পাঁচটি কবিতা

অভিমন্যু মাহাত
ভ্রমণকাহিনী
অতল স্রোতের অজস্র ঢেউ
জামার কলার বেয়ে ঢুকে পড়ল দেহে
নোনতা জলস্পর্শে পায়ের ফ্যাকাসে পাতা
ফুঁ দিয়ে ওড়ানো যাবে না সাম্প্রতিক অসুখ

রাত শেষ হয়ে আসে
মৎস্য শিকারীর দল জাল ফেলে ভাঙছে আঁধার
আমার বালিমাখা ভেজা চুল ভিড়ে, পুলিশের কর্কশ ভ্যানে
মরশূন্যতার কক্ষপথ ঘুরে আসি গৃহে
দরজার তালা নিজেকেই খুলতে হয়...
প্রিয় শ্রুশ্রূষা শব্দটি কাঁসার বাসনে নেই
           নেই বারান্দার মোড়ায়
বরং অন্য নামে ডাকছো আমায়,
আরেক ভাষায় কথা বলছ

গুমোট ঘরে জল দেবে কে? জানলা খুলবে কে?
হাতঘড়ি খুলে ফোন ‘ব্লক’ করলে...
গন্ধ নিতে ইচ্ছে করে ওপ্রান্তের রিংটোনের
ভুল নও তুমি, এ তো মুখোমুখি সমাধিপ্রান্তর

এতদিনে উপেক্ষার রঙ ইন্দ্রিয়গোচর
টাটকা বাক্যবন্ধে জানান দিচ্ছঃ
            হালকা বাতাসে বিদেয় হও
            কে বলেছিল কাদা পায়ে বাঁচতে?
            ঠিকানা লেখার আগে পিন কোড দেখে নাও,
            বিরক্ত করো না!
দাঙ্গা
ভেজানো ঘাসে পড়ে আছে তোমাকে লেখা
অপ্রকাশিত ক্রোড়পত্র
ভবিতব্যব্যাপী দেখা যায় না এক খণ্ড জমি
সহসা হাতে এসে ঠেকল শ্মশান ফেরত কাষ্ঠ
যার গায়ে এখানো অস্থি’র ধ্বনি লেগে আছে

পকেটে থাকা থেবড়ানো চিরকূটের প্রতি
জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
অথচ তার তো কোনো আঘাত ছিল না
হাইপ্রেসারী উর্দিধারীর খিস্তিমুখ ফেনোচ্ছল
সলিল সমাধির মুখ থেকে আমাকেও
বাঁচার নামে ভরে অপান্থ লকআপে
তারপর বর্ষিত হয় অশ্লীল প্রবচন, রোবট জীবাণু

তুমি আমায় গ্রাস করেছো বলেই
বেজে ওঠে উটের গলার ঘন্টা
নবদ্বীপ বালুচরে কোনো পাঁচিল নেই
তবু বসে আছো বজ্রাহত
বাড়িতে হবিষ্যরান্নার গন্ধ ওঠে আমিশেষর
কন্ঠে তোমার অরন্ধনের নামতা পড়ার শব্দ
মাধুকরি
ভাগীরথীর পলিমাটি ফাটিয়ে চিৎকার করেছি একটাই নাম
জলে দৌড়ে আসে অজ্ঞাত নগর কীর্তন
কচুরিপানার ফুঁয়ে ভারি চাঁদ নিভে যায়
বেশ তদারকি মৎস্য সমাজের
ওদিকে ক্রমে ভোরের আজান অভ্যেসবশত বাতাসনির্ভর
অধোভাঙা জীবদ্দশায় আমি ডুবে যাই
তবু তোমার নামে জলজ ভ্রমণ পাখি দেখি
যারা বলে জলের উপরে যাও, উপরে...
অপেক্ষায় আছে কেউ
উঠে দেখি, নদীর স্রোতে অব্যবহৃত শত শত ভ্রুণ ভেসে যাচ্ছে
তুমি সেই, যে দিল সাঁতারের বেড়ি
উড়ে আসে পানডুবকি উত্তরীয়
তোমাকে চুম্বন, দাও মাধুকরি
নিমন্ত্রণ
তোমাকে ছুঁতে বা দেখতে যে স্মৃতি লাগে
তাই যেন ধূলা, যেন মরুভূমিবোধ
               যেন জ্যোৎস্নাময়ী সিঁথি পুণ্যের
               যেখানে আমার হুল্লোড় কান্না
মারাংবুরুর দেশে একটি পাহাড়
একটি কুঁড়েঘর আর শিমুলমাতা ঝর্ণা বামনি
অনন্ত চিলের ডাক শোনা যায়, তুলো ওড়ে
বামনি ঘিরে ছোটবড় পাথরের বেড়া
আমার সমষ্টিকরণে অভিশম্পাতহীন দীর্ঘশ্বাস

রাত্রি নামেনি দোতলা থেকে
বন্ধ জানলা ছিঁড়তে যে ব্যথা লাগে,
তা আধো সাঁতার না জানা যুবক টের পায়
‘উপেক্ষা’ আর ‘ফোন ব্লক’ যেন যমজ সন্তান
কাকে বেশি বাৎসল্য দেবো?
যদি গণিত না শেখো?
যে ঝুমুর গানে গাছ বাড়ে, তাকে প্রতিশ্রুতি দিও
তুমি ঋতুচক্রে ঘুমিয়ে পড়েছ
আমার তেষ্টার ঠোঁট ষোলোর পঞ্জিকার নিচে
শীত চায়...
অশৌচ
ঘোরের মধ্যে তোমাকেই দেখতে চেয়েছি
অঙ্গে মলিন পোশাক
নিয়েতিতে কান পেতে থাকি, অথচ শব্দরা প্রতারণা করে
সমস্ত ট্রাফিক সংকেত অগ্রাহ্য করে
ধ্বনিত হয় সড়ক দুর্ঘটনা
ওলোট পালোটের সময় আসছে
ঘোড়ায় চেপে আছেন মারাংবুরু ঠাকুর

এই পথে কোনো স্টেশনের নাম জানা নেই
জলের তেষ্টা পায়, নলকূপহীন প্রান্তর
বুকে বীজ পুঁতে রাখি আমলকি, তুলসীপাতা
অথচ নষ্ট জল প্রতিত্রাণ চায়
ছন্নছাড়ার ঠিকানা আছে বলে
মফস্বলে লুটায় কম্পাস

মানতের গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি
খেলার সাথি বন্ধুরা আত্মসম্মানবোধ খোঁজে
বলি, কোনো মৃত্যু সংবাদ নেই
আমি বেঁচে ফিরেছি বলে
কঠোর অশৌচ পালন
অঙ্কন - দেবাশীষ সাহা
শেয়ার করুন: