জীবন এরকমই হয়

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

কোনও কোনও মানুষ তাঁর জীবনযাপনে জীবনের সময়সীমাকে ছাপিয়ে যান। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন সেই রকমই একজন। তবে শুধু জীবনেই নয়, ‘সময় বড় বলবান’— সে কথা মেনে নিয়েও তিনি তাঁর লেখাতেও সময়কে অতিক্রম করতে চেয়েছেন বারবার। অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, জীবনরহস্য, মেধা আর রসবোধ মিলেমিশে গিয়েছে তাঁর লেখায় যা মনোযোগী পাঠকের কাছে আদরের হয়ে উঠেছে। গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে তিনি লিখেছেন অজস্র‌ গদ্যও। সেইসব লেখাও তাঁর মতোই দুঃসাহসী, সতেজ ও উজ্জ্বল যাদের প্র‌বন্ধ বা নিবন্ধের সীমায় আটকে রাখা যায় না। এখানে যে গদ্যটি প্র‌কাশিত হল তার গোত্র প্রাথমিকভাবে আলাদা মনে হতে পারে, তবে সেখানেও তিনি নিজস্ব প্র‌করণে উপস্থিত। সাল-তারিখ দিয়ে তাঁর জীবনের প্রায় সমস্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এখানে। ২০০১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্র‌য়াত হন। তার পাঁচ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একটি জীবনপঞ্জি বলা যেতে পারে লেখাটিকে। যদিও পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করতে পারবেন যে এখানেও শ্যামল চিরাচরিত নিষ্ঠাবান, অকপট ও উদাসীন দার্শনিক।

লেখাটি আমার কাছে ছিল। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ই দিয়েছিলেন। কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে মাঝে মাঝে দেখেছি কিন্তু কোথাও প্র‌কাশ করা যায় কিনা তেমন ভাবনা এযাবৎ উপস্থিত হয়নি। এবার তা প্রকাশ করা হল লেখকের পরিবারের অনুমতি নিয়েই। প্র‌সঙ্গত বলা দরকার, এই লেখাটি যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় একটি ধারাবাহিক উপন্যাসের উল্লেখ করেছেন। সময়ের হিসেব করলে বলা যায়, তিনি তখন ‘আলো নেই’ উপন্যাসটি লিখছেন যা শেষ করে যেতে পারেননি মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায়। লেখাটির একবারে শুরুতেই, ওপরে তারিখ রয়েছে ২৯ নভেম্বর, ১৯৯৬। তবে কোনও শিরোনাম ছিল না। লেখার ভেতরের একটি লাইন আমি শিরোনাম হিসেবে এখানে ব্যবহার করেছি।

অরিন্দম বসু

১৯৩৩, ২৫ শে মার্চ বর্তমান বাংলাদেশের খুলনা শহরের প্রান্তদেশে জন্ম। সেই সময় বাস-রিকশা চলত না, মানুষের চাহিদা ছিল খুব কম। স্কুল বা বিয়েবাড়ি যেতাম খালি পায়ে, কলকাতা আসি খালি পায়ে। আমরা অবস্থাপন্ন ছিলাম না। কোনওরকমে চলে যেত। ইলেকট্রিকের আলো ছিল না। কেরোসিন তেলের আলো জ্বলত। মানুষের চাওয়া অন্যায় নয় কিন্তু চাওয়ার পরিমাণ ছিল কম।

বাবা মতিলাল গঙ্গোপাধ্যায় কোর্টে পেশকারের কাজ করতেন। মা কিরণকুমারী গৃহবধূ। ঠাকুরদা গিরীশ চন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় যাত্রাদলে অভিনয় করতেন। নট্ট কোম্পানি। ১৮৪০ সালে ঠাকুরদার জন্ম। বঙ্কিমের চেয়ে দু’বছরের ছোট। ঠাকুরদা জমিজমা থেকে ভাগের আয় পেতেন।

আমাদের ৬ জন ভাইয়ের মধ্যে বর্তমানে চারজন। বড়দা মেজদা সরকারি চাকরি, পরের দুজন সংবাদপত্রে, ছোটভাই আত্মঘাতী, বোন খেয়াল করে, নাম রমা মুখার্জী। স্ত্রী ইতি গঙ্গোপাধ্যায়। কুষ্ঠিয়ার কুমারখালি থানার গড়াই নদীর ধারে ধলনগর গ্রামে বাড়ি।

পাড়ার জমিদারের ঘোড়া ছিল, কোচোয়ান ঘোড়া হাঁটিয়ে নিয়ে যেত। স্বপ্ন দেখি ঘোড়া প্যারেড করছে বুকে। সকালে জ্বর আসে— টাইফয়েড। ছেলেবেলায় স্কুলজীবনের বন্ধু চারজন। আনন্দগোপাল থাকে ব্রহ্মপুরে, কলকাতার কৃতি ডাক্তার শশাঙ্ক ও বংশী। অন্য বন্ধু অচিন্ত্য খুবই প্রতিভাবান ও দুষ্টু।

লেখাপড়া করি খুলনা জেলা স্কুলে। বড় স্কুল ছিল। টিফিন দিত টমাটো, বড় আলু, ফুলকপি সহ গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ি। ৪৭-এ কলকাতায় বাবা মায়ের হাত ধরে। ১লা ডিসেম্বর। দেশভাগের শিকার। দত্তপুকুরে কাকার বাড়িতে প্র‌থম, তারপর নেবাধুঁই গাঁয়ে এক জমিদারবাড়িতে ভাড়া হিসেবে। ২০-২৫ ফুট চওড়া বড় বারান্দা, বাড়ির পেছনে জংলা, ধানখেত।

বড়দা, মেজদা চাকরি করত। মেজদা তত ভালো রোজগার করত না। নেবাধুঁই স্কুলে ম্যাট্রিকুলেশন। তারপর টালিগঞ্জের বাড়িতে। পাশের পর আশুতোষ কলেজে আই এস সি পড়ি। ১৯৫১-য় আই এস সি পাশ করি, তারপর বি এস সি পড়তে পড়তে ডিসকলেজিয়েট হওয়ায় পরীক্ষায় বসতে পারিনি। তারপর বেলুড়ে ন্যাশনাল আয়রন অ্যান্ড স্টিল নামে ৬০০০ লোক কাজ করে এমন জায়গায় কাজ করি। সেখানে ৩০ টন ওপেন হার্থ ফার্নেসে হেল্পার হিসেবে ট্রেনিং-এর কাজ করি। ১৯৫২-৫৩ সাল পর্যন্ত। ফার্নেসে লোহা গলানোর কাজ। ৫১ সালে গল্প লেখা শুরু। কারখানায় ঢুকি ১৯ বছর বয়সে। ২১-এর শেষে বেরিয়ে এসে বুঝতে পারি কারখানা আমার জীবন নয়, কিন্তু এই জীবন আমাকে পরিশ্রমী, সহিষ্ণু ও নিয়মানুবর্তী করে তুলেছিল। যা পরে আমাকে খুবই সাহায্য করেছে।

কারখানার পর বাংলায় অনার্স নিয়ে বি এ পাশ করি। আগে পড়তাম বি এসসি, কেমিস্ট্রিতে অনার্স। গ্র্যাজুয়েট হয়ে বছর দেড়েক মথুরানাথ বিদ্যাপীঠে (নিউ আলিপুর) বাংলা পড়াই। সেখানে আরও দুজন লেখককে নিয়ে গেছিলাম। বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় গঙ্গোপাধ্যায়। পরে ওই স্কুলে অল্পদিন চাকরি করেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও মতি নন্দী। স্কুলে কাজ করতে করতে ৫৮ সালে আনন্দবাজারে যোগ দিই সাংবাদিক হিসেবে। ৫৯ সালে পদত্যাগ করি। ফিরে আসি ওই স্কুলে। আবার পদত্যাগ করি স্কুলের চাকরি থেকে। ৬০ সালে আবার আনন্দবাজারে যোগ দিই। ৬০-৭৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত একটানা আনন্দবাজারে কাজ করি নানা পদে। ৫৮ সালে ‘দেশে’ গল্প বের হয় ‘তুষার হরিণী’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও মতি নন্দী প্র‌শংসা করেছিলেন। ৬১ সালে প্র‌থম উপন্যাস ‘বৃহন্নলা’, পরে নাম হয় ‘অর্জুনের অজ্ঞাতবাস’। ৬২ সালে ‘অনিলের পুতুল’। ৬৬-৬৭-তে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’, যা ধারাবাহিক হিসেবে প্র‌কাশ হয়। ৬৯-৭০-৭১-এ ‘নির্বান্ধব’, ‘সরমা ও নীলকান্ত’, ‘পরস্ত্রী’, ‘নতুন ভুবন’। ৭৪-এ জাপান, ফিলিপাইন্স, থাইল্যান্ড, হংকং যাই। ওই বছরেই ‘স্বর্গে তিন পাপী’, ‘ক্লাস সেভেনের মিস্টার ব্লেক’। জাপান সরকার লেখক হিসেবে আমন্ত্রণ দেন।

৭৪-৭৫ সালে বন্ধুদের সঙ্গে ‘কৃত্তিবাস’ করেছিলাম। ওই সময় লিখি ‘অদ্য শেষ রজনী’। ৭৬ সালের ডিসেম্বরে আনন্দবাজার থেকে পদত্যাগ।

৬১-৬২ সালে জমির প্র‌তি আগ্র‌হ জন্মায়। ৬৩-তে চম্পাহাটিতে জমি কিনে বাড়ি করার কথা ভাবি। বাড়ি করে ৬৬-তে সেখানে চলে যাই। ডেলি প্যাসেঞ্জারি করি। ভূমিহীন চাষিদের নিয়ে সমবায় করি। খাল গভীর করে জল ধরে রেখে চাষ করি। চম্পাহাটিতে থাকতে থাকতে চাষবাস ও গরুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। ইটখোলা, মাছ চাষ, বাড়ি নির্মাণ, সবজি চাষ, রাস্তা বানানো, খাল কাটা, সাপ ধরা ইত্যাদি বিষয়ে জড়িয়ে পড়ি।

চম্পাহাটিতে ১০-১১ বছর থাকাকালীন আমার জীবন অনেকটাই পালটে যায়। যেমন পালটে গেছিল ইস্পাত কারখানার জীবন। ওই দুই জগতের মানুষ ও প্র‌কৃতি আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। এদের জীবনের কথাই আমার লেখার বিষয় হয়ে ওঠে।

৭৪-৭৫ সালে ‘কৃত্তিবাস’ করার সময় অভিনেতা ও নাট্যকার অসীম চক্রবর্তী, অভিনেতা ও গায়িকা কেতকী দত্ত, অভিনেতা ও নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র— এদের অভিনয় দেখে, এদের ঘনিষ্ঠতায় মঞ্চের প্র‌তি, থিয়েটারের প্র‌তি আকর্ষণ অনুভব করি। সেই সময় ‘অদ্য শেষ রজনী’ উপন্যাস লেখার ইচ্ছা হয়।

১৯৫০ সালে আশুতোষ কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে জয়লাভ করি। তখন পার্টি ব্যাপার ছিল না, পরে পার্টি ব্যাপার হয়ে যায়। তবে কংগ্রে‌স ও কম্যুনিস্ট প্র‌ভাব ছিল। সেবার কলেজ নির্বাচনে যে সহপাঠী হেরে গেছিল সে কর্মজীবনে পুলিশের আই জি হয়ে রিটায়ার করেছে। আমি সাংবাদিক হিসেবে রাইটার্সে তার কাছে খবর করতে যেতাম। আমরা খুব বন্ধু ছিলাম। তখন আনন্দবাজারে সাব-এডিটর ছিলাম।

কর্মজীবনে সন্তোষকুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল কর, সাগরময় ঘোষ, অমিতাভ চৌধুরী, অরুণ বাগচী, শিশির কর, অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, অভীক সরকার, কানাইলাল সরকার, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুবোধ ঘোষ, জগবন্ধু ভট্টচার্য, অনাদি নাথ পাল— এদের সংস্পর্শে আসি। কী জীবিকায়, কী সাহিত্যে, কী জীবনে এদের কাছে অনেক কিছু পেয়েছি। তবে এদের মধ্যে যারা আমার চেয়ে বয়সে বড় তাদের কেউ কেউ আমার প্র‌তি আরেকটু সুবিবেচক হলে আমার জীবন অন্য খাতে বইত। সে কথা নিয়ে আজ আর কোনও দুঃখ নেই, কষ্টও নেই। কারণ এখন মনে করি জীবন এরকমই হয়।

যুগান্তরে ছিলাম ১৯৭৭-এর শুরু থেকে ৯১ সাল পর্যন্ত। বন্ধ হওয়া অবধি। তখন সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ সম্পাদনা করতাম। দৈনিক যুগান্তরে ছিলাম ফিচার এডিটর হিসেবে। এই সময় কর্মজীবনে, নিজের জীবিকায় অনেক কিছু করতে চেয়েছিলাম। প্র‌তিষ্ঠানটি ছিল অগোছালো। নেতৃত্ব ছিল অদক্ষ। যা করতে চেয়েছিলাম, করতে পারিনি। কাজ করতে গিয়ে কাজ ভুলতে বাধ্য হয়েছি। তবুও তুষারকান্তি ঘোষ, তাঁর মেয়ে শ্রীলেখা বসু ও প্র‌তাপকুমার রায়ের সান্নিধ্য, পরামর্শ ও প্রে‌রণা পেয়েছিলাম। বাকিটা সবই অন্ধকার, হতাশা। এই সময়ের ভেতর লিখেছিলাম ‘হাওয়া গাড়ি’, ‘যতীন দারোগার বেদান্ত’, ‘এক গেরস্তের তিন সংশয়’ ও ‘স্বর্গের আগের স্টেশন’। ৭৬ সালে আনন্দবাজার থেকে পদত্যাগ করার বছর লিখি ‘ঈশ্বরীতলার রূপোকথা’। ৬৭ সালে লিখেছি ‘কুবেরের বিষয় আশয়’।

যুগান্তর বন্ধ হওয়ার মুখে শেষ কয়েক বছর সময়মতো মাইনে পেতাম না। অবশ্য কোনও কাজও করতাম না, কেন না কেউ কাজ দিতেন না। যুগান্তর তখন ডুবছে। এই চরম হতাশার ভেতর সাপ্তাহিক বর্তমানের অশোক বসু এসে আমাকে উসকে দিয়ে তাদের সাপ্তাহিকে ধারাবাহিক ‘দারাশুকো’ লিখতে নামিয়ে দেন। আমি কিছুই জানতাম না। হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে কোনওরকমে তীরে ওঠবার চেষ্টা করলাম। ধারাবাহিক ‘শাহাজাদা দারাশুকো’ ওখানে যখন শুরু করি তখন ২০/২২ হাজার সার্কুলেশন ছিল। যখন শেষ করি সার্কুলেশন বেড়ে দাঁড়ায় লক্ষাধিক। এ কথা ওরা আমাকে জানিয়েছিলেন।

৯১-এর মাঝামাঝি আজকালে যোগ দিই। আজকালে এসে আমার বড় লাভ নবীন বন্ধুদের দল এবং সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত। ওদের কাজের ভেতর আমার অল্পবয়সের সাংবাদিকতায় শিক্ষক সন্তোষকুমার ঘোষের বুদ্ধি ও নেতৃত্বের চিহ্ন পাই। অশোক নিজেও লেখক— সাহিত্যমনস্ক মানুষ। মেঘে মেঘে কাগজের কাজ হয়ে গেল ৩৮/৩৯ বছর। প্রথম গল্প ছাপা হয়েছিল ১৯৫২ সালে মাসিক ‘অগ্র‌ণী’ পত্রিকায়। লেখালেখির বয়স ৪৪। এরকম বয়সে অনেকেই মারা যায়। আরও আগে মারা গেছেন মাইকেল, বঙ্কিম, বিভূতিভূষণ, মানিক, শরৎচন্দ্র, প্রে‌মচন্দ্র, গোর্কি, লু-সুন, জীবনানন্দ। লিখলাম খারাপ, বেশি বেঁচে কী হবে? কাগজে পড়ি ৬০ বছরের বৃদ্ধ হতাশায় আত্মঘাতী। আত্মঘাতী হওয়ার মতো সাহসে কুলোয় না। এখন যা ভালোবাসি— দু’চারটে কাঁচাগোল্লা

৮৯ সালে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম আমেরিকা যাবার। ওই বছর আমেরিকা থেকে ফেরার পথে ব্রিটিশ কাউন্সিলের নিমন্ত্রণ পাই ব্রিটেন ঘুরে দেখার। আমেরিকা ঘুরে বুঝতে পারি দেশটা বড়। মানুষগুলো ভালো। ওখানে স্বল্প পরিচয় হয় সলবেলোর মতো সাহিত্যিক, কেনেডি পরিবারের জীবিত টেড কেনেডির মতো মানুষের সঙ্গে। আমি যা লিখি তার সঙ্গে আমেরিকার মতো দেশে গিয়ে সেজেগুজে ঘুরে বেড়াবার কিছুই নেই। তাই ব্রিটিশ কাউন্সিলের আমন্ত্রণে যাইনি। সোজা বাড়ি ফিরে আসি। এখন যতটা পারি নিজের কাছে থাকতে চাই, নিজের দিকে তাকাতে চাই। আমি যা লিখেছি তা বেশিরভাগই নিজের কথা।

১৯৬০ সালে বিবাহ। দুই মেয়ে, প্রত্যেকের দুটি সন্তান। ছোট মেয়ে ডাক্তার। বড়জামাই কবিতা লেখেন ও কবিতার কাগজ করেন।, ‘কবিতা দর্পণ’। লেখক মতি নন্দী আমার ভায়রাভাই।

১৯৪৩ সালে প্রে‌ম— স্কুলের প্র‌ধান শিক্ষকের কন্যা— যার সঙ্গে কোনওদিন আলাপ হয়নি। শুধু দেখেছি তাকে।

১৯৫১ সাল— সহপাঠিনী— দুজনের যথেষ্ট কথা— একজনের চলে যাওয়া— খুব কষ্ট— অধ্যাপনা থেকে অবসরগ্র‌হণ— ছেলেমেয়ে, স্বামী খুবই কৃতী।

১৯৫৪ সাল— সহপাঠিনী— দুজনের অনেক কথা— আমি চলে আসি— তার খুব কষ্ট। এখন রিটায়ার্ড— স্বামী দুই বাসের মধ্যে পড়ে মারা যান— দুই মেয়ে অধ্যাপিকা।

১৯৫৭ সাল— সে যে কত কথা— সে চলে গেল— খুব কষ্ট— ডাক্তার স্বামী মারা গেলেন— মেয়ের পাত্র খুঁজে দিতে বলেছিল, পারিনি— অনেক বাড়িভাড়া পায়।

১৯৫৯— বন্ধুর শালী— খুব বেশি কথা নয়।

১৯৮৯— পাঠিকার মা-মরা মেয়ে— অনেক কথা, অনেক ঝগড়া— অনেক পড়াশোনা— অনেক ভালোবাসা— আমি চলে আসি— দুজনের খুব কষ্ট— চাকুরিরতা। আমি চলে আসায় ভালো হয়েছে। আশা করা যায় বিয়ে হয়ে যাবে। ও ছিল বলেই দারাশুকো লেখা হল।

ওপারে ইংরেজি পড়ায়, কলেজে— বলেছিল, চলে এসো, শুধু লিখবে, আর কিছু করতে হবে না। আমি খাওয়াব পরাব, আমার কাছে থাকবে— রেডিওতে ভালো অতুলপ্র‌সাদী গায়। আজও বিয়ে করেনি। ছোট তিন ভাইকে মানুষ করেছে।

যখন বাবা-মায়ের কাছে ছিলাম, তখন এপার ওপার নিয়ে মোট পাঁচটি বাড়িতে থেকেছি। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চম্পাহাটিতে তিনটি বাড়িতে ছিলাম। তার মধ্যে শেষেরটি নিজে বানাই। কলকাতায় ফিরে গত ২৪ বছরে পরপর আটটা বাড়িতে থেকেছি। এখন বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে কিংবা বাড়ি করে চলে যেতে ইচ্ছে করে। যেমন বাড়ি পালটেছি— তেমন চাকরি পালটেছি— তেমন বন্ধু পালটেছি— তেমন শরীর পালটেছি। কখনও মোটা হয়ে রোগা হয়েছি। মেয়েরা বিয়ে হয়ে চলে যাওয়ায় মাঝে মাঝে মনে হয় ছেলে থাকলে— ছেলের বউ বাড়িতে থাকত। বিকেলে এক কাপের জায়গায় দু’কাপ চা পেতাম। আশা আছে, হয়তো হবে না— নাতি ও তার স্ত্রীর কাছে একদিন হয়তো থাকব। একটা খুব বড় বাড়ি করতে ইচ্ছে করে। সেখানে মেয়ে-জামাই, তাদের ছেলেমেয়ে, সেইসব ছেলেমেয়ের বউ ও স্বামী সবাই থাকবে। কিন্তু এ তো হয় না। এই সেদিন আমার এক মাসতুতো বোনের বাড়ি গেলাম। আমরা সমবয়সি। তাদের পাঁচতলা বাড়ি। আমার বোনের শ্বশুরমশাই বানিয়েছিলেন। এখন সে বাড়ি ভূতের বাড়ি। লোক নেই বলে একতলায় টিউটোরিয়াল কলেজ করতে দেওয়া হয়েছে। দোতলায় চাবি। তে-তলায় আমার বোন-ভগ্নীপতি থাকেন। স্টিভেটার। চারতলায় খুব কম ভাড়ায় দুজন ভাড়াটে থাকেন। তাদের খুব খাতির করে রাখা হয়। কারণ ভগ্নীপতির বয়সি। ছেলেমেয়ে বিদেশে। বললাম, বাড়ি রং করুন। ভগ্নীপতি বললেন, একবার রং করতে যা খরচ তা দিয়ে একটা ছোট একতলা বাড়ি হয়ে যাবে।

এখন লিখছি। আমার শৈশবে টের পাই আমাদের বাবা-জ্যাঠা-মামা-পিসেমশাইরা যেন ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে এমন মাঠে ফুটবল খেলছে— নিজেরা দাঁড়াতে পারছে না— স্লিপ করছে। বলও কেউ নিজের পায়ে রাখতে পারছে না, বল পিছলে যাচ্ছে। সবার আশংকা এই বুঝি গোল হয়ে গেল। কেউ বুঝতে পারার আগেই বল গোলে চলে গেল। ঠিক এভাবেই মাত্র ১০ বছরের অবিশ্বাস, নিয়তি বুঝতে পেরেও আটকাতে না পারা— দেশভাগ হয়ে গেল। এই বিষয়টি দুটি পত্রিকায় আলাদা আলাদা ভাগে সময় ভাগ করে নিয়ে ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছি।

শেয়ার করুন: