এত জনপ্রিয়তা থাকলে শত্রু থাকবেই

চল্লিশ বছর লেখার পর কেন এখনও কোন ভাবনা তাঁকে লিখতে বাধ্য করে? ক্ষমতার কেন্দ্র এবং প্রান্তে থাকার পরও এখনও তাঁকে জারিত করে কোন স্বপ্ন? গীতবিতান, বুদ্ধদেব বসু থেকে তাঁকে নিয়ে অজস্র বিতর্ক। কবি সুবোধ সরকারের মুখোমুখি অনুজ কবি ও কথাকার বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। আড্ডায় যোগ দিলেন শমীক ঘোষ

“গভীর রাতে হয়তো আমার খুব বুকে ব্যথা করছে। আমার ছেলে হয়তো দূর আমেরিকায়। পিএইচডি করছে। কেউ নেই। আর আমি জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। বা হয়তো ফোনের দিকে। কাউকে জানাতে পারছি না।” কথা বলছেন সুবোধ সরকার। গলা নয় হৃদয় থেকে কথাগুলো বেরিয়ে আসছে যেন। কবিতা আকাদেমির প্রশস্ত ঘরের ভেতরে, চওড়া সেক্রেটারিয়াল টেবিলের উলটো দিকে বসে। আর তাঁর সামনে বসে এই প্রজন্মের আরেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। সুবোধদা বলে চলেছেন, “এখন আমার এটাই একমাত্র ভয়। সাত বছর হয়ে গিয়েছে মল্লিকা নেই। ওঁর থাকার সময় আরও অনেক বেশি অসংযত ছিলাম। কোনওদিন ইচ্ছে হল না, বাড়ি ফিরলাম না। হয়তো সুনীলদার বাড়ি থেকে রাত দেড়টার সময় বেরোচ্ছি। এখন সাড়ে আটটা বাজলেই মনে হয় ছেলেটা বাড়ি ফিরল কিনা। হয়তো কোথাও গিয়েছি, যেখানে প্রচুর ভালো ভালো খাবার। পানীয়। আমার মনে হয় বাড়ি চলে যাই। ছেলেটার সঙ্গে বসে দু’টো রুটি খাই।”

“চল্লিশ বছর কবিতা লিখছ তুমি। সেই আটাত্তর সাল থেকে। আমার লেখালেখিই কুড়ি বছর পেরিয়ে গেল। এত দিন পরও সকালে উঠে একজন কবি কী লিখতে চান? কোন কথাটা বলা বাকি রয়ে গেল?”

“আমার অনেক কথা বলার আছে। অনেক কথা!” ভারী গলায় টেনে টেনে বললেন সুবোধদা। “অনেক কিছু লিখব ভেবেছিলাম। এখনও লেখা হয়নি। প্রতিদিন সকালে উঠেই অস্বস্তি হয়। শুধু কবিতা নয়। তা ছাড়াও অনেক কিছু লেখা বাকি আছে আমার।

"একটা বড় লেখায় হাত দিয়েছি।"

এই বছরের আঠাশে অক্টোবর...”

“তোমার ষাট বছর বয়স হবে।” বলে উঠলেন বিনায়কদা।

“অনেকে উপভোগ করে। আমার কিন্তু ভয় হচ্ছে। ষাট বছর বয়স হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ক’বছর আর সময় পাব? এটা সাঙ্ঘাতিক খোঁচা দিচ্ছে। ভাবছি চাকরিটা এবার ছেড়ে দেব। আমি তো সকালে লিখি। এখন সকালটাকেও আর লেখার জন্য যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। সাহিত্য আকাদেমির কাজ, কবিতা আকাদেমির কাজ, এগুলো তো বিকেলেও করা যায়। বিকেল সন্ধেয় তো কেউ লেখে না। একটা বড় লেখায় হাত দিয়েছি।”

“আত্মজীবনী? তিন খণ্ডে যেটা লিখছ?”

“সেটা তো আছেই, তার সঙ্গে ভাবছি একটা প্রতিমহাকাব্য যদি লেখা যায়...।”

“রাখো তোমার কাব্য/ আগে আমাকে বলতে হবে/ আমরা কবে এক শহরে এক পাড়ায়/ এক বাড়িতে থাকব।” কথা শেষ হওয়ার আগে এইবার থামিয়ে দিলেন বিনায়কদা। “এই যে তোমার প্রেমের কবিতা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রতিবাদী কবি বলে পরিচিত সুবোধ সরকারের এখন প্রেমের জন্য সময় আছে?”

মুচকি হাসলেন সুবোধদা। “প্রেমের জন্য কোনও আলাদা সময় কেউ রাখে বলে আমি জানি না। রাখতে নেই। সকালবেলা থেকে প্রতিটা কাজের মধ্যেই প্রেমকে জড়িয়ে নিতে পারি। আলাদা করে প্রেম করার তো দরকার পড়ে না। আগে ছিল একসঙ্গে কফি খাওয়া, চা খাওয়া, কিংবা সিনেমা দেখতে যাওয়া। এখন সে সব কোথায়? সিনেমা তো লোকে হলে গিয়ে আর দেখেই না। বরং আমার বেশি পছন্দ পাঁচদিনের জন্য দার্জিলিং বা পুরী বা হয়তো ইউরোপের ছোট্ট একটা গ্রামে গিয়ে বসে থাকা। সেই পাঁচদিন সময়ও-তো আমরা বার করতে পারি না আলাদা করে। যে দশটা কবিতার কথা তুই বলছিস সেটার নাম ছিল ‘অন্ধ যখন দেখতে পায়/ ইলিশ ওঠে দেগঙ্গায়!’ এর পরে যে দশটা কবিতা দিয়েছি, তার নাম ‘আমার ভালোবাসার কোনও তারিখ নেই।’ সত্যিই কি ভালোবাসার কোনও সাল তারিখ হয়? কোনও বয়স হয়? এটা তো একই সঙ্গে আমার দু’পকেট ভর্তি ভালোবাসা। এবং সেটা আবহমান। এর জন্য আলাদা করে কোনও বয়স হয় না। ষাট বা সত্তর বছরও বয়সেও হতে পারে। আবার আঠারো বছরেও হতে পারে। আমি তো একই সঙ্গে ষাট এবং উনিশ।

“পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের একটা কথা ছিল, কবিকে হতে হবে ফেলুদার মতো। তাকে সবাই চিনে ফেললে কবিতা লেখার ক্ষতি হতে পারে।”

থমকালেন সুবোধ সরকার। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে শুরু করলেন আবার সেই ব্যারিটোন ভয়েজে। “এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে পৃথিবীর চারজন মহান কবির নাম বলতে পারি - পাবলো নেরুদা, অক্টাভিও পাজ, শ্রীকান্ত ভার্মা এবং শেষে যে নামটা না নিলেই নয় – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনজন তো আন্তর্জাতিক স্তরে ভীষণ জনপ্রিয় কবি। শ্রীকান্ত ভার্মাকেও সারা ভারত চিনত। কারণ, তিনি সেই সময় সরকারের, জাতীয় রাজনীতির একেবারে কেন্দ্রে ছিলেন। অটল বিহারী বাজপেয়ী বা আমাদের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উদাহরণও দেওয়া যায়। এরা কখনওই নিজের লেখালেখির জায়গাটায় কোনও কম্প্রোমাইজ করেননি। আসলে এটা না আস্তে আস্তে কবির শরীরের মধ্যে, মনোজগতের মধ্যে একটা কাল্ট হয়ে যায়। পু্রো ফ্রেমটা তিনি তৈরি করেন তারপর বুঝে নেন যে এটার মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হবে।”

"মুখ্যমন্ত্রী সুস্পষ্ট ভাবে বলেই দিয়েছেন, আরও বৃহত্তর পরিসরে কবিতাকে পৌঁছে দেওয়াটাই মূল কাজ।"

চায়ের কাপে চুমুক দিলেন সুবোধদা। “এই তো কালকেই একটা টেলিভিশন চ্যানেলে এক-দেড় ঘণ্টা ছিলাম। বেরিয়ে এসেই আমি একটা উপন্যাস পড়লাম। কোনও অসুবিধে তো হয়নি, পাঠক হিসেবে তো আমি বেঁচে আছি। আমার পাঠক সত্তা এবং লেখালেখি এই দুটো জায়গাকে আমি সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছি। আমি যদি সাহিত্য আকাদেমি, কবিতা আকাদেমি, রেডিও, টেলিভিশনে কিচ্ছু না করতাম, কোন অনুষ্ঠানেই না গিয়ে নিভৃতে কবিতা রচনা করতাম, তাতে যে বেটার কিছু দিতে পারতাম তা তো নয়। এটাই আমার প্রতিভার উল্লম্ফন এবং এটাই তার সীমাবদ্ধতা।

“ভারতের ভেতর বাংলা কবিতা এবং বাংলার ভেতরেও বাংলা কবিতার সবচেয়ে পরিচিত ব্যক্তিত্ব এখন সুবোধ সরকার। একদিকে তিনি সাহিত্য আকাদেমির বাংলার আহ্বায়ক। অন্য দিকে, তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় কবিতা আকাদেমিরও শীর্ষে। তাহলে কেউ বলতে পারে বাংলা কবিতার প্রান্ত এবং কেন্দ্র দুইই এখন সুবোধ সরকার।” দু’জনের কথার মাঝে আমি ঢুকে পড়লাম।

“দুটো সাহিত্য প্রতিষ্ঠান। কবিতা আকাদেমির বয়স মাত্র দু’বছর। শুধু কবিতার জন্য এমন একটা আকাদেমি করা যায় এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই ভাবতে পেরেছিলেন। লোকে অবাক হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিল তা আবার হয় নাকি। মাত্র দু’বছরেই এটা এখন একটা অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। মুখ্যমন্ত্রী সুস্পষ্ট ভাবে বলেই দিয়েছেন, আরও বৃহত্তর পরিসরে কবিতাকে পৌঁছে দেওয়াটাই মূল কাজ। আর অন্য দিকে সাহিত্য আকাদেমি। অনেক পুরনো প্রতিষ্ঠান। সরকারি বলে তার কিছু কুণ্ঠা আছে। সেদিক দিয়ে বলতে গেলে বিদগ্ধ শ্রেণীর প্রতিষ্ঠান। আমার কাজ হচ্ছে মাস এবং ক্লাস সবার জন্যই এই দুই প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলে দেওয়া। দুটোর একটা মিশ্রণ ঘটানো। কাউকে বাদ দিয়ে তো কোনও প্রতিষ্ঠান হয় না।

“কাউকেই বাদ দিয়ে কোনও প্রতিষ্ঠান হয় না।” কাউকেই শব্দটার ওপর জোর দিয়ে বললেন বিনায়কদা।

"প্রতিষ্ঠান কীভাবে তাঁর দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে পারবে?"

“ঠিক।”

“আমি পঁচিশ বছর ধরে তোমাকে চিনি। তোমার দরজা কারো জন্যই কখনও বন্ধ নয়। কিন্তু অনেক কবি তো স্বভাব লাজুক। আবার কেউ কেউ আছে যারা সহজেই সব জায়গায় পৌঁছে যায়। তারা সাহিত্য আকাদেমি কবিতা আকাদেমিতে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু ওই স্বভাবলাজুক, ধরা যাক আজকে জীবনানন্দের মতো কেউ যদি থাকে, তাহলে সে কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানের দরজায় এসে দাঁড়াবে?”

“কঠিন। খুব কঠিন। তবে দায়টা আমার। আমাকেই পৌঁছতে হবে। বুদ্ধদেব বসু নিজেই লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ তাঁকে দেখতে পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু তো জীবনানন্দকে সমর্থনই করেছেন। আমার খুব ভাবতে ভালো লাগে যে এই সময়েও একজন খুব শক্তিশালী কবি নিভৃতে, সবার চোখের আড়ালে ওইভাবে লিখছেন।

“প্রতিষ্ঠান কীভাবে তাঁর দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে পারবে?”

“আমি সেই কবিকে অনুরোধ করব, আপনি বাংলা ভাষাকে, বাংলা সাহিত্যকে একটু সুযোগ দিন। অন্তত একটা বই করুন। দশটা কবিতা ছাপতে দিন। তাছাড়া যুগটাও বদলে গিয়েছে। তিনি কোথাও ছাপাতে না দিয়েও ফেসবুকে লিখতে পারেন। হয়তো তিনি খুব দরিদ্র। কিন্তু পরিচিত কারো ইন্টারনেটও তো তিনি ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের কাছে তাঁকে আসতে হবে না। আমরাই চেষ্টা করব তাঁর কাছে পৌঁছতে।”

“এত হাজার হাজার লোক কবিতা লিখছেন। খুঁজে পাবেন কীভাবে?” আবার ছুঁড়ে দিলাম প্রশ্নটা।

“আমার কবি বন্ধুরাও তো আছেন। অতিতরুণ থেকে বয়স্ক। সকলেই আছেন। তাঁরাই আমাকে খবর দেবেন। আমি তো কোনওদিন রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরীর লেখা কোনও বড় কাগজে পড়িনি। লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তাঁর লেখা পড়তে পড়তেই তো আমি একদিন তাঁর কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম। তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। সুতরাং ষাট বছর বয়সে সেই চেষ্টা আরও বেশি করে করব। যাতে কবিতা আকাদেমি সবার জন্য খোলা থাকে। এমনকি তার জন্যও যে সুবোধ সরকারকে পছন্দ করে না।”

“আমি একটা অন্য কথা বলি,” আবার প্রশ্ন করতে শুরু করলেন বিনায়ক’দা, “এলিয়টের একটা কথা আছে, ‘much learning deadens or perverts poetic sensibility’… আজকাল অবশ্য আমাদের কবিদের খুব বেশি পড়াশুনো করার দুর্নাম কেউ দেয় না।এবার সুবোধ সরকারের পিএইচডি না করলেও চলত।কিন্তু করেছ। বাংলা ভাষার একমাত্র কবি হিসেবে পেয়েছ ফুলব্রাইট ফেলোশিপ। সেটাও একটা তুমুল অ্যাকাডেমিক সম্মান। এক কথায় পড়াশুনোটা তুমি চিরকাল চালিয়ে গিয়েছ। কেন?”

"বুদ্ধদেব বসু আর আমার একই দিনে জন্মদিন।"

“আমার কাছে আদর্শ বাংলা সাহিত্যের একটা নাম বুদ্ধদেব বসু। তাঁকে চোখে দেখিনি কোনওদিন। কিন্তু তিনি আমার কাছে আচার্য। বাংলাভাষায় এমন কেউ আর আসেননি। তাঁকে কবি হিসেবে আমরা কতটা চিনেছি সেটা বড় কথা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের প্রবন্ধে। ওই প্রবন্ধ পড়লে সারাজীবন কোনও কবিতা না লিখতে পারার বেদনা ভুলে থাকা যায়। আমি বিশ্বাস করি ওই মানের প্রবন্ধ খোদ রবীন্দ্রনাথও লিখতে পারেননি। শুধু সভ্যতার সঙ্কটের কথা বলছি না। বলছি সাহিত্যের প্রবন্ধের কথা। আবার এই বুদ্ধদেব বসুর-ই শেষ জীবনের রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ পড়লে চোখে জল চলে আসে। প্রবন্ধ লিখেই একজন মানুষ কাঁদিয়ে দিতে পারে। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। শার্ল বোদলেয়রের কবিতার অনুবাদের সময় উনি একটা ষাট পাতার অ্যাপেন্ডিক্স ছাপিয়েছিলেন। সেখানে ইউরোপের দু’শো বছরের ঐতিহাসিক কালক্রম লিখেছিলেন। মূলত ফরাসী কবিতার। তার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের ইতিহাসও উঠে আসছে। শুধু ঐটুকু যদি কেউ পড়ে – ওঁর লেখা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বা জীবনানন্দের ভূমিকার কথা বাদ দিয়ে বলছি, ওই কালপঞ্জিটুকু পড়লেই ইউরোপ চেনা যায়। এতটাই অমোঘ! এত ভালো মাস্টার মশাই। তিনি কবি, তিনি ঔপন্যাসিক, তিনি অত্যন্ত জরুরি অনুবাদক। বড় সংগঠক। আরও কত কিছুই তো করেছেন। সেই ষাটের দশকে তিনি একজন বাঙালি লেখক হিসেবে আমেরিকার অতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় চষে বেড়িয়েছেন। প্রায় সব জায়গা থেকেই ডাক পেয়েছেন। এ তো ভারতবর্ষের কোনও কবি বা লেখকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। উনিই প্রথম এই সম্মান আমাদের জন্য এনে দিয়েছিলেন। সবদিক থেকেই উনি আমার কাছে আইকন।

“বুদ্ধদেব বসুর প্রসঙ্গ এল বলে একটা কথা বলি। বুদ্ধদেব বসু আর আমার একই দিনে জন্মদিন। ৩০ নভেম্বর। ওঁর মৃত্যুর দু’বছরের মধ্যে আমার জন্ম। আমাদের নামের আদ্যাক্ষরও এক।” বিনায়কদার মুখে একটা মজার হাসি।

“এত মিল! ভেবে দেখিনি তো! তবে ওর চেহারা ছিল ছোটোখাটো। সেদিক থেকে তোর সঙ্গে মিল নেই।” হাসলেন সুবোধ সরকার। সেই হাসিতে স্নেহের আভাস।

“আপনার পরের প্রজন্মের বাংলা কবিতা, কাদের কথা বলবেন?” শমীক জানতে চাইলেন।

“দেখ,” আমার দিকে তাকালেন সুবোধদা। “আমি জ্যোতিষে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমি কিছু কিছু ব্যাপারে আমি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। আজ থেকে আঠারো বছর আগে একটি কবিতার বই ‘আমি কারো অন্ধকার নই’ আমি উৎসর্গ করেছিলাম তিনজন নবীন কবিকে। তারা আমার ভাইয়ের মতো। তারা আমার সন্তানের মতো। শ্রীজাত, বিনায়ক, অংশুমান। তারাই তো আমাদের পরবর্তী সময়ের প্রধান কবি। সেইসময় কতজন কত কথা বলেছিল। শেষ পর্যন্ত আমার মন্তব্যটাই স্থায়িত্ব লাভ করল।”

একটু অপ্রস্তুত হলেন যেন বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘দেশে দেশে পাড়ায় পাড়ায়’ সাহিত্য একটা অ্যানেকডোট হিসেবে আসছে। কিন্তু সাহিত্যের প্রবন্ধ তো তুমি লিখলে না।”

“ইংরাজিতে যে সমস্ত বই লিখেছি সেগুলো সাহিত্যের এই জায়গা থেকে লেখা। বাংলায় আমি এই প্রবন্ধগুলো লিখতে পারি না। কিছু একটা অসুবিধে হয়। ‘দেশে দেশে পাড়ায় পাড়ায়’ আমায় লিখতে বললেই লিখে দেব। সেটাও সাহিত্য নিয়েই। কিন্তু সেটা গল্পের ঢং-এ। বাংলায় প্রবন্ধ লেখার যে চূড়ান্ত ডিসিপ্লিন বুদ্ধদেব বসুর ছিল। সেইটা করার মনের জোর আমার নেই। ইংরাজি হয়ে গেলেই সেটা আবার হয়ে যায়। তবে আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছে প্রায় চার-পাঁচশো পাতার একটা প্রবন্ধের বই লেখার। সাহিত্যের প্রবন্ধ।”

“তুমি প্রচণ্ড পণ্ডিত। আবার প্রবল জনপ্রিয় একজন কবিও। সদ্য স্বাক্ষর লোকও তোমার কবিতা পড়ে। মেদিনীপুরের একটা প্রত্যন্ত গ্রামের লাইব্রেরিতে সুবোধ সরকারের বই কেনার পয়সা নেই বলে ফটোকপি করে রাখা হয়। এই দুটো মেলে কীভাবে?।”

“আজ থেকে পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগের একটা ঘটনা বলি। কবি গৌতম ঘোষদস্তিদারের রক্তমাংস পত্রিকা ছাপা হচ্ছে। উনি এসে আমাকে খবর দিলেন যে ভদ্রলোক পত্রিকাটা কম্পোজ করছেন তিনি নাকি কম্পোজ থামিয়ে আমার লেখা পড়েছেন। আমি হতভম্ব। কম্পোজিটাররা তো সাধারণত পড়েন না। কম্পোজ করে যাওয়াই তাঁদের কাজ। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কদিন আগেই এমন আরেকটা জিনিস ঘটল। সেদিন আমি খুব ক্লান্ত। শুয়ে পড়েছি। একজন শিক্ষক ফোন করলেন। আমরা সকলেই তাঁকে চিনি। টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। তিনি জানালেন, তাঁদের অঞ্চলের স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের কবিতা পাঠের একটি প্রতিযোগিতা ছিল। সেখানে ১৫২ জন ছাত্রের মধ্যে ১৪৩ জনই কবিতা পড়ার জন্য সুবোধ সরকারের কবিতা বেছে নিয়েছে। নিজে থেকেই। আমার লেখা কিন্তু সিলেবাসে নেই। রাখাই হয়নি। এই জনপ্রিয়তা আমি যে উপভোগ করি না এটা বলা মিথ্যে বলা হবে। ”

চুপ করলেন সুবোধদা। আবার চায়ে চুমুক দিলেন। একটু ভাবলেন যেন।

“আমি যখনই কবিতা লিখেছি, তখনই ভেবেছি আমার বাঁদিকের বা ডানদিকে ফ্ল্যাটে যিনি থাকেন, তিনিও যদি আমার কবিতা একবার পড়তে চান, আমি তাহলে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দেব আমার কবিতাটা। সে পড়ুক না। সে কবিতার লোক নাই হতে পারে।

"আমার বিশ্বাস আমার গরিব মা আমাকে যা শিখিয়েছেন, ওদের ভারতীয় মায়েরাও তাই শিখিয়েছেন।"

“এটা কিন্তু সমালোচনার জায়গাও। সুবোধ সরকারের কবিতা হল অমিতাভ বচ্চনের ফিল্ম পত্রিকা পাঠ করা। মানে ব্যারিটোন ভয়েজ আছে, ভেতরে কিছু বস্তু নেই এমন কথা আমি কারো কারো মুখে শুনেছি।”

“এটা অনেকেই বলেন। এলিট অংশের অনেকেই যেমন আমার কবিতা পছন্দ করেন না। শঙ্খবাবুর বাড়িতে যাঁরা যান তাঁরা কি আমার কবিতা পছন্দ করেন? এই ধরনের একটা এলিটিস্ট প্রবণতা আছে। আবার সুনীলদার বাড়িতে যাঁরা যেত তার নব্বই শতাংশই আমার কবিতা পছন্দ করত। এই পার্থক্যটা আছে। শক্তিদার বই পছন্দ করে এমন অনেকেও আমার বই কেনে। অনেকেই ভাবেন আমি শঙ্খবাবুর বিরোধিতা করছি সব সময়। একেবারেই নয়। শঙ্খবাবু কি আর এর জন্য দায়ী? এটা হল এক ধরণের চিন্তা। সুবোধ সরকারের বিরোধিতা করা একটা এলিটিস্ট ফ্যাশন। এটা আমার মনে হয় একটা পলিটিক্স অব এক্সক্লুশান। আবার অনেকে বলেন এত জনপ্রিয়তা থাকলে তো শত্রু থাকবেই।”

“শঙ্খবাবুর বাড়িতে আমিও কখনও সখনও যাই। তাই ওই বাড়িতে যাওয়া মানেই তোমার কবিতা না পড়া, এমনটা বোধহয় নয়। যাইহোক, এই প্রসঙ্গেই বলি, তুমি জানো আমি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসক দলের অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করি। সেই জায়গা থেকে আমাকে একঘরে করার চেষ্টাও কেউ-কেউ করেছে এবং করে। মুখে আবার এরাই ভিন্নমত উচ্চারণের বিরাট সমর্থক, অথচ একটি বিরুদ্ধ কথা কেউ বলেছে কি গেছে... তো কথা হল, বিরোধিতা মানে তো চিতাবাঘের হাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়া নয়, বিরোধিতা মানে একটা ডিবেট। সেই ডিবেটের জায়গা থেকে আমার মনে হয়, আমি এটা আমার ইন্টারভিউতেও বলেছি, যদি কোথাও বৃষ্টি হয়, এবং একজন মহিলা সেখানে আসেন, তিনি আমার চরম প্রতিপক্ষ হলেও তাঁর বসার চেয়ার মুছে দেওয়াটা একটা শিভালরি, একটা ভদ্রতা।

“ঠিক। ওখানে আমার জায়গায় যদি অন্য কেউ বসে থাকতেন তাহলে তিনিও আমি যা করেছি তাই করতেন। করাটাই তো উচিত। মায়ের বয়সী, বোনের বয়সী বা কন্যাসমা কেউ হলেও তাই তো করবেন! আমার জায়গায় অমর্ত্য সেন বা সীতারাম ইয়েচুরি থাকলেও তাই করতেন। আমার বিশ্বাস আমার গরিব মা আমাকে যা শিখিয়েছেন, ওদের ভারতীয় মায়েরাও তাই শিখিয়েছেন। কোনও মা তার ছেলেকে শেখান না , কেউ জলে বসতে গেলে, তুই দেখিসনি ভাব করে মুখ ঘুরিয়ে নিবি। কিন্তু মিডিয়া ট্রায়াল তো সে কথা বলল না। যাঁরা গাড়ি বাড়ি নিলেন, তাঁদের কথা না বলে বলা হল সুবোধ সরকারের কথা। আমি আর মল্লিকা আজ থেকে আঠারো বছর আগে, বহু কষ্টে সিরিটি শ্মশানের কাছে সাড়ে ছশো স্কোয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলাম। খুবই কম দামে। আজও সেখানেই আছি। সেটা তো হাইলাইটেড হল না কই!

"তার সমস্ত ইমএমআই আমরা শোধ করেছি আঠারো বছর ধরে।"

“সেটা নাকি গৌতম দেবের দেওয়া?” সুবোধদার কথার মধ্যেই বলে ওঠেন বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।

“তার সমস্ত ইমএমআই আমরা শোধ করেছি আঠারো বছর ধরে।” ধীর গলায় বলে চলেন সুবোধদা, “মল্লিকা চলে যাওয়ার পর বাকি সাত বছর আমি দিলাম। এই সামান্য কদিন আগে কমপ্লিট হয়েছে। যাঁরা বলার তাঁরা এই ধরণের কথা বলতেই থাকবেন।শত্রুতা করার সময় সত্য বলছি কি না দেখার দরকার হয় না তো। ”

“রূপমকে একটি চাকরি দিন। পলাশপুর। একশো মিটার দৌড়। শাড়ি। হাউ টু বি আ গুড কমিউনিস্ট। এই প্রত্যেকটা কবিতাই তৎকালীন সমাজ এবং রাজনীতির খুব ধারালো ক্রিটিক। তৎকালীন শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই তোমাকে তখন ধরে নেওয়া হত। তারপরও তুমি এইগুলো লিখে গেছ। আজকে যখন বর্তমান শাসক দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই তোমাকে দেখা হয় তখন পশ্চিমবঙ্গের কোনও ঘটনা নিয়ে যদি তোমার লেখার ইচ্ছে হয়, তুমি কি লেখাটা লিখতে পারবে? লিখবে?”

“আমার যদি এমন কোনও কিছু নিয়ে প্রতিবাদ করার দরকার পড়ে, আমি নিশ্চয় লিখতে পারব। এটা স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়। ভুল বোঝাবুঝির প্রশ্ন নয়। ৩৪ বছর যখন মধ্যগগনে, তখন কারো কোনও টু ফুঁ করার সাহস ছিল না। কোনও কবিতা,কোনও নাটক, কোনও উপন্যাসে, কোনও সিনেমায় টু ফুঁ হয়নি। কিছু হয়েছে চাটুকারিতা। আর বেশিরভাগই চুপ করে ছিলেন। এখন সেটা আর নেই। এখন আমার সামনে বসে, টেলিভিশনে হোক বা রবীন্দ্রসদন, শিশিরমঞ্চে, অনেক বুদ্ধিজীবীই খোলাখুলি এই সরকারের সমালোচনা করছেন। কই তাঁর বাড়িতে কেউ মাঝরাতে গিয়ে তো কড়া নাড়ছে না। ৩৪ বছরের মধ্যগগনে এটা সম্ভবই ছিল না। শেষের দিকে, নন্দীগ্রামের সময় এটা বদলে যায়। তার আগে তো তেমন কোনও প্রতিবাদ ছিল না। ফেসবুকে তো প্রায় সারাদিনই এইরকম নিন্দা করা হয়। মাঝে মাঝে, যেটা কাম্য নয় সেই অশালীন ভাষাতেও করা হয়। সেটা যদি হতে পারে, তাহলে কবিতা, যার ক্ষমতা সব থেকে ক্ষীণ, সে কেন ভীত হবে সত্যি কথা উচ্চারণের জন্য?”

“তুমি নাকি পরের বছর সাংসদ হতে পারো?”

“না। কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাব না। এই শহর ছেড়ে থাকা আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

“গান নিয়ে কিছু বলবে?”

"আজকের সুবোধ সরকারকে কলকাতার রাস্তায় দেখলে অনেকেই চেনে..."

“হারমোনিয়ামটা এখনও মাথার কাছেই রাখা থাকে। রোজ বসি ওটা নিয়ে। তবে গান গাই না আর। ছেড়ে দিয়েছি। ক্লাস এইট-নাইনে বাবা মারা গেলেন। আমার আর দিদির তো গানের সংসার ছিল। দিদি যে সব ছাত্রছাত্রীদের শেখাতে পারতো না, আমাকে দিয়ে দিতো, আমি শেখাতাম। গান গেয়ে, গান শিখিয়েই পড়াশুনো করেছি। পরে অবশ্য স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। দিদিই একদিন কোত্থেকে একটা ছেঁড়া -হলদেটে গীতবিতান এনেছিল। মাঝে মাঝে দুটো একটা লাইন পড়ে চমকে উঠতাম। সে বই আমি এখনও শেষ করতে পারিনি, জানি না কোন বাঙালি পেরেছেন কিনা। গীতবিতান আসলে সারা জীবন ধরে পড়ার বই।”

“একটা প্রশ্ন করি সুবোধ’দা?” আবার প্রশ্ন করলাম আমি। “আজকের সুবোধ সরকারকে কলকাতার রাস্তায় দেখলে অনেকেই চেনে...”

কথাটা শেষ হওয়ার আগে এবার থামিয়ে দিলেন সুবোধদাই। “সন্দেহের চোখেও তাকায়। একটু মারব মারব ভাব নিয়েও তাকায় কেউ কেউ।” হাসলেন।

“চার দশক আগে এক কিশোর, গান গেয়ে পড়াশুনোর খরচ চালানো সুবোধ সরকার কলকাতায় এসেছিল। আজকের সুবোধ সরকারের সঙ্গে তাঁর দেখা হলে কী বলবেন?”

“দেখা হয় না। আসলে এইমুহূর্তে যেখানে বসে রয়েছি, আমার পেছনে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমার শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় লিখেছিলাম। তখন তো কিশোর। কৃষ্ণনগর স্টেশনে একদিন দেখলাম একটা পাঠানের মতো দেখতে লোক চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিল। লোকটা ছিল ভবঘুরে। একটা পাউরুটির টুকরো রেললাইন থেকে তোলার জন্য লোকটা ওইভাবে প্রাণ বিপন্ন করে ঝাঁপ দিয়েছিল। তারপর সে যখন আবার উঠে এল তখন তার মুখে একটা অদ্ভুত হাসি। বলে বোঝাতে পারব না। মৃত্যু থেকে উঠে আসা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে! তাঁর মুখে হাসি! সেই হাসিটাই আমাকে প্রথম কবিতা লিখিয়েছিল। আমি সেই হাসিটার মানে জানি না। গত চল্লিশ বছর আমি কবিতা লিখেছি সেই হাসিটা নিয়েই। সেই হাসিটা কৃষ্ণনগর ছাড়িয়ে, বিহার, ইউপি ছাড়িয়ে, ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে, আফ্রিকা ছাড়িয়ে লাতিন আমেরিকার দিকে চলে গিয়েছে। সেই হাসিটাই তো লিখে এসেছি এতদিন। ডিকোড করে এসেছি। আমার মনে হয় সেই হাসিটাই আজও দেখতে পাচ্ছি। আমার পিঠের কাছেই সেইদিনের কিশোর সুবোধ সরকার দাঁড়িয়ে আছে।”

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু সরকার
শেয়ার করুন: