বাংলা সাময়িক পত্রের দুশো বছর

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা
দেখতে দেখতে দুশো বছর হয়ে গেল!

এক

দেখতে দেখতে দুশো বছর হয়ে গেল!

সমাজ ও সভ্যতার অন্যতম স্তম্ভ সাময়িক পত্র। শুধু দেশ-বিদেশের খবর সংগ্রহ নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে সাময়িক পত্রকে কেন্দ্র করে। সভ্যতার অগ্রগতি ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে সাময়িক পত্রিকা। আমাদের প্রাত্যহিকতায় একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু সাময়িক পত্র তথা সংবাদ পত্র। সাময়িক পত্রিকা ছাড়া আজ আর আমরা ভাবতেই পারি না। বছরের মাত্র বিশেষ বিশেষ তিন-চারটি দিনে খবরের কাগজ বন্ধ থাকে, সে দিনগুলি যেন কাটতেই চায় না। অসম্পূর্ণ মনে হয়। এখন টিভি এসে গেছে। সেও তো ব্যাপক অর্থে সাময়িক পত্রেরই অন্য এক রূপ। অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদির যুগেও মুদ্রিত খবরের কাগজ ম্লান হয়ে যায়নি। এতটুকুও কমেনি তার গুরুত্ব।

এই অমোঘ ও অনিবার্য বস্তুটির অস্তিত্ব স্বাভাবিক ভাবেই একসময় ছিল না— এ কথা এখন ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রকাশিত হওয়ার জন্য বলা হয় সাময়িক পত্রিকা। বাৎসরিক, ষাণ্মাসিক, ত্রৈমাসিক, মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক, বারত্রয়িক, দৈনিক নানা রকম হতে পারে সাময়িক পত্রের প্রকাশ। তবে সংবাদ-নির্ভর সাময়িক পত্রিকাগুলির অধিকাংশই দৈনিক। সাময়িক পত্রের জন্মলগ্নে এ রকমটা ছিল না। বাংলায় তো নয়ই, বিদেশেও না।

"হিকি সাহেব সম্পাদিত এই পত্রিকাটির নাম ‘বেঙ্গল গেজেট’"

আমাদের দেশে সাময়িক পত্রের উদ্ভব হয় আঠারো শতকের শেষ দিকে। কিন্তু পাশ্চাত্যে তার বহু আগে থেকেই সাময়িক পত্র প্রকাশিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর প্রাচীনতম সাময়িক পত্রিকাগুলির মধ্যে অন্যতম ‘Erbauliche Monaths Unterredungen’ (Edifying Monthly Discussions)। এই জার্মান প্রকাশনীর কাগজটির প্রকাশকাল ১৬৬৩ থেকে ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সাময়িক পত্রিকাগুলির মধ্যে অন্যতম ‘The Gentleman’s Magazine’। এটিই ইংল্যান্ডের প্রথম সাময়িক পত্র। জনপ্রিয় এই পত্রিকাটি প্রায় দু-শো বছর (১৭৩১-১৯০৭) ধরে প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন Edward Cave।

সাময়িক পত্রিকাগুলির উৎস নিহিত আছে প্যামফ্লিট-প্রচার পুস্তিকা ইত্যাদির মধ্যে। আমাদের দেশের প্রথম মুদ্রিত পত্রিকাটি কোনও ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত হয়নি। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারি ভারতবর্ষের প্রথম সাময়িক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ইংরেজিতে। হিকি সাহেব সম্পাদিত এই পত্রিকাটির নাম ‘বেঙ্গল গেজেট’

বাংলা ভাষায় সাময়িক পত্রিকার প্রকাশ ঘটে আরও কয়েক দশক পরে। আজ থেকে ঠিক দুশো বছর আগে। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন থেকে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষায় প্রথম মুদ্রিত সাময়িক পত্র ‘দিগদর্শন’। ষোলো পৃষ্ঠার এই মাসিক পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন জোশুয়া মার্শম্যানের পুত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যান। স্কুলের পাঠ্য হিসেবে এই পত্রিকার বিভিন্ন সংস্করণ গৃহীত হয়েছিল। স্কুলবুক-সোসাইটি পত্রিকাটির বহু সংখ্যা কিনে ছিল পাঠ্য করবার জন্য। দ্বিভাষিক ছিল পত্রিকাটি। প্রথম সংখ্যার প্রথম লেখাটির নাম ছিল ‘আমেরিকার দর্শন বিষয়’। এই লেখাটির কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি—

“পৃথিবী চারি ভাগে বিভক্ত আছে ইউরোপ ও আসিয়া ও আফ্রিকা ও আমেরিকা। ইউরোপ ও আসিয়া ও আফ্রিকা এই তিন ভাগ এক মহাদ্বীপে আছে ইহারা কোন সমুদ্রদ্বারা বিভক্ত নয় কিন্তু আমেরিকা পৃথক্‌ এক দ্বীপে প্রথম দ্বীপহইতে সে দুই হাজার ক্রোশ অন্তর। অনুমান হয় তিন শত ছাব্বিশ বৎসর হইল আট শত আটানব্বই শালে আমেরিকা প্রথম জানা গেল তাহার পূব্বে আমেরিকা কোন লোককর্তৃক জানা ছিল না এই নিমিত্তে তাহার প্রথম দর্শনের বিবরণ লিখি— ...”

প্রথম সংখ্যার পূর্ণ সূচিটি এরকম— ‘আমেরিকার দর্শন বিষয়’, ‘হিন্দুস্থান সীমার বিবরণ’, ‘হিন্দুস্থানের বাণিজ্য’, ‘বলূনদ্বারা সাদ্‌লর সাহেবের আকাশগমণ’, ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ররায়ের বিবরণ’ এবং ‘শঙ্কর তরঙ্গের কথা’। বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে পত্রিকাটির ঐতিহাসিক ভূমিকা স্বীকার করতেই হবে।

"নানা বিষয়ে ঈশ্বর গুপ্ত অজস্র কবিতা লিখেছিলেন।"

উল্লেখ করা যেতে পারে একই জায়গা থেকে প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সমাচার দর্পণ’ (২৩ শে মে, ১৮১৮)। প্রতি শনিবার প্রকাশিত হত এটি। এটিই বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র। সাহিত্যের সঙ্গে পত্রিকাটির প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকলেও বাঙালি পণ্ডিতদের দ্বারা রচিত কোনও কোনও সংবাদে সাহিত্য-বোধের পরিচয় পাওয়া যায়। নবপর্যায়ের ‘সমাচার দর্পণ’-র সম্পাদকীয় বিবৃতির কিছু অংশ—“সমাচার দর্পণের নমস্কার। পাঠক মহাশয়েরদের সমীপে প্রাচীন দর্পণের নামে ও আকার প্রকারে উপস্থিত হওয়াতে ভরসা করি অনেক পাঠক মহাশয় আমারদিগকে বহুকালীন বৃদ্ধ বন্ধুস্বরূপ দর্শন করিয়া গ্রহণ করিবেন। যখন ১৮৪১ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর তারিখে দর্পণের অদর্শন হইল তখন পুনরুদয় হওনের প্রত্যাশা ছিল না পরন্তু দেখুন, পুনরুত্থিত হইলাম। এই দর্পণের নাম ও বেশ বৃদ্ধ প্রবীণের, সাহস ও শক্তি নবীনের...।” সরস ও সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ গদ্য ‘সমাচার দর্পণ’-এর পাতায় পাতায় ছড়ানো ছিল।

বাংলা ভাষার প্রথম সাময়িকপত্র এবং প্রথম সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল একদিন সাহেবদের হাত ধরে। দুশো বছরে স্তম্ভিত করবার মতো তার বৈভব বিস্তৃতি এবং পরিণতি। বাংলার সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতিতে একদিন যে নবজাগরণ ঘটেছিল তারও ধারক বাহক ছিল সাময়িক পত্রগুলি। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে পত্রিকার সূত্রপাত না হলে হয়তো বাংলায় রেনেসাঁ আসতে কিছুটা দেরি হতো। বা তা এত সহজে বিস্তৃত হতে পারত না।

শ্রীরামপুর মিশন থেকে পত্রিকা প্রকাশের কিছু দিনের মধ্যেই একে একে অনেকগুলি বাংলা সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এর পরের গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘সংবাদ প্রভাকর’। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় পত্রিকাটির প্রকাশ ঘটে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারি। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সাহিত্য পত্রিকারূপেও চিহ্নিত করা যায় একে। সংবাদপত্র রূপে ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর প্রকাশ ঘটলেও অচিরেই এতে প্রকাশিত হতে থাকে সাহিত্য। সম্পাদক নিজেই তাঁর কবিতা নিয়ে হাজির হলেন প্রভাকরের পাতায়। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শাণিত প্রয়োগ, নতুন নতুন শব্দের ব্যবহার করে বাংলা কবিতার প্রচলিত চেহারাটাই বদলে দিলেন তিনি। মধ্য উনিশ শতকের বাঙালির জীবনযাপন, তার সামাজিক-রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত তাঁর কবিতার ভাঁজে ভাঁজে। অসীম সাহসী এই কবি কাউকেই ভয় করতেন না। সমকালীন বাবুরা, সাহেবরা, ভণ্ড ব্রাহ্মণ, অসৎ রাজনীতিক, ভণ্ড ধর্মবেত্তা সবাই ছিল তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য। সম্পাদকের এই যে সাহসিকতা, প্রতিবাদী মেজাজের প্রকাশ ঘটল ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ। হিকি সাহেবের কাগজটিও প্রতিবাদী ছিল—সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা এখানে বাংলা সাময়িক পত্রে, বাংলা কবিতায়, বাংলা সাহিত্যে প্রতিবাদ মূর্ত হওয়ার প্রসঙ্গে এই কথাটি বলতে চাইছি।

নানা বিষয়ে ঈশ্বর গুপ্ত অজস্র কবিতা লিখেছিলেন। ১২৯২ বঙ্গাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের যে কবিতা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়, তার প্রতিটি কবিতাই সংগৃহীত হয়েছিল ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর বিভিন্ন সংখ্যা থেকে। নীলকরদের নিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র অনেকগুলি কবিতা লিখেছিলেন তাঁর পত্রিকায়। এরকমই একটি কবিতার কিছু অংশ—

অন্তরা।
না বুনলে নীল, মেরে কিল,
“কিল্‌” করে, নীলকরে!
দেশের ছোটকর্তা, দিলেন্‌ তাদের,
হর্তা কর্তা কোরে।
জোরে বেঁধে আনে ধোরে।।

             চিতেন।
যমন কাজীরে সুধালে পরে, হিঁদুর পরব নাই,
তেমনি সব নীলকরের আচার্‌, বিষম বিচার,
গোস্বামী ভক্ষণের গোঁসাই।
একেতো মাগ্‌গি গণ্ডা, লুটেল তায় কুটেল ষণ্ডা,
তারাতে ঠাণ্ডা কেহ নয়।
লুঠে এণ্ডা বাচ্ছা লয়।
গিয়েছে পুঁজিপাটা, ভিটেতে শ্যাকল কাঁটা,
আমার ধন গিয়েছে, মান গিয়েছে,
এখন্‌ মা, প্রাণ নিয়ে সংশয়।
গেল গরু জরু, তৃণ তরু, কিছু নাহি আর।
কোরে হাকিম হয়ে সাকিম নষ্ট,
সম্মান কষ্ট বারমাস।

কবিতাটিতে উদগ্র হয়ে আছে নীলকর সাহেবদের প্রতি প্রবল প্রতিবাদ। এই ধরনের প্রতিবাদী কবিতা ‘সংবাদ প্রভাকর’-র আগে অন্য কোনও বাংলা সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করবার সাহস দেখাতে পারেনি।

শুধু কবিতা নয়, আরও নানা রকম নতুন বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর পত্রিকার পাতায়। ১২৬০ বঙ্গাব্দের ১ তারিখ (১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দ) থেকে তিনি ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর একটি মাসিক সংস্করণ প্রকাশ করতে শুরু করেন। এটি সর্বাংশেই সাহিত্যপত্র। এই মাসিক সংকলনে কবি

তা ছাড়াও গদ্য-আলোচনা ছাপা হতো। প্রাচীন কবিদের লুপ্তপ্রায় কবিতা গান পদ ইত্যাদি সযত্নে প্রকাশ করতেন সম্পাদক। কবিদের জীবনী সংগ্রহ করে প্রকাশ করতে উৎসাহী ছিলেন। বহু পরিশ্রমে এগুলি সংগ্রহ করতে হয়েছিল তাঁকে।
"বাঙ্গালা সাহিত্য এই প্রভাকরের নিকট বিশেষ ঋণী।"

এ ছাড়া কিছু অনুবাদ সাহিত্যও প্রকাশিত হয়েছিল ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ। ক্যাম্পবেল, পোপ প্রমুখের কবিতা, শ্রীমদ্ভাগবতের অনুবাদও কিছুটা ছাপা হয়েছিল। সাহিত্য সমালোচনাও প্রকাশিত হত। সব অর্থেই ‘সংবাদ প্রভাকর’ বাংলা সাহিত্য পত্রের সূচনা করেছিল। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেও একটি লেখকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের তিনটি ধারার তিন বিশিষ্ট লেখকের প্রথম লেখা ছাপা হয় ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর পাতায়। এই তিন জন অতি বিশিষ্ট লেখকেরা হলেন— কাব্যে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, গদ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং নাটকে দীনবন্ধু মিত্র। এ ছাড়াও রাজা রাধাকান্ত দেব, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রামকমল সেন প্রমুখেরাও ছিলেন এই লেখক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বঙ্কিমচন্দ্র এর মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন—

বাঙ্গালা সাহিত্য এই প্রভাকরের নিকট বিশেষ ঋণী। মহাজন মরিয়া গেলে খাতক আর বড় তার নাম করে না। ঈশ্বর গুপ্ত গিয়াছেন, আমরা আর সে ঋণের কথা বড় একটা মুখে আনি না। কিন্তু একদিন প্রভাকর বাঙ্গালা সাহিত্যের হর্ত্তা কর্ত্তা বিধাতা ছিলেন। প্রভাকর বাঙ্গালা রচনার রীতিও অনেক পরিবর্ত্তন করিয়া যান। ভারতচন্দ্রী ধরণটা তাঁহার অনেক ছিল বটে— অনেক স্থলে তিনি ভারতচন্দ্রের অনুগামী মাত্র, কিন্তু আর একটা ধরণ ছিল, যা কখন বাঙ্গালা ভাষায় ছিল না, যাহা পাইয়া আজ বাঙ্গালার ভাষা তেজস্বিনী হইয়াছে। নিত্য নৈমিত্তিকের ব্যাপার, রাজকীয় ঘটনা, সামাজিক ঘটনা, এ সকল যে রসময়ী রচনার বিষয় হতে পারে, ইহা প্রভাকরই প্রথম দেখায়। আজ শিখের যুদ্ধ, কাল পৌষপার্ব্বণ, আজ মিশনারী, কাল উমেদারি, এ সকল যে সাহিত্যের অধীন, সাহিত্যের সামগ্রী, তাহা প্রভাকরই দেখাইয়াছিলেন।

‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রকাশিত হবার পরে পরে অজস্র পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। শুধু সংবাদ নয়, সাময়িকপত্র যে কোনও বিষয়ের হতে পারে। ধ্রুপদী সাহিত্য, সাহিত্য, কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, শিল্পকলা, অনুবাদ, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, দর্শন, সমালোচনা, কৃষি, বাণিজ্য...আরও আরও কত বিষয়-নির্ভর পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এখনও হচ্ছে। তার আলোচনা এখানে বাহুল্য হবে।

দুই

কয়েক দশকে সাময়িক পত্রের চেহারা আমূল বদলে গেছে। মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নতিও বিপ্লব ঘটিয়েছে। ইলেক্‌ট্রনিক্স মিডিয়ার প্রসার প্রিন্ট মিডিয়াকে প্রভাবিত করছে। নিউজ চ্যানেলের মতো খবরের কাগজ আম-জনতার উপরে প্রভাব ফেলতে পারে না। কাগজ পড়ার জন্য প্রাথমিক ভাবে শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। কোনও রকমে নাম-সই করতে পারা সাক্ষর হলে হবে না; পড়াশোনার অভ্যেস থাকা দরকার। ফলে সাময়িকপত্রের দ্বারা ব্যাপক ভাবে মানুষকে প্রভাবিত করা যায় না। ইলেক্‌ট্রনিক্স মিডিয়ার ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই। সাক্ষর-নিরক্ষর নির্বিশেষে সকলেই তার দর্শক। লেখাপড়া মানুষের চেতনাকে সমৃদ্ধ করে। কম শিক্ষিত মানুষের উপর নিউজ চ্যানেলের প্রভাব খবরের কাগজের তুলনায় অনেক বেশি। প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও এখন পৌঁছে গেছে কেব্‌ল-ডিস্‌ টিভি। যে গ্রামে পাঁচ জনের বেশি নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন না, সে গ্রামে পাঁচশো জন নিয়মিত টিভি দেখেন। টিভি-তে এক সময় অপেক্ষা করতে হতো খবর শোনার জন্য। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে খবর প্রচারিত হতো। এখন কত কত নিউজ চ্যানেল। আর অপেক্ষা নয়। সারাক্ষণ টাটকা খবরের পসরা নিয়ে হাজির। নিউজ এবং ভিউজ— সবই টাটকা। খবরের কাগজের বাসি খবরের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে।

"তবু মানুষ খবরের কাগজ পড়েন।"

বিশ্বাসযোগ্যতার প্রধান চিহ্ন সাময়িক পত্রিকা। কয়েক দশক আগেও কাগজে প্রকাশিত কোনও বিষয়কে অভ্রান্ত মনে করা হতো। এখনও আমরা কথায় কথায় প্রমাণ দেওয়ার ছলে প্রায়শই বলি, কাগজে বেরিয়েছে...অমুক খাওয়া যাবে না...অমুক করলে ক্যানসার হবে... ইত্যাদি ইত্যাদি। পত্রিকায় ছাপা মানেই তা প্রশ্নহীন। সত্যতা যাচাইয়ের প্রামাণ্য মাপকাঠি ছিল সাময়িকপত্রের ছাপা খবর। নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ছিল তার। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষদের প্রশ্ন করত সাময়িকপত্র। নেতা-মন্ত্রীরা ভয় পেতেন পত্রপত্রিকাকে। তবে ধীরে ধীরে সাময়িকপত্রের এই পরিসর কমছে। মানুষের বিশ্বাস-ভরসা হারাচ্ছে পত্রিকাগুলি। এটা ভালো লক্ষণ নয়।

তবু মানুষ খবরের কাগজ পড়েন। খবরের জন্য যতটা, তার থেকে বেশি খবর সংক্রান্ত আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত জানার জন্য। ইদানীং দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দলের প্রতি সাময়িকপত্রগুলির বিশেষ আনুগত্য। রাজনৈতিক দল যেমন মিডিয়াকে ব্যবহার করে। তেমনি মিডিয়াও ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলকে।

সাময়িকপত্র মানুষের রুচি নির্ধারণ করে। আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যেসকে বদলে দেয়। আজন্ম লালিত বহু শব্দের উচ্চারণ, বানান সাময়িকপত্রের প্রভাবে বদলে ফেলি আমরা। সাময়িকপত্রের কল্যাণেই শচীন হয়ে গেল সচিন, বাইচুং থেকে ভাইচুং...। আর এখন যাকে ডেঙ্গি বলি, দু’বছর আগেও তো তাকে ডেঙ্গু বলেই জানতাম। তবে এটা ভাবার কারণ নেই যে, মিডিয়া যা খাওয়াবে মানুষ সব সময় তা খাবে।

তা সত্ত্বেও মানুষের সকল বিশ্বাস, আস্থা সাময়িকপত্রের উপর। তথা মিডিয়ার উপর। কারণ এখনও সাময়িকপত্রের পাঠক তাঁরাই, যাঁরা শিক্ষিত, বিবেচক, সুস্থ চিন্তার অধিকারী।

বর্তমানে সমাজ-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক সাময়িক পত্রিকাগুলি। যত দিন যাচ্ছে মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে তার উপর। সময়ের চিহ্ন ধরে আছে সাময়িকপত্র। আধুনিক মানুষের অগ্রগতি— সমাজ-সভ্যতার ইতিহাস প্রকৃত প্রস্তাবে সাময়িকপত্রের ইতিহাস। বর্তমানে সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ সাময়িকপত্র সভ্যতার দলিল।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু সরকার

তথ্যসূত্র ও টীকা

১। ‘Merriam Webster’s Encyclopedia of Literature’, Springfieid, Massachesetts, 1995, পৃ-৭১২

২। ঐ, পৃ-৪৫৫

৩। এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি বেশিদিন চলেনি। বছর দুয়েকের মধ্যে পত্রিকাটির প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের স্ত্রী এবং আরও কয়েক জন পদস্থ সাহেবের বিরুদ্ধে মানহানিকর কিছু লেখা প্রকাশ করেছিলেন স্পষ্টবক্তা হিকি। এই সাহসিকতা সহ্য করেনি কোম্পানির গভর্নমেন্ট। ফলে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

৪। ‘বাংলা সাময়িক পত্র’, প্রথম খণ্ড, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, ১৩৭৯, পৃ-১০

৫। এর আগে কোনও বাংলা সাময়িকপত্রে কবিতা প্রকাশিত হয়নি, তা নয়। ‘সমাচার দর্পণ’-এ বেশ কিছু দিন (৪ জুলাই ১৮১৮-২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮২৬) একটি শ্লোক লেখা থাকত। শ্লোকটি—

দর্পণে মুখ সৌন্দর্য্যমিব কার্য্যবিচক্ষণাঃ।

বৃত্তান্তানিহ জানন্তু সমাচারস্য দর্পণে।।

আবার ১৮২৯-এর ১০-ই মে নীলরত্ন হালদার প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বঙ্গদূত’-এর উপরে একটা কবিতা ছাপা থাকত—

সংগোপনেল্পবিবৃতিং প্রবন্তি দূতাঃ সর্ব্বে ন তত্র সুজনা হিতমভ্যুপেতাঃ।

কিঞ্চাখিলার্থকলনাদ্বহুদেশভূতপ্রজ্ঞাময়ং বিতনুতে খলু বঙ্গদূতঃ।।

অন্যঅন্যদূতগণ, সামান্য যে বিবরণ, সেইমাত্র কহে সংগোপনে।

তাহাতে সচরাচরে, তত্ত্ব না জানিতে পারে, মুগ্ধ রহে মর্মঅন্বেষণে।।

অতএব সাধারণ, সর্ব্বজন প্রয়োজন, স্বদেশ বিদেশ সমুদ্ভুত।

সমাচার সমুচ্চয়, প্রকাশ করিয়া কয়, হিতকারী এই বঙ্গদূত।।

—‘বাংলা সাময়িক পত্র’, পূর্বোক্ত, পৃ-৩১

তবে এগুলিকে কবিতা না বলে পদ্য বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

৬। ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত-র কবিতা সংগ্রহ’, সম্পাদনা—বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কলেজ স্ট্রীট, বইমেলা ১৯৯৫, পৃ-৭৮

৭। ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর বিভিন্ন সংখ্যায় যাঁদের জীবনী প্রকাশিত হয়েছিল তাঁরা হলেন—

কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন — ১লা আশ্বিন, ১লা পৌষ, ১লা মাঘ ১২৬০

রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) — ১লা শ্রাবণ, ১লা ভাদ্র ১২৬১

রাম(মোহন) বসু — ১লা আশ্বিন, ১লা কার্তিক, ১লা অগ্রহায়ণ ১২৬১

নিত্যানন্দদাস বৈরাগী — ১লা অগ্রহায়ণ ১২৬১

কেষ্টা মুচী — ১লা অগ্রহায়ণ ১২৬১

লালু নন্দলাল — ১লা অগ্রহায়ণ ১২৬১

গোঁজলা গুঁই — ১লা অগ্রহায়ণ ১২৬১

হরু ঠাকুর — ১লা পৌষ ১২৬১

রাসু, নৃসিংহ, লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস (লোকে কানা) — ১লা মাঘ ১২৬১

ভারতচন্দ্র রায় — ১লা জ্যৈষ্ঠ ১২৬২

৮। ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কবিতা সংগ্রহ-র ভূমিকা’, বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, ১৩৬১, পৃ-৭৬৯

শেয়ার করুন: