আমির খুসরোর স্বগতোক্তি

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
বেড়ে উঠছে পুরনো অনুপস্থিতি। বন্ধু ও সুরার পাশে বেড়ে উঠছে নিজস্ব তোয়াজ, বন্ধুত্বই যদি তওহিদ হয় তাহলে কোথায় যায় পুরনো কাঁটা? আমি স্থির হৃদয়ে চেয়ে থাকি, যুদ্ধক্ষেত্রে গিঁথে দেওয়া খঞ্জর সেইতো তোমার প্রেম! হৃদয়হরণ বলে কিছু নেই আছে কয়েকটা গতরাতের কাটা ফল, তাদের ফ্যাকাশে ছড়িয়ে এই দৃঢ় সংকল্পের ভাষা জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঘুরে দাঁড়ানো কাকে বলে? দেওয়াল ও প্রদীপের মাঝে যে সন্ধে সোনালি, তাকে বালি-পাথরের সুরে বাঁধো — একমাত্র নিশ্ছিদ্র তওহিদ!
আল্লাহ জের। আল্লাহ জের হতে পারে না। যে আমায় সকাল দিয়েছে — সকাল ও নদীর পাড়ে আধো-অন্ধকার। দূর থেকে ভেসে আসা গান। কে গায় অস্পষ্ট পাড়ে? কেন পূর্বপুরুষের গলা শুনতে পাই সেই সুরেদের ভিড়ে? আমাদের বেঁচে থাকা সুরের ছাপ। কোথায় যাব আমরা? এত সুর ভাষাহীন — এত ভাষা সুর-দেহে ঝাপসা — রক্ত ও প্রবাহ — জিভে বাসা করা বিস্মরণ — অথচ হৃদয় একটা মৃত সূর্য — তার শেষতম বিভায় কি তোমার নাম ছিল মইনুদ্দিন?
দিল্লির উপর মেঘ তার ওপারে যে আকাশ সে-ই তো আসল আঞ্জুমান। আমার কাজ ও বিস্তার একমাত্র এস্তখলাস — আসলে কোনও নির্দিষ্ট মনিব নেই — কাজ আর তার উদ্দেশ্যে যে কোনও রাস্তাই সঠিক
এই দিল্লি — মেঘের উপর থেকে দেখে রাখছেন কেউ — কোথাও কুফরান নেই — এই যে খিড়কি, আকাশের সামনে চৌখুপ্পি মাত্র! তেমনই আমার সুর — মাংস থেকে ছুরি বের করে আনবার সময়ের মসৃণ শব্দ — এর বেশি আর কি পারা যায়?
এখানে কোরান নয়, শুধু তার মুখ — হজরত নিজামুদ্দিন কীকরে সহজ কথা বিশেষণ ছেড়ে তাঁর পায়ের নিচে ঘুরে বেড়ায় — কল্পনা ছাড়া কোথাও জন্নত নেই, জাহান্নুম সাতটা হলুদ আগুনের কাপড় মাথা থেকে পা অব্দি আমাদের ডেকেছে — আমার জগৎ বলে কিছু নেই — শুধু উপর থেকে দেখা তাঁর চোখ, আমাদের পাথরের ঘরে অন্ধ মেয়েটির দরজা — কল্পনাবিহীন
আলো কেঁপে যায় যেন সূর্যের সামনে দিয়ে পাখির ঝাঁক — যেভাবে মুহূর্তটুকু ধরা রইল চোখের পলকে, যেভাবে অক্ষরের সামনে আমার আঙুল, যেভাবে ফেরারি কিছু সৈনিকের মৃতদেহ পৌঁছে গেল মাটির শরীরে — যেভাবে সমস্ত গানের সূত্র স্থগিত রইল যুদ্ধ আগমণে

১ তওহিদ — একেশ্বর, সৃষ্টিকর্তা
২ জের — পরাজয়
৩ আঞ্জুমান — মজলিশ
৪ এস্তখলাস — আল্লাহের জন্য করা কাজ
৫ কুফরান — ঈশ্বর অবিশ্বাস বা অমান্য করা
অঙ্কন - দেবাশীষ সাহা
শেয়ার করুন: