এক বিপ্লবীর জীবনকথা

একরাম আলি
বাস্তববাদী হও, অসম্ভবকে দাবি করো।– চে গেভারা

এক

একটা সময় ছিল, গত শতকের ছয়ের দশকের শুরুর দিকে, যখন পাড়ার লাইব্রেরিতে সবে যাওয়া-আসা করছি, ভূতের বা গোয়েন্দা গল্পের মতোই টান ছিল অগ্নিযুগের সব লোম-খাড়া-করা গল্পের বইগুলোর প্রতি। সেইসঙ্গে বিপ্লবীদের জীবনীও কম আকর্ষক ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়া এবং যোগ দিয়ে জেল-খাটা মানুষজনদের দেখা মিলত। তাঁদের চোখেমুখে, হাতেপায়ে, বুকের খাঁচায় বীরত্বের আর সাহসের চিহ্ন খোঁজার গোপন প্রবণতা ছিল এ-কারণে যে, দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষের থেকে তাঁদের তফাতটা কোথায়, খুঁজে পাওয়া দরকার। কেন তাঁরা দেশকে স্বাধীন করবার জন্যে প্রাণ বাজি রেখেছিলেন! আদর্শ জিনিসটা কী, পার্সে থাকে নাকি বাজারের থলেয়, ধারণা ছিল না।

এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল। তখন সদ্য ক্লাস সেভেনে। উনিশশো বাষট্টির জানুয়ারি মাসের শুরু। নতুন ক্লাস। নতুন বই, নতুন উত্তেজনা। হস্টেলে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়নি। ফলে অফুরন্ত খেলা আর খেলা।

একদিন রাস্তার ধারে—তখন সেটা ধুলো-ওড়ানো কাঁচা রাস্তা-- পাড়ার মাঠে ফুটবল পেটাচ্ছি কয়েকজন গেঁয়ো বালক, একটা লজঝড় জিপগাড়ি এসে দাঁড়াল। হাসি-হাসি মুখে নেমে এলেন এক মহিলা। ফর্সা, নিরাভরণ, তাঁতের সাদা শাড়ি, টানটান করে বাঁধা চুল। বয়স? এখন আন্দাজ হয়, চল্লিশের আশপাশে।

"দুধে-আলতা শরীরটি ফিনফিনে পাঞ্জাবি-ধুতিতে মোড়া।"

ততদিনে তাঁকে চিনে গেছি একটু-একটু। প্রতিভা মুখার্জি। এলাকার কেউ কেউ বলতে শুরু করেছে— দিদিমণি। পরে দিদিমণি নামেই তিনি বিখ্যাত হবেন। তখন লোকে আড়ালে বলে— বাঙাল মেয়ে। বিরক্তও সবাই। এত বড়ো সাহস মেয়েটার, বদিবাবুর সঙ্গে লড়তে এসেছে? সবার চেনা বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। কয়েক পুরুষের জমিদার। থাকেন কলকাতায়, বালিগঞ্জে না কোথায়। দুধে-আলতা শরীরটি ফিনফিনে পাঞ্জাবি-ধুতিতে মোড়া। হাতের আংটিতে হিরে। জোড়া-বলদের অবিসংবাদিত প্রাথী। তাঁর বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়ানোর হিম্মত হয় কী করে!

এ হেন অকুতোভয় দিদিমণি এগিয়ে এলেন আমাদের মতো ছোটোদের দিকে। এবং সবাইকে আদর করলেন ছুঁয়ে-ছুঁয়ে। দু-একটা কথা। নাম কী। কোন ক্লাস। ইলেকশন আসছে, আমরা জানি কিনা। তারপর অতি-দুর্লভ আমন্ত্রণ। আমরা কি সাঁওতালপাড়া যেতে চাই, ওই গাড়িতে চড়ে?

বলা মাত্র লাফিয়ে তিন-চারজন উঠে পড়ি পেছনের ডালা টপকে সেই ধুলোয় ঢাকা গাড়িতে। সেই লাফ যে কতটা, একটা লাফ যে কত দূরে পৌঁছে দেবে আমাদের, সে-মুহূর্তে ভাবা অসম্ভব ছিল। সে-লাফ যে ছিল মৃত জমিদার আর প্রবল হয়ে উঠতে থাকা জোতদারদের মিশেলে নব্য সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে ছোটো ছোটো লাফেরই খুদে সংস্করণ, তখন কি জানতাম?

গাড়িটা ছিল সত্যিই যাকে বলে ঝরঝরে। বহু পুরোনো। ক্যাম্বিস নয়, ফাটা ত্রিপলে ঢাকা। গাড়ির নানা অংশ থেকে নানারকম আওয়াজ বেরোচ্ছে। সেইসব আওয়াজ ছাপিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, সোবিয়েত ইউনিয়ন নামে কোনো দেশের কথা আমরা শুনেছি কিনা। সে-দেশটা যে রূপকথার দেশের মতো গড়ে উঠতে পেরেছে বহু মানুষের স্বপ্ন আর লড়াইয়ের জন্যে, লেনিন নামের একজনের নেতৃত্বে-- জানান তিনি। এও জানান, সেরকম ইচ্ছা থাকলে আর লড়াই করলে আমাদের দেশটাকেও রূপকথার দেশের মতো গড়ে তোলা যায়। এসইউসি সেই চেষ্টা করছে। খুদে মাথায় ঢোকে, ইনিই তাহলে বদিবাবুর বিরুদ্ধে লড়ছেন দেশটাকে পালটানোর জন্যে। এবং এঁর দলের নাম এসইউসি।

ছোটোরা তো বিশ্বাস করতেই চায়। বড়োদের কথায় সন্দেহ করে ঠিকই, কিন্তু তাদের নিজেদের একটা বিশ্বাসের জগৎ আছে। সেই জগৎকে বিশ্বাস করাকেই তারা বিশ্বাস করে। আর, নিজেদের জগৎটাকে বাড়িয়ে নিতে চেয়ে বড়োদের কথায় সন্দেহ করে-করে বিশ্বাসের পরিধি বাড়ায়।

গাড়ি ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে সাঁওতালপাড়ায়। অবাক হয়ে দেখি, যাদের বাড়িতে সটান ঢুকে যাচ্ছেন তিনি, কথা বলছেন বাড়ির লোকের মতো, নোংরা অপুষ্ট বাচ্চাদের কোলে নিচ্ছেন আর নাকের সিকনি পরিষ্কার করছেন ধপধপে শাড়ির আঁচল দিয়ে, তারা যে আমাদেরই কারো-না-কারো বাড়ির কৃষাণ বা মাহিন্দার। তারা অচ্ছুৎ।

এটা কি করা যায়! সেই ছোটোবেলাতেই কী ভাবে যেন বুঝে গেলাম-- পনেরো বছর হল দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই স্বাধীনতার অধিকারী যারা, যারা আশপাশের সমস্ত জমি পুকুর বাগানের মালিক, তাদের তো ক্ষুব্ধ হওয়ারই কথা। তাই তারা বলাবলি করে, এই বাঙাল মেয়েটা দেশের সর্বনাশ করবে। ছুটির ক-দিন ভিড়ে গেলাম সেই দিদিমণির দলে।

"চিনে ফেললাম লাল পতাকা।"

উনিশশো বাষট্টির তাঁর প্রথম নির্বাচনে দিদিমণি জিততে পারেননি। চরম খাদ্যসংকটে রাজ্য তখন ভুগছে। কংগ্রেসকে হারানোর জন্যে কয়েকটি বামদল মিলে গঠিত হয়েছে লেফট ফ্রন্ট। এসইউসি সেবার লেফট ফ্রন্টে যোগ দেয়নি। তাছাড়া বীরভূমের সর্বজনশ্রদ্ধেয় মিহিরলাল চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন সেবারের প্রার্থী। সবাই জানতেন, মিহিরবাবু হারবেন। তবু প্রচারে গেলে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ছোটদেরও চোখ এড়ায়নি। বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রতিভা মুখার্জি হেরেছিলেন ১১০৬৫ ভোটের ব্যবধানে। শুধু হারা নয়, তিনি হয়েছিলেন তৃতীয়।

সেই হারের মধ্যেই আমরা কিন্তু জেনে গেলাম ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নাম। বলশেভিক পার্টি, নভেম্বর বিপ্লবের মতো যুগান্তকারী দু-একটা শব্দ ঘুরতে লাগল বড়দের এড়িয়ে। চিনে ফেললাম লাল পতাকা। যেন গোপনে। যেন কেন, সত্যিই গোপনে।

বড়রা কেউ পছন্দ করতেন না এইসব সর্বনেশে চিন্তাভাবনা। তাঁদের চারপাশে জমিজিরেত। ব্যবসা-ট্যাবসা। বংশপরম্পরায় এসব টিকিয়ে রাখতে হবে।

দুই

আজ এতটা বয়সে অগ্নিযুগের এক বিপ্লবীর আত্মজীবনীতে তাঁর কৈশোরকালের কথা পড়তে গিয়ে বুঝলাম, ১৯১৩-১৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়বার মহড়া তাঁরা যেমন দিয়েছিলেন প্রাক-কৈশোরে, আমাদেরও প্রাক-কৈশোর ছিল কিছুটা তেমনই। ১৯৬০-৬২ সালে বিরুদ্ধপক্ষের রূপ পালটে গিয়েছিল শুধু। চরিত্র তেমন পালটায়নি।

বইটির নাম ‘দি অটোবায়োগ্রাফি অফ আ রেভোলিউশনারি ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’। লেখক কালী ঘোষ (কালীপদ ঘোষ)। প্রকাশক:সোশ্যাল সায়েন্স প্রেস।

আত্মজীবনী খুলে শুরুতেই চোখে না-পড়ে পারেনি যে, দুনিয়ার অধিকাংশ লেখক শুরু করেছেন বাবা-মায়ের কোনো-একটা প্রসঙ্গ নিয়ে। এশিয়ার প্রথম আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবুর’-এরও শুরু পরোক্ষ ভাবে বাবা উমর শেখ মির্জার মৃত্যু দিয়ে। যেহেতু ততদিনে বাবর বিশাল ভূখণ্ডের শাসক, আত্মজীবনীতে তাঁর শুরুর বাক্যটি এরকম— ‘৮৯৯ হিজরির (জুন ১৪৯৪) রমজান মাসে, বারো বছর বয়সে, আমি ফারঘানা রাজ্যের শাসক হই।‘ অর্থাৎ, তাঁর বাবার মৃত্যুর পর। এরপরই এসেছে উমর শেখ মির্জার কথা।

"ইট ইজ সেভেন ইয়ারস সিন্স আই কেম টু ইংল্যান্ড।"

বিপ্লবী কালী ঘোষের আত্মজীবনী শুরু হচ্ছে বাবা-মায়ের স্মৃতিচারণায়। তখন তিনি তিন কি চার বছরের শিশু। স্মৃতির শুরু খুলনা শহরে এবং এইভাবে-- ‘মাই ফাদার হ্যাড নিয়ারলি ফিনিশড ড্রেসিং ফর দি সিটিং অফ দি ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট, অ্যান্ড মাই মাদার ওয়াজ হেলপিং টু বাটন হিস কোট। হি টুক আপ হিজ হ্যাট অ্যান্ড পুটিং হিজ আর্ম রাউন্ড হার, ট্রায়েড টু কিস হার। বাট শি রেসিস্টেড হিম, ওনলি হাফ প্লেফুলি, টু পয়েন্ট আউট মাই প্রেজেন্স।‘ বইটিতে লেখকের দূরতম স্মৃতি এটাই।

কালী ঘোষের জন্ম খুলনায়। নির্দিষ্ট তারিখ জানা যায় না। তবে, ১৯০০ থেকে ১৯০২ সালের কোনো-এক সময়। মৃত্যু দিল্লিতে, জানুয়ারি ১৯৭৮-এ; যদিও এ-বইয়ের জীবনীপঞ্জিতে প্রয়াণ স্থান লেখা আছে লন্ডন।

কিন্তু আত্মজীবনীটি লিখেছেন কখন? ভূমিকায় গুন্নেল সিয়েডারলফ জানাচ্ছেন, ইংল্যান্ডে যাওয়ার আট বছর পর তিনি লেখা শেষ করেন।

তবে এই তথ্যটি নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। গুন্নেল জানাচ্ছেন, কালী ঘোষ ইংল্যান্ডে যান ১৯৩১-এ, স্বদেশে দু-বছর জেল খাটার পর। কিন্তু আত্মজীবনী থেকে আমরা অন্য তথ্য জানতে পারি। এক, কালী ঘোষ জেলে ছিলেন এক বছর এবং ১৯৩১-এর মাঝাম্যাঝি তাঁকে ইংল্যান্ডে চালান করা হয়। দুই, ১৯৩৫ সাল। ইওরোপের তখন চরম দুঃসময়। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের অনটন, সন্দেহ, চাপানঊতোর, নতুন করে যুদ্ধসজ্জার ভারী হাওয়া বইছে। এমন সময়ে এক সুইডিশ মহিলা পাওলা উইকিংয়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ। পাওলা ছিলেন সোশ্যালিস্ট। মনের মিল হতে দেরি হয়নি। ফলে প্রেম এবং বিয়ে।

বলতে গেলে, ইংল্যান্ডের অধ্যায়টি বেশ ছোটই। মাত্র সাড়ে সাত পৃষ্ঠার। দুটো কারণে ইংল্যান্ডবাসের শুরুর বাক্যটি আমাদের কাছে জরুরি—‘ইট ইজ সেভেন ইয়ারস সিন্স আই কেম টু ইংল্যান্ড।‘

ইংল্যান্ডে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল নির্বাসনে। এবং সাত বছরের জন্যে। সাত বছর পর তিনি ফিরে আসতে পারবেন নিজের দেশে। তাই এই সাত বছরের উল্লেখ। এই বাক্যটির মধ্যে বন্দিত্বের কালো দাগ লেগে আছে যেমন, তেমনই আছে মুক্তির হাওয়া।

দ্বিতীয় ব্যাপার হচ্ছে, যে-বাক্যটিতে সময়ের উল্লেখ তিনি করেছেন, সেই বাক্যটির পর লিখেছেন মাত্র সাড়ে সাত পৃষ্ঠা। বেশি সময় লাগবার কথা নয়। আমরা ধরে নিতে পারি, বইটির কাজ তিনি শেষ করতে পেরেছিলেন ১৯৩৮ সালের মধ্যেই। শুরু করেছিলেন সম্ভবত ১৯৩৫ সালের পরে, কোনো-এক সময়ে।

দেশে ফেরা তাঁর হয়নি। সংসার পেতে ফেলেছিলেন। শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতার জীবন। কিন্তু পেশায় নিজের আদর্শ বজায় রাখার জন্যে যে-খ্যাতিটুকু তিনি পেয়েছিলেন, সেই খ্যাতিতে অর্থের প্রাচুর্য আসে না। ইংল্যান্ডেও না।

সে যা-ই হোক, কিন্তু ১৯৩৮ সালে লেখা শেষ হল যে-বইয়ের, সে-বইটি জনসমক্ষে আসতে কেন লেগে গেল পঞ্চান্ন বছর? এ এক রহস্যই বলতে হবে। আমরা দেখছি, বইটির প্রকাশকাল ২০১৩ সাল। অথচ তখনই, বা তার কিছু পরে, বইটির একটি ছোট্ট হলেও দরকারি ভূমিকা কালী ঘোষ লিখে রেখেছিলেন। এমনকী, উৎসর্গপত্রটিও যত্নে লেখা: টু মাই ওয়াইফ, হু ওয়ান্টেড মি টু রাইট দিস বুক, হু হ্যাজ সাফার্ড উইথ মি অল দি পেইনস অফ অথরশিপ।

শুধু তা-ই নয়, এর মাঝে তাঁর জীবদ্দশায়, ১৯৭২-এ, ‘দ্য ইন্ডিয়ান ওয়ে’ নামে একটি বইও বেরিয়ে গেছে আর্নল্ড-হেইনম্যান ইন্ডিয়া থেকে, যার প্রচ্ছদে মার্ক্স, গান্ধী, নেহরুর রেখাঙ্কন। লেখক কে পি ঘোষ, যে-নামে তিনি লিখতেন।

অথচ আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি চলে যায় ক্যারোলিনায়, উপসালা ইউনিভার্সিটিতে! কালী ঘোষ কই চাননি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে? এ-প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া আজ অসম্ভব।

তিন

আত্মজীবনীটিকে তিনি চার পর্বে ভাগ করেছেন-- ইন দ্য ভিলেজ, ইন দ্য সিটি, ইন ক্যাপটিভিটি এবং ইন ইংল্যান্ড। প্রতিটি পর্ব আবার কয়েকটি করে অধ্যায়ে বিভক্ত। যেমন প্রথম পর্বটি শুরু হচ্ছে ‘মাই পেরেন্টস’ নামে। তারপর ‘মাই আর্লি লাইফ’। এই দুই পর্বে নিখাদ পারিবারিক জীবনের বর্ণনা, যা আমাদের অনেকটা চেনা, কিন্তু গত শতকের তিনের দশকে লন্ডনে বসে লেখার কারণে একটু আলাদা। কোথাও কোথাও যেন বাংলার গ্রামজীবন তাঁকে বোঝাতে হচ্ছে ইওরোপের মানুষকে।

"যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি, কংগ্রেস, গান্ধী, অসহযোগ আন্দোলন, বেঙ্গল ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্ট পার্টি, সুভাষচন্দ্র বসু, ভূপেন্দ্রকুমার দত্ত"

পাঁচ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ। শুরু হয় শৈশবকালীন পারিবারিক সব ছোট-ছোট কথা। খুলনা শহর ছেড়ে সেনহাটি গ্রামে মামাবাড়ির গ্রামীণ জীবন। দাদু, সন্তান-সহ বিধবা মাসি, মামাদের মাঝে বিধবা মায়ের ব্যস্ত এবং পরজীবী হয়ে সন্তানপালন।

ছোট্ট ভূমিকায় তিনি দাবি করেছিলেন, এটি ‘পোলিটিক্যাল অটোবায়োগ্রাফি’। তাঁর কথাকে সত্যতা দিতেই যেন তৃতীয় অধ্যায়ে, মাত্র তেরো বছর বয়সেই, কালী ঘোষের জীবনে ঢুকে পড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ সাল। ব্রিটেন বনাম জার্মানির যুদ্ধ তখন খুলনাতেও কিশোরদের খেলায় ঢুকে পড়েছে, যে-খেলায় সবাই চাইছে— ইংরেজরা হেরে ভূত হয়ে যাক। অন্তত কালী ঘোষের আর তাঁর বন্ধু যদুর। দেশের ভিতরে তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার। তার আঁচ লাগছে খুলনার দুই গ্রামের বালকের গায়ে।

এইভাবে বিপ্লব-বিপ্লব খেলতে খেলতে, নিজেদের দল বাড়াতে গিয়ে একদিন সত্যিকারের এক বিপ্লবীর মুখোমুখি হয়ে গেল ওই দুই কিশোর। ‘আ ভেরি গ্রোন-আপ ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট উইদ আ ফুল-ফ্লেজড মোস্টাচ’। ব্যস, সেই শুরু। তিনি লিখছেন, ‘আওয়ার পোলিটিক্যাল ইনফ্যান্সি ওয়াজ অ্যাট অ্যান এন্ড অ্যান্ড উই ওয়ের প্রাউড অ্যান্ড এক্সাইটেড টু নো দ্যাট হিয়ার বিগ্যান আওয়ার মেমবারশিপ ইন আ ফুল-ফ্লেজড, অ্যাডাল্ট পোলিটিক্যাল অর্গানাইজেশন।‘

এইভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘূর্ণিস্রোতে কালী ঘোষের ঝাঁপিয়ে পড়া। যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি, কংগ্রেস, গান্ধী, অসহযোগ আন্দোলন, বেঙ্গল ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্ট পার্টি, সুভাষচন্দ্র বসু, ভূপেন্দ্রকুমার দত্ত, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার, স্বাধীনতা পত্রিকা— তাঁর আত্মজীবনীর অনেকগুলো পাতা এ-সবের বিবরণে ঠাসা।

গত শতকের কুড়ির দশকের শেষ পর্যন্ত বাংলার রাজনীতির একটা আঁচ পাওয়া যায় এ-বই থেকে। কিন্তু এ-সব কথা কমবেশী আমাদের জানা। ঝকঝকে ইংরেজিতে লেখা বলে পড়তে ভালো লাগে, এই যা। তাহলে এ-বই পড়ব কেন?

বেশ কয়েকটি কারণে।

এক. অগ্নিযুগের এক বিপ্লবীর শিশুমনের পরিচয় এখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে, যেটি আমাদের বিপ্লবীদের লেখায় কদাচিৎ পাওয়া যায়। শুধু সেটুকুই নয়, নিজের শৈশবজীবন এবং সেখান থেকে খেলতে-খেলতে বিপ্লবী হয়ে ওঠার চমৎকার বিবরণ অত্যন্ত সুলেখকের মতো লিখেছেন কালী ঘোষ। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতি-পরিবেশ যদিও, তবু কৈশোরে পড়া নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির ‘ইস্পাত’ বইটির কথা, কিশোর পাভেল করগাচিনের কথা, মনে না-পড়ে উপায় ছিল না। এমনকী শুরুতেই যে নিজের ছোটোবেলার কথা লিখেছি, সেও কালী ঘোষের ওই প্রথম দুটি অধ্যায় পড়ে।

দুই. ১৯২৯-এর ৩১ জুলাই সন্ধ্যেয় এক গোপন মিটিঙে যাওয়ার পথে বড়বাজারের এক গলি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিস। নিয়ে যায় থানায়। তারপর স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের হেড কোয়ার্টারে। ‘ইন ক্যাপটিভিটি’ পর্বে এর বিবরণ আছে। এ-পর্বের তিনটি অধ্যায়েই ঠাসা রয়েছে সেরা থ্রিলারের উত্তেজনা। এত পরিমিত শব্দে, ছোটো-ছোটো বাক্যে ‘পুলিস হসপিট্যালিটি’ অধ্যায়টি লেখা হয়েছে, এত অন্ধকারে আচ্ছাদিত তার ভাষা যে গোটা পরিবেশ আর ঘটনার নিষ্ঠুরতা আলাদা করে প্রকাশ করবার দরকার হয়নি। অধ্যায়টি শুরু হচ্ছে এভাবে—‘দি হেভি আয়রন গেট অফ দি স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চ বিল্ডিং ওপেনড টু অ্যাডমিট দি কার ইন হুইচ আই ওয়াজ বিইং ব্রট, অ্যান্ড দেন ক্লোজড এগেইন বিহাইন্ড আস।’

দু-দিন পুলিসি অত্যাচারের পর তিনি লিখছেন, ‘ইন দ্য মর্নিং আই ওয়াজ এগেইন ট্রান্সফার্ড টু দ্য ব্যাক রুম বাই দ্য গার্ডেন, দো আই কুড নট সি দ্য গার্ডেন, অ্যাজ দে স্যাট মি ফেসিং এ ব্ল্যাংক হোয়াইটওয়াশড ওয়াল।‘

টানা কয়েকদিন ভয়ংকর অত্যাচারের পর একটা কালো গাড়িতে হাওড়া জেলে নিয়ে যাওয়ার পথে পড়ে হাওড়া ব্রিজ এবং গঙ্গা। সেই যাত্রার বর্ণনাটি এরকম— ‘পাসিং ওভার দ্য এভার-ক্রাঊডেড হাওড়া ব্রিজ। আই সাউট ফর আ গ্লিম্পস অফ দ্য মাডি ওয়াটার অফ দি গ্যাঞ্জেস। পারহ্যাপস ফর ইয়ারস আই উড নট সেট আইজ অন আ রিভার এগেইন, লেট অ্যালোন বাথ অর সুইম ইন ওয়ান।’ অধ্যায়টির নাম ‘আ ইয়ার ইন প্রিজন’।

তিন, চালান শব্দটির আগে দ্বীপ শব্দটি স্বাভাবিক ভাবেই আসে। বাঙালির কাছে যেটি আন্দামান। কালী ঘোষের ক্ষেত্রে সাত বছরের দ্বীপচালান হয় ইংল্যান্ডে। এবং যেদিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেদিনই তাঁকে তোলা হয় বোম্বে মেলে, সঙ্গে কোনো-এক সরকার পদবিধারী পুলিস অফিসার। লম্বা ট্রেনযাত্রা এবং মুম্বইয়ে দেড় দিনের অভিজ্ঞতাও কম নয়। এই সরকার তাঁকে একেবারে জাহাজে তুলে তারপর কলকাতা ফেরেন।

সব মিলিয়ে এক বিপ্লবীর ভিন্নধারার জীবনকাহিনি আমরা পেয়ে যাচ্ছি এমন একটি বইয়ে, যে-বইটি লেখক লিখেছিলেন তাঁর সুইডিশ স্ত্রীকে জানানোর জন্যে যে কেন এবং কোন দেশ-সমাজ-পরিবেশ থেকে তিনি লন্ডনে এসে পৌঁছেছেন।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু সরকার
শেয়ার করুন: