বিদ্যাসাগরচরিত

আবীর কর
মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখছেন, ১৮৬৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর, যার বাংলা তর্জমা— ‘‘গত রবিবার ২৮ আগস্ট সকালে আমি আমার পড়ার ঘরে বসে আছি এমন সময় আমার স্ত্রী অশ্রুভরা চোখে এসে বললেন, ‘ছেলেরা মেলায় যেতে চায়, কিন্তু আমার হাতে আছে মাত্র তিনটি ফ্রাঙ্ক...’ আমি তাকে বলেছিলাম, আজ ডাক আসার দিন। আমি কোনও না কোনও সংবাদ আজ পাবই। আমি যে লোকের কাছে আমার প্রার্থনা জানিয়ে চিঠি লিখেছি, প্রাচীন ভারতীয় ঋষির প্র‌জ্ঞা ও মণীষা তাঁর, কর্মোদ্যমে তিনি একজন ইংরেজের মতো প্র‌বল, তাঁর হৃদয় বাঙালি মায়ের মতো কোমল। আমি ঠিকই বলেছিলাম। একঘণ্টা পরই তোমার চিঠির সঙ্গে তোমার পাঠানো ১৫০০ টাকা পেলাম। তোমায় কী বলে ধন্যবাদ জানাব বন্ধু, তুমি শুধু যশস্বী নও, তুমি মহৎ, তুমি বিরাট...’’

বলাই বাহুল্য, এই মহৎপ্রাণ, সর্বব্যাপী পুরুষটি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

আবার ওই বছরই ২৮ ডিসেম্বর, প্র‌বাসী মধুসূদনের চিঠি, বিদ্যাসাগরকে। ‘‘তোমার চিঠি ও ২৪০০ ফ্রাঙ্কের একটি ড্রাফট পেয়েছি, ঠিক সময়েই পেয়েছি। আমাদের হাতে তখন একটি ফ্রাঙ্কও ছিল না, আমরা ব্যাকুল হয়ে তোমার পত্রের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’’

দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরের কাছে মাইকেলের চাহিদা বেড়েই চলেছিল। ১৮৬৬ সালের নভেম্বরে ভারতে ফিরবার জন্য টাকা চেয়ে পাঠিয়েছেন মাইকেল। শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ও অনুকূলবাবুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিদ্যাসাগর মাইকেলকে টাকা পাঠান। মধুসূদন দেশে ফিরেও সে টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। বিদ্যাসাগর মধুসূদনকে লিখেছেন— ‘‘উভয় স্থলেই আমি অঙ্গীকার ভ্রষ্ট হইয়াছি। সত্ত্বর টাকা না পাইলে বিলক্ষণ অপদস্থ ও অপমানগ্র‌স্ত হইব তার কোন সংশয় নাই। এক্ষণে কিরূপে আমার রক্ষা হইবেক, এই দুর্ভাবনায় সর্বক্ষণ আমার অন্তঃকরণকে আকুল করিতেছে এবং ক্রমে ক্রমে এত প্র‌বল হইতেছে যে রাত্রিতে নিদ্রা হয় না। অতএব আপনার নিকট বিনয় বাক্যে প্রার্থনা এই, সবিশেষ যত্ন ও মনোযোগ করিয়া ত্বরায় আমায় পরিত্রাণ করেন।’’

শুধু মাইকেল নন, বহুজনকেই এই ভাবে ‘দয়া’ প্র‌দর্শনে বিদ্যাসাগর ঋণগ্র‌স্ত হয়ে পড়েন। বিধবা বিবাহ আইন প্র‌ণয়নে যে বিপুল পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হয়েছিল তার সিংহভাগই বিদ্যাসাগরের। ঋণভারে জর্জরিত বিদ্যাসাগর বাধ্য হয়ে ১৮৬৯ সালের ৯ আগস্ট সংস্কৃত মুদ্রণযন্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশ রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কালীচরণ ঘোষকে আট হাজার টাকায় বিক্রি করেন।

বিদ্যাসাগরের মহানুভবতার আর এক চিত্র উপহার দিয়েছেন কবি নবীনচন্দ্র সেন, তাঁর ‘আমার জীবন’ নামক গ্রন্থের প্র‌থম খণ্ডে। নবীনচন্দ্র তখন বি এ ক্লাসের ছাত্র, সদ্য পিতৃবিয়োগ হয়েছে, দারিদ্র্যপীড়িত, চট্টগ্রামবাসী। কলকাতায় এসেছেন অথচ কপর্দকশূন্য। নবীনচন্দ্র লিখছেন— ‘‘একটি কিশোর বয়স্ক কলিকাতার পথের কাঙাল, কেমন করিয়া কুল পাইবে? সকল অবলম্বন ভাসিয়া গিয়াছে, সকল আশা নিভিয়া গিয়াছে। একমাত্র আশা সেই বিপদভঞ্জন হরি, ভক্তিভরে, অবসন্ন প্রাণে, কাতর অশ্রুপূর্ণ নয়নে তাঁহার দিকে চাহিলাম। তিনি প্র‌হ্লাদের মত আমাকেও তাঁহার নরমূর্তিতে দেখা দিলেন। সেই নরনারায়ণ শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।’’

বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা ভগবতী দেবীর সাতটি পুত্রসন্তান। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, হরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিশ্চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের মধ্যে হরচন্দ্র ও হরিশ্চন্দ্র খুব কম বয়সে কলেরায় মারা গেলে শোকার্ত ঠাকুরদাস ছোট ছেলে ঈশানচন্দ্রকে এবং ঈশ্বরচন্দ্রের একমাত্র পুত্র নারায়ণকে কাছছাড়া করতে চাননি। কলকাতার কর্মজীবন শেষে ঠাকুরদাস তখন বীরসিংহ গ্রামে। আর অন্য চারভাইকে নিয়ে বিদ্যাসাগর তখন কলকাতায়, ভাইদের যথাযথ পড়াশোনা ও প্র‌তিষ্ঠার জন্য বিদ্যাসাগর যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তখন তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ, বাংলা ও বাঙালির শিক্ষা বিস্তারে দিকে দিকে স্কুল প্র‌তিষ্ঠার কাজে পূর্ণমাত্রায় ব্যস্ত। অন্যদিকে সংস্কৃত ছাপাখানার কাজ তো আছেই।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই, দেশে শিক্ষা সংস্কারের ও বিস্তারের যিনি অগ্র‌দূত, তিনি তাঁর পুত্রকে শিক্ষিত করে তুলতে পারেননি। বীরসিংহ গ্রামে ঠাকুরদার কাছে কেটে যায় নারায়ণের প্র‌থম ষোলোটি বছর। তারপর বিদ্যাসাগর একপ্র‌কার জোর করে সংস্কৃত কলেজের স্কুল বিভাগে তার পুত্রকে ভর্তি করলেও সে কিছুতেই কলিকাতায় টিকতে পারেনি, তার মন টেকেনি। সে আবার ফিরে যায় ঠাকুরদার কাছে। গ্রামে নারায়ণের সঙ্গী বন্ধুসম কাকা ঈশানচন্দ্র আর খুড়তুতো ভাই গোপাল। এই গোপাল শুধু মূর্খ ছিল না, ছিল মাতালও। এর পরিণাম সহজেই অনুমেয়। এইসব নানা কারণে বিদ্যাসাগর তাঁর পিতার প্র‌তি ক্রুদ্ধও হয়েছিলেন, বলেছিলেন— ‘‘আপনি ঈশান ও নারায়ণের মাথা খাইতেছেন, এরপরও আপনি লোকের নিকট আপনাকে কিরূপে নিরামিষাশী বলিয়া পরিচয় দেন।’’

আবার এই বিদ্যাসাগরই বিধবা বিবাহের স্বপক্ষে বই লেখার পর পিতার কাছে গিয়েছেন বই ছাপানোর অনুমতি নিতে। ঠাকুরদাস বলেছিলেন— ‘যদি আমি এ বিষয়ে মত না দিই, তুমি কি করিবে?’

ঈশ্বর— তাহা হইলে আমি আপনার জীবদ্দশায় এ গ্র‌ন্থ প্র‌চার করিব না। আপনার দেহত্যাগের পর আমার যেরূপ ইচ্ছা হইবে সেইরূপ করিব।

ঠাকুরদাস— আচ্ছা, কাল একবার নির্জনে বসিয়া মনোযোগ সহকারে সমস্ত শুনিব, পরে আমার যাহা বক্তব্য তাহা বলিব।

পরের দিন।

ঠাকুরদাস— তুমি কি বিশ্বাস কর, যাহা লিখিয়াছ, তাহা শাস্ত্রসম্মত হইয়াছে?

ঈশ্বর— হাঁ তাহাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।

ঠাকুরদাস— তবে তুমি এ বিষয়ে বিধি মতো চেষ্টা করিতে পার, আমার তাহাতে আপত্তি নাই।

পিতার কাছ থেকে সানন্দ অনুমতি পেয়ে ঈশ্বরচন্দ্র গেলেন, মা’র কাছে।

ঈশ্বর— মা, তুমি তো শাস্ত্র-টাস্ত্র কিছু বুঝিবে না, আমি বিধবা বিবাহ সম্বন্ধে এই বইখানি লিখিয়াছি, কিন্তু তোমার মত না পেলে এই বই ছাপাইতে পারি না। শাস্ত্রে বিধবা বিবাহের বিধি আছে

ভগবতী— কিছুমাত্র আপত্তি নাই। লোকের চক্ষুশূল, মঙ্গলকর্মে অমঙ্গলের চিহ্ন, ঘরের বালাই হইয়া নিরন্তর চক্ষের জলে ভাসিতে ভাসিতে যাহাদের দিন কাটিতেছে, তাহাদিগকে সংসারে সুখী করিবার উপায় করিবে, এতে আমার সম্পূর্ণ মত আছে। তবে এক কাজ করিবে। যেন ওকে (ঠাকুরদাস) বলিও না।

"ঈশ্বর, ধর্মশাস্ত্রে বিধবা বিবাহের কি কি ব্যবস্থা আছে?"

ঈশ্বর— কেন মা, বলিব না?

ভগবতী— তাহা হইলে উনি বাধা দিতে পারেন, কারণ তুমি বিধবা বিবাহের গোলযোগ তুলিলে ওঁর অনেক ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা।

ঈশ্বর— বাবা মত দিয়েছেন।

ভগবতী— তবে আর ভয় কি।

বিদ্যাসাগরকে বিধবা বিবাহের বিষয়ে পিতামাতার এহেন সমর্থনের পরিচয় দিয়েছেন ‘বিদ্যাসাগর’ জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই বিবরণের অল্পবিস্তর হেরফের লক্ষ করা যায়, বিদ্যাসাগর-ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের বয়ানে। ‘‘বীরসিংহের বাটিতে চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া ঠাকুরদাস ও ঈশ্বর, পিতা-পুত্রে কথোপকথন হইতেছে, এমত সময় জননীদেবী একটি বালিকার বৈধব্য উল্লেখ করিয়া চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়া বলিলেন, তুই এতদিন যে শাস্ত্র পড়িলি, তাহাতে বিধবাদের কোন উপায় নাই কি?’’

এরপর ঠাকুরদাস— ঈশ্বর, ধর্মশাস্ত্রে বিধবা বিবাহের কি কি ব্যবস্থা আছে?

ঈশ্বর— শাস্ত্রে প্র‌থম ব্রহ্মচর্য, অভাবে সহমরণ বা বিবাহ।

ঠাকুরদাস— রাজ আজ্ঞায় সহমরণ প্র‌থা নিবারিত হইয়াছে, কলিতে ব্রহ্মচর্য সহজ নহে, সুতরাং বিবাহই একমাত্র উপায়, অতএব তুমি পুনরায় ভাল করিয়া শাস্ত্র দেখিয়া ইহা শাস্ত্রসিদ্ধ করিবার জন্য যত্নবান হও, এবং এ বিষয়ে প্র‌বৃত্ত হইলে লোকের নিন্দাবাদে বা অপর কোন কারণে পশ্চাৎপদ হইবে না, এমনকি তোমার পিতামাতা-আমরা নিবারণ করিলেও ক্ষান্ত হইবে না।

শম্ভুচন্দ্র জানাচ্ছেন, ‘‘এরপর পুস্তক প্র‌চার হলে, ঠাকুরদাস কলিকাতার বহুবাজারে পঞ্চাননতলার বাসায় ডাক্তার নবীনচন্দ্র মিত্র, ঈশ্বরের সঙ্গে কথোপকথনকালে সহাস্যে বলেন— ‘ঈশ্বর আর তোমাকে আমার শ্রাদ্ধ করিতে হইবে না।’ ইহা শুনিয়া ঈশ্বর বলিলেন, ‘হরেদরে এক আঁটু অর্থাৎ ভালো-মন্দ সুখ্যাতি অখ্যাতি দুইই আছে।’ ঠাকুরদাস বলিলেন, ‘বাবা ধরেছো, ছেড়ো না। প্রাণ পর্যন্ত স্বীকার করিও, এই অভিপ্রায়েই পূর্বে বীরসিংহ গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে আমরা উভয়ই তোমাকে বলিয়াছিলাম।’’

এরপর তো সেই ঐতিহাসিক বিধবা বিবাহ আইন প্র‌ণয়ন (১৮৫৬)। কিছু সমাজ-পণ্ডিত মানুষের বিরুদ্ধাচরণ ছাড়া আপামর জনসাধারণের সমর্থন, বিশেষত বাল-বিধবাদের আশীর্বাণী ঝরে পড়ল ঈশ্বরের মাথায়। তাঁর অতুল কীর্তিতে কত কবি কবিতা লিখলেন, গাইয়েরা গাইল গান, এমনকী শান্তিপুরের তাঁতিরা কাপড়ের পাড়ে বুনে দিলেন জনমত— ‘বেঁচে থাকো বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে। সদরে করেছ রিপোর্ট, বিধবাদের হবে বিয়ে।’

"বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিবাহের সময় আমি নীতবর ছিলাম।"
ঈশ্বরচন্দ্রের স্ত্রীর নাম দীনময়ী দেবী। তাঁদের চার কন্যা, এক পুত্র। হেমলতা, কুমুদিনী, বিনোদিনী, শরৎকুমারী ও নারায়ণ। বিদ্যাসাগরের বিবাহ প্র‌সঙ্গে এক সরস বর্ণনা দিয়েছেন শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন। তাঁর বয়ানে— ‘‘জগন্নাথপুর, রামজীবনপুর, ও ক্ষীরপাই— এই তিন গ্রামই পূর্বের হুগলি জেলার অন্তর্গত ছিল। এক্ষণে ওই তিন গ্রামই মেদনীপুর জেলার অন্তর্গত। রামজীবনপুরের আনন্দচন্দ্র রায় বা অধিকারী, ঠাকুরদাসের খড়ুয়া ঘর, পাকা ঘর নহে, এই উল্লেখে তাঁহার পুত্রকে কন্যা দান করিলেন না। ঠাকুরদাস বড়মানুষ ছিলেন না বলিয়া তাঁহার সহিত কুটুম্বিতায় অনেকে সম্মত হইলেন না। পরে রাসমণি ঠাকুরানী ও পিতামহী দুর্গাদেবী ক্ষীরপাই গ্রামে সম্বন্ধ স্থির করিলেন।’’ শম্ভুচন্দ্র আবারও লিখছেন— ‘‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিবাহের সময় আমি নীতবর ছিলাম। আমার বেশ মনে আছে, আমাদের দেশে বিবাহের পরদিবস আকাটা পুকুরে স্নানের পূর্বে স্ত্রীলোকেরা কন্যাকে লুকাইয়া রাখিয়া বরকে কন্যা খুঁজিতে বলে। বর যত এ ঘর ও ঘর খুঁজিতে থাকে, স্ত্রীলোকেরা তত কৌতুক করিতে থাকে। বিদ্যাসাগর মহাশয় সম্বন্ধে তাহাই হইয়াছিল। রীতি বহির্ভূত হয় নাই।’’
পরম কল্যাণীয় প্রাণাধিক
শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
জ্যেষ্ঠপুত্রবাবাজীউ চিরজীবিষু।
কলিকাতা।

শ্রীশ্রীদুর্গা শরণং।।

শুভাশীর্বাদ বিজ্ঞাপনঞ্চ বিশেষ।

বাবা ঈশ্বরচন্দ্র, তুমি কি স্নেহ মমতায় জলাঞ্জলি দিয়া একেবারে এ অভাগিনীকে ভুলিয়া গেলে? বাপরে একথা ভাবতে গেলে যে আমার বুক ফেটে যায়। বাবা ঈশ্বর, আমি যে আর চাতকিনীর মত কোলকেতা থেকে আসবার পথের দিকে চেয়ে থাকতে পারি নাই। আজ ১৮।১৯ বছর হোল তুমি আমাকে ভুলে আছ। আজ ১৮।১৯ বছর তোমার চাঁদ মুখটি দেখতে পাইনি। বাবা সকলেই বলছে বিদ্যাসাগর আর দেশে আসবেন না। তবে কি বাবা, সত্য সত্যই তুমি আমাকে ভুলে গেছ? ঈশ্বর, প্রাণের ধন আমার, তবে কি আমি সত্যই তোমাহারা হলাম? এতদিন ত’ বাপ তোকে কিছু বলিনি, সবার কথা শুনে শুনে আর যে প্রাণ ধরতে পারিনি বাবা। ঈশ্বর, বাপ আমার। একবার কোলে এস, মনের সাধ মিটিয়ে চক্ষু ভোরে তোর মুখটি দেখি, ঈশ্বর রে...

...একবার এসে দেখা দে। এই সময় আয় বাবা। এরপর এলে আর চোখে দেখতে পাব না। তোর জন্য কেঁদে কেঁদে এখনই দেখতে পাইনি। যে মেয়ে দিগ্‌বিজয়ী বেটা পেটে ধোরেছে, সেই অভাগিনীকেই বেটার জন্য কাঁদতে হোয়েছে। সুনীতি ধ্রুবের জন্য কেঁদেছে, কৌশল্যা রামের জন্য কেঁদেছে। আমাকে তোমার জন্য কাঁদতে হোচ্ছে। তাদের ছেলেরা তাদের মাকে একবারে বিসর্জন দিয়ে কাঁদায়নি। তাদের ছেলেরা মা-বাপের কথা ঠেলতে পারে নাই। তুমি বাবা আমার এই কথাটি রাখ। একবার আমাকে দেখা দিয়ে যাও। আমি গয়নাপাতির জন্য তোমাকে বিরক্ত কোরব না। কেবল কোলে করে প্রাণ শীতল কোরব।

জগদীশ্বর! আমার কপালে যাই কর, আমার প্রাণের ঈশ্বরেকে চিরজীবী করে রাখ।

কল্যাণমিতি। সন ১২৯৬ সাল, তাং— ১৫ই অগ্র‌হায়ণ।

শুভাকাঙ্খিনী কাঙ্গালিনী
তোমার বীরসিংহা জননী

ঘটনার সূত্রপাত একটি বিধবা বিবাহকে কেন্দ্র করে। বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ করার বিষয়ে যিনি মূল হোতা সেই বিদ্যাসাগর মহাশয় একজন বিধবার বিবাহে আপত্তি জানান। কিন্তু বীরসিংহ গ্রামের কয়েকজন মিলে সেই বিধবার বিবাহ দেন। এরপর ক্রুদ্ধ বিদ্যাসাগর বীরসিংহ গ্রাম ছাড়েন, ১২৭৬ সালের অগ্র‌হায়ণ মাসে। দীর্ঘ অদর্শনে এক সুদীর্ঘ চিঠি লিখলেন মা ভগবতী। সেই চিঠিটি পুস্তিকাকারে প্র‌কাশিত করেন বিদ্যাসাগরের গুণমুগ্ধরা।

"কিন্তু মাতৃআজ্ঞা পালনে বদ্ধপরিকর ঈশ্বরচন্দ্র কোন বাধাই মানিলেন না, সবল দেহ বীরপুরুষ দামোদরের তরঙ্গ সংগ্রামে জয়ী হইয়া পর পারে উঠিলেন।"

যে বিদ্যাসাগর মাতৃআজ্ঞা পালনের জন্য আজও বাঙালির কাছে আদর্শ, তাঁর এরূপ কঠিন সংকল্পজনিত আচরণ আমাদের বিস্মিত করে। আবার এ তথ্যও মিলছে, এই বিশ বছরে তিনি বীরসিংহ গ্রামে শিক্ষাপ্র‌সার ও অন্যান্য জনহিতকর কাজে অকাতরে অর্থব্যয় করেছেন কিন্তু বীরসিংহ গ্রামের মাটিতে পা রাখেননি। তাহলে কীরূপ অভিমান? কার প্র‌তি অভিমান?

মনে পড়ে, মাতৃআজ্ঞা পালনের জন্য মার্শেল সাহেবের কাছে বিদ্যাসাগরের ছুটি ভিক্ষার বয়ানটি— ‘আমার মা আমাকে বাড়ী যাইতে বলিয়াছেন। আমাকে বাড়ী যাইতেই হইবে। যদি বিদায় না দেন, আমি কর্ম পরিত্যাগ করিলাম। মঞ্জুর করুন, আমি বাড়ী যাইব।’

বিদ্যাসাগরের জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, ‘‘সাহেব মাতৃভক্তির এই স্বর্গীয় দৃশ্যে অভিভূত হইয়া বলিলেন তোমাকে কর্ম পরিত্যাগ করিতে হইবে না, আমি বিদায় দিতেছি, তুমি বাড়ী যাও।’’ এরপর ভৃত্য শ্রীরামকে নিয়ে বাড়ির অভিমুখে রওনা হলেন বিদ্যাসাগর। চণ্ডীচরণের বর্ণনায়— ‘‘ক্রমে সেই ভীষণ কলেবর দামোদর তীরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দামোদরে বর্ষার জল নামিয়াছে। একগাছি তৃণ পড়িলে শতখণ্ড হইয়া যায়। দুকূল ভাসাইয়া প্র‌বল তরঙ্গ তুলিয়া জলরাশি নৃত্য করিতে করিতে তীরবেগে ছুটিয়াছে। পারের নৌকা পরপারে। নৌকা আসিলে তাঁদের লইয়া গেলে, সেদিন আর গৃহে যাওয়া হয় না। কেবল পার হওয়া হইবে মাত্র তাহারও নিশ্চয়তা নাই। মাতৃভক্ত বিদ্যাসাগর কি করিলেন, পাঠক! শুনিতে চাও, ভাবিতেও শরীর শিহরিয়া উঠে, ভয়ে হাত পা পেটের ভিতর প্রবেশ করে, উপন্যাসে কবি কল্পনায় এরূপ ঘটনার অবতারণা সম্ভব হয়। কিন্তু সত্য সত্যই যে মানুষ এরূপ করিতে পারে, তাহা সহজে বিশ্বাস হয় না, কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয় মায়ের আদেশ পালনের জন্য বর্ষায় ভরা দামোদরের জলোচ্ছাসে অঙ্গ ঢালিয়া দিলেন। যাহারা পারে যাইবে বলিয়া বসিয়া ছিল তাহারা অনেক নিষেধ করিল, কেহ কেহ বাধাও দিল। কিন্তু মাতৃআজ্ঞা পালনে বদ্ধপরিকর ঈশ্বরচন্দ্র কোন বাধাই মানিলেন না, সবল দেহ বীরপুরুষ দামোদরের তরঙ্গ সংগ্রামে জয়ী হইয়া পর পারে উঠিলেন।’’

যদিও বিদ্যাসাগর-ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র বলছেন, ‘বর্ষাকালে ভরা দামোদর সাঁতরাইয়া পার হওয়ার কথা যে লিখিয়াছেন, তাহা নিতান্ত অসঙ্গত।’

এখন এর বিচার কে করবে? ঈশ্বরের মাতৃআজ্ঞা পালনের এই রোমাঞ্চকর কাহিনি বাঙালি বিশ্বাস করে এসেছে, তাঁর দামোদর সাঁতরে পার হওয়ার গল্পটি বাঙালির মূল্যবোধে বড় অমূল্য সম্পদ হিসেবে সঞ্চিত হয়ে আছে। বিদ্যাসাগরের অন্যান্য জীবনীকার, তাঁর সম্পর্কিত অধিকাংশ লেখকরাও চণ্ডীচরণের অনুসরণে মাইলস্টোন থেকে বিদ্যাসাগরের ইংরাজি সংখ্যার শিক্ষা লাভ, সমস্ত গৃহকর্ম সামলে বিদ্যাসাগরের বিদ্যার্জন, মাতৃআজ্ঞা পালনে দামোদর সাঁতরে আসার তথ্য পরিবেশন করে এসেছেন। শম্ভুচন্দ্রের বিরুদ্ধে অনেকেই ভ্রাতৃ-ঈর্ষার গূঢ় ইঙ্গিতও রেখেছেন। বাঙালির মাতৃভক্তি যেমন অটল, ভাইয়ে-ভাইয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাঙালির অবস্থান ঠিক ততটাই টলমল। তাই আমাদের কাছে বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি কোনও প্রশ্নের অপেক্ষা রাখে না।

"মৃত্যুকালে পুত্রকে দেখতে চেয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের অনুমতি মেলেনি।"

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একমাত্র পুত্র নারায়ণের জন্ম ১৮৪৯ সালে। যাকে যথাযথ শিক্ষা দিতে পারেননি বিদ্যাসাগর মহাশয়। নারায়ণের একুশ বছর বয়সে, ১২৭৭ সালের ২৭শে শ্রাবণ খানাকূলের কৃষ্ণনগর নিবাসী শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ষোড়শবর্ষীয় বিধবা-কন্যা ভবসুন্দরীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন বিদ্যাসাগর। শুধুমাত্র বিধবা বিবাহের প্র‌চার বা তাকে আইনানুগ করাতেই তো শান্ত থাকেননি তিনি। ‘আপন আচরি ধর্ম পরের শিখায়’-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন বিদ্যাসাগর। যদিও বিয়ের দু’বছর কাটতে না কাটতেই পুত্রের স্বভাবদোষে অসন্তুষ্ট বিদ্যাসাগর তাঁকে ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করেন। অটল পুরুষাকার আপোষহীন বিদ্যাসাগরের কঠির কঠোর বক্তব্যটি ছিল— ‘‘আমার পুত্র বলিয়া পরিচিত শ্রীযুক্ত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় যারপরনাই যথেচ্ছাচার ও কুপথগামী এজন্য ও অন্য অন্য গুরুতর কারণবশত আমি তাঁহার সংশ্রব ও সম্পর্ক পরিত্যাগ করিয়াছি।’’ ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণার পর বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রায় কুড়ি বছর বেঁচে থাকলেও পিতা-পুত্রের সম্পর্কের দূরত্ব ঘোচেনি। বিদ্যাসাগরকৃত সম্পত্তির শেষ উইলে পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগিনী-সহ অনেক দূরসম্পর্কের আত্মীর-জ্ঞাতিদের নামানুসারে মাসোহারা দেওয়ার অঙ্গীকার থাকলেও, নারায়ণের নামটুকুও উচ্চারিত হয়নি সেখানে। যদিও পুত্রবধূ শ্রীমতী ভবসুন্দরী দেবীর নামে মাসোহারা বাবদ পনেরো টাকা বরাদ্দ করে যান ঈশ্বরচন্দ্র। নারায়ণচন্দ্রকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন ১৮৭২ সালে, নিজ হস্তে সম্পত্তির উইল করে যান ১৮৭৫ সালে।

এর থেকেও কঠিন পিতার পরিচয় তখনও বাকি। ১৮৮৮ সাল, দীনময়ী দেবী শেষ-শয্যায়। মৃত্যুকালে পুত্রকে দেখতে চেয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের অনুমতি মেলেনি।

জীবনের শেষ কয়েক বছর সবার সঙ্গে সব সংশ্রব ত্যাগ করে বিদ্যাসাগর চলে যান কারমাটারে, সাঁওতাল আদিবাসীদের সঙ্গেই কাটান। এরপর ১৮৯১ সালের গোড়া থেকে তিনি অসুস্থ। নিয়ে আসা হল চন্দননগরের বাসায়। তারপর যখন শয্যাশায়ী তখন বাদুড়বাগানের বাসায় তাঁকে আনা হল। জুলাইয়ের গোড়াতেই একপ্র‌কার স্পষ্ট হল, বিদ্যাসাগরের ইহকালের সময় শেষ হয়ে এসেছে। ওই অবস্থাতেও ২০ জুলাই মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন সম্পর্কে তাঁর ইচ্ছাপত্র লিখেছেন। সাতজনের ট্রাস্টিবোর্ড গঠনের কথা বলেছেন সেই ইচ্ছাপত্রে। এরপর এল সেই অন্তিম মুহূর্ত। বিদ্যাসাগর অচৈতন্য। তখন বিদ্যাসাগরের জ্যেষ্ঠা কন্যা হেমলতা ‘কুপথগামী’ ভাই নারায়ণকে পিতার সামনে ডাকলেন। মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে তাঁর হঠাৎ যেন জ্ঞান ফিরল। কী যেন খুঁজলেন হতাশ দৃষ্টিতে। তারপর চোখ বুজলেন চিরতরে।

১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই, বাংলা ১২৯৮, ১৩ই শ্রাবণ, রাত্রি ২ টা ২২ মিনিটে চলে গেলেন আমাদের বাংলা ও বাঙালির নিকটতম ঈশ্বর, ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

তথ্যসূত্র : বিদ্যাসাগর— চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দধারা প্র‌কাশন।
            বিদ্যাসাগর জীবনচরিত ও অমনিবাস— শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন।
            বিদ্যাসাগরের জীবনের শেষ দিনগুলি— সন্তোষকুমার অধিকারী, অনন্য প্র‌কাশন।

শেয়ার করুন: