গুচ্ছ কবিতা

যশোধরা রায়চৌধুরী
অপমানসিরিজ থেকে একটি
গলার ভেতরে লাফ দিয়ে ওঠে ব্যাং
ব্যাং নয় ওটা সবুজ রঙের রাগ
আমি তো ওটাকে জল দিয়ে গিলে নিয়ে
কতদিন ধরে মানিয়েছিলাম বাগ

ব্যাং নয় ওটা সবুজ পিত্ত, বিষ
অপমান ঢালে বন্ধু ও পরিচিত
কেননা জীবন ছুঁড়ে দেয় নিশপিশ
অন্ধকারের ভেতরে আমাকে তেতো

গলার ভেতরে লাফ দিয়ে ওঠে শাপ
কোনদিন আমি মাথায় তুলি নি তাকে
ঘৃণা গিলে নেয় রাগকে, ব্যাঙ কে সাপ
যেভাবে গিলেছে , হজম করেছে পাপ

ঘৃণাই এখন ক্ষুরধার, ঘৃণা ভাল।
ঘৃণাই এখন দ্রুতগামী, রংহীন।
ঘৃণাই এখন লতায় লতিয়ে চলে।

আমিও এখন ভদ্র ও সমীচীন।
লড়াই
নিজেকে দুঃখী করব না আমি ভেতরের দিকে রাস্তা খুঁড়ব দীর্ঘ
অপমানগুলো গুলে খাব আমি হজম করব পাথর এবং স্বর্গ
উঁচুতে ওঠা বা নিচুতে নামাকে সমান দেখব কেননা সবই অথর্ব
করেছে আমাকে, আমার ভেতরে গড়েছে দুষ্ট দৈত্য । অসাড় ভিক্ষু

নিজেকে দুঃখী করব না আমি সুখীও কেন যে নিজেকে এখন করব!
শান্তি চাইছি শান্তি চাইছি ভেতরের দিকে থাকতে চাইছি শান্ত।

তবুও দহন। ওটা বাদ দিয়ে কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু।
নস্টালজিয়া
বেদনা তার বিলাপ আনে, বিলাপ তাকে বেদনা খেতে দেয়
জানিনা কেন দুজনে মিলে আমাকে রোজ ট্রেনেও তুলে নেয়
সে গাড়ি যায় উদাসলোকে, কান্না গায় ধোঁয়ার ঝোঁকে
বাড়ির কাছে স্টেশন পেলে নামি না আমি বেপাড়া চলে যাই

বেদনা যত ফুচকা আনে। বিলাপ তত চুড়মুড় সাজায়।
জানিনা কেন ফাঁকা শিমুল ঝরতে থাকে বেঞ্চিটিতে, বিষাদ জামা গায়ে
একলা এক যাত্রী হাঁটে। দু তিন মুঠো বাদাম তুলে খায়।

বেদনা আর বিষাদ আজ নিঃস্বঘুমে পবিত্রতা চায়।
যন্ত্রণাট্যুরিস্ট
(কেরালা ২০১৮)

কাদার পৃথিবী
জলের ভুবন
মৃত্যু নিকষে
জীবনের আলো

ছটা নদী জুড়ে
মহাপ্রলয়
দশটা রাস্তা
প্রশস্ত নালা
পাঁকে গেঁথে যাওয়া
অসাড় শরীর
ভাসমান গরু
ঢোল হওয়া দেহ
থর থর কাঁপা
পোষা পশুপাখি
নষ্ট শস্য
ভেসে যাওয়া স্কুল…

ডাঙায় ট্যুরিস্ট
সঙ্গে ক্যামেরা



সব ছবির ওপর দিয়ে এখন গড়াচ্ছে রোদ্দুরের ক্ষীণ অপচেষ্টা

বন্যা নেমে গেলে পড়ে থাকে পাঁকের গর্জন
বন্যা নেমে গেলে রোদ্দুরে দেওয়া হয় ইস্কুলের বইখাতা
বন্যা নেমে গেলে হাড়গোড় আর কংকাল
টিভি ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিনের আত্মারা
দেহ ছেড়ে বেরিয়ে সিলিং এর কাছে লটকে যায়

বন্যা শেষ হয়ে গেলে ফিরে আসে আমাদের সম্পত্তিপ্রবণতা
এক কাপড়ে বেরিয়ে যাওয়া মানুষও নিজের পুরনো বাসায় এসে কী যেন খোঁজে
ভিজে লাট কাপড়ের মধ্যে থেকে খুঁজে নিতে হয় প্রিয় রং
ছড়িয়ে পড়ে পুরনো চিঠির বান্ডিল
কুটিকুটি হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের       সার্টিফিকেট থেকে অনন্ত ভবিষ্যতের চিন্তা

রেশনকার্ডের হতবাক দলাপাকানো ভুবন।

বন্যার পর ধানখেতে পাঁক হাইওয়েতে মাটির বিমূর্ত শিল্পকলা
একদিন এইসব পেরিয়ে আবার জীবন জীবনের কাছে ফিরবে?

মশলার খেতে হাওয়া দেবে, গোলমরিচের বনে সবুজ টিয়ে উড়বে
তোমার ছিপ নৌকো ভরে উঠবে রুপোলি মাছের ঝাঁকে…

আমরা, , বাকি ভারতবাসী, দেখতে যাব কেরালার ধ্বংসের শিল্প,
কেরালার অ্যাপোক্যালিপ্স…

এর নাম যন্ত্রণা ট্যুরিজম
অঙ্কন - দেবাশীষ সাহা
শেয়ার করুন: