের চোখের দিকে তাকাতেই মনে হল এইরকম কোনও চোখ আমি কোনওদিন দেখিনি। যেন আমাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেখতে পাচ্ছেন। ওই চোখের বর্ণনা আমি অনেকবার চেষ্টা করেও দিতে পারিনি। সেই সময় আমি সামান্য লেখালেখি করি। লব্ধপ্রতিষ্ঠ নই। ঠাকুরে কাছে তখন অনেক নামীদামি মানুষের ভিড়। অথচ ঠাকুর যেন আমাকে আপন করে নিলেন। কী যেন একটা ঘটল। সেটা অনুভব করেছিলাম। এর কোনও ব্যাখ্যা হয় না।”

“আচ্ছা, তারপর থেকেই সব বদলাতে শুরু করল?”

"কিন্তু এখন ধর্মই তো অধর্মের মূল কারণ।"

“ঠাকুরকেই আঁকড়ে ধরলাম। ওটাই আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। একটা পথনির্দেশ যেন পেলাম। কী ভাবে বাঁচতে হবে, শিখলাম। এটাকেই ধর্ম বলে। ধর্মাচরণ মানে তো জীবনযাপন। জীবনের সব কিছুতেই ধর্ম আছে। সকালে বিকেলে ধ্যান করাটাই কিন্তু শুধু ধর্ম নয়। ধর্ম মানে আসলে জীবনের ধর্মকেই পালন করা। যা করা উচিত তা করা। তবে আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করো আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন? আমি কিন্তু ঠিক বলতে পারব না। কিছুটা নাস্তিকতা এখনও আমার মধ্যে আছে।”

“কিন্তু এখন ধর্মই তো অধর্মের মূল কারণ।”

“বটেই। একশোবার। ধর্ম আর ধর্মের বিকার এইদুটো পাশাপাশি থাকে। একটা ভালো জিনিস তৈরি হলে তার নকলটাও বেরিয়ে যায়। একটা অরিজিনাল ব্র্যান্ডেড জিনিসের নকল পাওয়া যায় না? ধর্ম এমন একটা জিনিস যা মানি স্পিনার। ধর্মাচরণের সব সময় একটা ব্যবসার দিক আছে। ধর্ম হচ্ছে ঈশ্বরের নাম করে ব্যবসা। ধর্মকে তো কাজে লাগানোই হচ্ছে। রাজনীতিতেও হচ্ছে। পপুলার জিনিসকে লোকে তো কাজে লাগাবেই। ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় সব ধর্ম নিয়েই এইগুলো হয়েছে। ইসলামের নামে যা হচ্ছে, মৌলবাদ, সেটা কি সত্যিই ইসলাম? ক্রিশ্চানিটির নামেও একদিন হয়েছিল। এখন হিন্দুত্বের নামেও হয়েছে।এই যে কিছু সমাজকর্মীকে খুন করা হল। ধরে নিয়ে যাওয়া হল কদিন আগেই। এইগুলো তো ধর্মের বিকার। কিন্তু ধর্ম নিয়ে ব্যবসা হচ্ছে, ধর্ম নিয়ে খুনখারাপি হচ্ছে তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে দাও, এটাও হয় না। মাথা ব্যথা হলে কি মাথাটা কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া যায়?”

“ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ বোধহয় ’৬৫ সালে। ’৬৭ সালে ঘুণপোকা লিখলেন। বস গালাগাল দিল বলে শ্যাম পাগল হয়ে গেল। আয়না নিয়ে খেলতে খেলতে তার মনে হল রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটা লোককে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করিয়েছে। অদ্ভুত! অসম্ভব এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস! অথচ ঘুণপোকা লিখছেন। কিন্তু জীবনে তো তখন কোথাও পোঁছে গিয়েছেন?”

‘পৌঁছনো কিন্তু হয়নি। এখনও হয়নি। পুরো জীবনটাই তো একটা জার্নি। আসলে পৌঁছই কিনা আমরা জানি না। কিন্তু একটা টার্গেট লক্ষ্য করে চলি। সেটা হয়তো এক জীবনে হয় না। তখন তো সবে ঠাকুরের কাছে নত হয়েছি। ’৬৭ সালে আমার ঘুণপোকা বার হল। আমার লেখার মধ্যে একটা প্রভাব এল। সেটা হলো পজিটিভিটি। নেগেটিভিটিটা আস্তে আমার লেখা থেকে চলে গেল। সোজা কথা হল মানুষ যে বেঁচে থাকে সেটা তো মরে যাওয়ার জন্য নয়। এটা আসলে মৃত্যুর বিরুদ্ধে একটা অবিরাম যুদ্ধ। হেমিংওয়ের একটা কথা আছে, ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-এর মধ্যে। একজন বুড়ো মানুষ যুদ্ধে গিয়েছে। তাকে দেখে একজন যুবক ঠাট্টা করে বলছে, তুমি বুড়ো, তুমি এখানে কী করছ? তখন সেই বৃদ্ধ মানুষটা বলেছিল, হ্যাঁ আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ, যে মৃত্যু আসার আগে অবধি বেঁচে আছি। এই কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল।

"আকাশ কাউকে পাগল করে দিতে পারে?"

“সবাই বলে প্রথম উপন্যাস আত্মজৈবনিক।”

“আত্ম লেখায় কিছুটা ঢোকে। পুরোটা নয়। তবে কিছুটা নিশ্চই। ঘুণপোকার মধ্যেও আমি আছি। দেখো, দেশ স্বাধীন হল কিন্তু আমরা সেই আনন্দটা তো করতে পারলাম না। একটা গোটা দেশ চলে গেল। একদিন সকালে উঠে আমরা দেখছি আমাদের দেশ নেই। আমাদের আসল দেশ ঢাকা। কিন্তু ময়মনসিংহে আমাদের বাড়িঘর ছিল। ওখানেই আমার জন্ম হয়েছিল। হঠাৎ সকালে উঠে দেখলাম পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। সবাই উল্লাস প্রকাশ করছে। আমাদের দেশ নয় আর এটা। অদ্ভুত একটা ধাক্কা মানুষের জীবনে। বিশাল একটা ট্র্যাজিক ধাক্কা। এটা তো কখনও আমাকে খুব একটা খুশি করেনি। এইগুলো কিন্তু ঘুণপোকার মধ্যে আছে। মা-বাবা ওই পারে রয়ে গিয়েছে। মায়ের কথা মনে পড়ছে। বাবা চিঠিতে কী লিখছে না লিখছে।”

“ ‘পারাপার’ উপন্যাসে একটা লোক আকাশের কথা ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে গেল। আকাশ কাউকে পাগল করে দিতে পারে?”

“আকাশ মানে কী? তুমি একটা কথা ভাবো, একটা মানুষ যদি ক্রমাগত অসীমের কথা চিন্তা করতে শুরু করে তাহলে সে কী হবে? সাইকিয়াট্রিস্টরা বলেন,একটা থ্রেশহোল্ড আছে, সেটাকে অতিক্রম করে ফেললেই তুমি পাগল হয়ে যাবে। তারপর আর ফেরা যাবে না। অসীমকে ভাবতে নেই। আমাদের নিজেদের তো সীমা আছে। আমাদের ব্রেন ফাইনাইট। তাই তো আমরা ইনফিনিটিকে ভাবতে পারি না। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে অসীমকে ভাবা যেতে পারে? অসীমকে তখনই ভাবা যেতে পারে যখন তোমার পাত্র বড় হবে। তুমি সেটাকে ধারণ করতে পারো। যদি ততটা আধ্যাত্মিক উন্নয়নের সম্ভব হয়। গার্গী যাজ্ঞবল্ককে বলেছিল, পরম ব্রহ্ম কীসে সংলগ্ন হয়ে আছে? এই প্রশ্নের যাজ্ঞবল্ক রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সাবধান গার্গী আর এগিও না, তোমার মুণ্ড খসে পড়বে। অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন গার্গী তখন ভয় পেয়ে বসে পড়েছিল। এইখানেই সেই সতর্কবাণী। এরপরে আর প্রশ্ন হয় না। এরপরে প্রশ্ন কোরো না। এরপর প্রশ্ন করলে তুমি কিন্তু উন্মাদের জগতে চলে যাবে। এই যে আকাশ মানুষের মাথায় চলে যাওয়া। আমার নিজের যেমন হতো। সেইসময় আমার মনে হতো আমি আর স্বাভাবিক নেই। অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছি।”

“ছেলেবেলায় একবার নাকি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন?”

“এমনি ম্যালেরিয়া, মালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া, সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া – এই তিনরকম ম্যালেরিয়াই আমার হয়ে গিয়েছে। ছোটবেলায় হয়েছিল সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া।আমরা তখন মাল জংশনে থাকে। তখন মাল জংশন একেবারে ছোট্ট একটা জায়গা। কোনও লোকজন নেই। চা বাগান, জঙ্গল, পাহাড়ের মধ্যে একটা ছোট্ট স্টেশন। ওই স্টেশনের আশেপাশেই বাঙালি কেরানিবাবুদের বাস ছিল। সারাদিনে দুটোমাত্র ট্রেন আসত যেত। কাঠের বাংলো ছিল। সে বাংলোটা এখনও আছে।একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। ক’দিন আগেই গিয়েছিলাম। আর বহুদূরে একটা ছোট্ট দোকান ছিল। সেই দোকানটাই ওখানকার ডিপার্টমেন্টাল স্টোর।”

“ওখানেই সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া হল?”

“তখনকার দিনে জ্বর কমানোর কোনও ওষুধ ছিল না। আমি কোমায় চলে গিয়েছিলাম। পাকে খান বলে এক ডাক্তার ছিলেন ওখানে। রেলের ডাক্তার। আমরা মজা করে বলতান পোকা খান। উনি অন্য কোনও চিকিৎসা তেমন করতে পারতেন না। কিন্তু ম্যালেরিয়ার খুব ভালো চিকিৎসা করতেন।

সেই সময় ঘোরের মধ্যে আমি দেখেছিলাম করোনেশন ব্রিজে একটা দড়ি ধরে আমি ঝুলছি। আর একজন লোক আমাকে গুলি করছে। আমি আতঙ্কে চিৎকার করছি। ডাক্তার বসেছিলেন আমার পাশে। নাড়ি ধরে। ইঞ্জেকশন দিচ্ছে। শেষে যখন আমি চিকিৎসায় রেসপন্ড করলাম তখন পাকে খান ‘হে আল্লা’ বলে বাবাকে বললেন, বাচ্চা বেঁচে গেছে। আর চিন্তা নেই। তবে আরেকটু হলেই কিছু একটা হয়ে যেতে পারত। আমি সেরে ওঠার পরে আমাকে উনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন,আমি চিৎকার করছিলাম কেন। সব শুনে উনি আমাকে বলেছিলেন, একটা গুলিও যদি তোর বুকে লাগত তাহলেই তোর হার্টফেল হয়ে যেত।”

"লেখালেখির শুরু ওই ছোটবেলাতেই?"

হাসতে থাকেন শীর্ষেন্দু’দা।

“এই যে বিষাদ, অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা, এখন বললেন এই কোমার মধ্যে দেখার স্বপ্নের কথা, আপনার কখনও মনে হয় না যে সব কিছু যেন আগে থেকেই ঠিক করা।”

“তুমি দেখ আমার হাতে আংটি টাংটি কিচ্ছু নেই। আমি ওসব মানিও না। কিন্তু এটা ঠিক মনে হয় যে ভাগ্য একটা তো আছেই। কোনও সময় কোনও কিছু ঘটে গেল। সেটা মনে হয় আগে থেকে ঠিক ছিল। তা না হলে এটা হবে কেন? আমার মতো একটা নাস্তিক কেন ঠাকুরের কাছে গেল? নিশ্চয় পূর্ব নির্দিষ্ট কিছু ছিল।কাজেই এটাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না।”

“লেখালেখির শুরু ওই ছোটবেলাতেই?”

“ছেলেবেলা থেকে আমার একটা লেখার ঝোঁক ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র আমার মাথাটা খেয়েছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই আমার পড়ার একটা ভীষণ নেশা ছিল। পড়া আর খেলা। কিন্তু মফস্বলে তো আর বই পাওয়া যেত না। সে আমলে বাচ্চাদের বই কিনে দেওয়ারও চল ছিল না। একটা দুটো বই পেতাম। তারপর যখন ছোটদের বই নেই তখন বড়দের বই পড়তাম। সাত বছর বয়সে আমি শরদিন্দুর বই পড়তে আরম্ভ করলাম। বঙ্কিম পড়তে এত ভালো লাগত, ওঁর বাংলায় উদ্বুদ্ধ হলাম। খাতার মধ্যে বঙ্কিমি বাংলায় লিখে রাখতাম। অনেক জায়গায় ওই লেখা গল্প বলে পাঠিয়ে দিতাম। সেগুলো ফেরত আসত। মা আবার সেগুলো লুকিয়ে রাখত। কোচবিহারে থাকতে স্কুল কলেজ ম্যাগাজিনে লিখতাম। তারপর সব বন্ধ হয়ে গেল। এমএ ক্লাসে যখন পড়ি তখন আমাদের এক বন্ধুর লেখা বার হত দেশে। সেই জানলাম নতুনদের লেখা ছাপা হয় দেশ পত্রিকায়। তিন চারজন ছিলাম, লিখতে শুরু করলাম। আমার তৃতীয় লেখাটা ছাপা হয়ে গেল। এর পরেই খুব দ্রুত আমি দেশ পত্রিকার লেখক হয়ে উঠলাম। এটা আমার পক্ষে অবিশ্বাস্য ছিল। আমি দুটো গল্প লিখে পুজো সংখ্যায় লেখার জন্য সুযোগ পেয়েছি।তখনকার দিনে এটা প্রায় যে কোটি টাকার স্বপ্ন।”

“বঙ্কিম ছাড়া আর কার কার লেখা ভালো লাগত?”

“আমি আসলে দস্তেয়ভস্কির খুব ভক্ত ছিলাম। থমাস মান, জয়েস, আলবেয়রঁ কামু, শোপেনহাওয়ার আর বঙ্কিম। জীবনানন্দ দাশ। মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এঁরা আমাকে খুব প্রভাবিত করেছেন। ছেলেবেলায় মা রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ত ঘুম পাড়াতে। ওটাও আমার মাথা খেয়ে ফেলেছিল। কবিতার প্রতি যে আমার ভয়ংকর ভালোবাসা তার কারণই হচ্ছে মা।

“দু’বছর ধরে একটা গল্প লিখেছিলেন।”

“পরবর্তীকালে খুব সচেতন ভাবে এঁদের সকলের প্রভাব আমি আমার লেখা থেকে সরিয়ে ফেলেছি। আমি নিজস্ব গদ্যের জন্য খুব লড়াই করেছিলাম প্রায় দু’বছর আড়াই বছর ধরে। স্বপ্নের ভিতরে মৃত্যু লিখছি তখন। দু’বছর ধরে ওই একটা গল্পই লিখে গেছি। বারবার লিখে গেছি।”

“ ‘পার্থিব’ উপন্যাসে, ছেলে কৃষ্ণজীবন যা ভাবে, তা আসলে যেন তার বাবা বিষ্ণুচরণের চিন্তা। আপনার অনেক লেখার মধ্যেই শেকড়ে ফেরার একটা ঈঙ্গিত আছে।’’

ম্লান হাসলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এইবার। ‘আসে। আসে। তার মানে কিন্তু নস্টালজিয়া নয়। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। মান্যতা দেওয়া। যে বৃক্ষ থেকে আমি জাত হয়েছি, মা বাবাও তো সেই বৃক্ষের অংশ। আমি তো একটা উটকো ধূমকেতু নই। আমাদের একটা ঐতিহ্য আছে। বংশধারা আছে। আমরা একটা চেনের লিংক। এইটাকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমাদের শ্রাদ্ধাদি বা পৈতে যখন হয়, তখন পূর্বপুরুষকে জলদান করা হয়। এটা কেন? আসলে শ্রাদ্ধ কথাটার মানে হচ্ছে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। এর আরেকটা মানে হচ্ছে নতিস্বীকার করা। আমার বংশধারার যে বৈশিষ্ট্য সেটা আমার মধ্যেও আছে। সেটাকেই আমি আরতি জানাচ্ছি। এটা আমাকে শক্তি দেবে কেন? কারণ আমার মনে পড়বে যে আমার পেছনে একটা বিশাল মনুষ্যধারা, রক্তের ধারা, জেনেটিক স্রোত কাজ করছে।”

“ ‘মানবজমিন’ এর তৃষা। অসম্ভব ডমিনেটিং একটা চরিত্র। যে তার স্বামীকে পরীক্ষা করে দেখে সে বেশ্যালয়ে গিয়েছিল কিনা। সেই আবার কিন্তু তার ছেলে সজলের কাছে নতিস্বীকার করে। আপনার প্রথম দিকে লেখা ‘গঞ্জের মানুষ’, সেখানেও পুরুষের পোশাক পরা ফটিকচাঁদের স্ত্রী শেষ পর্যন্ত স্বামীর কাছে নতিস্বীকার করে।”

"কিন্তু পুরুষের অনুগামিনীই হতে হল নারীকে শেষ অবধি।"

হাসতে থাকেন শীর্ষেন্দু’দা।

“কিন্তু বিজ্ঞান অনুযায়ী বিশ্বাস করতে হবে মেয়েরা মনোগ্যামাস। ছেলেদের ক্ষেত্রে উলটো। কোনও কোনও ক্ষেত্রে মেয়েদেরও এটা হতে পারে। হয়তো সে বাধ্য হচ্ছে। বা তাঁর স্বামীর থেকে তাঁর চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। কোনও ক্ষেত্রে তাঁর পুরনো সম্পর্ক কাজ করছে। সে সব ক্ষেত্রে এমন কিছু হতে পারে। এ সব ক্ষেত্রে হয়তো মেয়েটিকে আমি দায়ী করতে পারি না। এমন কিছু চরিত্র আমার আছে। দেখা গেল সজল একজন প্রবল পুরুষ হয়ে উঠছে। মা নিজে প্রবল পরাক্রমী ছিল একসময়। কিন্তু এখন ছেলে চোখে চোখ রেখে তার সঙ্গে কথা বলতে পারছে। তখন মাকে নতজানু হতে হচ্ছে। বাধ্য হচ্ছে সে। উপায় থাকে না। কারণ ভালোবাসাও কাজ করে তো মায়ের। এটা একটা সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার।”

“কিন্তু পুরুষের অনুগামিনীই হতে হল নারীকে শেষ অবধি।”

“আমি যা দেখছি সেটা তো আমি এড়াতে পারি না। লেখক হিসেবে। মেয়েরা সবসময়ের সমাজের ভিকটিম। এদের যে মুক্তির কথা বলা হয় সেটা সম্পূর্ণ উলটো প্রক্রিয়া। সেই মুক্তি কোনওদিনও আসবে না। কারণ বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে সব জায়গায় মেয়েদের ব্যবহার করা হচ্ছে। মেয়েরা ব্যবহৃত হতেও দিচ্ছে।সুতরাং নারীমুক্তির কথা কী করে বলবে? মুক্ত নারী বলে কিছু হয় না। নারী সবসময় আবদ্ধ। আজও সেই পুরুষশাসিত সমাজই আছে। মেয়েরা মুক্তির নামে যা করতে চাইছে সেটা পুরুষই তো ইন্ডিকেট করছে। আজকে বিজ্ঞাপনে সেই মেয়েটিই পণ্য হয়ে উঠছে। তাকে দিয়েই রোজগার করা হচ্ছে। মেয়েরা দেখছে।অসহায়ের মতো দেখছে। এটাকেই বারংবার নানা ভাবে আমি বলার চেষ্টা করছি। মেয়েদের এই ইটার্নাল ভিকটিমাইজেশনও কিন্তু দুশ্চিন্তার ব্যাপার। মেয়েদের অসহায়তার কথাই বেশি লেখার চেষ্টা করি আমি।”

“কিন্তু সমাজজীবনে নারীর অবস্থান, একটু লোডেড প্রশ্ন করছি। এটা নিয়ে কী ভাবে ভাবেন?”

“একটা জিনিস আমার কাছে খুব পরিষ্কার। এটা আমি খুব জোর দিয়ে বলতে চাই। একজন মেয়ে যখন তার স্বামীর খুব কাছের হয়, পুরনো ভাষায় যাকে বলা হত পতিপরায়ণা। স্বামীকেন্দ্রিক যদি সে হয়। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যদি একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়, তাহলে দেখবে মেয়েটি সম্পর্কের মধ্যে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটা আমি কিছুটা গয়নার বাক্সের মধ্যে দেখিয়েছি।”

চোখ দুটো ঝক ঝক করে শীর্ষেন্দুদার। যা বলছেন গভীর বিশ্বাস থেকে বলছেন।

আমি ব্যক্তিজীবনে এমন অন্তত চারটি পাঁচটি মেয়েকে দেখেছি যাদের মধ্যে ওই জিনিসটা আছে। এবং প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁরা খুব পাওয়ারফুল। তাঁরা চারিত্রিক দিক থেকে খুব ক্ষমতাবান হন। মানসিক দিক থেকেও। রুখে দাঁড়াতে পারেন। এটা তাঁদেরই থাকে, যাঁরা খুব স্বামীকেন্দ্রিক। প্রাচীন কাল থেকে এটা বলে আসা হচ্ছে। এখন আর এগুলো মানা হয় না। এই ধরনের মেয়েদের আমি নিজে খুব শ্রদ্ধা করি। একটি মেয়েকে দেখেছিলাম দুর্গাপুরে। খুব সুন্দরী। রঙটা চাপা।ওদের বাড়িতে আমি ছিলাম। সম্পন্ন পরিবার। দেখলাম সে বাসন মাজছে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি বাসন মাজছেন কেন? বলল আমি কাজের লোককে ঢুকতে দিই না। আমার স্বামী আমার ছেলেমেয়ে ওদের দেখভাল আমাকে করতে হবে। কাজের লোক কী ভাবে কাজ করবে তা তো আমি জানি না। মেয়েটির পরিশ্রম বেড়ে যাচ্ছে। অথচ তার মানসিক বা শারীরিক শক্তি আছে সেটা করার মতো। হাসিমুখে কথা বলছে। আবার চোখের শাসনে সবাইকে ঠিকঠাকও রাখছে। আমার খুব ভালো লেগেছিল। ভীষণ ভালো লেগেছিল।”

“কিন্তু ছোটদের লেখায় নারী চরিত্র তো বিশেষ নেই।”

“তা-ও আমার থাকে। সত্যজিৎ বাবুর তো তাও নেই। ওঁর তো মা, মাসি, কাকিমা কিছুই থাকে না।” আমার যেন প্রশ্নটার জন্য অপেক্ষা করেই ছিলেন। কথাটা বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। “তা-ও আছে মনোজদের অদ্ভুত বাড়ির মধ্যে আছে। আসলে বাকি চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়েই তো হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে এক আধজনকে আনি। একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে লেখা লিখছি। দেখা যাক।”

“এই বাচ্চা মেয়েটা কি নাতনি প্রভাব?”

“না, না!” বলেই আবার হেসে উঠলেন শীর্ষেন্দুদা। অকপট হাসি।

“একটা শেষ প্রশ্ন করি। আবার সেই ‘গঞ্জের মানুষ।’ গুপ্তধনের সন্ধানে ঢিবি খুঁড়তে খুঁড়তে শেষ অবধি লোকগুলো একটা পুরনো আমলের মালগাড়ির ওয়াগন খুঁজে পেয়েছিল। আট দশকের জীবন, ছয় দশকের লেখালেখি। আপনি কী খুঁজে পেলেন শীর্ষেন্দুদা?”

“পাওয়া নিয়ে তো ভাবিনি। আকাঙ্খা আমার খুব কিছু নেই আসলে। একটা সময় এমন ছিল যখন জীবন সংগ্রাম এমন জায়গায় গিয়েছিল যে একশো টাকাটাও অনেক টাকা। এখন আর নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই। তবে ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার থেকে পৃথিবীর কল্যাণটাই বেশি করে চাই। আর আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। সেই চাওয়াও তো আছে।”

“না বোধের জায়গার কথা বলছি।”

“প্রথম কথা হচ্ছে এই জীবন শেষ কিনা। এরপরও আরও জীবন আছে কিনা। মৃত্যু কী? জন্ম কী? এইগুলো জানার ইচ্ছে তো রয়েই গেল। বিশেষ করে পরলোক সম্পর্কে আমি জানতে চাই। এইসব আকাঙ্খা তো আছেই।”

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: সম্রাট মুখোপাধ্যায়, দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, অর্ণব চক্রবর্তী

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু সরকার ও দেবাশীষ সাহা
শেয়ার করুন: