খাট্টার গাঁট্টা খেয়ে নীলগিরিতে চণ্ডীপাঠ

দামু মুখোপাধ্যায়

সত্যি বলছি, পুজোয় কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার কুবুদ্ধি কখনও মগজে উঁকি মারেনি। তবে, কপালের ফের এমনই যে, ওই চার-পাঁচ দিনই কোত্থেকে যেন বিদঘুটে সব আপদ এসে জোটে! বছর ছয়েক আগের কথা। জমিয়ে ঠাকুর দেখার প্ল্যান-ট্যান ছকে ফেলেছি। হঠাৎ তাতে জল ঢেলে দিল অফিসের ই-মেল। হুকুম হল, বড় সাহেবের হয়ে প্রক্সি দিতে কেরালায় ছুটতে হবে। বন্ধুদের টিপ্পনি, সহকর্মীদের সান্ত্বনা, বাড়িসুদ্ধু লোকের গজগজ মাথায় নিয়ে ভোর ভোর হাজিরা দিলাম দমদমে। কোচি থেকে আরও সাড়ে চার ঘণ্টা পথ পেরিয়ে মুন্নার। বিমানবন্দর ছাড়িয়ে ঘণ্টা দেড়েক পরে ঘাট রোড, ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল দূরের নীল পাহাড়। চেনা দার্জিলিং-সিকিমের সরু পাকদণ্ডি রাস্তা নয়। রয়ে-সয়ে বাঁক নিতে স্টিয়ারিঙের সঙ্গে কুস্তি করতে হয় না। মসৃণ পথের দুই ধারে ঘন সবুজ বন। মাঝেসাঝে ঝর্নার উঁকিঝুঁকিতে একঘেয়েমি কাটে। দুপুরে পথচলতি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চের বিরতি। নিরামিষ থালি দেখে শুদ্ধ শাকাহারী সহযাত্রীদের আহ্লাদ আর ধরে না। কচি কলাপাতায় যত্নে বেড়ে দেওয়া কোলাম চালের ধপধপে ভাতের সঙ্গে সোনা রঙা সাম্বার, বাদামি রসম, নানা রঙের ভাজি আর কমলা পুডি চাটনির প্যালেট দেখে চোখ জুড়োয়।

"ধানিলঙ্কার জ্ঞাতি, দক্ষিণ ভারতের এই কুখ্যাত চিলি প্রথম মোলাকাতেই ভয় ধরাল।"

খিদের মুখে সাম্বার-ভাতের গ্রাস চালান করা মাত্র ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। টকের সে কী প্রচণ্ড দাপট! শিরশিরানি ধরলে আরসিটি করা দাঁতের পাটি ককিয়ে উঠল। জলদি হাত বাড়াই রসমের দিকে। স্বাদে সে নিরাশ না করলেও ঝালের থাপ্পড়ে চোখে ধাঁধা লাগায়। বিপদ এড়াতে এ বার এগোই পাঁচমেশালি সব্জি ভাজার দিকে। তার আবার দাঁতভাঙা নাম— মেঝুক্কুপুরাট্টাই। কারিপাতা আর সর্ষে ফোড়নের গন্ধ মনোরম হলেও সে সব ছাপিয়ে সেখানেও লঙ্কারাজ্যের বিস্তার। জিভ জুড়োতে খাবলা মেরে চাটনি মুখে দিই। ওরে বাবা! তাতে আবার শুকনো লঙ্কার মস্তানি। ওদিকে পাশে বসা তামিল ব্রাহ্মণের পোয়াবারো। স্নেহদৃষ্টি বর্ষণ করে বোঝাতে লাগলেন, এই হল খাঁটি কৈরালি ঘরানার রান্নাবান্না। ‘খেয়ে সুখ, হজম করা নিয়েও ভাবনা নেই’— আপ্পামে আপ্লুত হয়ে গদগদ মুখে তিনি রায় দিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কেরালার কুখ্যাত কাণ্ঠারি চিলির আশীর্বাদেই ঝালের এই বাড়বাড়ন্ত। ধানিলঙ্কার জ্ঞাতি, দক্ষিণ ভারতের এই কুখ্যাত চিলি প্রথম মোলাকাতেই ভয় ধরাল। সফরের বাকি দিনগুলোর কথা ভেবে তাই প্রমাদ গুনলাম!


হাই রেঞ্জ ক্লাব, মুন্নার

হোটেল-দোকান-শপিংমলে সাজানো মুন্নার শহর ছাড়ালে চা বাগানের ছড়াছড়ি। চারপাশের পাহাড় মুড়ে রেখেছে পান্না সবুজ কার্পেট। তার ফাঁকে কিছু কফি প্ল্যান্টেশন। প্রায় দু’ কিলোমিটার চড়াই ভেঙে বনেদি হাইরেঞ্জ ক্লাবে থাকার ব্যবস্থা। দিনে ঘুমনোর অভ্যেস কোনও কালে নেই। তাই আশপাশ দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। ১৯০৫ সালে স্থানীয় চা বাগান মালিকদের জন্য জিমখানা ক্লাবের পত্তন হয়। ১৯১০ সালে চালু হয় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। ছবির মতো সুন্দর ক্লাব চত্বর ঘিরে রেখেছে গল্ফ কোর্স, টেনিস কোর্ট, ক্রিকেট মাঠ আর ফুলের কেয়ারি করা লন। স্থাপত্যরীতি ও মেজাজে লাল টিনের ঢালু চালওয়ালা ক্লাববাড়ির সারা গায়ে লেপ্টে সাবেক ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আবহ। অন্দরসজ্জা, আসবাবপত্র, পরিচারকদের পোশাকে এখনও ব্রিটিশ আমলের ছাপ সযত্নে লালিত। ট্রফিরুমের দেওয়ালে পালিশ করা কাঠের প্যানেলে মাউন্ট করা বাঘ, বাইসন, হরিণ আর নীলগিরি থরের বাস্ট। পাশে তাদের ভবলীলা সাঙ্গকারী রকমারি বন্দুক আর শিকারিদের টুপির কালেকশন। ক্যাবিনেটে সাজানো ঝকঝকে রুপোর স্মারক, পুরস্কার। দেওয়ালে ঝোলানো পুরনো ফোটোগ্রাফে সাদা চামড়ার শিকারির পায়ে লুটিয়ে পড়া ডোরাকাটা বাঘ আর দাঁতালের দেহ। বেশ কিছু ছবিতে সাহেবের পাশে উপস্থিত স্থানীয় কুলিরাও।

"বড় বাঘ, হাতি, বাইসন, হরিণ, বুনো খরগোস, শেয়ালের সঙ্গে দেখা যেত নানা প্রজাতির পাখি।"

“শিকারের শখ আছে নাকি?” ঘরের এক কোণে কাউচে বসে প্রশ্নটা যিনি ছুড়ে দিলেন, তাঁর বয়স নির্ঘাৎ সত্তর পেরিয়েছে। গায়ে টুইলের বুশ শার্ট, কর্ডুরয়ের ট্রাউজার্স, চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা। আনাইমালাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রঞ্জন মাথাইয়ের সঙ্গে হাইরেঞ্জ ক্লাবের সম্পর্ক গত চল্লিশ বছরের। এককালে বন্দুক হাতে জঙ্গলে টহল দেওয়ার বাতিক ছিল। ইদানীং তা পাখি দেখার নেশায় বদলে গিয়েছে। একদা এই ক্লাবের ক্রিকেট দলের কাপ্তেনিও করেছেন। জানালেন, গত কয়েক দশকে চাষের জমি বেড়ে যাওয়ায় এবং পর্যটনের রমরমায় গভীর বনের চেহারা অনেক পাল্টে গেলেও এক সময় ইদুক্কির পাহাড়ে জানোয়ারের অভাব ছিল না। বড় বাঘ, হাতি, বাইসন, হরিণ, বুনো খরগোস, শেয়ালের সঙ্গে দেখা যেত নানা প্রজাতির পাখি। পাহাড়ের রুক্ষ খাঁজ বেয়ে তরতরিয়ে ছুটে বেড়াতো নীলগিরি থরের দল। বাহারি শিঙের লোভে কালে কালে তাদের প্রায় নিকেশ করে ফেলা হয়েছে। “ক্লাউডেড গোটের দেখা পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা দলের দেখা পেতে পারেন কাছের রাজামালাই জাতীয় উদ্যানে,” কাঁধ ঝাঁকালেন হতাশ মাথাই।

ইশারায় পাশের সোফায় বসতে বলে কফির অর্ডার দিলেন। জানতে চাইলাম ছবিতে দেখা কুলিদের কথা। মাথাই জানালেন, তারা সকলেই নীলগিরির আদিম মুদুভান জনজাতিভুক্ত। মুদুভানরা গভীর অরণ্যের বাসিন্দা। আজও অধিকাংশের আধুনিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বনের গভীরে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হয় তাদের গ্রামে। সেখানে ছোট ছোট গা ঘেঁষাঘেঁষি বাঁশের তৈরি কুঁড়েঘরে তারা থাকে। মেয়েদের বেশির ভাগই নিজের গ্রাম ছেড়ে জীবনে কোথাও পা বাড়ায়নি। পুরুষরা ইদানীং ফসল বেচার তাগিদে হাটেবাজারে মুখ দেখালেও বাইরের জগতে মিশতে একেবারেই আগ্রহী নয়।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ইংরেজরা চা চাষ শুরু করার আগে এই মুদুভানরাই ছিল পাহাড়ের আদি বাসিন্দা। ১৮৭০ সালে মুন্নারে এসে পৌঁছন ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের দ্বিতীয় ইংরেজ রেসিডেন্ট জন ড্যানিয়েল মানরো। জায়গাটা তাঁর এতই পছন্দ হয়ে যায় যে, পুনজার রাজ পরিবারের থেকে কয়েক একর জমি লিজ নিয়ে তিনি সেখানে কফি, সিঙ্কোনা, এলাচের চাষ শুরু করেন। মাথাইয়ের কথায়, “প্রথমে শ্বেতাঙ্গদের দেখে ঘাবড়ে গিয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে বনের আড়ালে ছুটে পালিয়েছিল মুদুভানরা। পরবর্তীকালে বহু চেষ্টার পরে নিজেদের স্বার্থে তাদের সঙ্গে আলাপ জমায় ভিন্‌ দেশি চা ব্যবসায়ীর দল। বন কেটে চাষের জমি তৈরি, রাস্তাঘাট গড়ার কাজে লাগানো হয় এই লাজুক স্বভাবের আদিবাসীদের।” চা বাগানের সাহেবদের ছিল বেজায় শিকারের নেশা। মুদুভানরাও জাত শিকারি। অপিরিচিত জঙ্গলে পথ দেখাতে আর জানোয়ারের তালাশ করতে সাহেবরা তাই এই অরণ্যচারী জনজাতির সাহায্য নিত। সেকালে নাকি নিজস্ব মুদুভান ‘ট্র্যাকার’ পোষা, সাহেবদের কাছে ছিল বিশেষ সম্মানের ব্যাপার। পালের মধ্যে খুনে হাতিকে চিনিয়ে দেওয়া, পায়ের ছাপ অনুসরণ করে বাঘের ডেরার সন্ধান করা বা দুর্গম পাহা়ডচুড়োয় আশ্রয় নেওয়া নীলগিরি থরদের খুঁজে পেতে মুদুভান শিকারিরা ওস্তাদ। সাহসেও তারা সাহেবদের সঙ্গে সমানে টক্কর দিত। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, একবার মাত্র কুড়ি গজ দূরত্ব থেকে তেড়ে আসা খুনিয়া হাতির সামনে বন্দুকধারী সাহেবের পাশে আগাগোড়া অবিচল দাঁড়িয়েছিল দা হাতে এক মুদুভান শিকারি। গুলি খেয়ে হাতি না পড়া পর্যন্ত নিজের জায়গা ছেড়ে সে নড়েনি। এ ভাবেই ব্রিটিশদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের।

"টলটলে শান্ত লেকের তীর থেকে শুরু হয়ে সবুজ চা গাছের ঢেউ দিগন্তে মিলিয়েছে।"

সারা সন্ধ্যা আড্ডা মেরে, কিছু জরুরি ই-মেল ছেড়ে দিয়ে ডিনার টেবিলে পৌঁছলাম। ক্লাবের সব ভোজেই বাঁধাধরা মেনু। দুপুরের অভিজ্ঞতার ফলে রসম সাম্বার এড়িয়ে সোজাসুজি চিকেন কারির বাটি টেনে নিই। কারিপাতা-গোলমরিচ-দারচিনি-লবঙ্গ দেওয়া ঝোলের স্বাদ অচেনা ঠেকলেও মন্দ নয়। তবে, তাতেও পাওয়া গেল টকের হালকা প্রলেপ। মহা মুশকিল। এদের দেখছি টক ছাড়া চলেই না! শেষে স্বস্তি দিল ক্যারামেল কাস্টার্ড পুডিং। এমন অপূর্ব পোড় আর মাখনের গন্ধে ভুর ভুর পুডিং অনেক দিন পরে খেলাম। টকের হাত থেকে যে সহজে রেহাই মিলবে না, তা বুঝলাম পরের দিন ব্রেকফাস্ট ব্যুফেতেও। ইডলি, দোসা, উত্তাপ্পাম— যা-ই খেতে চাই না কেন, তার সঙ্গী হিসেবে নিতে হয় জাঁদরেল টক সাম্বার। কোনও রকমে ফলের রস আর চিজ স্যান্ডউইচে পেট ভরিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম। মুন্নার থেকে প্রায় ঘণ্টা খানেকের পথ মাট্টুপেট্টি বাঁধ। টলটলে শান্ত লেকের তীর থেকে শুরু হয়ে সবুজ চা গাছের ঢেউ দিগন্তে মিলিয়েছে। হ্রদের নামেই চা বাগান। ম্যানেজার উম্মেন চ্যান্ডি অতি সজ্জন ‘সিরিয়ান খ্রিস্টান’। অফিসে বসিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টকে ডেকে খাতা-পত্তর বোঝানোর বন্দোবস্ত করে তো দিলেনই, তার ওপর দুপুরে খাওয়ার নেমন্তন্নও করে বসলেন। কাজকম্ম খানিক মিটলে দেড়টা নাগাদ নিজের জিপে বসিয়ে নিয়ে গেলেন চা বাগানে ঘেরা ছবির মতো সুন্দর বাংলোয়। পরিচয় হল ওঁর স্ত্রী মরিয়াম্মার সঙ্গে। চিলড্‌ বিয়ারের সঙ্গে কলা চিপস নিয়ে ড্রয়িং রুমে শুরু হল আড্ডা।


মুন্নার

চ্যান্ডি জানালেন, কেরালায় খ্রিস্ট ধর্মের আগমন ৫২ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট টমাসের হাত ধরে। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে মালাবার উপকূলের ক্র্যাঙ্গানোরে এসে ভিড়েছিল তাঁর জাহাজ। তাঁর দীক্ষিত ভক্তেরা নিজেদের ‘মালাবার খ্রিস্টান’ বলে পরিচয় দিতেন। পরবর্তীকালে সিরিয়া থেকে টমাস অফ ক্যানান নামে এক ব্যবসায়ী প্রায় ৪০০ জন সিরিয়াবাসীকে নিয়ে পশ্চিম তটে এসে পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানান এই মালাবার খ্রিস্টানরা। পরে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের জেরে গড়ে ওঠে এক নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়, যাঁরা নিজেদের সিরিয়ান খ্রিস্টান বলে চিহ্নিত করেন। এই সিরিয়ান খ্রিস্টান ঘরানার রসনার বিবরণ পেয়েছি চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইতে। জেনেছি, তাঁদের রান্নায় প্রচ্ছন্ন ইহুদি প্রভাবের কথা। সেই সূত্রে ইহুদি সমাজের বেশ কিছু সংস্কার এখানকার সিরিয়ান খ্রিস্টানদের হেঁশেলেও ঢুকে পড়েছে। জেহোবার উপাসকদের মতোই কেরালার এই খ্রিস্টান পরিবারে শুয়োরের মাংস নিষিদ্ধ। গরু-ভেড়া-পাঁঠা-হাঁস-মুরগি কোতল করা হয় হালাল পদ্ধতিতে। আঁশছাড়া মাছ এঁদের রান্নাঘরে ঢোকে না। মাছ-মাংস রান্নায় দুধ বা দই মেশানোর চল নেই বলে নারকেল দুধের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। বইয়ে পড়া এই সমস্ত কিছুর সঙ্গে এ বার সাক্ষাৎ হবে ভেবে রোমাঞ্চিত হলাম। ঠিক তখনই মরিয়াম্মার আপ্যায়নে লাঞ্চ টেবিলে গিয়ে ভিড়লাম।

"এ বার থালায় পড়ল ভারুথারাচা বিফ ফ্রাইয়ের সঙ্গে কেরালার বিখ্যাত প্যাঁচদার পরোটা।"

সফেদ টেবিল ক্লথের ওপর রাখা থরে থরে বোল আর প্লেটে হরেক রকম পদের চেহারা দেখে তাক লেগে গেল। তাদের এক এক জনের এক এক রকম খোসবাই। প্রথমে পাতে পড়ল নরম-গরম পেটফুলো আপ্পাম, যার মুচমুচে কানায় বাদামি রঙের ছাঁট। নারকেল দুধের পেলবতায় সঠিক অনুপানে মিশেছে গোলমরিচ, লবঙ্গ, বড় এলাচ গুঁড়ো, কোকাম আর শুকনো লঙ্কা। সেই রসে জারিয়ে দীর্ঘ ক্ষণ ফোটানোর ফলে তৈরি হয়েছে তুলতুলে সুস্বাদু মাংস। ঘিয়ে রঙা গ্রেভিতে তার পাশাপাশি ভেসে বেড়াচ্ছে খুদে গোল আলু। আপ্পাম ছিঁড়ে চিকেন স্টুয়ে ডুবিয়ে মুখে দিতেই স্বাদে-সৌরভে মুগ্ধ হলাম। স্নিগ্ধ হেসে চ্যান্ডি বললেন, “সেন্ট টমাসের আবির্ভাবের বহু কাল আগে থেকেই মিশর, মধ্যপ্রাচ্য, পর্তুগাল ও চিন থেকে ব্যবসায়ীরা মুজিরিস ওরফে ক্র্যাঙ্গানোরে যাতায়াত শুরু করেছিলেন। তাঁদের হাত ধরে সেই সমস্ত দেশের রসনা সংস্কৃতি পৌঁছেছিল এই মুলুকে। তার সঙ্গে স্থানীয় মালমশলা ও রান্নার কৌশল মিলেমিশে সৃষ্টি হয়েছিল অভিনব রন্ধন ঘরানার।” যা ক্রমেই নাসারিন বা সিরিয়ান খ্রিস্টান সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।


কারিমিন

এ বার থালায় পড়ল ভারুথারাচা বিফ ফ্রাইয়ের সঙ্গে কেরালার বিখ্যাত প্যাঁচদার পরোটা। উত্তরের লচ্ছাদারের তুলনায় কেরালার এই পরোটা সংস্করণের ফারাক, তার মেজাজে। মুচমুচে মোলায়েম সেই পরোটা আর মশলাদার মাংসখণ্ডের অসাধারণ যুগলবন্দি আবিষ্ট করল। ভিনিগারে চোবানো কাঁচা পেঁয়াজের স্লাইসের সঙ্গতে প্রতি কামড়ে মাংসের টুকরো যেন চেতনায় নতুন রসনাচ্ছবি আঁকতে লাগল। হৃদয় তৃপ্ত হল। কর্তার ইঙ্গিত বুঝে কিচেন থেকে এ বার কারুকাজ করা জার্মান সিলভারের লম্বাটে ট্রে নিয়ে এলেন মরিয়াম্মা। তার ওপর সুতোয় বাঁধা কলাপাতার পুঁটুলির গায়ে পোড়া দাগ। বাঁধন খুলে বের হল আগুনে লাল রঙের মশলামাখা বড় আকারের চাঁদা মাছের কোনও প্রজাতি। চ্যান্ডি জানালেন, কেরালার ব্যাকওয়াটারে ঝাঁকে ঝাঁকে মেলে এই কারিমীন। চাঁদার মতো দেখতে হলেও আদতে তা সামুদ্রিক ভেটকির স্বজাতি। রান্নার পদ্ধতি অনেকটা আমাদের পাতুরির মতো, যদিও মশলার হেরফেরে চরিত্রে ঢের ফারাক রয়েছে। মাছ ভেঙে চেখে দেখি, ঝালের ভাগ একটু বেশি হলেও সঠিক পরিমাণে পেঁয়াজ-রসুন আর কারিপাতা-কোকাম পেস্টের সঙ্গে নারকেল দুধ পড়ার ফলে অতি স্বাদু রান্না হয়েছে। মাছের গায়ে লেগে থাকা কাইয়ের সঙ্গে মেখে নিলাম বেঁটে মোটা লাল চালের ভাত। প্রতি গ্রাসেই অমৃতের আস্বাদ!

চ্যান্ডিদের থেকে বিদায় নিতে সন্ধ্যা হল। আবার চা বাগান ঘেরা ঢালু রাস্তা ধরে পাহাড়ি বাঁক সামলে এঁকেবেঁকে চলা। কালচে বেগুনি আকাশে ঝকঝক করে জ্বলছে অযূত তারার চাঁদোয়া। ঝোপের আবছায়ায় ঝিকমিক করছে কোটি জোনাকির ঝাঁক। কোথায় তারার শেষ আর কত দূরেই বা পৌঁছেছে জোনাকির বাতি, সে হিসেব করতে পারে না অন্ধকার ফোঁড়ার চেষ্টায় আকূল জিপের হেডলাইট। পুজোর ভিড়ে হিমশিম কলকাতা থেকে বহু দূরে ঠিক এমনই মাহেন্দ্রক্ষণে নবমীর চাঁদ প্রসব করল নীলগিরি-সিল্যুট।

ছবি - দামু মুখোপাধ্যায়
শেয়ার করুন: