দেখোরে নয়ন মেলে জগতের বাহার

অমিতাভ সমাজপতি
নয়ন কে মেলিবে?
কাহার নয়ন আছে যে মেলিয়া ধরে?
কাহার নয়ন দেখে এ জগৎ পানে?

এ জগৎ এক মহা ধর্মশালা। এখানে মুসাফিররা আসে। বিশ্রাম নেয়। খায়, বসে। হাসে-কাঁদে-নাদে। রাত্রি যাপনে কাঁপন ধরে। শুরু হয় আলাপ, প্রলাপ, জোলাপ, গোলাপ, মিলাপের সংলাপ। ক্রমশ যত রাত বাড়ে ধান্দাবাজি, হেক্কড়বাজি, টিকরমবাজি, ছয়লাবাজি, দোকলাবাজি একেবারে বাজিগরের মতো সেরে নেয়। তারপর ফন্দিফিকির ইকিরমিকির চামচিকির ওইটুকু রাত্রিতে গুঞ্জায়িশ তোলে, একসময় ওম ভাঙে। ভোর হয়, দোর খোলে। কেটে পড়ে। যাওয়ার সময় মাথাটি নড়ে – যাবো না, যাবো না... আমার বাদলের গান হয়নি সারা। যমরাজ চিৎকার করে ওঠে, ম... নি... কা! ও মাই ডার্লিং... পিয়া তু অব তো আ যা... আঃ... আঃ... তারপর, খোদা হাফি(পি)স। চিরকালের জন্য পিসফুলি হাপিস। এতসব কিছুর মধ্যে নয়ন মেলার সিন কোথায়? সুবোধ ঘোষের একটা গল্প পড়েছিলাম। সম্পর্ক হাপিসের গল্প। এক প্রাক্তন দম্পতির দেখা হয়েছিল একটি অখ্যাত স্টেশনের প্লাটফর্মে। মনোমালিন্য হয়ে তাদের সম্পর্কে ছেদ হয়েছে অনেকদিন। আবার ঘটনাচক্রে তারা আটকে পড়ে সেই স্টেশনে। কথা হয় সুখ দুঃখের। চা খাওয়া হয়। একসময় ট্রেন আসে। তারা চলে যায় বিপরীত গন্তব্যে। পড়ে থাকে চায়ের কাপ দুটি। যেন দুই বিচ্ছিন্ন মানুষের একদা সম্পৃক্ততার শেষ প্রতীক। তাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। দুটি মানুষ পরস্পরের থেকে বেমালুম হাপিস হয়ে গেল। তাকাবার জন্যেই দুইটি নয়ন। একেবারে অত্যাধুনিক ক্যামেরা লেন্স অক্সিপিটাল লোব সহ। ব্রেন ভ্যাট ভ্যাট কম্পিউট করে মেলে ধরছে। কখনও মিড শট। কখনও লং। জুম চার্জ, জুম ব্যাক। ক্লোজ আপ। বি-গ ক্লোজ আপ... সব ওইটুকুতে ঠাসা। কী বললেন? তাকাবেন না? পচে গেছে? আচ্ছা, তবে শুনুন আর একটা গপ্পো। এ আমার ছেলেবেলায় পড়া।চার্লস ডিকেন্সের ‘এ টেল অব টু সিটিজ’। তিনি লিখেছেন... এ এক আশ্চর্য ক্রান্তিকাল। সময়ের আলো-আঁধারিতে ইতিহাসের গোধূলি আশ্বাসে নৈরাশ্যে খন্ডিত। জ্ঞানের সঙ্গে সংঘর্ষ অবিদ্যার। বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বিধার। স্বর্গ-নরকের কিনারা নেই... ইত্যাদি ইত্যাদি... । তো সেই গল্পে এক কন্যা তার দশ বছর জেলে পচতে থাকা বাপকে জেল থেকে বার করে বলেছিল... দেখোরে নয়ন মেলে জগতের বাহার... । একদিকে ডিকেন্স বলছেন, স্বর্গ-নরকের কিনারা নেই,অন্যদিকে তাঁর গল্পের নায়িকা জগতের বাহার দেখাচ্ছে। সুতরাং সবকালেই গল্ডগোল ছিল… । তাই বলছি জগতের বাহার দেখতে হলে নয়ন খুলতেই হবে। ধরুন আপনি যদি একদিন অর্থাৎ চব্বিশ ঘন্টা নয়ন বুজে থাকেন – তারপর চোখ খুলে দেখবেন ইতিমধ্যে আমাদের এই পবিত্র দেশে ছশোর অধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ছশো’ সংখ্যাটা নিয়ে আপনার পাড়ায় বেরিয়ে পড়ুন। এবার বাড়িগুলো গুনুন। অ্যাভারেজ কষে গুণ করে হিসেব করুন – দেখবেন,একদিন চোখ বন্ধ রেখে ফের খোলার মধ্যে আপনার এই দেশ একটি মস্ত পাড়া তৈরি করে ফেলেছে।

"একটা ছোট্ট চড়ুই পাখি তাকে গল্প বলতে শুরু করল… রাজধানীর দুঃখের গল্প।"

হতাশ লাগছে? তা লাগুক। আপনাকে আর একটু হতাশ করার ইচ্ছে হচ্ছে। ওই একদিনে ঝাঁ চকচকে ২০১৮ সালের আধুনিক ভারতে ভারতে প্রায় ষাট থেকে সত্তর জন লোককে বিষাক্ত সাপে কামড়ে মেরে ফেলেছে।অন্তত পাঁচটি কন্যা ধর্ষিত হয়েছে। যক্ষ্মা… ক্যানসার… কয়েক কোটি টাকার গুটকা নামাকয়া থুতু নিক্ষেপিত হয়েছে… ।

কী বললেন? নয়ন বুজে ফেলেছেন? সেকি! ঘাবড়ালে চলবে কেন? রম্যরচনায় সিরিয়াস কিছু পড়বেন না? তা বেশ, পুজো তো এসে গেল। তো পুজোর গল্প শুনবেন? কবি সাহিত্যিকদের গল্প? তা হলে নয়ন মেলুন… শ্যেনদৃষ্টি দিন অস্কার ওয়াইল্ডের মতো। সুখী রাজপুত্র দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজপথে পিতলের মূর্তি হয়ে। একটা ছোট্ট চড়ুই পাখি তাকে গল্প বলতে শুরু করল… রাজধানীর দুঃখের গল্প।

চলুন, আমরাও তাই করি। আমি চড়ুই, আপনি পিতলের মূর্তি।

ওই দেখুন, কবি বসে আছেন। ঘরে একটা মাত্র আলো। কবিতা আসছে জলস্রোতের মতো, অথচ তিনি গদ্য লিখছেন দুই হাতে। একটু আগেই কবিপত্নী স্বামীর সঙ্গে বাক এবং মুষ্টি দুই ধরণের যুদ্ধে জয়ী হয়ে রান্নাঘরে গেলেন। কবি তারপর অধোবদনে টেবিলে বসে পড়লেন। গদ্য লিখতে হবে। গদ্য ছাড়া পয়সা নেই। পদ্য আর লিটিল ম্যাগাজিন তার জীবন-যৌবন ব্যর্থ এবং অর্থহীন করে দিয়েছে। কবি তাই পুজোসংখ্যার গদ্য লিখছেন – পয়সা হবে। কবি পাতা দুয়েক লিখেই পেন কামড়ে বসে আছেন। ওদিকে রান্নাঘরে কবিপত্নী খুন্তি নাড়ছেন আর গান গাইছেন – পয়সা নাই যার মরণ ভালো এ সংসারেতে... কবি গদ্যের খাতায় লিখে ফেললেন –

‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান।’

ইঁদুর মারার ওষুধের বিজ্ঞাপন কাল ট্রেনে দেখে এসেছেন। তুঁতে সম্বন্ধে তাঁর ধারণা নেই... ফলিডল তাঁর কোমল স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না।

নয়ন বুজবেন না। প্লিজ। কবির জানলায় পাখি হয়ে চিৎকার করে বলুন – মা নিষাদ...

"কেউ বুঝবে না। নো প্রবলেম। প্রবলেম যেখানে, সেখানে ধাওয়া করো।"

এবার চলুন যাই গদ্যকারের গর্ভগৃহে। ইনি হলেন যাকে বলে ‘কেয়া বাত’ লেখক। প্রতি পুজোয় খানতিনেক উপন্যাস, বারো-চোদ্দটা গল্প লিখতেই হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়। লেখক এখন তার টেবিলে। হাতের কাছে একগাদা ইংরেজি বই। কম্পিউটারে বোতাম টিপছেন। দো কা চার, চার কা আট – এই নিয়ম ঘুরপাক খাচ্ছে। সাহিত্য ছেড়ে লেখক এখন বিশুদ্ধ গণিত চর্চা করছেন। তার টেবিলে পিথাগোরাস কোরাস গাইছে – ‘আজ সবার রঙে রঙ মেলাতে হবে’... পারমুটেশন কম্বিনেশনের খেলা চলছে। কম্বিনেশন ইজ দ্য এসেন্স অফ অল গ্রেট ওয়ার্কস... অতএব চার পাঁচটা বই। প্রথমে গল্পগুলো ঘুলিয়ে ফেলে ক্রমে একটা ঘোল তৈরি হল। ঘোলে অথবা লস্যিতে যেমন ফেনা উঠে আসে গ্লাসের মুখ অবধি, ব্যাপারটা তেমনি ফুলেফেঁপে উঠল একসময়। এবার সরু প্লাস্টিকের পাইপরূপী কলম দিয়ে সুরুৎ করে পুরো জিনিসটাকে টানতে হবে। ব্যাস! একদমে শেষ। কিন্তু শেষ হয়েও হয় না তো শেষ। যে তৃষ্ণা সে তৃষ্ণাই থেকে গেল। তা হোক। নেমে তো গেল। ল্যাজার সঙ্গে মুড়ো জুড়ে যায় বেমালুম। ল্যাটিন আমেরিকার মাথা, ইউরোপের মুড়ো আর প্রাচীন সংস্কৃতের আঁকা একসঙ্গে সেঁটে দাও। চকাচক হো যায়েগা। কেউ বুঝবে না। নো প্রবলেম। প্রবলেম যেখানে, সেখানে ধাওয়া করো। পুরস্কার যাদের হাতের খেল তাদের বাড়ী বাড়ি ঘোরো। তেল নিয়ে যাও। তেলে তেলে সব বন্ধন যাক ঘুচে। ঢেলে দাও দাদা-দিদিদের পায়ে। চটকাও। দলাইমলাই করো। পুরস্কার মিলে গেলেই বেস্ট সেলার। তার আগে বেস্ট সেল করে দাও... মালামাল কারবার।

এবার সাহস করে লেখকের ঘরে মুন্ডুটা ঢুকিয়ে বলুন, ‘লেখক, ভালো কিছু লেখো।’

ঢুকেছেন? আচ্ছা। বলেছেন? আচ্ছা। কী বলল?

বলল, ‘মারব শুয়ারের বাচ্চা।’

নো ম্যাটার, ওটা উত্তর আধুনিক টেক্সট।

চলুন, এবার যাই গানের জগতে।

পুজোর গান, আহা রে... বাহারে... গান কয় কাহারে... গান হি গান। যারা আমার বয়সি তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে পুজোতে শারদ অর্ঘ্য হিসেবে নামী রেকর্ড কোম্পানি একটা আস্ত বই তৈরি করে ফেলত। তাতে কত গান কত কণ্ঠ... কত সুর। ইলা বসু দিয়ে শুরু তার পর যথাক্রমে নির্মলা মিশ্র-সন্ধ্যা-সতীনাথ-মান্না-হেমন্ত-আশা-আরতি-কিশোর-লতা... সঙ্গে কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তি।

রেডিয়োতে, মাইকে পুজো রঙ ছড়াতো সুরের। আর এখন? কে যে গায়? কখন যে গায়? কেন গায়, কী ভাবে গায়, কোথায় গায়, কেনই বা গায়? হায় রে গান! আমার শৈশব- যৌবনের গান। কবে যে তারা চলে গেল... এখন গান আর সরস্বতীর সাবজেক্ট নয়। শুনেছি বিশ্বকর্মা অধিগ্রহণ করেছে তাকে। সুর এখন আর স্বর-আশ্রিতা নয়। যন্ত্রপাতি সহযোগে কম্পিউটার তাকে হজম করে ফেলেছে।

এক রেকর্ডিং রুমে মিউজিক ডিরেক্টর সেদিন ভয়ংকর ধমকে উঠলেন গায়ককে –

কী হচ্ছে কী এটা?

কেন দাদা, ভুল হল?

ভুল মানে! এত সুরে গাইছ কেন? গান গান লাগছে...

তাহলে?

আরে আইটেম, আইটেম গাও। দিস ইজ অ্যান আইটেম সং। হোয়াট ইজ অ্যান আইটেম সং?

গায়ক চুপ। এতদিন তিনি ক্লাসিক্যাল, সেমিক্লাসিক্যাল, লাইট ক্লাসিক্যাল, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল, আধুনিক। ফিলমের গান এই সব শুনেছেন... কিন্তু এই আইটেম...

অ্যান আইটেম সং মিনস্‌... ওহ! কী করে বোঝাই? ধরো তুমি অর্থাৎ তোমার গানে যে লিপ দেবে সে দশ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। ব্রেক ফেল করল! সোজা নীচে... গভীর নদী... সাদা ফেনায়িত জলস্রোত... বরফ চারিদিকে। তার পাড়ে কতগুলো হাফ-উলঙ্গ মেয়ে নাচছে। তুমি অর্থাৎ নায়ক পড়ে গেলে কিন্তু মরলে না, এমনকী, তেমন জখমও হলে না, শুধু আর্টিস্টিক্যালি সরু একটা রক্তের ধারামুখের একপাশ বেয়ে নেমে গেল... তুমি মরতে পার না। এইবার তুমি এই গানটা গেয়ে উদ্দামভাবে মেয়েগুলির সাথে নাচতে শুরু করলে। আর একটা কথা মনে রেখো, এই গানে তোমার নিজস্ব স্বর ব্যবহার করবে না।

"একটু নাকের আওয়াজ মিশিয়ে দিতে পারলে ফ্যান্টাস্টিক হবে..."

তবে?

আরে, গলার স্বরটা একটু বিকৃত করো... ভাঙা ভাঙা... ঠান্ডায় গলা ভেঙে গেলে যেমন হয় আর কি... একটু নাকের আওয়াজ মিশিয়ে দিতে পারলে ফ্যান্টাস্টিক হবে... মাঝে মাঝে হাঁপানির মতো টান... ক্লিয়ার?

গায়ক ঢোঁক গিলে মাথা নাড়লেন।

লুক, এই গানের সুরটা কার?

আপনার।

তোমার মুন্ডু। এটার মুখড়াটা আমি একটা ইংরেজি গান থেকে ঝেড়েছি, অন্তরা সাউথ ইন্ডিয়ান একটা গানের হুবহু কপি... পুরো অ্যারেঞ্জমেন্টটা আফ্রিকান ঢঙে... মিনস?

বুঝলাম না।

চোখ বোজো। নাউ থিঙ্ক অফ বিপস। বিপস কী? বিপাশা বসু, থার্টি সিক্স, টুয়েন্টি ফাইভ, থার্টি সিক্স... কাম অন... ওয়ান টু থ্রি ফোর...

একি! আবার চোখ বুজছেন? না না, ভগবান এত সুন্দর একজোড়া চোখ দিয়েছেন মেলে ধরবার জন্যই তো... কত কিছু দেখার বাকি... ছবি দেখবেন, ছবি?

দেখব, সেখানে তো আর...

না না, আগে কিছু বলব না। চলুন, এই সময়কার এক ফাটাফাটি চিত্রকরের বাড়ি যাই। সে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছে সারা দেশ। তার ছবি দমাদম ফাটছে। তিনি খুব উজ্জ্বল ছবি আঁকেন। তার রঙ আসে বিদেশ থেকে, তুলি আসে বিদেশ থেকে। তিনি সব্যসাচী চিত্রকর। কড়কড় করে থুতু দিয়ে নোট গোনেন দশ আঙুলে... তো এই চিত্রকর কোনো গরিব লোকের ছবি আঁকেন না। তাকে সাংবাদিকরা একবার এই বিষয়ে প্রশ্ন করেছিল। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, দেখুন, ছবির বায়ার কারা? হু আর দ্য বায়ারস? ছবি কেনে বড়লোকেরা। তারা ঘরবাড়ি বানায় লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে। সেই ঘরে উজ্জ্বল, সুখী নারীর ছবি ছাড়া মানায়? আপনারাই বলুন, সেখানে যদি আমি দুর্ভিক্ষের ছবি আঁকি জমবে? ধরুন আমি একটা রুগ্ন দুঃখী মুখ আঁকলাম – তাতে মনের মধ্যে যে ইমপালসিভ রি-অ্যাকশন হবে তা ওই সুন্দর ড্রয়িং রুমের পক্ষে রিভার্স একটা ইন্ডাকশন তৈরি করবে। সমস্ত ব্যাপারটাই তাতে ভেটকে যাবে। আপনারা কী বলেন?

সাংবাদিকরা বাক্যিহারা। জবাব নেই। শিল্পী বিজ্ঞের হাসি হেসে মন দিলেন তার পরের ছবিতে। তাতে ঝকাস বডি, ঝকাস বুক, ঝকাস পিঠ, ঝকাস কার্ভ, ঝকাস রঙ, ঝকাস ক্যানভাস, ঝকাস ফ্রেম, ঝকাস বাড়ি, ঝকাস গাড়ি, ঝকাস নারী, ঝকাস দাম – এককথায় সমস্ত ব্যাপারটাই ঝ-কা-স!

ঝকাস মানে বুঝলেন না? ঝকাস মানে হল গিয়ে... ওই ইয়ে... মানে ফাটিয়ে দেওয়া... ভিত্তর করে দেওয়া আর কি।

"হাঁস রে হাঁস, তোর পিছনে বাঁশ দেব..."

কিন্তু এটা তো ঠিক ছবি হল না।

চিত্রকর হো হো করে হেসে উঠে বললেন, তাহলে একটা গল্প বলি শুনুন – এক কবি আর এক হাঁসের খুব বন্ধুত্ব হয়েছে। কবি হাঁসের সঙ্গে সর্বদা পদ্যে কথা বলেন। একদিন হাঁস জলে সাঁতার কাটছে। কবি বসে আছেন পাড়ে। হাঁসকে ডাকছেন। হাঁস আসছে না। কবি রেগে গিয়ে বলল, হাঁস রে হাঁস, তোর পিছনে বাঁশ দেব...

হাঁস চিৎকার করে বলল, হল না, হল না, কবিতা হল না... মিলল না, মিলল না।

কবি ক্ষেপে গিয়ে বললেন –

মিলল না মিলল

তোর পেছন তো ফাটল।

হাঃ হাঃ হাঃ! শেয়ালের মতো হেসে চিত্রকর বললেন, আমারও সেই কথা – ছবি হল না হল, মাল্লু তো এল।

উঁহু-হুঁ, চোখ বুজবেন না প্লিজ। আপনার চোখ বোজা আর খোলা অনেকজটা চোখ মারার মতো হয়ে যাচ্ছে। ফট করে ইভটিজিং কেসে ফেঁসে যাবেন। তার থেকে চলুন এবার অন্য কোথাও যাই।

ও যাবেন না? যথেষ্ট হয়েছে? তা বেশ, আপনার যেমন ইচ্ছে। তবে দেখোরে নয়ন মেলে – এই সংক্রান্ত একটি গল্প শুনুন। গল্প নয়, এটা সত্য ঘটনা। এক সাংবাদিক গিয়েছেন এক পুরনো দিনের নায়িকা কাম গায়িকার কাছে। তাঁর আশি বছর বয়স। সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। অন্ধ।

সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন – আপনি যে দেখতে পান না, এতে আপনার কষ্ট হয় না? সেই আশি পেরিয়ে যাওয়ুয়া নায়িকা-গায়িকা এই কথা শুনে খুব হেসেছিলেন।

হাসছেন কেন?

হাসব না? তুমি বলছ আমি দেখতে পাই না বলে আমার কষ্ট হয় কিনা? বাপু, তুমি তো আমার নাতির বয়সি, সত্যি বলতো, তোমার কষ্ট হয় না?

আমি ঠিক বুঝলাম না। আমি তো দেখতে পাই। আমার কষ্ট কিসের?

সেই জন্যই তোপ হাসছি। চারিদিকে যা চলছে তা দেখতে যে তোমাদের কী কষ্ট হয় তা অনুমান করেই আমার অন্ধ চোখে জল আসে। তখন ভগবানকে ধন্যবাদ দিই এই ভেবে যে আমার পোড়া চোখদুটি কেড়ে নিয়ে তিনি কী অসীম দয়াই না করেছেন...

যাই হোক, আপনি অন্তত নয়ন মেলুন। কারণ, আপনি হলেন আমজনতা। বাকিরা সব কাঁঠাল অথবা আপেল জনতা। কাঁঠাল জনতা মানে গ্রামগঞ্জের মুখ্যুসুখু ফালতু গরিবগুরবো। সাইজে বড়ো, কিন্তুও দাম কম। ওদের পুড়িয়ে দিন, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিন, যেমন তেমনভাবে হাতের সুখ করে নিন, দেশের নো প্রবলেম। ওদের ধর্তব্যের মধ্যে আনবেন না। আর আপেল জনতা হল যারা আপনার মাথার উপরে। তাদের এই পোড়া দেশের ভালমন্দে কাঁচকলা। তাই এই আম শ্রেণীর জনতাকে চোখ মেলতেই হবে। আমের মধ্যে রকমফের আছে। আপনি হলেন হিমসাগর টাইপের। মিষ্টি হি মিষ্টি, প্রচুর ফলন। কিন্তু ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালী অথবা আলফানফো, এই শ্রেণীর জনতারও নয়ন আছে। কিন্তু তা যেন থেকেও নেই – সর্বদাই বোজা। যেমন ডাক্তারেরা – তাদের নয়ন মেললে চলে না। কারণ, তাদের মোটামুটি শিল্পপতি টাইপের স্ট্যাটাস রাখতে হয়। অতএব সরকারি কাজে ফাঁকি, প্রাইভেট প্র্যাকটিসে মনোযোগ। শিক্ষকের নয়ন মুদতে হয় – ইস্কুলে কম, প্রাইভেটে বেশি – এই ফর্মুলা রেখে চলতে হবে। শিল্পীর নয়নে দৃষ্টি নেই – তাকে বড়লোকের ড্রইংরুম সাজাতে হবে। কবির চক্ষু বোজা – তাকে বড় লেখা ছাপতে হবে। রাজনৈতিক নেতার নয়ন থেকেও নেই – তাকে বারবার ভোটে জিতে যাবজ্জীবন মন্ত্রী থাকতে হবে। খেলোয়াড়ের নয়ন খোলা থাকতে নেই – তাকে স্পনসর ফিট রাখতে হবে। নায়কের নয়ন নেই- তাকে ফাইটিং জানতে হবে। নায়িকার নয়ন নেই – তাকে অর্ধোলঙ্গ হতে হবে।

কী বললেন থামব কিনা? বেশ থামব। তবে, তার আগে রায় মশাইয়ের সুরে সেই গানটি ধরুন একবার – দেখরে নয়ন মেলে জগতের বাহার...

ও! ধরবেন না? বঙ্কিম আওড়াবেন? আম, আর সঙ্গে? বেশ তাহলে আসুন, বলুন –

এ নয়ন লইয়া আমি কী করিব?

এ নয়ন লইয়া আমি কাঁচকলা করিব।

অঙ্কন - জয়ন্ত বিশ্বাস
শেয়ার করুন: