হে পথিক, হে হননকাল

হিন্দোল ভট্টাচার্য
এসব অনেক আগে লেখা হয়ে গেছে।
ভাঙা শহরের টুকরো,
লগ্নভ্রষ্ট সন্ধ্যার বিষাদ
অনন্তকালের দিকে চেয়ে থাকা সমস্ত রাস্তাই
ক্রমশ নিজের দিকে ঘুরে আসে,
জীবন অতীতস্তব্ধ, বেড়াতে যাওয়ার নাম করে
নিজেদের কাটছাঁট করে।
তবে কি তোমাকে বলব, অনেক বয়স হল?
এই বার মানে মানে বাণপ্রস্থ ভালো?
যে স্রোত নীরবে যায়, ছুঁয়ে থাকে ঘাট, তুমি
তার পাশে বোস।
পাথর রেখেছ পিঠ, বলো সিসিফাস,
কত আর কত ভার নিজেই এখন?
আর কত ভেসে গেলে পাবে ভাঙা চায়ের দোকান
যেখানে জিরোনো যাবে, সৌরদহনের দিন
দুপুর শীতলপাটি, পাশে কুঁজো, বাতাসার আদর টাঙানো।
এসব নতুন কিছু নয়। পুরনো কবিতা পড়ে
মাতব্বর আকাশের বিষন্নতা থাকে
বুড়ো সন্ন্যাসীর চোখে
জানেন ঈশ্বর মানে
ঘুমিয়ে পড়ার পরে মিহি এক অন্ধকার
যার কোনও জন্ম নেই, মৃত্যু নেই
শুরু শেষ নেই
অমীমাংসিত
এভাবে আমিও তবে ঈশ্বরের কথা লিখি
লিখি আয়ু ভেসে যাওয়া কালো জলে
বেহুলাসাধনা
লিখি যত ডুব দেবে, তত তুমি পুণ্যবান
লিখি মন্ত্র, লিখি হত্যা
কত অগ্নি জ্বলে গেলে
কত অন্ধকার
এভাবে তুমিও তবে ঈশ্বরের সঙ্গে বসবাস
করেছ আমার মতো
সামান্য ঘুমের মধ্যে
বলেছ আমাকে দাও মন্থনের রস
আমিও রাক্ষসকুল
দেবভোগ্য হতে চাই
যখন বুকের মধ্যে দিয়ে চলে যায় লরি
শহর নির্জন এক গলি ধরে চলে যায়
মায়াবনে, ছায়াচরাচরে।
কোথায় চলেছ তুমি?
একবার ফিরে দেখ একা।
একটি দরজা আছে আমাদের নিজস্ব কোথাও
দুপাশে অনন্তকাল
তুমি সেই দরজার কাছে
দাঁড়িয়ে রয়েছ
দরজাও অর্ধেক খোলা
তবু তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ
অনন্ত অখণ্ডকাল
এইভাবে
অনন্ত
অনন্তকাল
বাজার বসেছে। খিদে বিক্রি করছে নিজেকে।
ব্যাগের ভিতরে ফুলে ফেঁপে উঠেছে
আমাদের লোভ, আয়ু, ইচ্ছেগুলো।
সকাল, নিজের কাছে
কথা দেয় সে কখনও সন্ধে হবে না।
এমনকী হেমন্ত, সেও
যে পাতা ঝরেছে তার কাছে
ক্ষমা চায়
ইঙ্গিত আসলে সত্য। নয় সত্য কোনও দৃশ্য আজ
কখনওই ছিল না সে, সুন্দর নিজের গায়ে টোকা
মেরে মেরে দেখতে চায় বেঁচে আছে কিনা-
সুন্দর সময়নিষ্ঠ, জানে, ক্ষয় রয়েছে ভিতরে
গোপন ঈশ্বর যেন, অন্ধকার রাস্তা ধরে ধরে
রাত্রির নীরব এক হেঁটে যাওয়া, এত দুঃখময়?
হে পথিক, এখনও বোঝোনি?
জীবন দুঃখের কাছে নিজেকেই সমর্পণ করে।
হারিয়ে ফেলাই সত্য। কাছে পাওয়া মুহূর্তের মায়া-
তুমি একা, তাই দিবাস্বপ্ন থেকে বাঘ গুঁড়ি মারে
খিদে মিটে গেলে সব জলরাশি ফিরে চলে যায়
তখন ভাঁটাই সত্য। দেখা যায় কতদূর খাত-
কত ইতিহাস আছে, কত গল্প, কত যে পুরাণ
কত অবতার তুমি নিজেকেও হনন করেছ।
ধুলোয় ধুলোর কথা, জল ধুয়ে নিয়ে যেতে পারে-
জলের আসল ধর্ম, বয়ে নিয়ে যাওয়া
হে পথিক, এখনও বোঝোনি?
এই এত জয়ধ্বজা, রণডঙ্কা, রূপকথার বাঁশি
এই তীব্র জীয়নকাঠি, লাভাস্রোত, রাক্ষসের হাত
ফাঁকা প্যান্ডেলের মধ্যে একা জ্বলে থাকা দীপাধার
ঘট ভেঙে চলে যাওয়া জীবন তখন
জোয়ারে নিজেকে ঢাকে, স্রোতসম, সমস্ত কাহিনি
একাকী দুঃখের লিপি মুছে যায় তার
আবার দুঃখের কাছে বসে থাকে নগ্ন মাধুকরী
জরা জীর্ণ মৃত্যু কেন, বোধি চায়, ভূতগ্রস্ত মুখ
বোঝে না কোথাও নেই পরিত্রাণ, মায়াবী আঁধারে
ঘুরে ফিরে যায় স্রোত, যেন কত চরা পড়ে গেছে
চরাজন্ম সত্য হয়, চরাজন্ম নদীর ভিতরে
ডুবে ডুবে জল খায়, জেগে ওঠে সন্তানের মতো
তুমি কি অখণ্ড কেউ? রাত্রির নীরবলিপি জানো?
কত শব্দ মুছে গেলে তবে কত শব্দ জন্ম নেয়?
রাজার ভাঁড়ার সত্য, দখল করেছে হানাদার
সেই কবেকাল থেকে, যিনি রাজা তিনিই ডাকাত।
তুমি কি তোমার কাছে বসে বসে রূপকথা শোনো?
ত্রিপিটক, গীতা, বাইবেল?
কোরানশরীফ? জল বয়ে যায়
জলের ভিতর।
মাথা চারা দিয়ে ওঠে চরা
চরা ডুবে যায়
আগুন সর্বস্ব খায়, নিজেকেও, একটু একটু করে।
পড়ে থাকে ছাই, ভস্ম, ধুলো আর তাপ!
যে ফুল নীরবে ফোটে তার পাশে লক্ষ লক্ষ অনিবার্য নক্ষত্র এসে পড়ে
শিকড় ভেসেছে জলে, ভাঙা হাট, রক্তপাত, জল জল অকূল পাথার
শরীর ডুবেছে তবু, মৃতদেহ কখনও ডোবেনি
যে ফুল নীরবে ঝরে, তার পাশে
মানুষ সমাধি লিখছে পৃথিবীর নিজস্ব মাটিতে
এত রক্ত কোথা থেকে বয়ে গেল বলো হে জাতক
বয়ে গেল সৃষ্টিশীল যাবতীয় শস্যক্ষেত নিয়ে
ভস্ম ওড়ে অপ্রাকৃত ভস্ম ছাই ঝরে পড়ে ঢেকে যায় পুণ্য তটভূমি
মন্থর গড়িয়ে নামে মন্থরের দিকে
মাটিতে আঁচড়
অমরত্ব লিখতে গিয়ে মানুষ লিখেছে- ক্ষমা কোর
আমাদের হিংসা ছিল নতুন শার্টের মতো ভীষণ পোশাকি
যেন মুখোসের দিকে চেয়ে থাকে সমস্ত মুখোস
মানুষ অপেক্ষা করে
মানুষ ঘুমোয়
হে পথিক এখনও বোঝোনি?
আসলে নরকযাত্রা ছিল এই জীবনের আনাচেকানাচে
দুপাশে আলপথ, যার
ভিতরে লুকিয়ে ছিল সাপ
মাটিতে লাঙল চললে মাটি নয়, মাংস উঠে আসে
আর রুদ্রবীণা বাজে
হে আকাশ
হে জল
বিশ্ব
হে বায়ু তোমার কাছে মানুষ উড়িয়ে দেয় কথা
কে রয়েছে কান পেতে কোনখানে? কোথায় প্রাচীন
ঘাটে জল ধাক্কা দেয় যেন কত গল্প জমে আছে
মোহানার ডাক তার
মোহানায় ফিরে যেতে যেতে
কানে কানে বলে যাবে – এখানে থেমো না তুমি, হাওয়া
তোমার রয়েছে কৃষি, বীজধান, একতারার সুর
উঠোনে তুলসীর গাছ, সন্ধে দিতে আসে ছোটবউ
পায়ে পায়ে লক্ষ্মীছাপ পড়ে এই নিকোন বাংলায়
রক্তের ভিতরে নাচে কয়েকশো শতাব্দী এইভাবে
তুমি জাতিস্মর ছিলে?
আবার নতুন করে এসেছ কি ফিরে?
যে কোনও কবর মানে
গাছজন্ম
ঘাসে জল বিন্দুবিন্দু প্রাণ
আলোর গোপন শব্দ
হয়ত একাকী ফুটে
একাকী নীরবে ঝরে যাওয়া
অবতারগাথা গাও, মন্ত্র পড় নাথ
আমিও তোমার কাছে এসেছি নিভৃতে
জীবন লিখেছি দ্রুত আগুনের পাশে
জাগো, তুমি জেগে ওঠো, হিতে বিপরীতে
নিজেকে খেয়েছ গিলে নিজেই আহুতি
শবের উপরে শব সন্ন্যাসীর লাশ
ধর্ম পড়ে আছে, ধর্মে হিংসার বিভূতি
মাটিতে নাভির দৃশ্য, ঈশ্বরের হাত
তবে কী ঈশ্বর তার ভক্তের ভিতর
শয়তানজন্ম হয়ে ধ্বংস লিখে লিখে
নিজেই নিজের কাছে পুজোর প্রসাদ?
এ পৃথিবী ঢেকে যায় কী চরম শীতে
মুছে যায় সমস্তই, মুছে যায় জল
অন্ধকার মুছে যায় আলোর আড়ালে
যতদূর শীত যায় ততদূর থেকে
একটি অনন্ত রাস্তা নিজেই নিজেকে
প্রদক্ষিণ করে শুধু, রাস্তাই পথিক-
পথিক, নিজেও রাস্তা, অন্ধকার খোলে
একটি অবাক আলো, বলে শান্ত হও
ছিঁড়ে ফেল পাণ্ডুলিপি, জন্ম দাও ভাষা
প্রথম অক্ষর লেখ, যেভাবে বিস্ময়
প্রতিটি শিশুর জন্ম আঁধারে একাকী!
এসব পুরোনো কথা, বলা হয়ে গেছে
এসব নতুন কথা, বলা হয়ে যায়
মানুষ ভাসায় তরী মানুষের দিকে।

মানুষ ভাসায় তরী মানুষের কাছেই কোথাও…
অঙ্কন - মৃণাল শীল
শেয়ার করুন: