হারাধনের দশটি ছেলে

প্রচেত গুপ্ত
নীতিকথামালা নিয়ে আমি চিরকালই সন্দিহান।

সেই ছোটবেলা থেকেই আমার মনে হত, সুনীতি–কুনীতির নামে যা শেখানো হছে সবই কি ঠিক? কোথাও ভুল হয়ে যায় না তো? যাঁরা এইসব নীতিমালা তৈরি করেছেন, তাঁরা কি সবার কথা ভেবে করেছেন, নাকি কোথাও ফাঁক থেকে গেছে? নীতিগল্প তো আর কেউ একজন বসে লিখতেন না, মুখে মুখে ছড়াত। মুখে ছড়ানোর সময় গল্প বদলেও যেত। কথক ইচ্ছে মতো গল্পে একটু আধটু প্যাঁচ দিতেন। তবে গল্প এদিক ওদিক হলেও মরাল একই রয়ে যেত

সেই সময়ে হোয়াট্‌স অ্যাপ, ফেসবুক ছিল না। নীতিকথা এখনকার মতো ‘ভাইরাল’ হওয়ার কোনও ব্যাপার ছিল না। মুখই সম্বল ছিল। গল্প ইন্টারেস্টিং হলে তবেই মুখে মুখে ছড়াত।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা না বলে পারছি না। মনে হতে পারে অন্য প্রসঙ্গ, তা হোক। আমি অনেকদিন পর্যন্ত হোয়াট্‌স অ্যাপ, ফেসবুকের ‘ভাইরাল’ কাকে বলে জানতাম না। ‘ভাইরাল’ বলতে শুধু জানতাম ভাইরাল জ্বর। ভাইরাস-ঘটিত সব অসুখকেই ‘ভাইরাল ডিজিজ’ বলা হয়। যেমন সর্দি কাশি, কন্‌জাকটিভাইটিস, পক্স— এইসব। আজকাল শুনি রোজই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা না একটা কিছু ‘ভাইরাল’ হয়‌। রাগ, প্রতিবাদ, প্রেম, কেচ্ছা, হিংসে ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। তাই নিয়ে খুব মাতামাতিও হয়। সবাই চেঁচায়—

"আর এদিকে ‘ভাইরাল’ হওয়া নিয়ে এত ফুর্তি!"

‘ওরে ভাইরাল হয়ে গেছে রে, ভাইরাল হয়ে গেছে, ওরে, সবাই শোন, ভাইরাল হয়ে গেছে।’

এই হাঁকডাকে কী আনন্দ! অবাক হতাম। ব্যাপারটা কী? ভাইরাল হওয়া নিয়ে এত আনন্দ কিসের! এসব কি হোয়াট্‌স অ্যাপ, ফেসবুকের সর্দি কাশি? তবে জিনিস তো ভালো না। ভাইরাসকে বাগে আনবার জন্য বিজ্ঞান লড়াই করছে। আর এদিকে ‘ভাইরাল’ হওয়া নিয়ে এত ফুর্তি! পরে জানলাম, না, সর্দি কাশি নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ব্যাপারটা অন্য। কোনও কিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি ছড়িয়ে পড়াকে ‘ভাইরাল’ হওয়া‌ বলে। যেমন কেউ হয়তো ফেসবুকে লিখল—

‘‌প্রচেত গুপ্ত মাথা ওপরে, পা নীচে রেখে গল্প লেখেন। সেই কারণে তার গল্পগুলো এত খারাপ। কেউ পড়ে না। লেখক হতে গেলে পা ওপরে, মাথা ফেসবুকে রেখে গল্প লেখা উচিত। সেই অর্থে শীর্ষাসনই গল্প লেখবার উপযুক্ত ভঙ্গি। থাই লেখক কারাবুকু জানাকুসি শীর্ষাসনে লিখে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করছেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা ভাষার ওপর তাঁর বুৎপত্তি, প্রগাঢ় জ্ঞান বাংলা সাহিত্য জগত‌কে বিশেষ সমৃদ্ধ, সুচিন্তিত, সুমার্জিত করে তুলেছে। শীর্ষাসনে অধিষ্ঠিত কারাবুকু জানাকুসি বাংলা সাহিত্যকে নব উন্মেষে উদ্ভাসিত করেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। প্রতি সপ্তাহে ৫০০ কপি বই বিক্রি হয়ে যায়। আনন্দ সংবাদ হল— চিন, জাপান, আফ্রিকাতেও তাঁর পাঠক ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার মানুষ তাঁর লেখা পড়বেন বলে বাংলার কারক, বিভক্তি, সমাস এককথায় প্রকাশ শিখছেন। পুরাণ, বেদ, উপনিষদ পড়ছেন। ফেসবুকে শর্ট কোর্স করানো হচ্ছে। বাংলা ভাষার এই প্রিয় লেখক প্রমাণ করেছেন, মাথা ওপরে রেখে আর যাই হোক, লেখক হওয়া যায় না। যারা কারাবুকু জানাকুসির বাংলা সাহিত্য পড়বেন না, হাসিঠাট্টা করবেন, ব্যঙ্গ করবেন, আসুন আমরা তাদের চোদ্দো পুরুষ তুলে গালি দিই। এই প্রসঙ্গে তাঁরা যদি সুকুমার রায়ের চলচ্চিত্তচঞ্চরি নাটকটির কথা মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে পাত্তা দেওয়ার কিছু নেই। সুকুমারবাবুর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিল না। এ যুগে তার রেফারেন্স অচল। এ যুগে বাংলা সাহিত্যিক একমাত্র কারাবুকু জানাকুসি। মনে রাখবেন, প্রতি ঘন্টায় ৫০০ কপি করে তাঁর উপন্যাস বিক্রি হচ্ছে।‌

ব্যস, এই গোটা পোস্টটি ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে।

"পুনর্গঠন নয়, পুনর্দর্শন।"

আশার কথা একটাই, এইসব ‘ভাইরাল’ বাজায় জোর ডঙ্কা, আসলে লবডঙ্কা।‌ আয়ু বেশিক্ষণ থাকে না। গাল ফুরোয়, এরাও ভাইরাসের মতো ফুরোয়। ভাইরাসের একটা নির্দিষ্ট সময়কাল থাকে। নতুন ‘ভাইরাল’ এসে একটি লাথি মেরে আগেরটাকে সরিয়ে দেয়। তখন বাংলা সাহিত্যে উজ্বল হয়ে আসেন চিলির সাহিত্যিক আস্তেরিকা জাস্তেনি। আবার তিনি কিছু দিন ফেসবুকের সর্দি কাশি হয়ে ছুটে বেড়ান।

দুঃখের কথা হল, সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলেও নীতকথামালা হাজার হাজার বছর টিকে রয়েছে। আরও হাজার হাজার বছর টিকে থাকবে।

আমি নীতিমালাগুলো নিয়ে একটু অন্যরকম ভাবছি। সিরিয়াস কিছু নয়। হালকা ভাবনা। সোশ্যাল মিডিয়ায় গাল দিয়ে এর গুরুত্ব বাড়ানোর কিছু নেই। যেমন খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড়ে ঘুমন্ত খরগোশকে পরাজিত করাটা কি গৌরবের হয়েছিল? অথবা তৃষ্ণার্ত কাকের ঘণ্টার পর ঘণ্টা নুড়ি ফেলে জলের জন্য হাপিত্যেশ করাটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? অথবা যে প্রেমিক তার প্রেমিকার জন্য মায়ের হৃৎপিণ্ড কেটে নিয়ে যায় সেই প্রেমিকা কি এতটাই নিষ্ঠুর?

গল্পগুলো যদি অন্যরকম ভাবে দেখা যায়? পুনর্গঠন নয়, পুনর্দর্শন। দেখি আজ একটা নীতিকথামালা নিয়ে কাজ করি।

গল্পটা সবার জানা। আবার বলি।

হারাধনের দশটি ছেলে। দশ ছেলের মধ্যে খুব ঝগড়া। এ ওকে দেখতে পারে না, ও তাকে দেখতে পারে না। নিজেদের মধ্যে মিলমিশ মোটে নেই। হারাধনের তো খুব চিন্তা। এরকম চলতে থাকলে সংসারে শান্তি বলে কিছু থাকবে না। কী করা যায়? সে ছেলেদের কতবার বলেছে, ওরে বাছারা, তোরা একসঙ্গে মিলেমিশে থাক। তোদের কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। বাইরের শত্রুরা গায়ে হাতও দিতে পারবে না। ছেলেরা এসব কথা শোনে না। শুনলেও দু’দিন পরেই ভুলে যায়। আবার নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি শুরু করে।

হারাধন ঠিক করল, ছেলেদের হাতেনাতে শিক্ষা দেবে। সে অনেকগুলো কাঠি জোগাড় করল। ছেলেদের ডেকে একটা একটা করে ধরিয়ে দিল।

‘নে, এবার ভাঙ তো।’

"এই গল্পের নীতি কী?"

ছেলেরা পটাপট কাঠি ভেঙে ফেলল। একটা কাঠি ভাঙতে আর কী জোর লাগে?

হারাধন এবার সবাইকে দশটা করে কাঠি দিয়ে বলল,‘এবার একসঙ্গে ভাঙ দেখি।’

সকলেই খুব বেগ পেল।

হারাধন বলল, ‘এবার নিশ্চয় বুঝতে পারলি দশজন এককাট্টা হয়ে থাকলে কেউ তোদের চট করে ভাঙতে পারবে না। হাতেকলমে জানলি তো? সবাই মিলে থাকলে তবেই সংসারে সুখ।’

ছেলেরা হইহই করে উঠল। বাবা তো ঠিকই বলেছে। তারা একসঙ্গে মিলেমিশে সুখশান্তিতে থাকতে শুরু করল।

এই গল্পের নীতি কী? সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে থাকলে কেউ ক্ষতি করতে পারে না। তাই তো ?

এবার গল্পটা অন্যভাবে দেখি। কাঠি ভাঙার কাণ্ড দেখে ‘সুখ ঠাকুর’ সেদিন হারাধনের বাড়ির উঠোনে বসে‌ মুচকি মুচকি হেসেছিলেন।

হারাধনের দশ ছেলের বিয়ে-থা হল। আলাদা আলাদা সংসার হল। ছেলেপুলে হল। ওইটুকু বাড়িতে সবার জায়গা হয় না। ঘরবাড়ি, উঠোন, রান্নাঘর, ছাদ, বারান্দা দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে শুরু হল গোলমাল। প্রথমে ঝগড়া, তারপর হাতাহাতি, তারপর ভাড়া করা গুণ্ডা এনে লাঠালাঠি। চাষের জমিও এইটুকু। আগে সংসার ছোট ছিল। খাওয়ার লোক কম ছিল। এখন বেড়েছে। ফলে জমি নিয়ে টানাটানি লাগল। হারাধনের একটা মুদি দোকান ছিল। হারাধন মারা গেলে ভাইদের মধ্যে সেটা নিয়েও গোলমাল বাঁধল। অনেকে পরামর্শ দিল, জমিবাড়িতে যখন কুলোচ্ছে না, বেচে দাও। যে যার ভাগের টাকা নিয়ে নিজের নিজের মতো জীবিকা খুঁজে নাও। হারাধনের দশ ছেলে ভাবল, ঠিক কথা। আমরা তো একসঙ্গেই আছি। জমিবাড়ি বিক্রি নিয়ে সমস্যা হবে না। দেখা গেল, একসঙ্গে থাকায় সমস্যা বেশি। কেউ বলছে, জমিবাড়ির দাম আরও বেশি হওয়া উচিত, কেউ বলছে যে কিনতে চায় সে বেটা চোর, কেউ বলল, বেচার আগে টাকা চাই। পুরো ব্যাপারটাই ভেস্তে গেল। একটা সময়ে দেখা গেল, হারাধনের দশ ছেলের ঘরেও শত্রু, বাইরেও শত্রু।

"হারাধনের কথামতো দশ ছেলে আজ নিজের মতো প্রতিষ্ঠিত।"

চরম অশাম্তি, নিত্য গোলমালের মধ্যে হারাধনের দশ ছেলের বাড়ি পড়ে রইল। কাকপক্ষীতেও ওই বাড়িতে বসে না। প্রতিবেশীরা ছায়া মাড়ায় না। সবাই হারাধনকে গাল দেয়। ছেলেগুলোকে ভুল শিক্ষা দিয়েছে।

এবার গল্পটা যদি এরকম হত—

ছেলেদের ঝগড়া দেখে হারাধন একদিন দশজনকে ডাকল। সবাইকে আগে দশটা করে কাঠি দিল।

‘দেখি ভাঙ তো।’

ছেলেরা সহজে দশটা কাঠি একসঙ্গে ভাঙতে পারল না।

হারাধন বলল, ‘এই কাঠি হল সংসারের সুখ, দুঃখ, অশান্তির কাঠি। এতগুলো কাঠি একসঙ্গে ভাঙা শক্ত। এবার একটা করে নিয়ে চেষ্টা কর।’

ছেলেরা একটা করে কাঠি হাতে নিয়ে পটাপট ভেঙে ফেলল।

হারাধন হেসে বলল, ‘তোরা কাঠি নোস, মানুষ। কাঠি সব একরকম হয়, মানুষ একরকম হয় না। তাদের ভাব ভালবাসা, প্রয়োজন অপ্রয়োজন, পছন্দ অপছন্দ আলাদা। তোরা আলাদা আলাদা ভাবে নিজেদের পছন্দ খুঁজে নিবি। আমি মরে যাওয়ার আগেই জমিবাড়ি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে দেব। নিজেরা যোগ্যতা অনুযায়ী সব গড়ে নিবি। যদি একসঙ্গে গড়তে চাস গড়বি, যদি একা একা চাস, তাই গড়বি। এতে দশ ভাইয়ের মধ্যেই ভাব ভালবাসা থাকবে। সংসার এক বাড়িতে থাকলেই সুখের হয় না। সংসার আলাদা থাকলেও সুখের হয়। শক্তিশালী হয়।’

হারাধনের কথামতো দশ ছেলে আজ নিজের মতো প্রতিষ্ঠিত। পুজোর ছুটিতে সবাই একত্র হয়ে হইহই করে।

অঙ্কন - জয়ন্ত বিশ্বাস
শেয়ার করুন: