লিখতে হলে লেখাই ভালো

জয়দেব বসু

এখানে ছাপা হলো জয়দেব বসুর পাঁচটি কবিতা, অগ্রন্থিত, অপ্রকাশিতও বটে। যার মধ্যে চারটি লেখার রচনা-তারিখ ও রচনা-সময়ের উল্লেখ আছে জয়দেবের নিজেরই হস্তাক্ষরে। কিন্তু দীর্ঘ কবিতাটির কোনো রচনা-সময় বা লেখাটির কোনো শিরোনাম উল্লেখ করেননি জয়দেব। অবশ্য এই দীর্ঘ কবিতাটি ছাড়া, বাকি চারটির মধ্যেও দুটি কবিতার কোনো শিরোনাম দেননি কবি। ফলে ক, খ, গ, ঘ, ঙ করে পাঁচটি কবিতাকে সাজানো হলো। জয়দেবের কবিতাজীবনের সবচেয়ে ফলবান সময় ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২। এখানে তিনটি কবিতার রচনাকাল ১৯৮৭-র শেষার্ধ। একটির ১৯৮৯-র প্রথমার্ধ। অর্থাৎ জয়দেব তখন তাঁর সৃষ্টির মধ্যগগনে, ২৫-২৬ বছরের এক যুবক। এই সময়ের লেখার একটা বড় অংশ পরে সংকলিত হবে ‘ভবিষ্যৎ’ কাব্যগ্রন্থে, বা কিছুটা তারও আগে ‘ভ্রমণকাহিনী’-তেই। এবং এরপর তিনি ঝাঁপ দেবেন ‘জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়’-এর সুদীর্ঘ কবিতাগুলির দিকে। ফলে, এসব তথ্য থেকে, মূল পাণ্ডুলিপির পরিবর্তিত হস্তাক্ষরের ধরণ থেকে এবং বাচনভঙ্গীর ধরণ থেকে, ব্যক্তিগতভাবে একটা আব্‌ছা অনুমান যে এই দীর্ঘ কবিতাটি হয়তো ১৯৮৯-৯০ নাগাদ লেখা হতে পারে।

সময়সূত্রের বদলে, লেখাগুলি মুদ্রণের ক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে এখানে চিন্তাসূত্রের ভিত্তিতে। দ্বিতীয় কবিতাটির যে সাংগীতিক গড়ন – বিশেষত ‘আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো’ লাইনটিকে গানের ধুয়ার মতো বারবার ক্রমাগত ব্যবহার করা – তার উদাহরণ জয়দেবের লেখাতেও বিরল।

সন্দীপন চক্রবর্তী

ক.

ভালোবাসা

এমনকি জার্মান বুর্জোয়ারাও সেদিন বলেনি, জলপানের অধিকার একমাত্র আর্যদেরই। কিছু কিছু বিষয় নিষিদ্ধ করা যায় না। অ্যাডোনিস ও হেফাস্তস, মন্থরা ও বসন্তসেনা প্রত্যেকের কাছেই যা কিনা অমোঘ, বিস্ফোরক ও কূলপ্লাবী। যা কিনা স্বাধীনতার মত। তারা ফ্যানি ব্র ন, তারা ইভা ব্রাউন।

              রাত ৯.৫৮ মিনিট
               ৫/৮/৮৭

খ.

  যেখানে চিঠি যায়, যেখান থেকে চিঠি আসে
আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো
তার জানলার পাশে মরা গাছ
তার জানলার পাশে মরা মেঘ
আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো
তার চোখের পাতায় ফোটা টিউলিপ
তার পাইনবনের ধারে বাসা
আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো
রাস্তায় রক্তের ফোঁটা, রাস্তায় ভাঙা ঘরবাড়ি
আগুন জ্বলছে দূরে দূরে, আগুন অন্ধকার ভারি
আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো
দূরে যাই আরো দূরে যাই, কাছে আসি আরো কাছে আসি
জমে থাকে চোখে চোখে জল, জমে থাকে পাতা রাশিরাশি
আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো
তার অশ্রুর রং ফিকে নীল
তার নখদর্পণে মুখ দেখি
আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো
তার মাথা ধরে, প্রায়ই মাথা ধরে
তার মনখারাপের দিন কাটে
আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে চলো
   
  রাস্তায় অনাথ ছেলেরা, রাস্তায় শিশুদের লাশ
নিয়ে যাই ঝিনুকের দুল, নিয়ে যাই সোনালী পলাশ

              রাত ১১.১৫ মিনিট
               ২৯/৩/৮৯

গ.

১.

শেষমেশ আমাকে তো থেকে যেতে হয়
ঘরেরই মধ্যে – ঘরে – ঘর থেকে ঘরেরই মধ্যে

বাংলা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ
ও তারপর এশিয়া, তা থেকে
লাতিন আমেরিকা
বা আফ্রিকা বা...

যখন বাংলায়
আমি আমার রাজ্যের মধ্যে থাকি
বেরিয়ে গেলে
আমি আমার দেশের মধ্যে থাকি
বেরিয়ে গেলে
আমি আমার মহাদেশের মধ্যে থাকি
বেরিয়ে গেলে
আমি আমার পৃথিবীর মধ্যে থাকি

আমি আমার ঘর থেকে ঘর তা থেকে
ঘরেরই মধ্যে
থাকি

২.

তাই, বুঝলেন রবি বাবু, আসুন
থিতু হয়ে ঘরেই বসা যাক।
এখানে আছেন
লি-পো, রুবেন দারিও, ওয়ল্ট হুইটম্যান
আছেন উগো, ব্রাউনিং বা ফ্রস্ট
আমরা – বিভিন্ন বয়সের ছোঁড়ারা
(ছুঁড়িরাও থাকতে পারেন কেউ কেউ)
বসে বিবেচনা করি
কখনই – কোনো অবস্থাতেই –
ঘর থেকে বেরুনো যায় কিনা

৩.

মোদ্দা এটাই সমস্যা
আমি আমার মধ্যে থেকে বেরিয়ে
আমাদের মধ্যে থাকতে চাই কিনা

এবং, আমরা
আমাদের মধ্যে থেকে বেরিয়ে
আমার মধ্যে থাকতে চাই কিনা

আজ এই বৈঠকে
আপনাদের এই মীমাংসাটা করে
যেতে হবে।

আর আমি দরজায় নিশিগ্রস্ত
পাহারাওলার মত
ঠায় জেগে থাকবো,
আপনারা পালাবার চেষ্টা
করলে বেদম ঠ্যাঙানি খাবেন
আমি
কিছুতেই মীমাংসা না করে
আপনাদের উঠতে দেবোনা

(মূল পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, এই কবিতার দ্বিতীয় অংশটি শেষ করার সময়ে, বর্তমানে যেখানে শেষ হয়েছে দ্বিতীয় অংশ, তারও পরে আরেকটি স্তবক লিখে জয়দেব দ্বিতীয় অংশ শেষ করেছিলেন – ‘কিংবা / কখন – কোন অবস্থায় / আমি আমার মধ্যে থেকে বেরিয়ে / আমাদের মধ্যে / থাকা শুরু করতে পারি’। কিন্তু পরে, লেখার মধ্যেই, দ্বিতীয় অংশের থেকে এটা তিনি নিজেই বাদ দেন। তার বদলে, এই একই ভাবনা, সামান্য ভাষা পাল্টে, তৈরি হয়ে উঠলো তাঁর এই কবিতারই তৃতীয় অংশের প্রথম স্তবক। তাছাড়া, তৃতীয় অংশের শেষ স্তবকের পঞ্চম এবং ষষ্ঠ লাইনের মধ্যেও প্রাথমিকভাবে মূল পাণ্ডুলিপিতে আরেকটি লাইন ছিল – ‘আমার হাতে’। সেটিও মূল পাণ্ডুলিপিতেই কবিকর্তৃক বর্জিত হয়।)

ঘ.

কবি কেন কমিউনিস্ট হয়

কবিরা গরিব হবে এটা বেশ ফর্মুলা হয়ে গেল তবে।
কবিরা ছাগল হবে, ক্রমাগত প্রেমে পড়বে ননীর পুত্‌লীদের,
ছাত্রীরা নিয়মিত প্রেমপত্র দেবে আর নির্দিষ্ট সময়ে
ড্যাঙশ ড্যাঙশ করে খুঁট ধরে চলে যাবে শাঁসালো পতির;
এরকমই ফর্মুলা ছিল, হায়, কবিরা বেকার ছিল সে সময়ে

কবিরা চাকরি পায় আজকাল, তবুও গরিব থেকে গেছে
জুলজুল করে দেখে অকালের ফুলকপি জামাইষষ্ঠীতে
বেকার থাকার কালে কবিতাও রাগ-ব্যথা-অভিমান নিয়ে
অনেক সরল ছিলো, চাকরি পাবার পরে অতি সাম্প্রতিক
কেরাণীর কুটিলতা এসে গেছে শরীরে-অন্তরে

কবিরা গরিব হবে এটা তবু প্রথাসিদ্ধ কথা
গরিব না হলে যেন কবিতা হয়না, যেন অন্য সব পেশা
কবিতা লেখার চেয়ে শ্রম-বুদ্ধি দাবি করে বেশী
মহার্ঘভাতার দাবি সেহেতু তাদেরই শুধু, প্রেম ও সম্মান
কেবল তারাই পাবে – এরকম আপ্তবাক্য আজও দেখি উচ্চারিত হয়
#
অধিকার কেড়ে নিলে কেবল তখনই আসে একমাত্র জয়
কবিরা গরিব তাই কবিদেরই কমিউনিস্ট হয়ে যেতে হয়

              রাত ২.০৭ মিনিট
               ১১/১১/৮৭

ঙ.

এখন সব পাল্টে গেছে,
সত্যি বলছি অনেক আমি করে দেখলাম
রাতবিরেতে মদ্যপানে, কিংবা গানে
হদ্দ কোনো মেয়ের টানে
হয়না কিছুই, কেউ বলেনা
আধুনিকতা, বরং এসব কথার কথা
অগ্রজেরা মিষ্ট হাসেন, ভালওবাসেন
তাদের যত নষ্টস্মৃতি এসব দেখে
ওমের মধ্যে গুটলি পাকায়, কাজেকাজেই
হয়না কিস্যু, এখন বোধহয়
জামার বোতাম, জুতোর ফিতে
নিখুঁত রেখে, পাঁজর ঢেকে
ঠাণ্ডা মাথায় ভাবনা ভালো
এখন তো সব পাল্টে গেছে
লিখতে হলে লেখাই ভালো

              রাত ১২.৩৩ মিনিট
               ৩১/১০/৮৭

অঙ্কন - সৌজন্য চক্রবর্তী
শেয়ার করুন: