ফিল্মফেয়ার পাওয়াটাই আমার কাল হয়েছিল

‘তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়’ কিংবা ‘না বলে এসেছি তা বলে ভেবো না’ – তাঁর গানে আজও মুগ্ধ বাঙালি। কলকাতা ছাড়িয়ে বম্বের হিন্দি গানে জগতেও ছড়িয়েছিল তাঁর খ্যাতি। পাল্লা দিতেন লতা কিংবা আশার মতো গায়িকাদের সঙ্গেও। মুম্বাইতে সেই আরতি মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি হলেন অর্ঘ্য দত্ত

“গানগুলো মনে রেখেছে সবাই। অবাঙালিরাও। কিন্তু আমার নামটা মনে রাখেনি। আর যদি পাঁচ বছর গাইতে পারতাম! তাহলে হয়তো...”

কথাটা শুনে মনে পড়ে গেল মুম্বই শহরেরই একটা ঘটনা। বছর দশেক আগের।

‘আরতি মুখোপাধ্যায়।’ নামটা বলা মাত্রই লোকটা অবাক চোখে তাকিয়েছিল সেইদিন। ‘কোন হে ওহ?’

গুমটির ভেতর বাবু হয়ে বসে পান সাজছিল লোকটা। পাশের ট্রানজিস্টারে বাজছিল আরতিদির গাওয়া গানই। ‘দো নয়না এক কহানি।’ অথচ আরতিদিকে চেনে না!

“এই গানটা যাঁর গাওয়া, সেই আরতি মুখোপাধ্যায়।”

“নেহি ইয়ে তো লতাদিদিকা গানা হ্যায়।”

"‘শান্তিসদন’, মধুপার্ক।"

আরতির কথাগুলো শুনতে শুনতে সেই দশ বছর আগের দিনটা মনে পড়ে গেল। সেদিনই প্রথম এসেছিলাম এই বাড়িতে। খার স্টেশন থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। ‘শান্তিসদন’, মধুপার্ক। আরতি মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি। রাস্তা জিজ্ঞেস করায়, এই বাড়ি থেকে সামান্য দূরের সেই পানের দোকানদার কিছুতেই চিনে উঠতে পারেনি আরতিদিকে।

"ওই ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটাই আমার কাল হলো। তারপর থেকে আর পঞ্চমদার কোনও গানের জন্য ডাকই পেলাম না। আমার নামটাই যেন মুছে গেল।"

চাঁপা ফুল রঙের শাড়ি পরা। ঠোঁটের ওপর, বাঁদিকে অমলিন সেই তিলটা। মাথা ভর্তি তেমনি ঢেউ খেলানো স্টাইলিশ কালো চুল। আরতিদি বসে আছেন ড্রয়িং রুমের এক কোণে। কে বলবে, বয়স এখন সাতের কোঠায়?

“অফিস থেকে এসেছো, আগে কিছু খেয়ে নাও।” ঘরে ঢোকা মাত্রই খাবারের প্লেট নিয়ে এসেছিল এই বাড়ির গৃহকর্মসহায়ক।

বাইরে দুরন্ত মুম্বইয়ের বর্ষা। বর্ষা ঢুকে এসেছিল ড্রয়িং রুমের ভেতরেও। গুনগুন করে গান করছিলেন উনি। ‘'আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে।”

কিন্তু প্রশ্নের পর এখন মুড বদলে গিয়েছে। এখন আরতিদির মুখ একটু থমথমে। একটু যেন অভিমান লেগে আছে মুখে।

“আপনি কি মনে করেন এর পেছনে পেডার রোডের দুই বোনের কোনও ভূমিকা...”

"কিন্তু লোকে বলে, লতা আশার জন্যই আরতি মুখোপাধ্যায়..."

"দেখো, তখন আমি মুম্বইতে নতুন। স্টুডিওর সাউন্ড রেকর্ডিস্টরাও আমাকে বলতো, খালি ভাল গান গাইলেই হবে না,পেডার রোডের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে। আরো অনেকেও এ কথা বলতো।” থামলেন একটু। “আমি কিন্তু কোনও নেতিবাচক কথা বলব না। বরং আমি পেডার রোড থেকে যে স্নেহ পেয়েছিলাম সেটাই বলতে চাইব। মনে রাখব।"

“কিন্তু লোকে বলে, লতা আশার জন্যই আরতি মুখোপাধ্যায়... যেমন অনেকে বিশ্বাস করেন রাজকাপুরের জন্যই উত্তমকুমার...”

“না, না, ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। প্রথম দিকে তো সাহায্যই করেছেন। খুব। স্নেহও করতেন। মুম্বইতে প্রথম এসেছি যখন একদিন হেমন্তদা (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) বললেন, ‘করেছিস কী! এখনও লতার সঙ্গে দেখা করিসনি! লতাজি নিজেই নাকি ওঁকে বলেছিলেন, আমি দেখা করিনি।’

‘দেখা করলেন?’

‘হ্যাঁ! চলে গেলাম পেডার রোডের বাড়িতে। মেরি বলে একজন থাকত তখন ওঁর কাছে। সেই দরজা খুলেছিল। কিন্তু কিছুতেই লতাজির সঙ্গে দেখা করতে দেবে না। বলছে, দিদি বিশ্রাম করছেন। যত বলছি আমার নাম আরতি মুখোপাধ্যায়, সে শুনবেই না। সেই আমলে মোবাইল ফোনও ছিল না...”

‘তারপর?”

"আমি অল ইন্ডিয়া মারফি মিউজিক কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়েছিলাম।"

‘কথাবার্তা শুনে চলে এসেছিলেন ঊষা মঙ্গেশকর। উনিই বসতে বললেন।”

“দেখা হল?”

“হ্যাঁ! কত কথা! হ্যাঁ। কার কার সঙ্গে গান গাইছি জানতে চাইলেন। রবীন্দ্র জৈনের নাম করাতে বললেন, শক্তি সামন্তের সঙ্গে দেখা করো। লক্ষীকান্তের সঙ্গে দেখা করো। আমি ফোন করে ওদের বলে দেব। কদিন পরেই সকালে ফোন এসেছে। তুলে হ্যালো বলতেই, ‘ম্যায় লতা বোল রহি হুঁ।’ গলা তো না যেন সুরেলা বাঁশি বাজছে। ফোনে জানালেন যে লক্ষীকান্তজীকে আমার কথা বলে দিয়েছেন, আমি যেন দেখা করি।"

“এতো একদম উল্টো কথা শুনছি।”

“সেই ছোট বেলায় আমি অল ইন্ডিয়া মারফি মিউজিক কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়েছিলাম। সেই সময় আমাকে কোলে বসিয়ে আদর করে চকলেট খাইয়েছিলেন। তারপরে, শিশুশিল্পী হিসাবে ওঁর সঙ্গে গানও গেয়েছি। মা ও সন্তানের ডুয়েট গান। উনি মীনাকুমারীর লিপে আর আমি ডেইজি ইরানীর। আসলে সঙ্গীত পরিচালক বা চিত্র প্রযোজকরাই ওঁদের বাদ দিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে গাওয়ানোর সাহস করতেন না। ওঁরা ব্যস্ত থাকলে বা ওঁদের পারিশ্রমিক দিতে না পারলে তখন হয়তো অগত্যা অন্য শিল্পীদের সুযোগ মিলতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওঁরাই বলে দিতেন কাকে দিয়ে গাইয়ে নিতে হবে।"

“আশা ভোঁসলে, ওঁর সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল?”

"দেখো আমার মুখে কথা বসিও না কিন্তু..."

“খুব ভালো। পরওয়ারিশ সিনেমায় তো আমরা একসঙ্গে গানও গেয়েছি। সে গানও হিটও । উনি তখন আমার খুব প্রশংসাও করতেন। আমাকে তো সবাই মজা করে বলতো, আরতি, তুমি এদের দুই বোনকে কী গুড় খাইয়েছ যে এরা তোমার এত প্রশংসা করে?"

“আপনি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলালো?”

“দেখো আমার মুখে কথা বসিও না কিন্তু...” ধমক দিলেন আরতিদি।

“তাহলে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পরই কেন আপনাকে দিয়ে গাওয়ানো কমে গেল?”

“আসলে আমার পাবলিসিটি করার... আমার হয়ে ধরাকরা করার কেউ ছিল না। আমি নিজে ও সব বুঝতামও না,করতেও পারতাম না। মুম্বইতে তখন অনেক বাঙালি পরিচালক ছিলেন, তাঁরাও আমাকে দিয়ে গান গাওয়াননি। এমনকী,'আনন্দ আশ্রম' সিনেমার বাংলায় যে গান আমার গলায় সুপারহিট, সেই গানও শ্যামলদা হিন্দিতে প্রীতি সাগরকে দিয়ে গাইয়েছিলেন। এবং দেখো সেই হিন্দি ভার্শন শ্রোতাদের মনে কোনো দাগই কাটতে পারেনি। কিশোরদা, মানে কিশোরকুমার, তো খুব বকাবকি করতেন। বারবার বলতেন, আরতি তোমার আরও অনেক বেশি গান গাওয়া উচিত।”

“কিশোরকুমারের সঙ্গে আলাপ কী ভাবে?”

প্রথম দেখা শিলিগুড়ির এক জলসায়। তখন তেমন পরিচিত কেউ নই। সবে দু’চারটে রেকর্ড বেরিয়েছে। এদিক ওদিক ডাক পাই গান গাইতে। তেমনি পেয়েছিলাম শিলিগুড়ির ওই অনুষ্ঠানে। সেখানে কিশোরকুমারও গাইবেন। অর্কেস্ট্রা নিয়ে। তাঁর ঠিক আগে আমার গান। কিশোরদা গ্রিনরুমে বসেই আমার প্রশংসা করেছিলেন। সেদিন নাকি উনি বলেছিলেন, গান গাইতে জানলে শুধু হারমোনিয়াম দিয়েই মাতিয়ে দেওয়া যায়!।

“বাবা! বিরাট প্রশংসা!”

“তারপরে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। ডুয়েট গাইলাম ওঁর সঙ্গে। শ্যামল মিত্রের সুরে, ‘পদ্মগোলাপ’ সিনেমায়। পরে অবশ্য হিন্দিতেও ডুয়েট গেয়েছিলাম।'দো পঞ্ছি দো তিনকেঁ কহো লে কে চলে হ্যায় কহাঁ', গানটা তো সুপার হিট। দারুণ মজার মানুষ ছিলেন কিশোরদা। স্টুডিও একদম জমিয়ে রাখতেন। আমার সঙ্গে পরে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। স্নেহ করতেন খুব। উপদেশ দিতেন। তখন আমি মাঝেসাঝেই কলকাতায় আসতাম। বাংলা সিনেমাতেও গান করতাম। সেই সময় তো মোবাইল ছিল না। হিন্দি ছবির অনেক মিউজিক ডিরেক্টর মুম্বইয়ের বাড়িতে ফোন করেও পেতেন না। ফিরে এলেই কিশোরদা বকতেন। কোথায় থাকিস? জানিস এতগুলো গান মিস করেছিস!”

“উত্তমকুমারও তো খুব স্নেহ করতেন আপনাকে।”

"এই জনপ্রিয় গানটা তৈরিতে উত্তমদারও একটু অবদান ছিল।"

“খুব! ছোটো বোনের মতোই ভালোবাসতেন। 'তুই' করেই সম্বোধন করতেন। মনে আছে একবার দিল্লিতে একটা অনুষ্ঠান হবে বন্যাদুর্গতদের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের জন্য টাকা জোগাড় করা হচ্ছিল। আমরা সবাই দল বেঁধে কলকাতা থেকে গিয়েছিলাম। হেমন্তদা, বেলা বৌদি, মান্নাদা, সন্ধ্যাদি আরো অনেক শিল্পী। এমনকি জ্যোতি বসু ও উত্তমকুমারও গিয়েছিলেন। হঠাৎ আমার গানের আগে উত্তমকুমার হেমন্তদাকে বললেন, মঞ্চে আরতির গানের ঘোষণা আমি করব। পুলকদার লেখা এবং ওয়াই এস মুলকির সুরে গাওয়া আমার ‘কার বাঁশি যে কেড়ে নিয়ে গেল আমার মন’ গানটা ওঁর খুব প্রিয় ছিল। অনেক বার বলেছেন। আসলে উনি ছিলেন প্রকৃত সঙ্গীতরসিক। সবাইকে বলতেন,আরতিকে কত ছোট থেকে দেখেছি, সাধনা যে কী ভাবে একটি শিল্পীর উত্তরণ ঘটায় ওকে দেখলে বোঝা যায়! সুধীনদাকে দিয়ে আমাকে ওঁদের পুজোর জলসায় গান গাইতে অনুরোধ করেছিলেন। তখন যে আমি খুব জনপ্রিয় কোনও শিল্পী তেমন নয়।”

“উনিও তো গান জানতেন।”

“গান সম্বন্ধে ওঁর ধারণা কতটা পরিণত ছিল দুটো ঘটনা বললে বুঝতে পারবে। ‘ধন্যিমেয়ে’ সিনেমায় আমার একটা গান আছে, 'যা যা বেহায়া পাখি যা না, অন্য কোথা যা না, কেউ করেনি মানা।' নচিদা, মানে নচিকেতা ঘোষ উত্তমকুমারের বাড়িতে বসেই গানটার সুর দিয়েছিলেন। ভূপালি রাগে। এত সুন্দর করে এমন সব কথাকে সাজিয়েছিলেন! কিন্তু এই জনপ্রিয় গানটা তৈরিতে উত্তমদারও একটু অবদান ছিল।”

“তাই নাকি!”

“ঐ যে গানটার মধ্যে মধ্যে আমি যে একটা, দুটো ছোট কথা বলেছি, ওটা কিন্তু উত্তমদারই আইডিয়া। মানে, সিনেমাটার সিকোয়েন্স অনুযায়ী একটা গ্রামের মেয়ের মুখে দু-চারটে শব্দ কথা হিসাবে বসালে যে গানটা সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠবে সেটা বোঝার মতো সাঙ্গীতিক বোধ ওঁর ছিল। আরেকবার, মনে আছে, 'ভোলা ময়রা' সিনেমার গানের রিহার্সাল চলছে,রেকর্ডিং হবে। উনি কোথাও শ্যুটিংয়ে ছিলেন। খবর পাঠিয়েছিলেন যে ওঁকে একবার না শুনিয়েই যেন রেকর্ডিং না করে ফেলা হয়। তারপর উনি এলেন, মন দিয়ে শুনলেন। এবং এখানে সেখানে ছোটখাটো কিন্তু মূল্যবান পরিবর্তনের উপদেশও দিলেন। আমি কিন্তু আর অন্য কোনও নায়কের মধ্যে সিনেমার গান নিয়ে এই কনসার্ন দেখিনি।"

“উত্তমকুমার, কিশোরকুমার ভালোবাসতেন। কিন্তু তারপরও মুম্বইয়ের বাঙালী পরিচালকদেরও সাহায্য না করাটা আশ্চর্যের!”

"কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন আরতিদি। ক্ষোভ? নাকি অভিমান?"

"তপন সিনহা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। উনি নিজে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শক্তি সামন্তের কাছে। আলাপ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমার আদরের মেয়ে। কিন্তু আমি শক্তি সামন্তের কাছে কোনওদিনও নিজে থেকে গান গাইতে চাইনি। তবে উনি বা হৃষিকেশ মুখার্জী আমাকে খুব স্নেহ করতেন। খোঁজ খবর নিতেন। এমনকি 'তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়'-এর মতো হিট গান গাওয়ার পরেও আমি সে ভাবে বাপী লাহিড়ির হিন্দি গানেও সুযোগ পেলাম কই! মনে আছে তখন 'রাম তেরি গঙ্গা মইলি'-র প্রস্তুতি চলছে। একদিন রাজ কাপুর আমার সামনেই রবীন্দ্র জৈনকে ডেকে বলেছিলেন, আরতিকে দিয়ে কেন গান গাওয়াচ্ছো না? ওতো খুব সুন্দর গায়। রবীন্দ্র জৈন বলেছিলেন, কী করে গাওয়াব? আপনি তো আগেই সব গানের জন্য লতাজীকে প্রমিস করে দিয়েছেন। আসলে আমার মনে হয় তখন সবাই চাইতো লতাজীকে সন্তুষ্ট রাখতে। উনি অসন্তুষ্ট হতে পারেন এই ভয়ে খুব কম সুরকারই অন্য শিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ানোর সাহস দেখাতে পারতেন।’’

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন আরতিদি। ক্ষোভ? নাকি অভিমান? “শুধু হিন্দি গান? তুমি ভাবতে পারো সলিল চৌধুরী এবং রাহুল দেব বর্মনের সুরে আমার একটাও বেসিক বাংলা গানের রেকর্ড নেই! এ আফশোস আমার জীবনে যাবে?" এবার বেশ উত্তেজিত।

"কিন্তু নেই কেন? আপনি তো তখন অত্যন্ত জনপ্রিয় শিল্পী!"

"সেটাই তো আমারও প্রশ্ন! এইচএমভি-র তথ্য দেখ, সব থেকে বেশি সংখ্যক হিট গানের রেকর্ড এই আরতি মুখার্জির। অথচ দেখো সেই সময়ের দুজন দিকপাল সুরকারের সুরেই আমার কোনও বেসিক গান গাওয়া হলো না। হ্যাঁ,ছায়াছবির গান অবশ্য গেয়েছি। কিন্তু যতই বল, বেসিক গানের একটা আলাদা মর্যাদা।”

“আশ্চর্য!”

"আপনার খাবারে বিষ মেশানো হয়েছিল…"

“কথা কিন্তু হয়েছিল, জানো! সলিলদা তিরাশিতে পুজোর গান গাওয়াবেন বলেছিলেন। পঞ্চমদাও কথা দিয়েছিলেন। কাজও এগিয়েছিল। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে রেকর্ডিং আর হলো না।"

“আপনার খাবারে বিষ মেশানো হয়েছিল…”

“আমি নিজেই নিশ্চিত করে আজও জানি না কে কেন কবে কী ভাবে বিষ দিয়েছিল। খুব শরীর খারাপ হয়েছিল, পা ফুলে যাচ্ছিল। বসতে পারতাম না বেশিক্ষণ, গাইতে পারতাম না। ডাক্তার পেট ওয়াশ করে এমন বিষ পেয়েছিল যা খাবারে কেউ ইচ্ছাকৃত না মেশালে পেটের ভেতরে পাওয়ার কথা নয়। তবে যেহেতু আমি জানি না কে এই কাজ করেছিল তাই এই নিয়ে নির্দিষ্ট কারো ওপর আমার কোনো ক্ষোভও নেই।’’

“যাঁদের নাম নিলেন তাঁদের স্ত্রীরাও তো গায়িকা ছিলেন।”

‘তুমি আমাকে দিয়ে বিতর্কিত কথা বলাবে ভেবেই এসেছ নাকি?” হা হা করে হেসে উঠলেন আরতিদি।

“আপনি বোধহয় সুচিত্রা সেন থেকে দেবশ্রী রায়, এবং মাঝে সব নায়িকার লিপেই গান গেয়েছেন..."

"হ্যাঁ, গেয়েছি। শুধু বাংলা সিনেমার নায়িকাদের লিপেই নয়, একমাত্র আমিই মনে হয় বৈজয়ন্তীমালা, সায়রা বানু,ওয়াহিদা রেহমান, তনুজা, শর্মিলা, রাখী, মৌসুমী, জয়া মুম্বই থেকে যত নায়িকা বাংলা সিনেমা করতে গেছেন সবার লিপে গেয়েছি।"

আমাদের কথাবার্তার মাঝেই ভেতরের ঘর থেকে ভেসে আসছিল সেতারের সুর। দেশ রাগের আলাপ।

"আপনি নিজেও তো লন্ডনের অ্যালবার্ট হলেও প্রোগ্রাম করেছেন!"

“আরতিদি কে বাজাচ্ছে?”

“আমার ছেলে। সোহম! কেমন বাজাচ্ছে? ভালো না!” মুহূর্তে গর্বে ভরে ওঠে মায়ের মুখ।

“আলি আকবর সাহেব আমাকে বলেছিলেন ছেলেকে খেলনা দেবে না। বাদ্যযন্ত্র কিনে দেবে। তাহলে ছোট থেকেই কান তৈরি হবে। আগ্রহ তৈরি করতে হবে।। আমিও কলকাতা থেকে ওকে ছোটো সেতার কিনে এনে দিয়েছিলাম। অন্য মায়েদের মতো ছোটবেলায় তো ওকে বিশেষ কাছে পাইনি। আমার এই শ্বশুরবাড়ির রীতি মেনে ওকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল পণ্ডিচেরীর আশ্রমে। সেখানেই ওর বড় হওয়া। ওর বাবা, ঠাকুরদা, মানে মুনিম পরিবারের পুরুষেরা সবাই তো ওকালতিতেই জড়িত। আমার ছেলের জন্যও অফিস, ক্লায়েন্ট সব রেডিই ছিল, আছে। কিন্তু কী আশ্চর্য দেখো ও কিন্তু নিজের ইচ্ছায় বেছে নিল সুরের সাধনা। সেতার। আজকাল তো আমার সঙ্গে কিছু ফিউশন কাজ করার কথাও বলছে। কতটা কী হবে জানি না, কিন্তু এই যে ও জীবনে সঙ্গীতকে বেছে নিল এ আমার কাছে যে কতবড় তৃপ্তির! আমার জীবনে অনেক না পাওয়ার ব্যথা ভুলে যাই যখন ওকে মঞ্চে বসে বাজাতে শুনি।

“আপনি নিজেও তো লন্ডনের অ্যালবার্ট হলেও প্রোগ্রাম করেছেন!”

“হ্যাঁ, সোলো। উনিশশো সাতাত্তরে। সে এক অভিজ্ঞতা! তখনও পর্যন্ত খুব বেশি ভারতীয় শিল্পী ওখানে অনুষ্ঠান করেনি। হল ভর্তি দর্শক। প্রায় এক ঘণ্টা গান গেয়েছিলাম। আমি ছাড়াও সেবার ছিলেন সালামাৎ আলি খাঁ। কল্যাণজি-আনন্দজির ট্রুপও ছিল। আমি বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে আমেরিকার ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনেও গান গেয়েছি।”

“একটু আগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গুনগুন করছিলেন...’’

“আরে ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্ক গপ্পো’তে গেয়েছি। ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি’। ‘নিশীথে’ ছবিতে ছিল, 'যখন এসেছিলেম অন্ধকারে' এবং ‘হৃদয়ের একূল ওকূল দুকূল ভেসে যায়’। তাছাড়া, আমার ধারণা হিন্দিতে রবীন্দ্র সঙ্গীতের রেকর্ড আমিই প্রথম করেছিলাম।”

“আপনার মনে হয় না আপনি যত রকমের গান গেয়েছেন, বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, মারাঠি, গুজরাতি-সহ যত ভাষায় গান গেয়েছেন, যত জনপ্রিয়তা পেয়েছেন সে তুলনায় ভারত সরকার আপনাকে তেমন কোনও উপযুক্ত সম্মান দেয়নি?আজকাল তো অনেকেই পদ্ম পুরস্কার পাচ্ছেন।”

“দেখো, অর্ঘ্য, আমি গান ভালোবেসে গেয়েছি। শ্রোতারাও আমার গান ভালোবেসেছে। আজও তারা ভালোবেসে আমার গান শোনে। এর থেকে বড় পুরস্কার তো আর হয় না! আমি ওসব নিয়ে ভাবি না। আজও গান গাই। যতদিন বেঁচে থাকব গান নিয়েই থাকতে চাই। গাইতে চাই। সরকারি পুরস্কারের জন্য আমার নাম তো আর আমি নিজে রেকমেন্ড করব না! সেটা রাজ্য থেকে বোধহয় করতে হয়।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, “এই তো বেশ আছি। তোমরা এখনো মনে রেখেছো।” কথাটা বলতে বলতে হাসলেন। তবে সেই হাসিতে অভিমান লেগেছিল।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু সরকার
ভিডিও: অর্ঘ্য দত্ত
ভিডিও এডিটিং: দিব্যেন্দু সরকার
শেয়ার করুন: