ছোট্ট কোনও হনুমানটুপি

অধীর বিশ্বাস
মা বলল, ক্যাঁথা-কাপড়ের কাছে বসে থাক বাবা, কুকুর-বিড়াল যেন না ওঠে।

কঞ্চি নিয়ে বসে আছি তাই। 'আসুক না একবার, পিটোই ছাল তুলে দেব না!'

মা নিশ্চিন্ত। কাঁঠালতলায় রান্না করছে। এখানেও একটা রান্নার জায়গা করে দিয়েছে বাবা। চারটে খুঁটির মাথায় বেড়ার ছাপড়া দেওয়া, নীচে উনুন। ছাপড়ায় ঝুলকালি। বাতাসে তিরতির নড়ছে ঝুল। অল্প কিছু হলে, এখানেই রান্না করে নেয় মা।

রান্নাঘর থেকে এক-পাঁজা খড়ি (শুকনো ডাল) নিয়ে কাঁঠালতলায় দিয়ে এলাম। মা কী রান্না করবে, দেখে ফেলেছি। খেসারির ডাল, চালকুমড়ো-ভাজা। আমাকে দিয়ে চালকুমড়োর ফালি করে নিল মা। ফালি মানে, বঁটিতে দুই ভাগ। আর কিছু করতে হয় না। শুধু ভাগ। মায়েদের নাকি চালকুমড়ো ভাগ করতে নেই। পেয়ারাগাছে উঠেছি, সেখান থেকেও নামিয়ে আনল।

'ওরে, এট্টু কা'টে দিয়ে যা!'

"পারো এ সব? খালি উস্তাদি!"

জানি, দুই ভাগ করে না-দিলে চালকুমড়ো কাটতে পারবে না। এই সময় আমার মর্জি। যা খুশি মেজাজ করি। 'অত তাড়া ক্যা, পিয়ারাডা পাড়তি দেও!'

অসহায় মা। 'আয় রে, ইসকুলি যাবি তো, তাড়াতাড়ি করে দে, বাবা!'

ভাদ্দর মাসেই কাঁথা-কাপড় রোদ্দুরে দেয়। কদিন ধরেই বলছিল মা। করছি না দেখে আজ, নিজেই পাঁজাকোলে নামাচ্ছিল উঠোনে। দেখতে পেয়েই দৌড়ে গিয়ে বকা দিই। 'পারো এ সব? খালি উস্তাদি!'

চুপ করে যায়। বকুনি খায়। আমাকে দরকার পড়লে, মা-ই শোনে আমার কথা।

জালা থেকে এক এক করে বের করে উঠোনে ঢেলে দিয়েছি। জালার মধ্যে নামলে মাথা ডুবে যায়। ভিতরে নেমে এক এক করে বের করেছি কাঁথা-কাপড়। কাপড়চোপড় কই তেমন? ভরা খালি কাঁথা-বালিশ।

তলায় বিছোনো দুটো পাটি। এত দিনের গুমোটে-থাকা জিনিসপত্র রোদ পেয়েই গন্ধ ছাড়তে লাগল। শুধু গুমোট নয়, গুমোটের মধ্যেও কেমন যেন মিষ্টি গন্ধ এক। ওই গন্ধে, ইচ্ছে হচ্ছে কাঁথা-কাপড়ে লুটোপুটি খাই। কিন্তু বড্ড রোদ যে!

বাইরে ওই রোদ টপকে কুমড়ো ফালি করে এসেছি। কাঁঠালছায়ায় দাঁড়িয়ে দেখি ছেঁড়াভুড়ো লেপ-কাঁথারা জড়াজড়ি করে ওম নিচ্ছে। দাদার ছোট জামা এখান থেকেও কত ছোট লাগছে দেখতে। 'মা, ছোট হনুমানটুপি কিডা পরত, আমি?'

"এ সব কী এমন, রোদ্দুর দিয়ার জন্যি খ্যাঁচখ্যাঁচ করতে খালি!"

কুমড়ো-কাটা থেকে হাত নামিয়ে মাথা তুলল মা। দেখে বলল, উডা তোর।

'এত ছোট ছিলাম তহন ?'

'সগলিই ছোট থাহে। তোর মতো হলিই হাত-পা গজায়, ছোটবেলাডা দেখতি পায় না।' বলেই কাজে মন দেয় মা।

গুটিগুটি যাই উঠোনে। টুপিটা তুলে নিই। ছোট্টবেলা্র মুখ, ছোট্টবেলার কানঢাকা আমি। টুপিটা খুব আদরের হয়ে যাচ্ছে যেন। মাথার দিক ছেঁড়া। টেনে টেনে জোড়ার চেষ্টা করি। রেখে দিই। মাদুরের পাশ দিয়ে ঘুরতে থাকি। আর কিছু আছে আমার?

বাবার কোনও জামা দেখলাম না। একটা শুধু ধুতি। মা-র কাপড় যা, ভাল না তো! ছেঁড়া-ছেঁড়া। কুচড়িমুচড়ি হয়ে পড়ে আছে। ওর মধ্যেই সুঁচসুতোয় বোনা ঘোরানো পাখা আমাদের। লক্ষ্মীঠাকুরের জরি-দেওয়া ফালি কাপড়ও রোদে এসেছে। তিন-চারটে বালিশেই মাদুরটা ভরে উঠল। আবার কাছে গেলাম। বলি, এ সব কী এমন, রোদ্দুর দিয়ার জন্যি খ্যাঁচখ্যাঁচ করতে খালি!

'দিতি হয় রে, ভাদ্দর মাসে রোদ দিয়ার নিয়ম। রোদ পা'লি রোগবালাই গায়ে লাগে না।'

''ভাল জিনিস কিছুই তো নেই, ছেঁড়াভুড়ো ক্যাঁথা-কাপড় শুধু!''

'তবু। এই মাসেই যে! সব কিছু বুঝবিনে তুই!'

পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর পর আবার। সে দিন বাড়িতে দেখলাম জামাকাপড় রোদে দিতে। এ দেশে এসে বাড়ি করেছি একটা, দালানবাড়ি। ইট দিয়ে বানানো বাড়ির খুব শখ ছিল। পাকিস্তান ছেড়ে এসে নানান কাজ করে বেড়াই। রাতে ফিরি। এসে যখন টাকাপয়সা গুছিয়ে রাখি, তখনই মনে হত নানান কথা। চাকরি। দালানবাড়ি, একটা বউ। 'তুমি তুমি' করে কথা। এক দড়িতে আমার জামা, বৌয়ের শাড়ি। আর রইল বাড়ি। সওয়া কাঠা জমিতে ছোট্ট দালানবাড়ি হবে না? একখানা ঘর একটা পায়খানা-বাথরুম। দেওয়ালের সঙ্গে তিন ইঞ্চি ইট দিয়ে গাঁথা একটা রান্নাঘর হলেই হয়ে যাবে।

সেই বাড়ি। এই বাড়িতেই সে দিন ভাদ্দরের রোদ দিতে জামাকাপড় মেলা হয়েছে। আমাদের বড়দার ছোট বৌমা, মানে, আমারও বৌমা, সে এসেছিল এমনিই। রোদে-দেওয়া কাপড়চোপড় দেখে বলল, ও কাকিমা, এত এত কাপড় আলমারিতে ছিল? কত ব্লাউজ!

"দাদুভাইদের জন্য? ছোট্ট কোনও হনুমানটুপি?"

খুকু আমার বৌ। এখন সে ভারী হয়ে পড়েছে। জানি, রোদের একটা ব্লাউজও আর গায়ে লাগবে না। বলি, ও বৌমা, দেখো, যদি তোমার গায়ে হয়! কাকিকে বলে দু-একটা কাপড়ও নিয়ে যেও।

'ও কাকা, এত সুন্দর জিনিস সব! এ ভাবে ছিল?'

'গুঁজে-গুঁজে রাখার জন্যি এমন দেখাচ্ছে।'

আমাদের ওই বাড়ির ভাইপোরা কেউ তেমন কাজ করে না। করে, কিন্তু খুব কম রোজগার। প্রশান্ত একটা বড় কাগজের অফিসে টাইপ করত। পনেরো বছর পর ডেকে নিয়ে কার্ড জমা দিতে বলল। দুটো বাচ্চা অন্ধ মা। রোদে-দেওয়া কাপড়চোপড়ের মধ্যে বসে পড়ি। সেই গন্ধ না? পুরনো গন্ধ, মিষ্টি গন্ধ। ভাদ্দর মাসে কাঁথা-কাপড় উঠোনে পড়লেই একবার গড়াগড়ি দেবই দেব। এই বুড়োবেলার দিনে গড়াগড়ি না, খুকুর রোদে-দেওয়া জামাকাপড় দেখতে থাকি। দুই ছেলের নানা রকম জামা-প্যাণ্ট সোয়েটার মাঙ্কিক্যাপ। সেই গজকুমারের দোকান। বলি, ও বৌমা, নাও, বেছে নাও, ধরো!

খুকু বলল, যা পছন্দ, নিয়ে যা।

উজ্জ্বল হয়ে উঠল বৌমার মুখ। 'পুজোর জিনিস অনেক আগেই তো হয়ে গেল, কাকিমা।'

'খুকু, সোনাদের ছোট-হওয়া জামাকাপড় কিছু দেবে, দাদুভাইদের জন্য? ছোট্ট কোনও হনুমানটুপি?'

'থাক ওগুলো, ওদের বরং কিনে দিয়ো। ওদের ছোটবেলার স্মৃতি থাক আমাদের কাছে।'

তাই তো, মা-ও তো রেখে দিয়েছিল!

অঙ্কন - মৃণাল শীল
শেয়ার করুন: