আমরা নর্থবেঙ্গলরা

দেবেশ রায়
হেসে বাঁচি না আমরা নর্থবেঙ্গলরা।

তবে আমাদের এমন আপন-হাসি সব সময় সবাই শুনতে পায় না। পাওয়া একটু কঠিনই। সেই মালদার রতুয়ার শুকনো মাটি থেকে সে হাসি ওঠে। মহানন্দা ওদিক দিয়ে বাঁকে না। পুরুলিয়ার থেকেও শুকনো রতুয়া। পুরুলিয়াতে যেমন ওপরে সবুজ জঙ্গল, তলায় পাথর, রতুয়া তেমন নয়। একটি সম্পূর্ণ মরুভুমি— বালি না, শুকনো ধুলো আর কাঁটাগাছের কী ঘন জঙ্গল। মানুষজন থাকতে পারে না। কিন্তু সে জঙ্গলেও জানোয়াররা আসে— মানুষ নেই বলেই আসে। নিরাপদে কিছুদিন বিশ্রাম করে, বেড়িয়ে আবার একদিন একদিকে হাঁটা দেয়। জল ছাড়া জানোয়ার বাঁচে না। লালগড়ে কে পায়ের ছাপ দেখে বাঘ চিনেছে শুনে রতুয়ার, আমাদের রতুয়ার নর্থবেঙ্গল, যদি হাসতে থাকে তা হলে এমন ধুলো উঠবে যে, সবার কানে তালা লেগে যাবে। কিন্তু হাসিটা কেউ নাও বুঝতে পারে।

আবার রতুয়ার সঙ্গে সঙ্গে তো দিনদুপুরে, হিলি বর্ডারের দাঁড়ানো ট্রাকগুলোর খালাসিরা ও ব্ল্যাকাররাও হাসবে। আমরা নর্থবেঙ্গলরা সীমান্তে সীমান্তে বর্ডারে বর্ডারে জালবোনা শাড়ির খোপকাটা ডিজাইন, আর সব একেবারে আন্তর্জাতিক বর্ডার।

"ধুলোতে বাঘের পায়ের ছাপ যে দেখেছে সে সারাজীবনে কখনও গোটা জ্যান্ত বাঘ দেখেছে তো?"

শিলিগুড়ি মহকুমায় অধিকারীতে নেপালের সঙ্গে বর্ডার। এক্কা-দোক্কা খেলার মতো লাফিয়ে নদী-বর্ডার পার হওয়া যায়। সেই নির্জনতম কালো জলের নদীর বর্ডার থেকেও তো লালগড়ে বাঘের ছাপ শুনে হাসি উঠেছে। সে হাসি নদীর হাসি। হাসি উঠছে ফুন্টশেলিংয়ের আর জয়গাঁর ভুটান বর্ডারে। ওটা তো হাতি, বাঘেরই রাজ্য। পাহাড়ের চড়াই-ভাঙা হাসি। হেসেছে বাঘেরাও— বক্সার রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে। ওই হাসি আবার জ্ঞাতিলজ্জার! লোকজন তোদের পায়ের ছাপ শুঁকছে? তাই বলে তুই মল খসালি। হাসির কথা আর না ছড়ানোই ভালো। আমাদের নর্থ-বেঙ্গলদের যে একটা আপন-গোপন হাসি আছে, এটুকু জানানোর ছিল। তাই ডুয়ার্সে বা জয়ন্তীতে ঢুকলাম না।

লালগড় না কোথায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছে কেউ না কেউ আর অমনি টিভি সিরিয়াল শুরু হয়ে গেল। আরে, ধুলোতে বাঘের পায়ের ছাপ যে দেখেছে সে সারাজীবনে কখনও গোটা জ্যান্ত বাঘ দেখেছে তো? না কি শুধুই ধুলো শুঁকে গেছে? সে কি শুধু বাঘের পায়ের ছাপই দেখে আসছে সারাজীবন?

ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অফিসার বা বনকর্মীদের কথা আলাদা। পাবলিক যখন পায়ের চিহ্নের ছাপ বাঘের বলে চিনেছে, অফিসার বা বনকর্মীদের ঘাড়ে দুটো মাথা আছে যে তাঁরা কোনও সন্দেহ জানাবেন? ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কোনও প্রশ্নই তুললেন না।

"বাঘের সাঁতার কেটে খাঁড়ি পেরোনোর সিনেমা না দেখানো পর্যন্তবনকর্মীদের মুক্তি নেই।"

এখন তো সব রহস্য সিসি টিভি মিটিয়ে দেয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট সেই একটা ছাপ ঘিরে ছ’টা সিসি টিভি ক্যামেরা বসিয়ে দিল। যেন, বাঘ ওই পথেই ঢাকুরিয়া লেকের মর্নিং ওয়াকারদের মতো একই রাস্তাতে ঘোরে? একটা বাঘ এক দিনে ৫০০ মাইল চক্কর দিতে পারে। পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ শিকারী এমন একটা মানুষখেকোর মুখোমুখি হতে না পেরে ফিরে যান।

বাঘের একটা পায়ের ছাপের পেছনে সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানোতেই আমরা নর্থবেঙ্গলরা চাপা হাসি হেসেছিলাম। আওয়াজ দিইনি। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট তখন দ্বিতীয় ব্যবস্থায় গেল। তারা একটা খাঁচা ফাঁদ ওই পায়ের ছাপের কাছেই বসিয়ে দিল। পাবলিক যখন পায়ের ছাপ বাঘের বলে চিনে ফেলেছে ডিপার্টমেন্টকে তো খাঁচা বসাতেই হবে। আর একটা ছাগলের বাচ্চাকেও সেই খাঁচার ভেতরে বেঁধে রাখতে হবে। যেন বাঘ কার্ডে ছাপা উজ্জ্বল উপস্থিতির মতো খাঁচার ভেতর ঢুকবে ও অনুপ্রাণিত হয়ে ছাগ-শিশুটির টুঁটি-চেপা উদ্বোধন করবে। বাঘ তো বেরোতে পারবে না। ফাঁদ পড়ে গেছে। প্ল্যান অনুযায়ী ফাঁদে পড়া বাঘকে ট্র্যানকুইলাজার ইনজেকশন দিতে হবে লোকজনের সামনে একটু আন্ডারডোজে। খাঁচার ভেতরে বাঘ কোনও কারণে মারা গেলে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গুষ্টির তুষ্টি হয়ে যাবে। ইনজেকশন দিয়ে, ফাইল থেকে এক বাঘের সাঁতার কেটে খাঁড়ি পেরোনোর সিনেমা না দেখানো পর্যন্তবনকর্মীদের মুক্তি নেই।

আমরা নর্থবেঙ্গলরা ভয় পেলাম— এই সেরেছে, বাঘ নেই কিন্তু খাঁচায় ছাগল চেঁচাচ্ছে। খাঁচায় ছাগল রাখা হয় তো চেঁচানোর জন্যই। গাছের গোড়াতেও বাঁধা হয়। গাছের ওপর রাইফেল নিয়ে বসে। কিন্তু এটা তো বাঘ-মারা অভিযান নয়। বাঘ বাঁচানো অভিযান। পথভোলা বাঘকে তার পথ ফিরিয়ে দেয়।পথভোলা মানে কার পথ? বাঘের জন্য বাঁধানো পথ থাকে না কি? বাঘের আবার পথ কী? বাঘ যেখানে যেতে চায় সেটাই বাঘের পথ। ও আমরা নর্থবেঙ্গলরা চিনি। যদি কোনও বাঘকে একা একা মেচি নদীর আধডোবা বোল্ডারগুলো পেরোতে দেখে, তাহলে যে কেউ বুঝবে বাঘটার খাওয়া হয়ে গেছে, এখন কয়েক মাইল হেঁটে আর কয়েকটা লাফে ও নেপালে ঠান্ডা ঘাসে ঢাকা ঠান্ডা পাথরের তলায় ঘুমোবে। ঘুমোতে যাচ্ছে দেশ পেরিয়ে। আমরা নর্থবেঙ্গলরা অমনি যাই।

কিন্তু ছাগলের ডাকে বিরক্ত হয়ে হাতির পাল ঢুকে পড়ল। হাতিরা বা কোনও একটি হাতি, লেজের ঝাপটে সেই ফাঁদ দিল ভেঙে। ছাগল আধুনিক অর্থে ‘নীরব’ দৌড় লাগাল। হাতিরা একটু বেশি মাওবাদী-নর্থবেঙ্গল।

"ওঁরা হাতি-বাঘ-গণ্ডারের অনেক কিছু জানেন।"

লেজটা হাতির সব থেকে দুর্বল জায়গা কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক ন্যায়পরায়ণতা। অত বড় একটা সম্প্রসারণশীল দশদিক ব্যাপ্ত শুঁড় থাকলে তার লেজ তো ছোট হবেই। হাতিদের চলাফেরার জায়গায় তারা ওই ফাঁদ-টাঁদ সয় না। শুঁড়ের এক ঘায়ে সে সব ভেঙে দেয়। এত দূর পর্যন্ত ছিল বনকর্মীদের নিছক আত্মকথা। ওঁরা হাতি-বাঘ-গণ্ডারের অনেক কিছু জানেন। কিন্তু যা জানি তা কি বলা যায়? তার পর তাঁরা আরও আধুনিক হলেন। হতেই হবে—ড্রোন দিয়ে বাঘ খুঁজতে লাগলেন। ড্রোন কাকে বলে আমি কিন্তু জানি না। কিন্তু ওই আওয়াজে বাঘ আরও নিশ্চিত হয়ে যায়, মানুষ তার পেছনে লেগেছে। বাঘ-হাতি-গণ্ডার বড় পশুরা মানুষকে সবচেয়ে সন্দেহ করে ও অবিশ্বাস করে। ড্রোন কাণ্ড কি শেষ হল? সিসি টিভি, খাঁচা, ইনজেকশন সব পর্ব শেষ হল। সরকার ও বনকর্মীরা নিশ্চেষ্টতার অভিযোগ থেকে ছাড় পেলেন। এবার বাঘ বাড়ি যাবে।

জঙ্গলে যে ফরেস্ট ভিলেজার সপরিবার পুরুষাণুক্রমে থাকেন, তাঁরাই ফরেস্টের প্রধানতম রক্ষক। তাঁরা ফরেস্টে জীবজন্তুর মতো থাকেন। এককালে তাঁদের কোনও জায়গা ছিল না। অন্তত নর্থবেঙ্গলে। এঁরা বনের মানুষজন। বনের থেকেই তাঁরা খাদ্য সংগ্রহ করেন। কখনও সখনও বনমুরগিও পান। পেলেই যে খাওয়া যায় তা নয়। আমাদের পশু নর্থবেঙ্গলরা আগুনের গন্ধ ও সেদ্ধ গন্ধ সইতে পারে না। অনেকদূর হেঁটে খুব বড় রাস্তায় মাংস রাঁধতে হয়। ওখানেই বসে খেতে হয়। পেট্রোল ডিজেলের গন্ধ, আগুনের তাপ বনের ভেতর ঢুকতে পারে না। তবে এইসব কদাচিৎ। ফরেস্ট ভিলেজাররা প্রধানত ফলাহারী। আমরা নর্থবেঙ্গলরা বাঘ, হাতি, গণ্ডার নিয়ে ঘর করি কিন্তু প্রধানত শাকাহারী। ফরেস্ট ভিলেজাররা মধ্যরাতে তিরিশ মাইল দূরে খবর দেয়— কোথায় পোচাররা রাতে যাওয়া-আসা করছে। হাতি দাঁত কাটবে। বাকিটা বিট অফিসের কাজ।

তা, বাঘ তো বাঘই। তার হাতের থাবায় বড় সাইজের গরু-বলদ মরে যায়। তারপর ওই দাঁতের সারির এক কামড়ে ও সারা শরীরের এক ঝাপটে সেই বলদকে পিঠে নিয়ে অন্তত ২৫-৫০ মাইল পাড়ি দিয়ে মাটিতে ফেলে। ঘাম না মুছে চিবুতে শুরু করে। সেইসব বলদের তুলনায় মানুষ তো বাঘের কাছে কোনও প্রাণীই না। মিষ্টান্ন। বাঘ যে পদ্ধতিতে তার মড়ি খায় সেটার পারম্পর্য দেখে এফআরসিএস সার্জেনও হাঁ হয়ে যায়।

এমন সাক্ষাৎ মৃত্যু লালগড়ে এসে পড়লে নর্থবেঙ্গলরা মুখ টিপে হাসে কেন? সে কী করবে? আমরা তো বাঘ নিয়ে ঘর করি।

কেমন? আমাদের এক হাজার-দেড় হাজার একরের আকছার যে কোনও চা বাগানের সীমা ঘিরে শক্ত কাঁটাতারের বেড়া থাকে শক্ত শালখুঁটির ওপর আর পুরো বাগান ঘেরা গভীর নালা কাটা থাকে। গভীর ও চওড়া। হাতি ঠেকাতে। হাতি খুঁটি উপড়ে দিতে পারে। সে কথা ভেবে। কিন্তু তারের ঘন বেড়ার কাঁটাতারে শুঁড়ের সবচেয়ে নরম মাংস বিঁধে যায়, যত ছাড়াতে চায় তত জড়িয়ে যায় ও তত বিঁধে যায়। হাতির চোখ সবচেয়ে ছোট কিন্তু দেখে সব থেকে বেশি। সেই দৃষ্টি দিয়ে সে খোঁজে তারকাটা মারা খুঁটিগুলোর মাটির কাছাকাছি কোনও গর্ত বা ফাঁক আছে কিনা। বনশুয়োরের বাচ্চা, একহাতি মোটা ধেড়েকার্তিক (ইঁদুর), সজারু খুব একটা না থাকলেও দু-এক জায়গায় থাকতে পারে, আর উঁইপোকা, ঝাঁক বেধে, কাঠ খেয়ে এমন এক ফাঁক তৈরি করে দেয়। এমন একটা ফাঁক পেলেই হাতি সেই ফাঁক গলিয়ে খুঁটিটা উপড়ে ফেলবে। তারপর শুঁড় বাঁচিয়ে সেই খুঁটি টেনে গুটিয়ে ফেলবে। তারপর আর কী? হাতির পাল বাগানে ঢুকলে তো আর কিছু করার নেই— চোখের সামনে পুরো বাগানের ধ্বংস দেখা ছাড়া। চা-বাগানে তো আর হাতির খাদ্য নেই। যতই তারা খাদ্য পায় না, ততই তারা ছড়িয়ে পড়ে আর চা-গাছ ওপড়াতে থাকে।

"সেই বিশ-ত্রিশ বছরের বিনিয়োগ, যত্ন, শ্রম ও ভালোবাসা, হাতির পাল যখন উৎপাটিত করে দিতে থাকে
তখন উপায়হীন চোখের জল ছাড়া আর কোথাও সান্ত্বনা থাকে না।"

একটা চা-গাছকে বিক্রয়যোগ্য পত্রপুটক্ষম করে তুলতে অন্তত বছর বিশেক লাগে। তাকে বুড়ো করতে হবে। আর এই চা-গাছ, আমাদের নর্থবেঙ্গলের চা-গাছ এক আশ্চর্য রমণী। তার বয়স যত বাড়ে, সে তত প্রজননশীলা ও রসময়ী হয়। তরুণী চা-গাছেও তো দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি ঋতুভর ফোটে ও ঝরে। কারণ, তার শিকড় মাটির তত গভীরে যায় না, যে গভীরের মাটি থেকে সেই রস আজকে সকালে ফোঁটা পাতাগুলোতে সে পোঁছে দিতে পারে, যে-রস ঈষদুষ্ণ গরম জলে ভেজা থাকলে নাকে সেই মনোরম বাস ঠেকবে, যা তোমাকে নেশা দেবে না কিন্তু নেশার অন্তরঙ্গতম একাকিত্বটুকু দেবে। হাই-আসামের চা পাতারও সেই পরম রমনীয়তা আছে কোথাও কোথাও। কিন্তু এ আমাদের, নর্থবেঙ্গলের বাপ-ঠাকুরদার নিজস্ব সম্পত্তি। পাহাড়ের সানুউচ্চতা থেকে তিস্তা উপত্যকা জুড়ে। যত ছোট চা-বাগানই হোক, সে বাগানে হিসেব থাকে, কবে সেই বাগিচার সেই খেতিতে চা-গাছের রোঁয়া গাড়া হল। তারপর বিশ বছর ধরে সেই খেতি বা ব্লকের লালন চলবে। তার পর কোনও একদিন থেকে সেই প্রাচীনা রজস্বিনীর পাতা তোলা শুরু হবে।

সেই বিশ-ত্রিশ বছরের বিনিয়োগ, যত্ন, শ্রম ও ভালোবাসা, হাতির পাল যখন উৎপাটিত করে দিতে থাকে তখন উপায়হীন চোখের জল ছাড়া আর কোথাও সান্ত্বনা থাকে না। মালিক, বাবুরা, মজুররা, একসঙ্গে চোখের জল ফেলে। তারপর কোনও একসময় কেউ পাগলের মতো কিছু চেষ্টা করে হাতির পালকে তাড়াতে। কেউ বন্দুক নিয়ে আসে— বন্দুকের শব্দে, বারুদের গন্ধে যদি পালায়। আর কেউ, তাড়াতাড়ি সেই বন্দুক নামিয়ে দেয়— খেপিও না, যেদিক দিয়ে পারে বেরিয়ে যাক। বেরিয়ে যায়ও হয়তো। মজুর-মজুরনিরা নানা ফন্দি জানে। সেসব ফন্দির কোনও মাথামুণ্ডু নেই। কেউ টিন বাজায়। কেউ ঢোল। কেউ কোত্থেকে এক ঝাণ্ডা বের করে লম্বা বাঁশের মাথায় লাগিয়ে হাতির পালকে নির্দেশ দেয়। বুদ্ধি তো অভিজ্ঞতা থেকেই আসে। বংশানুক্রমিক, জন্মান্তরক্রমিক অভিজ্ঞতায় এই হাতির পালের সঙ্গে একটা বিনিময়ের ভাষা তৈরি হয়ে উঠেছে, আমাদের নর্থবেঙ্গলদের। ২০০-৫০০ বছরের শাল-সেগুনদের সঙ্গে আকাশ ও নদীর জলের, হাতির পাল–বাঘের পাল–বনকুকুরের পাল (এখন বোধহয় এরা নেই), উইপোকা, অজগর সাপ, মাকড়সা, জোঁক, টিকটিকি, অজস্র ধরনের বায়ুভুক অর্কিড, নাম-না-জানা, নাম-না-হওয়া অজস্র রকমের সবুজ জঙ্গলের, সারা জায়গায় অ্যামোনিয়ার তীব্র গন্ধ, গোপন সব পাহাড় থেকে নিষ্কাশিত কার্বন আর মার্বেলের গন্ধ, এমন, এমন, এমন অনেক কিছুই আমাদের নর্থবেঙ্গলদের অন্য এক বিনিময়ময় জীবন দিয়েছে। আমাদের এই বিপুল আকাশে অক্সিজেনের প্রাচুর্য, ব্যবসায়ী দূষণ থেকে মুক্তি, ব্যবহারিক দূষণের বাধ্যতা সেই বিনিময়ের ভাষার বর্ণপরিচয়।

কেউ হয়তো সেই হাতির পালের সামনে কিছুটা হাঁড়িয়া ছিটিয়ে দেয়। তারপর রাস্তার ওপর ছড়িয়ে দেয়, তার ওপর একটা হাঁড়ি রাখে। হাতি হাঁড়িয়া বা ভাত পচানো মদ খুব পছন্দ করে। আর, এমন ঘটেছেও তো কতবার আমাদের নর্থবেঙ্গলে যে হাঁড়িয়ার গন্ধ শুঁকিয়ে শুঁকিয়ে হাতির পালকে বাগান থেকে বের করা গেছেও। কিন্তু খরচা পোষায় না। হাতির পালের একদিন তো নর্থবেঙ্গলদের বিশ-ত্রিশ বছর।

তাই কাঁটাতারের শালখুঁটির পাশ দিয়ে গভীর ও চওড়া নালী কাটা হয়। নালী না বলে খালই বলা যেত। কিন্তু খাল না, নালীই। এটা আমাদের নর্থবেঙ্গলদের জানা আছে কতটা চওড়া নালী হাতি পেরোতে পারে না। সেই মাপমতো নালী। কিন্তু বাগানের মানুষজনদের তো বাইরে যাতায়াত করতে হয়। তেমন কিছু জায়গা থাকে। কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যেই গেট ঠেলে খোলে আর বেরোলে আটকে যায়— আর আমরা বাগানের বাইরে থেকে বাগানেরভেতরে ঢুকে পড়ি। এমন গেট সাহেবদের আমদানি। হাতির পক্ষে এটা ব্যবহার করা অসম্ভব। তা ছাড়া, হাতি তো কোনও রাস্তা মানে না, যদিও আমরা মানি নর্থবেঙ্গলে। হাতির রাস্তায় মানুষ না গেলেই হয়। আর, মানুষের রাস্তা হাতিকে রাস্তা বলে বুঝতে না দিলেই হয়।

লালগড়ের বাঘ নিয়ে এত চাপা হাসির পর এত হাতির গল্প কেন? সেও তো আমাদের নর্থবেঙ্গলদের কহান। চা-বাগান কেমন তা না জানলে তো নর্থবেঙ্গলদের চলাফেরা বোঝা যায় না।

এটাই তো, আমরা নর্থবেঙ্গলরা। এমন চা— যা নাক দিয়ে টানতে হয়। এমন চা-বাগান যা হাতির পাল আধঘণ্টায় মাটি থেকে উপড়ে দিতে পারে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হয় বিশ-ত্রিশ বছরে প্রয়াসের এমন নির্মম ধ্বংস। আর চা-বাগিচার ওপরের সবুজ সমতল যেমন এক প্রান্তরের দৃশ্য দেয়, উৎপাটিত চা-গাছও তেমনি কঙ্কালের স্তূপ। চা-বাগান মাটির ভেতরে তার শিকড় যত চাড়ায়, ওপরের সবুজ ততই পাতলা হয়।

"লেবারের লাভ তো কোম্পানির ক্ষতি, এটা সে জানবে না?"

লালগড়ের বাঘ নিয়ে নর্থবেঙ্গলদের এমন মুচকি হাসি কেন? সেটা বলতেই তো হাতি কথা এল। হাতি-ঠেকানো কাঁটাতারের বেড়ার কথা এল। উইদের এক রাতে কাঁচা খুটির গোড়া খাওয়ার কথা এল, যদিও সে গল্প বলা হল না। সেই খুঁটি ঘেঁষে গভীর নালীর কথা এল। তা থেকে মানুষজনের চা-বাগানের ভেতরে ঢোকা বেরনোর কথা এল। নর্থবেঙ্গলের ভেজা জঙ্গলের বাইরে যে হপ্তা হাট বসে, সেখানে অন্তত মাইল ছয় হেঁটে কী করে যেতে হয় বুধু উড়াওনিকে, জমিতে চষা কিছু তরিতরকারি বেচতে ও ফিরতে, তা না জানলে তো নর্থবেঙ্গলকে ঠাহর করা যাবে না।

বুধু উড়াওনি চা-বাগানের মজুরনি ছিল। গরমেন্ট তাদের উপকারের জন্য চা-বাগানের লেবারদের পার্মেন করার আইন পাশ করল। বুধুর তো তার আগে একটা জীবন কনটাক লেবার হয়ে কেটেছে। সেই একজীবনে, সে পার্মেন না বলে কোনও বস্তির ঘর পায়নি। তাতে খুব অসুবিধে হয়নি, তার স্বামীর তো একটা ঘর ছিল। কিন্তু গরমেন্টের আইনের পর বয়সের বিচারে বুধুকেই পার্মেন করতে হয়। বুধু কোনও তফাত বুঝল না। সে যেমন কাজ করছিল, তেমনি করছিল কিন্তু তার মাইনে কমে গেল। ইউনিয়ন বলল এতে বুধুর লাভ। যত টাকা কমল, কোম্পানিও তার ডবল টাকা বুধুর নামে জমা দেবে। বুধু তখন বলেছিল— তার পার্মেন হওয়ার দরকার নেই, সে কনটাকই থাকবে। তার ঘর–রেশন চাই না। কিন্তু হাজিরা কম হলে চলবে কী করে? ইউনিয়নের নেতারা, লাইনের লোকেরা আর অফিসের বাবুরা ধরে ধরে বুধুকে বোঝাল, সে বোকা। বুধু মেনে নিল। তারা বলল, বুধু যদি পার্মেন মেনে না নেয়, তা হলে কোম্পানির লাভ। বুধুর চাইতে যারা ছোট তারা তো কোনওদিনই পার্মেন হতে পারবে না। লেবারদের পার্মেন না করলে কোম্পানির লাভ। এসব কথা বুধুর জানা। সে সারাজীবন ইউনিয়ন করেছে। লেবারের লাভ তো কোম্পানির ক্ষতি, এটা সে জানবে না?

কিন্তু আরও কিছু তো বুধুর জানা। কনটাকের তো আর রিটায়ার নেই। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ কাজ। পার্মেন হলে তো তাকে রিটায়ার করতে হবে। আমাদের লেবার নর্থবেঙ্গলদের এই এক প্যাঁচ, নিজের ভালো ভাবতে গেলে চলে না। বুধু পার্মেন হতে রাজি হল। সে পার্মেন হলে যদি লেবারদের উপকার হয়, দু-চারটে বস্তি, জলের কল হয়, হোক।

লেবার নর্থবেঙ্গলরা যেমন হঠাৎ মারা যায়, বুধুর স্বামীও তেমনই হঠাৎ মরে গেল। মরে যাওয়াটা তো হঠাৎ একদিনই হয়। মানুষ রোজ রোজ মরে নাকি? বিপদ বাধল বুধুর স্বামীর মারা যাওয়ার পর পরই বুধুর রিটায়ার হয়ে গেল। এটা তার জানা থাকলেও জানা ছিল না। সে কিছু নগদ টাকা হাতে পেল বটে। কিন্তু তাকে তো বস্তিবাগান ছাড়তে হবে। শ’ শ’ বছর ধরে বাগানের ছুট লেবার এমন উদ্বাস্তু হয়ে আসছে। তাদের কোথাও থাকা-খাওয়ার জায়গা থাকে না। কোনটা বাগানের জমি, কোনটা ফরেস্টের, কোনটা বা জোতজমি, এ আমাদের চা-বাগানির বাঁধানো গোলমাল। চা-বাগানের অনেক রকম জমি চাই, আইনতই চাই। নার্সারির জন্য। প্ল্যানটেশনের জন্য। কালটিভেশনের জন্য। লেবারদের বস্তির জন্য। ফ্যাক্টরির জন্য। ডায়িং শেডের জন্য। কিন্তু যখনই আপনি কোনও জমি চাইবেন, কোনও জমি নেই, অথচ শ’ শ’ একর জমি পড়ে আছে।

"ভুটানের হাতির পাল এসে জয়গাঁর ধানও খেত, চা-বাগানেরও ক্ষতি করত।"

এর কোনও হিসেবনিকেশ নেই, চা-বাগানের জমির। সেটা কেউ জানে না।

ধরুন, এই লেখাটি যখন লিখছি, তখনই খবর পেলাম কোহিনুর চা-বাগান খুলেছে। এর চাইতে আনন্দের খবর নর্থবেঙ্গলদের পক্ষে আর কী হতে পারে। কত বড় ও পুরনো চা-বাগান কোহিনুর। শামুকতলা থেকে বাঁয়ে ঘুরলেই কোহিনুর সাম্রাজ্যের শুরু। কোহিনুরের ভেতর দিয়েই রাস্তা সোজা ধওলাঝোরায় নামার। ধওলাঝোরাও এক বেশ পুরনো বড় বাগান। ধওলাঝোরা দিয়ে এগোলে একটা ছোট বাগান কিন্তু খুব সুন্দর। যেমন মনে হচ্ছে, তার পরেও একটা ছোট বাগান তুরতুরি পেরিয়েই সদর রাস্তা। পাথুরে ও এবড়োখেবড়ো। বেশ খানিকটা গিয়ে জয়গাঁ— যেখানে গেলে আর ফেরা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের একরকম সীমা। ওখান থেকেই ভুটানের শুরু। ভুটানের হাতির পাল এসে জয়গাঁর ধানও খেত, চা-বাগানেরও ক্ষতি করত। এ ঠেকানোর কোনও উপায় নেই। জয়গাঁর হাতিকে যদি ছেড়ে দেয়া যায় তা হলে তো তারা একের পর এক তুরতুরি, ধওলাঝোরা ও কোহিনুরে ভাঙচুর করতে করতে শামুকতলাতেও পৌঁছতে পারে। বুদ্ধিটা বের করল জয়গাঁর কৃষকরা আর মজুররা। কোত্থেকে এক ধানের বিছন নিয়ে এসে একটা পাথুরে জায়গায় চাষবাস শুরু করে দিল। এটা ঠিক ধানের বিছন হয়তো নয়। ধান আর যব মিশিয়ে একটা খাদ্যশস্য। বিহারের অমন এক পাহাড়তলি থেকে এক বস্তা নিয়ে এসেছিল। আষাঢ়ে পুঁতে দিলে শ্রাবণের শেষ থেকে পেকে যায়। তখন তারা কিছু শস্য খেতে রেখে বাকি শস্য দিয়ে ড্রাম-ড্রাম হাঁড়িয়া কী ওই ধরনের মদ তৈরি রাখত। হাতিরা ভুটান থেকে নেমে আসত শ্রাবণে। নেমেই এমন ড্রামে-ড্রামে মদ আর খেতভরা ধান পেয়ে তারা কোনও রকম গোলমাল না করে ওখানেই থেকে যেত আর শীতকালে পাহাড়ে ফিরে যেত। জয়গাঁ একটা খুব ভালো আর স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। লেখা যে কী করে শুরু হয় তা লেখা শুরু হওয়ার পরও জানা যায় না। কোনও একসময় আন্দাজ পেয়ে সেইমতো একটু গোছানো যায়। এই লেখাটি শুরুরআগে আমি এইটুকু জানতাম যে আমার নিজের কোনও ঘটনা বলব না। তা হলে সেটা হয়ে যাবে, ‘আমার দেখা উত্তরবঙ্গ সিরিজ’, যেন, আমার দেখার কোনও আলাদা দাম আছে।

এক একজনের তো এক একটা নর্থবেঙ্গল থাকতেই পারে। কিন্তু সবার সেই আলাদা আলাদা নর্থবেঙ্গল সত্ত্বেও একটা আলাদা নর্থবেঙ্গলদের খুঁজে বার করতে হবে। যেমন, আমাদের এই বাংলায় দখনেরা আছে, ঘটিরা আছে, আবাদিরা আছে, মল্লরা আছে, জংলারা আছে, বাঙালরা আছে, বারিন্দির আছে, তেমনই নর্থবেঙ্গলরা আছে। অধ্যাপক ভবতোষ দত্ত একদিন আমাকে বাঙালদের অসামান্য সংজ্ঞা শুনিয়েছিলেন, ‘যে যার পুবে সে তার বাঙ্গাল।’ তেমনি যে যার উত্তরে সে তার নর্থবেঙ্গল নয়। আমরা নর্থবেঙ্গলরা আলাদা। কারও ‘উত্তরের’ ধার ধারি না। আমরা বরাবরই নর্থবেঙ্গল। কেমন বরাবরের, সেকথা উঠলে বলব কেমন বরাবরের। আপাতত এক লালগড়ের বাঘের পায়ের ছাপ নিয়েই তো নর্থবেঙ্গলদের মুচকি হাসির জালে কী না এল— হাতি, হাতি থেকে চা-বাগান বাঁচানোর বেড়া, বেড়ার তলায় নালী— গভীর কিন্তু খাল নয়। বুধু উড়াওনির পার্মেন আর কনটাক, চা-বাগানের জমির কত ভাগ-বাঁটোয়ারা ও দখলদারি— এত কিছুর পরও লালগড়ের বাঘের পায়ের ছাপ নিয়ে হাসি এখনও দূরে। চা-বাগানের যে জায়গাটুকুতে কাঁটাতারের বেড়াআর নালী আর চা-গাছের সবুজ দেখা যায় সেটা মোট চা-বাগানটার পাঁচ ভাগের এক ভাগও না। একসময় সত্যি সত্যি নর্থবেঙ্গলদের চা-বাগান তৈরির খুব হুজুগ ছিল। হয়তো একটা চা-বাগান তিস্তা বা তার চাইতেও ছোট কোনও নদীর বন্যায় বালিচর হয়ে গেছে। বালিচরে তো আর চা-বাগান হয় না। কিন্তু চা-বাগানটাও থেকে যায় একরকম। লেবার বস্তি থাকে, লেবাররাও থাকে, কিছু শেডও থাকে। কোনও কম-পয়সার লোকেরও হঠাৎ প্ল্যান্টার হওয়ার ইচ্ছে হল। সে সেই বালিচর হয়ে যাওয়া চা-বাগান কিনে নিল, ঠিকঠাক দরেই। লেবাররাই দরদাম করে। তাদের উৎসাহই বেশি।

"তারপর ঝোঁক হল চা বাগানের রিসেল ভ্যালু তৈরি করা।"

কিন্তু তারপর চা-বাগান বিক্রিটাই বেশ বড় ব্যবসা হয়ে উঠল। এগুলো বড় চা-বাগান। নানারকম কায়দায় চা-বাগান বন্ধ করে রাখল— লেবার ট্রাবলের ছুতোয়। সেরকম কিছুদিন চলার পর খদ্দের জোটে। এবার চা-বাগান জমি হিসেবে সেসবও দেখাল যা তার জমিই নয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, ব্লক, এগ্রিকালচারাল ল্যান্ড— নানারকম লিজ নেওয়া কী, পারমিট নেওয়া, কী কিছুই না নেওয়া। চা-বাগানের ভোগে আসা জমি। সেই পুরো জমির দাম তখন শুধু চা-বাগানের জমির পঁচিশ গুণ বেশি। চা-বাগান রাখার চাইতে বেচায় লাভ বেশি। একসময় ছিল যখন চা-বাগান তৈরির দিকেই ঝোঁক ছিল নর্থবেঙ্গলদের। তারপর ঝোঁক হল চা বাগানের রিসেল ভ্যালু তৈরি করা। রিসেল আর কী করবে— জমি ছাড়া, ফোকটে নেওয়া জমি ছাড়া, খালজমি, ফরেস্ট জমি, অনাবাদী জমি ছাড়া?

জমিটা যে চা-বাগানেরই কাজে লাগে, প্রায় ভোগ সত্ত্বে, সেইটা জাহির করার জন্য চা-বাগান বুধু উড়াওনিদের মতো রিটায়ার পার্সেনদের কিংবা কনটাকদের, বা তাদের লায়েক ছেলেপুলেদেরও ওখানে ঘর তুলতে দিত। বুধু উড়াওনিরও ওখানেই একটা ঘরদোর ছিল, একটু জমি-সমেত। চা-বাগানের বস্তির চাইতে ভালো। ওই জমিটুকুতে বুধু উড়াওনি তরকারি ফলায়। একটা সুবিধে এই যে ফরেস্টের ভেতর দিয়ে, কাছেই একটা চওড়া ঝোরা আছে। চওড়া ঝোরা মানে ওপর দিয়ে ঝরনার মতো ঝরছে না। ওপরে তেমন কোথাও ঝরনা আছে তারপর ফরেস্টের ভেতর দিয়ে পাথরের ওপর দিয়ে এই ফরেস্টটা পার হয়ে বাতাবাড়ির কাছে বেশ বড় ঝরনা হয়ে নেমে গেছে। সমতলের নদী তো এই রকমই তৈরি হয়। এতটা পাথুরে বিস্তারে বয়ে যাওয়া ঝোরার সুবিধা হচ্ছে— তুমি যদি তোমার সংসারটাকে ঝোরার মাঝখানে বড় একটা পাথরের ওপর নিয়ে বসো তাহলে তোমার সংসারের যাবতীয় কাজ সেরে তুমি একবারে বাড়ি ফিরতে পার। যারা গরু-বাছুর-ছাগল পোষে তারা তো তাদেরও নিয়ে যায়। বাগানের বাবুরাই খদ্দের। কিন্তু বুধুর তো তরকারির বাগান। সে তো আর তরকারির বাগানটাকে ঝোরা পাথরের ওপর বিছিয়ে জল খাওয়াতে, স্নান করাতে পারে না। পারলে বড় সুবিধেই হত। সুবিধেই যদি তাহলে তো বুধু তার বাগানটাকে ঝোরার পারেই স্থায়ী করতে পারত। পারত, কিন্তু তাতে বিপদ ঘটত। বুধুর বাগানের তরিতরকারি তো মানুষের খাওয়ার তরকারি, কোনওটা লতানো, কোনওটা খাঁচায়, কোনওটা গাড়া, কোনওটা খাড়া, কোনওটা ঝোলে, কোনওটা দোলে, কোনওটা মাটি ফুঁড়ে বেরোয়। সারাজীবনে চা-বাগানে কাজ করে করে বুধু উড়াওনি নর্থবেঙ্গল জানে, জেনে গেছে— বনের জংলা শাকে-ফলে ঘরুয়া মানুষের স্বাদ মেটে না। তারা ঘরুয়া লতাপাতা তরকারি খোঁজে। বুধু উড়াওনি নর্থবেঙ্গল খেয়ে-খেয়ে-না ঘরুয়া স্বাদ শিখেছে। এখানে দশ দিকে ফরেস্টের ভেতর হাট বসে। কাছাকাছি বস্তির মানুষ কেনে। এদিকে কিছু ভাটিয়া মানুষেরও ঘর রয়েছে। তারা কেনে। পারলে প্রায় রোজই হাটে যেত বুধু উড়াওনি— নর্থবেঙ্গল।

ওই ঝোরাটার নাম মোরগঝোরা। ওইখানে এই ফরেস্টের ও ওপারের ফরেস্টের হাতি-গণ্ডার-বাঘ-বাইসন-হরিণ সব জল খেতে আসে বিকেলের দিকে বা শেষরাতে। ওপারে একটা টিলার ওপর খুব ঝোপ খেলানো একটা বড় গাছ আছে। তার নীচে এক ফরেস্ট ভিলেজারের ডিউটি থাকে। এটা বড় পশুদের এমন জল খাওয়ার জায়গা যে ফরেস্ট থেকে নজর ও হিসেব রাখে— কোনও বড় পশু কমছে বা বাড়ছে কিনা। এ পারের পশুরাও যায়। যার যার টাইম বাঁধা আছে। কোনও গোলমাল নেই। কিন্তু কোনও কোনও দলে বাচ্চা থাকলেই গুঁতোগুঁতি বাঁধবেই। বিশেষ করে যদি হাতির বাচ্চা আর বাঘের বাচ্চা থাকে। কিন্তু বড়রা ওদের ছাড়িয়ে দেয়। জল খাওয়ার জায়গায় মারামারি চলবে না। বিপদ বাঁধে যদি কোনও কারণে বাঘের সঙ্গে হরিণের পালের দেখা হয়ে যায়। হরিণ পেলে বাঘ তাকে খেতে যাবে না— এ হতেই পারে না।

"কী রে, ডাকাডাকি কেন রে এত রাত্তিরে?"

বুধু উড়াওনি–নর্থবেঙ্গল যে তার বাগানটাকে মোরগঝোরার পাশে বা মধ্যে নিয়ে যেতে পারে না তার প্রধান কারণ হরিণ আর হাতি। হাতিরা গন্ধ পায়। তারা দু-একদিন সহ্য করে ঠিক টের পেয়ে যাবে এখানে মানুষের হাত পড়েছে। ব্যাস। শুঁড়ের দুই ঘায়ে বুধুর ব্যবসা লাটে উঠবে। অবিশ্যি হাতিকে ঠকানোর বুদ্ধি করা যায়— একটু ছড়িয়ে বাগান ছিটিয়ে করে। কিন্তু হরিণ তো গন্ধে টের পায় কোন লতাপাতা তার খাদ্য ও কোন লতাপাতা তার খাদ্য নয়। সব লতাপাতা যদি হরিণ খেত তা হলে নর্থবেঙ্গলের ফরেস্টে এত জঙ্গল (আন্ডারগ্রোথ) হত?

প্রায় জোড়া লেগে গেছে লালগড়ের বাঘের পায়ের ছাপের কথা দেখেশুনে নর্থবেঙ্গলদের হাসি। কম তো পথ না, এই হাসির। সেই রতুয়ার কাঁটাঝোপের ধুলো মরুভূমি থেকে মেচি নদীর বালি পেরিয়ে নেপালে গিয়ে কোনও এক পাথরের তলায় বাঘের ভাতঘুম, তারপর আবার চা-বাগান, চা-বাগান মানেই তো হাতির পাল, হাতির পাল ঠেকানোর নানা বুদ্ধি, লেবারদের পার্মেন আর কনটাকের প্যাঁচে বুধু উড়াওনির ফরেস্টের জমিতে নতুন বস্তি আর নতুন পেশা— মোরগঝোরার পাড়ে যেখানে হাতি-বাঘ একসঙ্গে জল খায় বিকেলে আর শেষরাতে আর মোরগঝোরা ব্যবহার করে বাড়ির পুকুরের মতো।

শুধু একটা সোজা কথা বলা হয়নি, রোজকার কথা আর কত মনে থাকে?

এই চা-বাগানটার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমায় যে হাতিজব্দ সিড়িগেটটা আছে সেটাই সেদিন পেরোচ্ছিল বুধু উড়াওনি–নর্থবেঙ্গল, মাইল পাঁচেক দূরের কাঁটালগুড়ি হাট থেকে ফেরার পথে। বাগানের ভেতর দিয়ে দিয়ে প্রায় দক্ষিণ-পুবে এসে মোরগঝোরা বস্তি। সেই গেটটা পেরোতেই সে গন্ধটা পেল, পাশেই আট নম্বর বেড, নতুন পাতা গজাচ্ছে, দু-একদিনের মধ্যেই পাতাটিপা শুরু হবে। এই সময় এই গন্ধ। বুধু একই গতিতে হেঁটে যাচ্ছিল। তার পা ফেলা দেখে কারও মনেই আসবে না, সে যে গন্ধটা পেয়েছে তা সে যাচাইও করল না। এমনও মনে হতে পারে কারও— বুধু তো আর বাগানে কাজ করে না তার কী দরকার কোথাও কী গন্ধ তা যাচাই করার।

বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বুধু পথ বদল করে কী করে না। এত দীর্ঘ, নির্জন পথ আমাদের নর্থবেঙ্গলদের হাঁটতে হয়, যে কেন কোন দিকে হাঁটছি সেটা আমাদের হিসেবে থাকে না।

এখন যেদিকে হাঁটছে বুধু, সেদিকে বাবু কোয়ার্টার, ফ্যাক্টরি, একটু-আধটু বিজলিবাতি জ্বলে।

বুধু বাগানবাবুর কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকে, ‘হে বাগান, বাগান হে— ’

বাগানবাবু দরজা খুলে বলেন, ‘কী রে, ডাকাডাকি কেন রে এত রাত্তিরে?’

‘মিষ্টি খাওয়া। তোর মাইয়া আট নম্বরে বিয়াইছে। আট নম্বরে তো নতুন পাতাও গজাইছে। দিন পনেরো ওই দিকে পাতা টিপতে পাঠাস না। গন্ধ পাইছু’।

বুধু হা হা করে হাসতে হাসতে তার বস্তির দিকে হাঁটা দেয়।

চা-বেডের গভীর নালাগুলি হাতি ঠেকায় আর বাঘকে ডাকে। সেই জোলো ভেজা মাটিতে বাঘিনীরা বাচ্চা বিয়োতে পছন্দ করে। চা-পাতার ঘনসবুজ গন্ধে শ্বাস নিলে ওরা, বাচ্চাগুলোও, তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে।

বাগানবাবু-নর্থবেঙ্গল, বুধু-নর্থবেঙ্গলকে একবারও যাচাই করে না সে কী দেখেছে। বুধু গন্ধ পেয়েছে প্রসবিনী বাঘিনীর। সে জান্তব জ্ঞানকে সন্দেহ করতে পারে একমাত্র সে, যে নর্থবেঙ্গল না। আর একই পরিবেশে বংশানুক্রমিক জন্মান্তরক্রমিক বাস করতে করতে প্রকৃতি, জীবজন্তু আর মানুষ বাঁচার ও বাঁচতে দেওয়ার অন্য অভ্যেস ও উৎস পেয়ে যায়। এতই স্বাভাবিক যে কেউ জানতেও চাইবে না আট নম্বরে পাতিটেপা বন্ধ কেন। যেদিন শুরু হওয়ার তাও আর এক বুধু জানিয়ে যাবে। বৃত্তান্ত সবে শুরু হাসি দিয়ে।

অঙ্কন - দেবাশীষ সাহা
শেয়ার করুন: