থিয়েটারের নামে এখানে যা হচ্ছে সেটা শিল্পের দূষণ

তাঁকে বাঙালি চেনে ভারতীয় থিয়েটারের অন্যতম মুখ হিসেবে। সিনেমাও করেছেন। সেই সব ছবি দেখানো হয়েছে দেশ-বিদেশের ফেস্টিভালে। আবার এই শহরেই রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে গিয়েছে তাঁর ছবি। বাংলা থিয়েটার, বাংলা ফিল্ম নিয়ে তাঁর ক্ষোভ থেকে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, নবারুণ ভট্টাচার্যকে নিয়ে তাঁর ভাবনা – অকপট সুমন মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি হলেন শমীক ঘোষ

দরজা খুললেন অরুণ মুখোপাধ্যায়। খালি গা। লুঙ্গি পরা। ঠিক যেন পাশের বাড়ির খুব চেনা কোনও বৃদ্ধ। কে বলবে তিনি শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় থিয়েটারেরও এক কিংবদন্তী।

“কাকে চাই?” প্রশ্নটা শুধু মুখে নয়, চোখেও।

নামটা বলতেই ভেতরে নিয়ে গেলেন। বাঁদিকে ড্রয়িং রুমে সোফা কাউচে বসে সুমন মুখোপাধ্যায়। একদিকে লম্বা বুক কেসে সারিসারি বই।

জিনস, টি শার্ট। সামনে টি টেবিলে রাখা সিগারেটের রোলিং পেপার। টোব্যাকো। বাঙালি এঁর হাতে হয় দস্তেয়ভস্কি নয় মিলান কুন্দেরার বই দেখতেই অভ্যস্ত। ইনি কথায় কথায় হবসবম কোট করতে পারেন। যাঁর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে অভিষেক মজুমদার বলেন, “ওঁর সঙ্গে আড্ডার পর, আমি ঘরে গিয়ে নোটস নিয়ে রাখতাম।”

"আমি আসলে ওই সময়টাকে ধরতে চাইছি।"

কে এই অভিষেক মজুমদার? তিনিও আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের একজন বিরাট নাম, যাঁর থিয়েটার লন্ডন না নিউ ইয়র্কে অভিনীত হয়। সেই থিয়েটারের রিভিউ হয় গার্ডিয়ানের মতো বিদেশের খবরের কাগজে।

সেই সুমন মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি আমি। ইচ্ছে করেই সোফায় না বসে মাটিতে বসলাম আমি।

“মিস শেফালিকে নিয়ে ওয়েবসিরিজ করতে চাইছিলেন। শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা নিয়ে। কিন্তু আপনার যে রাজনৈতিক বিশ্বাস, সেখানে শেফালি মানে তো অপসংস্কৃতি?”

“আমি আসলে ওই সময়টাকে ধরতে চাইছি। এমন একটা সময় যখন শেফালি নামের একজন রাতের কলকাতা শাসন করছেন। বামপন্থীরা এসে তাঁকে অপসংস্কৃতি বলছেন। একটা আশ্চর্য ফ্যালাসি আছে। কনট্রাডিকশন আছে। তখনকার বামপন্থীদের প্রধান মুখ বলেছিলেন, আমি সংস্কৃতি-টংস্কৃতি বুঝি না। সেই সময়ে আমাকে বলা হয়েছিল, ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ থেকে বাঘারুর এমএলএ-কে কাঁধে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটাকে বাদ দাও। ভুল মেসেজ যাচ্ছে। হারবার্ট নন্দনে দেখানো হবে না ভুল মেসেজ যাচ্ছে। আসলে আমার কাছে শেফালি একটা প্রশ্ন। কালচার বা সংস্কৃতি যার কথা আমরা বারবার বলি, সেটা আসলে কী?”

“খুব ইন্টারেস্টিং!”

“তুমি ভাবো, একই শহরে একই সময়ে সত্যজিৎবাবু ছবি বানাচ্ছেন, মৃণাল সেন ছবি বানাচ্ছেন, আবার মিস শেফালিও নাচছেন। শেফালির সেই নাচকে ব্যবহার করা হচ্ছে থিয়েটারে। সেখানে অন্য অভিনেতাদের বাদ দিয়ে পোস্টারে মিস শেফালিকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। সেটা নিয়ে অভিনেতারা প্রশ্নও তুলছেন। কিন্তু তারাও জানেন যে দর্শক আসলে আসছেন, মিস শেফালির নাচ দেখতে। আইটেম ডান্স সেই সময়েও ছিল।”

“হ্যাঁ, আশ্চর্য সময়!”

"সাধারণ বাঙালি কিন্তু আপনাকে আজও থিয়েটার ডিরেক্টর হিসেবেই চেনে।"

“এই শেফালিকে ধরতে গিয়ে যদি সমকালীন ইতিহাসটাকে দেখা যায়, ‘সংস্কৃতি’ বিষয়টাকে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে দুটো রাজনৈতিক ছবি পাওয়া যাবে। একটা নকশাল আন্দোলন। আরেকটা জ্যোতিবাবু। শেফালিকে আমি সময়ের একটা প্রতীক হিসেবেই দেখব। একসময় ভ্যাম্পরা নাচত। এখন হিরোইনরা নাচে। এখন কিন্তু এই তফাৎগুলো সব ভেঙেচুরে গেছে। আজকে পর্নোগ্রাফি সহজলভ্য। প্রতিটি টিনএজার পর্নোগ্রাফি দেখছে। তাহলে আজকে দাঁড়িয়ে আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি যে সংস্কৃতিটা আসলে কী? অপসংস্কৃতিটাই বা কী? আজকে কালচারাল মোটিফগুলো কী? এই সময়ে কালচারের যে এতগুলো পারস্পেকটিভ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে দাঁড়িয়ে তার জন্য আমার লড়াইটা বা কী? রাষ্ট্রের সঙ্গে কালচারের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন করা যায়। আমি ওই সময়টাকে ধরতে চাইছিলাম। প্রযোজকরা চাইছেন শুধু সেক্স বম্বকে নিয়ে একটা ছবি। ক্যাবারে নাচ। কিন্তু আমি বলেছিলাম ক্যাবারে তো থাকবে কিন্তু সঙ্গে কালচারাল পার্স্পেক্টিভগুলোও থাকুক।

“সাধারণ বাঙালি কিন্তু আপনাকে আজও থিয়েটার ডিরেক্টর হিসেবেই চেনে।”

“সিনেমার একটা নির্দিষ্ট ব্যাণিজ্যিক কাঠামো আছে। লজিক আছে। সেখানে সব সময়েই প্রোডাকটিভিটির কিছু সূত্র মেনে চলতে হবে। প্রতি বছর একটা ছবি বানাতেই হবে। দেখো ফিল্মমেকার হিসেবে আমি তো নিয়মিত ছবি করি না। ২০০৫ সালে আমার প্রথম ছবি। আর এই এতদিনে আমার মাত্র ছটা ছবি। একজন নিয়মিত ফিল্মমেকার তো এর থেকে অনেক বেশি ছবি বানান। তবে থিয়েটারও বা আমি কটা করেছি এতদিনে। তাছাড়াও…”

ঘুরে বসলেন সুমনদা। আমার দিকে সোজাসুজি। সিগারেটের রোলিং পেপারটা রোল করতে থাকেন।

“ছবি কতটা চলে বা না-চলে সেটা নির্দিষ্ট করে একটা বিশেষ অর্থনৈতিক গোষ্ঠী। যাকে আমরা বলি ইন্ডাস্ট্রি। সিনেমাটা কোথায় যাচ্ছে? তার প্রচার কী? আমি হয়তো ওই গোষ্ঠীর মধ্যে তেমন ভাবে ঢুকতে পারিনি। সত্যি কথা হল – ইন্ডাস্ট্রির যাঁরা বড় কর্তা, যাঁরা নিদান দেন কোন ছবি ভালো আর কোন ছবি খারাপ, তাদের গুড বুকে না থাকলে মুশকিল। দাঁড়াতেই দেবে না। আমি কাউকে কোনও দোষ দিচ্ছি না। তবে এই যে গোষ্ঠীর মধ্যে আমি ঢুকতে পারিনি।”

সিগারেটটা ধরিয়ে নেন সুমনদা। কথা বলতে শুরু করেন আবার, “অনেক কিছুই প্রযোজকের ওপর নির্ভর করে। প্রযোজকের হাতে কটা মিডিয়া আছে, তিনি কতটা ছবিটা প্রচার করতে পারেন। বাংলা থিয়েটারে এখনও অনেক কিছু করা যায়। তারপরও তুমি ভাবতে পারো পঞ্চাশটা শো হবে। ‘ডন’-এই তো এমন কিছু জিনিস করা হয়েছে যেগুলো সিনেমাতে ব্যবহার করাই যেত না। কিন্তু সিনেমায় সেটা হবে না। কোন প্রোডিউসারের কত গাঁটের জোর আর ক্ষমতা তার ওপরে নির্ভর করছে। প্রোডিউসারের জোর না থাকলে দু’সপ্তাহ পরে ছবিটা নামিয়ে দেবে। কিছু লোকই এর বাইরে থেকে বিষয়টা করতে পেরেছে। আমার ক্ষেত্রে আমি এই ইকুয়েশনের মধ্যে নেই, তার ওপর আবার অন্যরকম ছবি করি। দু’টো মিলিয়ে খুব খারাপ কেমিস্ট্রি তৈরি হয়ে গিয়েছে।”

কথাগুলো খুব নির্লিপ্ত ভাবে বলা। যেন এটাই তো হবে।

"কলকাতায় তেমনভাবে দেখাতে পারলাম কই?"

“কাঙাল মালসাট ধরো না। এখনও কত লোক চেয়ে বেড়ায়। কিন্তু আমি স্ক্রিনিং করাতে পারছি না। কাঙাল মালসাট এমন কতগুলো বিতর্কের মধ্যে ঢুকে গেল যে ঠিক ভাবে তার কোনও বিচার হল না। হারবার্টও সে ভাবে কিন্তু রিলিজ করতে পারিনি আমরা। তবে লোকে হয়তো ইউটিউবে দেখে নিয়েছে। এমন অনেক ভালো ভালো ছবি আমি দেখাতে পারিনি। ‘মহানগর অ্যাট কলকাতা’-ও আমার মতে আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিদেশে বেশ প্রশংসিত। কলকাতায় তেমনভাবে দেখাতে পারলাম কই?”

“আপনার প্রথম ছবি – হারবার্ট যতটা বিখ্যাত, ততটা কিন্তু অন্য ছবিগুলো নয়।”

প্রশ্নটা করা মাত্র একটু যেন ভাবলেন সুমনদা। একটু সরে বসলেন চেয়ারের ওপর।

“হারবার্ট আমার প্রথম ছবি। সব থেকে বেশি ফেস্টিভালে গিয়েছিল। হয়তো সব থেকে বেশি আলোচিত ছবিও। হারবার্ট টেক্সট হিসেবেই এমন যে আমি একটা খুব ইনটেন্স ফর্ম ব্যবহার করতে পেরেছিলাম। তবে এই যে তুমি বলছ হারবার্ট আমার সব থেকে বিখ্যাত ছবি, এটাও আর্টিস্ট হিসেবে আমার একটা স্ট্রাগল। নিজের কাজকেই নিজেই ছাপিয়ে যেতে চাইছি। আসলে...”

“কী?”

“’৯২ সাল থেকে হারবার্ট নিয়ে ভেবেছি। কী রকম ছবি হতে পারে। স্ক্রিপ্টের অনেকগুলো ড্রাফট লিখেছিলাম। বারবার বারবার বদল করেছি। সেই সময় আমি আর হিরণ মিত্র প্রচুর লোকেশনে ঘুরেছি। উত্তর কলকাতার নানা বাড়িতে। হিরণদা স্কেচ করেছেন। তারপর আবার ভেবেছি ওটাই ঠিক লোকেশন কিনা। এই প্রসেসটা কিন্তু হারবার্টে অনেক বছর ধরে করতে পেরেছিলাম। তার ফলও পেয়েছি। প্রসেস খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। পঁয়তাল্লিশ দিন শ্যুট করেছিলাম। প্রথম কাটটা ছিল তিন ঘণ্টা পনেরো মিনিটের। সেই ছবি কেটে দু’ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ছবিগুলোর ক্ষেত্রে, আমি সত্যিই বলছি, যতটা হওয়া উচিত ছিল ততটা পারিনি। আরেকটা ছবিতে অনেক কিছু করতে পেরেছিলাম – কাঙাল মালসাট। মাঝে মাঝে মনে হয় কাঙাল মালসাটের এখনও রিলিজ করা যায়। করলে খুব হইচই হতে পারে। কিন্তু ফিল্ম রাইটটা বিক্রি হয়ে গিয়েছে।”

"নবারুণদার ক্ষেত্রে আমার একটা অদ্ভুত কানেকশন আছে।"

কথা বলে যাচ্ছেন সুমনদা। একটানা। গলা উঠছে না একবারও। যেন ক্লাসে পড়াচ্ছেন।

“বাংলা ভাষার এক্সপেরিমেন্টাল লেখকদের দেখ - নবারুণ’দা বা দেবেশ রায়। এরা তো একদল পাঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেলেন। নবারুণদা একটা র‍্যাডিকাল গোষ্ঠীর মধ্যে পপুলার আর ফ্যাতাড়ুর লেখাগুলো পপুলার। কিন্তু যে উপন্যাসগুলোতে গালাগালি নেই, সেইগুলো কতজন পড়েছে? আপামর পাঠকের কথা ভাবো, তাদের ক’জন নবারুণ পড়ে, দেবেশ পড়ে বা সন্দীপন পড়ে? কিছু দর্শক তো আমারও আছে। থিয়েটারে হয়ত বেশি। সিনেমায় কম। এই যে ছবি করে যেতে পারছি এদেরই জন্য। ‘অসমাপ্ত’ নেটফ্লিক্সে বিক্রি হয়েছিল। সেটা করে প্রযোজক ভালো টাকাই পেয়েছিলেন। ছবির টাকা ফেরত এসেছিল। কিন্তু হল রিলিজ করে তো টাকাটা ওঠেনি।”

“নবারুণ ভট্টাচার্যকে নিয়ে কিন্তু বারবার কাজ করেছেন। থিয়েটারেও সিনেমাতেও।”

“নবারুণদার ক্ষেত্রে আমার একটা অদ্ভুত কানেকশন আছে। ওঁর লেখা আমাকে টাচ করে। বারবার কাজ করতে গিয়ে নবারুণদার গল্পে ফিরে যেতে পারছিলাম।”

“কেন?”

“তুমি ভাবো না... কালী নিয়ে নবারুণদার প্রচুর পড়াশুনো। অকাল্ট নিয়েও। আবার মার্ক্সবাদে তার অদ্ভুত বিশ্বাস। তার সঙ্গে সাব অলটার্ন নিয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবনা এবং সাররিয়ালিজম। এইগুলো শুধু দর্শনে থাকলে হবে না। লেখনীতেও থাকতে হবে। সেইগুলো উনি পারতেন। নবারুণদার সেই অর্থে কোনও তাত্ত্বিক পলিটিক্যাল কারেক্টনেস ছিল না। লিখলেন সমস্ত মশা যার কামড়ে মানুষ মরে সেইগুলো মহিলা মশা। দেখবে ওর পুরুষ চরিত্রগুলো যতটা স্ট্রং মহিলা চরিত্ররা ততটা নয়। এইগুলো নিয়ে তো ইন্টেলেকচুয়াল মহলে কম বিতর্ক হয়নি –নবারুণদার জেন্ডার কারেক্টনেস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। আমি নিজেও শুনেছি। নবারুণদা সেসব নিয়ে ধার ধারতেন না। উনি আসলে এতটাই অর্গ্যানিক একজন ইন্টেলেকচুয়াল! মার্ক্সিজম, অকাল্ট, বৌদ্ধ দর্শন, কালী এই সব কিছু ভেতর থেকে আসলে একজন জ্যান্ত মানুষ বার হয়। এই জ্যান্ত মানুষটাকে নিয়ে তো নবারুণদার কাজ ছিল। এই জ্যান্ত ব্যাপারটা আমি কিন্তু আমার কাজে নিয়ে আসতে পেরেছি। সেটা নবারুণদার গল্প উপন্যাসের ওপর করা থিয়েটার হোক বা সিনেমা।”

"রক্তকরবী তো ভীষণ পলিটিক্যাল।"

“শম্ভু মিত্র এবং উৎপল দত্ত। একজন ‘রাজা অউদিপাউস’ করছেন আরেকজন ‘টিনের তলোয়ার’। একজনের বিষয় মানুষের মনের অন্ধকার। আরেকজন পলিটিক্যাল। সুমন মুখোপাধ্যায় কী ভাবে দেখেন?”

“প্রশ্নটা ঠিক হল না।” আমাকে শুধরে দিলেন। “অউদিপাউসের আত্মজিজ্ঞাসাটাও তো খুব পলিটিক্যাল। এই যে এখনও সারা পৃথিবী জুড়ে অউদিপাউস নিয়ে এত কথা হয়। কারণ তার মধ্যেও তো রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের ফেটালিটির যোগাযোগ বা বিছিন্নতা নিয়ে বহু প্রশ্ন আছে। সমাজের বিধিনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন আছে। অউদিপাউস একজন আততায়ী। আবার সে নির্দেশিতও বটে। আমার মতে শম্ভু মিত্রও খুব পলিটিক্যাল ছিলেন। তিনি হয়ত কল্লোল করেননি। কিন্তু তিনি যে নাটকগুলো করেছেন তার মধ্যেও গভীর রাজনৈতিক বীক্ষা রয়েছে। ইবসেনের ডলস হাউজও তো খুব রাজনৈতিক। রক্তকরবী তো ভীষণ পলিটিক্যাল।”

“হু!”

“হ্যাঁ শম্ভুদা উৎপল দত্তের টিনের তলোয়ারের মতো পলিটিক্যাল কাজ করছেন না। অন্য দিকে উৎপলদা তো নিজেই বলতেন যে উনি প্রোপাগ্যান্ডাইস্ট। কিন্তু টিনের তলোয়ারকে তুমি কী বলবে? সেখানে একদিকে যেমন বৃহৎ প্রেক্ষাপট আছে আবার পাশাপাশি মানুষের খুব গভীর ভেতরের গল্পও আছে। এই যে ময়না এবং কাপ্তেনবাবুর বিষয়গুলো। শম্ভুদা একরকম ভাবে থিয়েটারকে দেখতেন। তিনি তাঁর মতো করে তাঁর রাজনৈতিক কথাগুলো বলেছেন। উৎপল’দা আরেক ভাবে করেছেন তাঁর নাটকের মধ্যে দিয়ে।”

"কিন্তু এটা একটা মেকি জায়গা তৈরি করছে।"

“বাংলা থিয়েটারে তো এখন প্রচুর কাজ হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছেন থিয়েটারের কমার্শিয়ালাইজেশন হচ্ছে।”

“প্রচুর কাজ হচ্ছে। ছেলেমেয়েদের কারো ডেট নেই। সবাই ডায়েরি নিয়ে বসে আছে। কিন্তু এটা একটা মেকি জায়গা তৈরি করছে।”

“মেকি জায়গা!”

“আমি বলব শিল্পের দূষণ হচ্ছে,” কথাগুলো বলার মধ্যে একটা ক্ষোভ আছে। কিন্তু সেটাও অসম্ভব পরিশীলিত। প্রায় অধ্যাপক সুলভ। “থিয়েটারের অনুশীলনটা এখন এমন যে ভালো কাজ হওয়াটাই খুব মুশকিল। দেখ যে কোনও নাটকের তো একটা অর্গানিক চ্যালেঞ্জ আছে। একটা প্রকাশ আছে। কিন্তু নতুন কাজে সেটা আমি কিছুতেই পাচ্ছি না। থিয়েটারে শিল্পের প্রতি একটা গভীর সন্ধান। এটা আমি একদম পাচ্ছি না।”

“আচ্ছা।”

“তুমি ভাবো না, যে কোনও রবিবার তুমি একটা হলে যাও। ধরা যাক অ্যাকাডেমিতে – সকালে একটা শো, বিকেলে একটা শো, রাত্রে একটা শো। তুমি একটা জিনিস তৈরি করেছ, তার লাইট ডিজাইন,সাউন্ড ডিজাইন এইধরনের অনেক কিছু আছে। সেটা করার জন্য যে ন্যুনতম সময়টুকু দেওয়া দরকার সেটাই তুমি পাচ্ছ না। একদল শো শেষ করে বেরোতে না বেরোতেই আরেকদল ঢুকে যাচ্ছে মেকআপ করতে। কোনও সূক্ষ্ম কাজ করার মতো পরিস্থিতিই নেই। প্রসেসটাই তোমাকে গোদা দিকে ঢেলে দিচ্ছে। সারাদিন ধরে একটাই শো করার মতো অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বহু দলের নেই। আমি তো আমার দলকে বলেই দিয়েছি রবিবারে কোনও শো নেবে না। সিনেমাতেও একই অবস্থা। কুড়ি দিনে শ্যুটিং শেষ করতে হবে। এ যে কী বিশাল একটা চাপ! পরীক্ষা নিরীক্ষা করাই যাচ্ছে না। এটা কেউ বুঝতে পারছে না। অর্থনীতিই আসলে শিল্পকে পরিচালন করছে।”

"থিয়েটারে এখন প্রচুর কাজ এসেছে। প্রচুর টাকাপয়সাও বিনিয়োগ হচ্ছে।"

একটানা কথা বলে যাচ্ছেন সুমনদা। থামছেন না। “থিয়েটারে নতুন কোনও কাজ করব সেই পরিবেশই নেই। ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’ যে সময় করছি, তখন পঞ্চাশজনকে নিয়ে ছ’মাস মহলা করেছি। এখন সেটা অবাস্তব লাগে। যদি আবার কিছু করতে চাই তাহলে ওইভাবেই করব। ব্যবস্থাটা আমাকে করে নিতে হবে। প্রসেসই প্রোডাক্টটাকে ডিফাইন করে। থিয়েটারে এখন প্রচুর কাজ এসেছে। প্রচুর টাকাপয়সাও বিনিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় থিয়েটারের যে শৈল্পিক উন্নতি দরকার সেটা আমি পাচ্ছি না। সবটাই এখন গ্ল্যামার। তাই নিয়ে লেখালেখি, সোশ্যাল মিডিয়া, কিন্তু মূল কাজটা যে ভেতর থেকে তৈরি হচ্ছে সেখানে চালাকি ঢুকে গেছে। যেটাকে তুমি বলছ কমার্শিয়ালাইজেশন।”

“কিন্তু প্রচার তো দরকার।”

“আমি সব বুঝছি। প্রচার দরকার। সোশ্যাল মিডিয়া দরকার। বিজ্ঞাপনও দরকার। কিন্তু কীসের বিনিময়ে? ওই মূল কাজটাকে বাদ দিয়ে যদি ওইগুলোই ভাবা হয়। শঙ্খবাবুর লাইন বলতে হয়, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।’ থিয়েটারের সঙ্গে তো শিল্পের একটা কেমিস্ট্রি তৈরি করতে হবে। সেটাই আমরা পারছি না। সব কিছু বাইরে থেকে চলছে। ভালো কাজ যে হচ্ছে না তা নয়। টুকটাক হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগটাই আর্টিস্টিক দিক থেকে ভেগ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। থিয়েটারকে সামগ্রিক ভাবে বলতে গেলে, কী সামাজিক অভিঘাত তৈরি হচ্ছে থিয়েটারে সেই আসল জায়গাটাই কিন্তু ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। দেখো, থিয়েটার অনেকরকম হতে পারে। অনেক ফর্ম হতে পারে। সেটা নিয়ে বিরোধও হতে পারে। সেটা একটা ইন্টেলেকচুয়াল বিরোধ। কিন্তু সেই বৌদ্ধিক ব্যাপারটাই তো নেই।”

“এখানে তো মনে করা হয় ইন্টেলেকচুয়াল মানেই সেটা সবার জন্য নয়।”

“এটা আমি একদম মানি না।” কথাটাকে যেন উড়িয়েই দিলেন তিনি, “আসলে যে মানুষের কথা ভাবছে সে কিন্তু বৌদ্ধিক জায়গা থেকেই ভাবছে। ভেতরে দার্শনিক প্রশ্ন না থাকলে সেটা কী করে হবে?আমাকে তো এই বর্তমান সমাজ ভাবনার থেকে ঘুরে যাওয়ার একটা চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু এখন যে ভাবে কাজ হচ্ছে, তাতে সেটা কাউকে সমৃদ্ধ করছে না। এখানে হল পাচ্ছি না বা ডেট পাচ্ছি না এটা নিয়েই যেন সব নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় প্রসেনিয়াম জিনিসটাকে খুব বেশি ব্যবহার করা হয়ে গিয়েছে। এখন নতুন বিকল্প খোঁজা উচিত।”

“মুম্বইয়ের থিয়েটার? সর্বভারতীয় থিয়েটার?”

"পঁচিশ বছর পর স্টেজে ফিরলাম।"

“মুম্বইতে যে থিয়েটার আমরা দেখছি সেগুলোতো ফিল্মস্টারদের থিয়েটার। সেটা থিয়েটার হিসেবে কতটা পদবাচ্য? লোকে তো নাসিরুদ্দিন বা পরেশ রাওয়ালকে দেখতে থিয়েটারে যাচ্ছে। বরং বলব,দক্ষিণ ভারতে অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। নতুন স্পেসের ব্যবহার করা হচ্ছে। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু ভারতবর্ষের অনেক অংশেই এই পরীক্ষানিরীক্ষার থিয়েটারকে জায়গা না দিয়ে ফিল্মস্টার নির্ভর কাজ হচ্ছে।”

“এত দিন পরে থিয়েটারে অভিনয় করতে এলেন হঠাৎ?”

“নিজেকে নিয়ে সবসময়েই নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করি। নানারকম কাজ করে যেতে চাই। অভিনয়ে ফেরাটাও একটা ডেফিনিট ডিসিশন। পঁচিশ বছর পর স্টেজে ফিরলাম। আমি বাংলা থিয়েটার থেকে বিচ্যুত বলেই আবার একটা অভিনয় করে যোগাযোগটা ঝালাই করতে চাইছিলাম। এই চরিত্রটা এমন যে ‘এই আকালেও স্বপ্ন দেখে’। ডন কিহোতের চরিত্রটাই এমন যে সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে বাস্তবকে উলটো ভাবে দেখছে। সম্পূর্ণ অবাস্তবের জন্য লড়ছে। এই যে কল্পনার একটা দৈত্যের লড়ছে, সেই লড়াইটাকে নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া। এই লড়াইটা না থাকলে তো হবে না। এই অবাস্তব ভূমিতেই তোমাকে লড়তে হবে। আমরা সবাই জানি সে প্র্যাকটিকাল নয়। এই প্র্যাকটিকালিটিটাই এমন একটা পলিটিকাল কারেক্টনেস দিচ্ছে যার আমার কাছে কোনও যৌক্তিকতা নেই। বরং আমরা তো ইম্প্র্যাকটিকাল হতেই পারি একটা অন্য পৃথিবী তৈরি করতে। সেই কথাটাই তো ডন বলে।”

“আপনি তো থিয়েটারের আর্কাইভিং করছিলেন।”

“একটা প্রোজেক্ট পেয়েছিলাম। ভারতের বিভিন্ন ভাষার থিয়েটার হিন্দিতে অনুবাদ করে নতুন করে করা হবে। সেইগুলো রেকর্ড করা হবে। ঠিক আর্কাইভিং নয়। একধরনের রিইন্টারপ্রিটেশন। তবে কিছু খুব ভালো, খুব উন্নত প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে ডিরেক্ট রেকর্ডিং করা হয়েছি। সেইগুলো আর্কাইভিংই। তবে অনেকে রাজি হননি। যেমন শুনেছি মহেশ এলকুঞ্চুয়ার। আসলে অনেকেই বিশ্বাস করেন না থিয়েটার আর্কাইভ করা যায়। তবে এখন গোটা ব্যাপারটাই আবার বিশ বাঁও জলে।”

“কেন?”

“আসলে ইংল্যান্ডের ন্যাশান্যাল থিয়েটার এমন একটা প্রজেক্ট করত। দিনের পর দিন পারফর্মেন্সগুলো রেকর্ড করে, ফাইনালি একটা এডিটেড ভার্শান তৈরি করত। আমরা খুব যত্ন নিয়ে করতাম। তিনটে ক্যামেরা ব্যবহার হতো। চ্যানেলের মনে হলো কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। কিনবে কারা? ওরা তখন বলল বিক্রয়যোগ্যতা বাড়াতে কমার্শিয়াল কিছু করো।” হাসলেন সুমনদা।

‘কিন্তু থিয়েটার তো একটা ইভলভিং প্রসেস। প্রতিটা শোতে বদল হচ্ছে। সেটাকে কতটা আর্কাইভ করা সম্ভব?”

“থিয়েটারকে রেকর্ড করা যায় না। বড়জোর একদিনের একটা শোর একটা ভার্শান রেকর্ড হতে পারে। হয়ত অন্য দিন আরও ভালো কাজ হয়েছিল। কিন্তু এটা ছাড়া তো উপায়ও নেই। তুমি যদি আজকে উৎপল দত্তর কোনও প্রোডাকশন দেখতে চাও, বা অজিতেশবাবু কিংবা শম্ভু মিত্রের, তুমি কী ভাবে দেখবে? ইউরোপে কিন্তু কিছু থিয়েটার আর্কাইভ করা আছে। গ্রোটোস্কি বা পিটার ব্রুকের বেশ কিছু কাজ তো আমরা এইভাবেই দেখতে পারি। তবে হ্যাঁ থিয়েটারের যে মূল চরিত্র, সেটার সঙ্গে হয়ত কিছুটা সমঝোতা হয়ে যায়। কিন্তু ঐতিহাসিক একটা গুরুত্ব তো থাকেই।”

"তোমার নিজের একটা পারসেপশন আছে।"

“সিনেমায় একজন নির্দেশক তো ঠিক করতে পারেন দর্শক কতটা দেখবেন। থিয়েটারে দর্শক পারফরম্যান্স থেকে কতটা দূরে, কোথায় বসে, সেইগুলোর ওপর তো দেখাটা বদলে যায়। আমরা যাকে বলি দর্শকের পয়েন্ট অব ভিউ…”

“আমি যখন আমেরিকায় পড়তে গিয়েছি সেইসময় অ্যান বোগার্ট বলে বিখ্যাত আমেরিকান পরিচালিকার নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। নিউ ইয়র্কে সেন্ট্রাল পার্কে। প্রচুর অ্যাকশন হচ্ছে। প্রচুর! আমার খুব অসুবিধা হচ্ছিল, আমি বুঝতে পারছিলাম না কোনটা দেখব। এত অপশান! অ্যানকে বলেছিলাম সেটা। ও আমাকে পালটা জিজ্ঞাসা করল, তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়েও কি জিজ্ঞাসা করো কোনদিকে দেখব? কোনটা শুনব? তোমার নিজের একটা পারসেপশন আছে। তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাজার হাজার ভিজ্যুয়াল কিংবা সাউন্ডের মধ্যে একটা কিছু বেছে নাও। যেটা তোমার দরকার। সেই একই ব্যাপার তোমার থিয়েটারের মধ্যেও আছে। আমি তোমায় সেই ডেমোক্রেসিটা দিচ্ছি। সেটা তুমি নাও।”

“অদ্ভুত!”

“এটা আমি আমার থিয়েটারেও মাঝে মাঝে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তুমি যদি আধুনিক থিয়েটার দেখ, সারা পৃথিবীর, যাঁরা বড় ডিরেক্টর তাঁরা কিন্তু এটা এক্সারসাইজ করছেন। কী ভাবে পারফরম্যান্সের আরো কাছে দর্শককে নিয়ে আসা যায়। এবং একই সঙ্গে এই দেখার গণতন্ত্রকে কী ভাবে আরো বাড়ানো যায়। ধরো যখন মুশকিন ১৭৮৯ করছেন। তিনি একটা প্রশস্ত ওয়ারহাউসে নানা স্টেজ তৈরি করেছেন। প্রত্যেকটা স্টেজে একটা পারফরম্যান্স হচ্ছে। তুমি এটা আলাদা আলাদা করে দেখতে পারো।”

“মেফিস্টো, ইস্তভান জাবোর বিখ্যাত সিনেমা সেটাই নাটক করেছিলেন...”

“সিনেমাটা আর নাটকটা অনেক আলাদা। আমি নাটকটা করেছিলাম অ্যারিয়ান মুশকিনের নাট্যরূপ থেকে। ক্লাউস মানের মূল উপন্যাসটা থেকে মুশকিনের একভাবে অ্যাডাপ্ট করেছিলেন। জাবো আরেকভাবে। আমি দুটোকে একভাবে বেঁধেছি। দুটো থেকেই কিছু কিছু নিয়েছি।”

“কী ভাবে?”

"এক পেশে কোনও মনোভাব থেকে তো কখনও শিল্প হতে পারে না।"

“মুশকিন পলিটিক্যাল থিয়েটারের জায়গাটায় খুব জোর দিয়েছিলেন। ওর মধ্যে একটা একটা হোমো সেক্সুয়াল অ্যাঙ্গেল, জেন্ডার ইস্যু ছিল। রাষ্ট্রের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটা অনেক বেশি জাবোর ছবিতে। ওই দুটোর অদ্ভুত একটা মিশ্রণ হয়েছিল। আসলে গুজরাত দাঙ্গার পরে আমি যখন ওই নাটকটা করেছি তখন আমার কাছে মূল জিজ্ঞাসা ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক। সেই সময় আমি উপন্যাসটা পড়লাম। ছবিটাও দেখলাম। নাটকটা আমি দেখিনি। নাটকের টেক্সটটাই পড়েছি। আমার তখন মনে হয়েছিল এই তিনটেকে আমাকে মেলাতে হবে। যাতে আমার দর্শকের কাছে ব্যাপারটা আরো সহজবোধ্য হয়। জেন্ডার ইস্যুটা বাদ দিয়েছিলাম। আমাদের দর্শকের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য।”

“এই যে শিল্পীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। ক্ষমতার সম্পর্কের কথা বলছেন... আমরা তো দেখতে পাচ্ছি শিল্পীরা বারবার ক্ষমতার কাছে চলে যাচ্ছেন।”

“এখন তো এটা একটা খুব কমন হ্যাবিট। শিল্পীরা তাঁদের নিজেদের কারণেই তো কোনও না কোনও রাজনৈতিক শক্তির কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন। আর চলে গিয়ে কতগুলো বিপদ ডেকে আনছেন। নিজেদের বিপদ। কতগুলো বন্ধন যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনই কতগুলো বাধ্যবাধকতাও তৈরি হচ্ছে। আমি কিন্তু কোনওদিন পলিটিক্যাল পার্টির কাছাকাছি যাইনি। কোনওদিন যাবও না বলে বিশ্বাস করি। এর ফলে আমার একটা স্ট্রাগল চলছে। এই যে বলছিলাম সিনেমাগুলো যত লোকের কাছে পোঁছনো উচিত ছিল তত লোকের কাছে পৌঁছলো না। এই দামটা তো আমাকে দিতেই হবে। আমি আমার মতো করে শিল্পকর্মটা করে যাব তাতে বিরোধ হলে সেই বিরোধটা আমাকেই ডিল করতে হবে।

“আপনার এত স্ট্রং ইডিওলজি। কিন্তু গোটা পৃথিবীর এখন যা অবস্থা... কোথাও নিজেকে কনফিউজড লাগে না?”

“কনফিউশান তো আছেই।, এই সময়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা যাবে সেটা নিয়েই তো আছে। এক পেশে কোনও মনোভাব থেকে তো কখনও শিল্প হতে পারে না। এই কনফিউশান আছে বলেই তো আমি কাজ করে যাচ্ছি। বারবার প্রশ্ন করছি যে থিয়েটারটাকে কী ভাবে করব।”

“কখনও মনে হয় না ইউরোপ বা অ্যামেরিকায় জন্মালে, বা থাকলে ভালো হত? কাজে এত বাধা আসত না? ”

থমকালেন। তারপর কাটাকাটা উচ্চারণে বললেন, “না, সেটা আমার কখনও মনে হয়নি। শিল্পীদের লড়াই সব জায়গাতেই আছে। গোটা পৃথিবীর বড় চলচ্চিত্র পরিচালক বা নাট্যপরিচালক, সবাই নিজের মতো করে লড়াই করছেন। সবারই স্ট্রাগল আছে। আমি এত বয়সে এসে শহর বদলানোর কথা ভাবলাম, কারণ যে ভাবে কাজ করতে চাইছিলাম সেটা এখানে পারছিলাম না। আবার এটাও তো সত্যি এই শহর আমাকে সম্মানও দিয়েছে। হ্যাঁ, কিছু জায়গায় হয়ত অন্যরকম হলে ভালো হত। দেখ আমার মধ্যে কোনও মোড়ল হওয়ার, গুরু হওয়ার বাসনা কোনওদিনই ছিল না। আমাকে রোজ বিকেলে গিয়ে দলে বসে থাকতে হবে আর সবাই আমার ভজনা করবে এটা আমি কোনওদিনও চাইনি। আমি তো দলটাই তুলে দিলাম। আমি যদি আবার থিয়েটার করি তাহলে আমার মতো করে অভিনেতাদের বেছে নেব। তাদের আমার মতো করে প্রসেস করব। আবার মুম্বাইয়ের একটা নিজস্ব পলিটিক্স আছে। সেখানেও আমাকে স্ট্রাগল করতে হচ্ছে। আমি শুধু আমার কাজটাই করে যেতে চাই। আমার মতো করে।”

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: হিরণ মিত্র, শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত মজুমদার, অভিষেক মজুমদার

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু সরকার
শেয়ার করুন: