গুচ্ছ কবিতা

সন্দীপন চক্রবর্তী
নেমেসিস
ধুতরোর বিচি বেটে খাইয়ে দিয়েছি আমি এসব শব্দকে
আর সেই বিষ তার মাথায় উঠেছে ––
নহবত বসিয়েছি। তার সুরে সুরে যাতে
দুলে ওঠে সেইসব বিষ

ডানা-ছেঁড়া প্রজাপতি এসে দ্যাখে -- ঈষৎ কপিশ
স্তব্ধতার শিরদাঁড়া বেয়ে শুধু সারারাত
লালপিঁপড়ে যাতায়াত করে।
আমাদের ফ্লুরোসেন্ট সমস্ত অক্ষরে
লেগে থাকে তার লালা, খর্ব প্ররোচনা

শব্দের ভিতরে কত আত্মহত্যা ঘটে যায়
কবিতা জানে না
বেগানা
ঘুম ছেড়ে এইবার আড্ডায় উঠে যাবো, ভাবি

দুই হাত দিয়ে শুধু সরাতে সরাতে যাই
তামাকের গন্ধে ভারী মেঘ --
স্বপ্নের বিশাল মণ্ড লাফ দিয়ে উঠে যায় বিছানার থেকে
বাতাসে দাম্পত্য ভাসে -- থলথলে, আঁচড়ময়, বাঁকা

মহান স্তম্ভের থেকে চুপচাপ সরে আসি
গর্ভের শিকড় ছুঁয়ে সরে আসি নিরালা কুহকে
বুকের উথাল শব্দ -- ঘৃণারক্তকান্নাভালবাসা
ঢেঁকুরের দলা হয়ে উঠে আসে
কিছুতে কিছুই যায়-আসে না আমার

নিজের বেগানা ছায়া খুঁজে খুঁজে খুঁজে
বাঘের মতোই বাঁচি, এরপর একদিন
বাঘের মতোই মরে যাবো।
ছিন্নমূল
মুখের উপর চালিয়ে দেওয়া ক্ষুরের মতো দাগ –
তোমরা তাকেই সীমান্ত বলেছিলে
হাত-পা-মাথা – গোটা শরীর – ইতিহাসের গর্তে
ঢুকিয়ে দিয়ে চেষ্টা করি বোঝার

কেন জেঠুর, কেন পিসির, মুঠো খুললে আজও
পার্টিশন বা রায়ট উঠে আসে?

দেশজোড়া উচ্ছেদের স্মৃতি, শুধুই পালিয়ে আসা
বুকের ভিতর কাঁপতে থাকে জল

আমিও এখন নিজের থেকেই পালাতে চাই দূরে...
শহর থেকে পালিয়ে বাঁচে যেমন মফস্বল
জন্ম
মৃত্যুর মুখোমুখি আমাদের অসহায় মুখ মনে পড়ে
অপ্রস্তুত, চেষ্টাকুল, ধীরে ধীরে চঞ্চলতা কমে আসে তার --
মৃত নক্ষত্রের আলো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মানুষের কাছে
যখন পৌঁছোয়, তার বহু আগেই সে মরে হেজে গেছে।
তবু সে আলোর ভ্রম মানুষের কাছে তার থাকার নির্ভুল চিহ্ন

বারান্দার অন্ধকারে রক্তমাখা ফুসফুস টাঙিয়ে
এইসব ভাবি; আর পুড়ে যায় সিগারেট, আমাদেরই মতো।
যে কোনো সম্পর্কে থাকে ছোট-বড় অজস্র পাঁচিল --
যে সম্পর্ক মরে গেছে, তার নানা আলোর ইশারা
যে সম্পর্ক ছিঁড়ে যাবে খানিক পরেই, তার ভাষা
আমায় উদ্যত করে আকাশের ঘন সিন্ধু জরিপ করায়।
ভাষার ভিতরে আজ ডুবুরি নামাতে গিয়ে দেখি
উন্মুক্ত ক্ষুরের দিকে মারাত্মক দোলাচল। ভাষার ঝিনুকে
হাঁটু ভেঙে মুখ থুব্‌ড়ে পড়ে আছে আমাদের রক্তাক্ত সন্তান
ভীষ্ম
নীরব কত উপেক্ষা আর তাচ্ছিল্য তো আছেই
শিকড়ে নীল জোনাকি, ভাঙা দু’গাল বেয়ে থুতু
ঘুমের ভিতর ছড়াতে দাও বীজের মৃদু স্রোত...

হয়তো জীবন এইরকমই -- শুধুই অপচয়
আফিমফুলের গন্ধ -- সে মুখ চন্দ্রাহত, নিচু --
এড়ানো যায় না, এড়ানো যায় না কিছু

কাগজফুলে এসে যেমন বৃষ্টি ভেঙে যায়
সেভাবে এসো, অলৌকিক, পোয়াতি হাবা মেয়ে
ভাষাই আদিম শরশয্যা, ভাষা অগতির গতি

ঝড়ের আগে থম্‌কে আছে, দমবন্ধ, গুমোট --
আকাশ বাতাস বিদ্যুৎসীমা, রক্তসরস্বতী
শূন্যতা
ভিতর থেকে বেরিয়ে-আসা অন্ধগলি যাবে কোথায়?
সঙ্ঘ চাই? বৃত্ত চাই? কিছুই তার চাই না আর
শুধু যখন রাত্রিবেলা বাতাস দেয় মনকেমন
তখন ঠিক মনটা আর মনের মাঝে থাকে না তার
সারাদিনের ধকল ভেঙে শব্দগুলো উঠে দাঁড়ায়
যুদ্ধ করে, রক্ত ঝরে, প্রেমেও পড়ে, ছুটে বেড়ায়
হাতের থেকে বেরিয়ে যায় হাতের সব রংমশাল
জ্বলতে থাকে গেরস্থালি, আকাশ খালি রং ঝরায়

আমার কথা শোনে না কেউ, কথায় ঢেলে দিই গরল
কথাগুলোর হেঁচকি ওঠে, সারা শরীর মুচড়ে যায়
তবু তাদের জেদ কমে না, পেরিয়ে যায় শহর-দেশ
পেরিয়ে যায় ইতিহাসের ভিতর যত সুড়ঙ্গ
বাতাস কেটে উড়তে থাকে মরচে-ধরা কথার ফুল
সঙ্ঘ চাই? বৃত্ত চাই? কিছুই তার চাই না আর
অঙ্কন - দেবাশীষ সাহা
শেয়ার করুন: