টুটাফাটা গল্পগাছা

রবিশংকর বল

বাশোর ‘দ‍্য ন‍্যারো রোড টু দ‍্য ডিপ নর্থ’ এর অনুবাদ দিয়ে শুরু হয় ‘চন্দ্রাহতের কুটির’ আখ‍্যানটি। এই বইটির মুখবন্ধে রবিশংকর বল লিখেছিলেন, ‘এ লেখা আমি একা লিখিনি, সপ্তদশ শতকের জাপানি কবি মাৎসুও বাশো এখানে আমার লিখনসঙ্গী।’ ১৯৮২ সালে রবিশংকরের প্রথম প্রকাশিত বই ‘হেমন্তের এলিজি ও অন্যান্য’। এক ফর্মার কাব‍্যগ্রন্থটি তিনি নিজের উদ্যোগে বার করেছিলেন। দাম মাত্র এক টাকা। সেই সময়ে দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার বুক রিভিউয়ের পাতায় ওই শীর্ণকায় বইটি প্রশংসিত হয়েছিল। কিছুদিন পর নিয়তির লিখন অনুসারে রবিশংকর আর আমি যখন দীর্ঘ পথ হেঁটেছি, তখনই দেখেছিলাম বোদলেয়ার, রিলকে, লোরকা আর জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আচ্ছন্ন এক মাতাল পাঠককে।

১৯৮৩-৮৪ সালে লেখা হয়, ‘হাজার বছরের নিঃসঙ্গতা’ নামে এক দীর্ঘ কবিতা। আশির দশকের শেষে রবিশংকর লিখেছিলেন ‘নাবিক ও নার্স’ নামে একটি কাব‍্যনাট‍্য। সেই পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। পঁচিশ বছর পর অলৌকিকভাবে ফিরে পেলে ‘বাতিঘর’ পত্রিকা ২০১১ সালে খুব যত্ন করে তা প্রকাশ করে।

পরবর্তী সময়ে, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ আর খবরের কাগজে ফিচার লেখার মাঝে মাঝে রবিশংকর কবিতা লিখে গিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে টাকির ইছামতি নদীতীরে দাঁড়িয়ে শিকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণাভোগের পর লেখা হল দেশভাগের কবিতা। পরের বছর জানুয়ারির বইমেলায় ‘বিষয়মুখ’ পত্রিকার বন্ধুরা সেই কবিতাগুচ্ছকে দুই মলাটে বন্দি করে ফেলেন। রবিশংকর তার নাম রাখেন ‘ত্রস্ত নীলিমা’ । সুন্দর ছিমছাম মলাটখানি ।

এইসব কবিতাগ্রন্থ ও আরও বিভিন্ন সময়ের লেখা কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘উনপঞ্চাশ বায়ু’। রবিশংকর তাঁর অন্তঃস্থলে, মেধায়, মননে গোপন প্রেমের মতো কবিতাকে লালন করছেন। তাঁর উপন্যাস বা গল্পের ভেতরে তো ভিন্ন ভিন্ন কবিতাকেই খুঁজে পাওয়া যায়। রবিশংকর চলে যাবার পর তাঁর যাবতীয় পাণ্ডুলিপি, বই-খাতা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে হাতে এসে যায় লাল টুকটুকে ছোট একটা নোটবুক। মেয়ে তিয়াসা বাবাকে উপহার দিয়েছিল। বেশিরভাগ পাতাই শূন্য। মাত্র কয়েকটি পাতায় লেখা আছে ‘টুটাফাটা গল্পগাছা’। নয়টি পাতার মধ্যে ধরা রয়েছে দশখানি কবিতা। সেই কবিতাগুচ্ছই পাঠকদের সামনে উপস্থিত করা হল।

সীমা বল।

একটা গল্প আমার পাশে পাশে হাঁটছে।
সে তার ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছে।
খুব ত্রস্ত ভাবে সে জিজ্ঞাসা করছে,
আমি তার নতুন একটা ঠিকানা খুঁজে দিতে পারি কিনা

পুরনো ঠিকানাতেও পৌঁছে দিতে পারি
আমি তাকে আশ্বস্ত করি।
কিন্তু সে একটা নতুন ঠিকানায় ঘর বাঁধতে চায়
কেন? সেখানে নতুন কী পাবে? আমি বলি।

গল্পটা আমার হাত আঁকড়ে বলে,
আমি একটা স্মৃতি চাই,
একমাত্র নতুন ঠিকানাতেই আমি তাকে পাব,
স্মৃতির সঙ্গে সহবাস হবে।

আমি তার নতুন ঠিকানা খুঁজে দিয়ে
আবার হাঁটতে শুরু করলাম
সে জানতেও পারল না, স্মৃতির ঝাঁপিতে
আমি একটা বিস্মৃতির সাপ রেখে দিয়েছি

অন্ধকারে এসরাজ একা শুঁয়ে আছে
তুমি তাকে বাজাবে না?
এই উন্মাদ এসরাজ একা একা শুয়ে কাকে খোঁজে।
সে কি ভেজানো দরজার ওপার থেকে
আসা নীল আলো?
না কি রমণীর দীর্ঘ এক চুল
স্নান সেরে এসে যে এখন
টানা বারান্দায় পড়ে আছে?
আর কিছু পরে উড়ে যাবে
ঘুমন্ত এসরাজের থেকে বহু দূরে।

এসো, আজ তবে ওর স্বপ্নের ভিতরে ঢুকে পড়া যাক।
ঘুমের ভিতর কী দেখে সে? এই এসরাজ?
রমনীর দীর্ঘ চুল ভেসে যায়
সুরের সাম্পানে?

কেউ থাকবে না,
বলে তুমি চলে গেলে।
সন্ধ্যামণি কি তবে ফুটে উঠল?
আলোকলতা কি হাত বাড়াল?

যাঃ কী যে বলো,
তুমি তো থাকবেই
আমার নেশারু বুকের ওপর জেগে ওঠা
নীল শিরার মতো।

শিরার ভেতর রক্ত ছোটে একা একা
আমি তার গল্পের পিছনে পিছনে...

আপাতত এইটুকুই আত্মহত্যার নকশা

স্বপ্নভূক দুটি গাছ একা একা দাঁড়িয়ে, প্রান্তরে
মাটির গভীরে এ-ওর শিকড়ের
রক্ত চুষে খায়

পরস্পরকে হত্যা করতে করতে দাঁড়িয়ে থাকে
স্বপ্নভূক দুটি গাছ

পূর্নিমায় সারা রাত তাদের ফিসফিস কথা শোনা যায়

শুঁড়ের মতো কিছু একটা
গলার ভিতরে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে নামছে,
নাভি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার কথা—
গোপন অক্ষরগুলি তুলে আনবে,
এমনই রটনা আছে

নাভি ভয়ে ভয়ে থাকে,
গোপনতাগুলি চলে গেলে
সে কি উল্কাখণ্ডের মতো
শরীর থেকে খসে পড়বে

কিছুই বলি না আর –
নিঃসঙ্গ বছরগুলির চেয়ে থাকা
পটচিত্রের মতো বিছিয়ে দিয়েছি,

দুখুশ্যাম বলেছিল, কথাগুলো এখন নয়
চালের বাতায় গোঁজা থাক,
তাই হোক। এখন শুধু ছবি আর রং

ঈশ্বর মৃত,
নীৎশে বলেছিলেন

তাহলে ঈশ্বরের জন্ম কবে –

এই প্রশ্নের খোঁজেই
চরাচরের ইতিহাস
লেখা হতে থাকে

ঝরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করি,
পত্রমর্মরের জন্য অপেক্ষা করি,
আহ্নিকগতির শব্দের জন্য অপেক্ষা করি,
আর তোমার মৃত্যু ...

আলতা-পায়ের ছাপ
এই দু-একটি সাধ শুধু রাখো

১০

তোমার মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারী নয়
তোমার মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা নয়

আমি সত্যিই জানি না,
কার সঙ্গে তোমার মৃত্যুর তুলনা

তুমি নেই— সত্যি মরে গেছ?
তোমার সঙ্গে কি কারও তুলনা করা যায়

অঙ্কন - মৃণাল শীল
শেয়ার করুন: