রবীন্দ্রনাথের টানে বাংলায় ছুটে আসেন স্প্যানিশ অধ্যাপক

সমর্পিতা ঘটক

স্ত্রীর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন নৌকাডুবির স্প্যানিশ সংস্করণ(El Naufrago)। সেই শুরু। রবীন্দ্র-দর্শন বিশেষত শিক্ষাচিন্তা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে, ক্রমে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। রাবীন্দ্রিক ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে  শান্তিনিকেতনে এসে তিনি বাস করেন বছরের বেশিরভাগ সময়টাই আর রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই দিনের পর দিন মাসের পর কাটিয়ে দেন স্বভূমি থেকে বহু দূরে। বলছিলাম স্পেনের ভিগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হোসে  পাসের কথা। সুদূর স্পেন থেকে তিনি মনের তাগিদে ছুটে আসেন রূপসী বাংলায়। এই নামেই তিনি ডাকেন পশ্চিমবাংলাকে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘোরার পর তাঁর মনে হয় শান্তিনিকেতনের মতো লাবণ্যময়ী, সুন্দর জায়গা আর কোথাও নেই। তাঁর ভালো লাগে না শহর কলকাতা, ভালো লাগেনা সম্পদের হাহাকার আর মানুষের অভাব-বোধ। সরল সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত রবীন্দ্রভক্ত এই মানুষটিকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েই তাঁর গবেষণা ও কর্মকাণ্ড। এ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং নানা দেশে ঘোরেন, মানুষ জানতে পারে তাঁর রবীন্দ্রানুরাগের কথা। পর্তুগাল, বাংলাদেশ, ইংল্যন্ড প্রভৃতি দেশের আলোচনা সভায় এবং নানা পত্রপত্রিকায় রবীন্দ্র শিক্ষা-চিন্তার কথাই বারবার তুলে ধরেন তিনি। কবির শিক্ষাচিন্তায় আস্থা রাখা এই মানুষটি বিশ্বাস করেন কবি প্রচলিত শিক্ষা-রীতি পূর্ণ মানুষ তৈরি করে, তাই তিনি বর্তমান উন্মার্গগামী যুব সম্প্রদায়ের কাছে রবীন্দ্রনাথের বিকল্পহীন শিক্ষা চিন্তার কথা বলে সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার আবেদন রাখেন। এই প্রজন্মের ড্রাগাসক্ত উদ্ভ্রান্ত যুব সম্প্রদায় মুক্তির পথ খুঁজে পাবে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষায়। স্প্যানিশভাষী একুশটি দেশে কোথায় কীভাবে রবীন্দ্র-চর্চা হচ্ছে তার সুলুক সন্ধান করেন এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তাই ব্রাজিলের রবীন্দ্রভক্ত সেসিলিয়া মেইরেলেস যেমন তাঁর আগ্রহ সৃষ্টি করে তেমনি ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংযোগ নিয়েও তথ্যাদি সংগ্রহ করেন তিনি। শান্তিনিকেতনে যে ছয় মাস তিনি থাকেন প্রতিদিনই রবীন্দ্রভবনে গিয়ে চার পাঁচ ঘন্টা লেখাপড়া করেন। এই মানুষটির ভালো লাগে বাংলার শান্ত প্রকৃতি, সাঁওতাল শিশু আর কোপাই-খোয়াইয়ের নিরালা প্রবাহ।

স্প্যানিশ শব্দ Paz  শব্দের অর্থ শান্তি। তাঁর পদবী অনুসারে তিনি নিজেকে শান্তিদা নামে পরিচয় দেন। ভাঙা ভাঙা বাংলায় তাঁর গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার পর ইচ্ছে হয় তাঁর পিতৃদত্ত  নামের আগুপিছু বাদ দিয়ে তাঁকে শান্তিদা নামেই ডাকি। আমাদের রবীন্দ্রনাথ নিয়ে যাবতীয় হুজুগের অনেকটাই ২৫ বৈশাখ আর ২২ শ্রাবণ ঘিরে কিন্তু তিনি যাপন করছেন রবীন্দ্রনাথকে, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন শান্তিনিকেতনের মাটিতে আর  সাঁওতাল ছেলেমেয়েদের নিয়ে কিছু করার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছেন প্রণপণে।

কত ছাত্রছাত্রী এবং বন্ধু-বান্ধব স্পেন থেকে এসে শান্তিনিকেতন ঘুরে যান তাঁর হিসেব আমরা রাখিনা কিন্তু এই আকর্ষণের বাতাবরণ তৈরি করেছেন অধ্যাপক পাস। প্রসঙ্গত আর একটি স্পেনীয় মেয়ের কথা আসে, তাঁর নাম বেয়াত্রিস লেদেসমা। হুয়ান রামোন হিমেনেস কৃত রবীন্দ্র রচনার স্প্যানিশ অনুবাদের নেপথ্য কাহিনি নিয়ে গবেষণা করছেন বেয়াত্রিস। এই সংক্রান্ত গ্রন্থ হয়তো প্রকাশিত হবে শীঘ্রই। তাই বলছিলাম যে আমাদের জানা বৃত্তের বাইরে কত মানুষ রবীন্দ্র চর্চায় গভীরভাবে নিমগ্ন তার সন্ধান করা এই মুহূর্তে আমাদের একটি দায়। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে যখন এইসব খবর পাই তখন বাঙালি হিসেবে গর্ব বোধ করি। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে ততদিন এই অহঙ্কার থাকবে।

তথ্যসূত্র-

  • স্প্যানিশভাষী দুনিয়া ও রবীন্দ্রনাথ- সংকলন হোসে পাস, অনুবাদ-তরুণ ঘটক।
  • পত্র পত্রিকায় হোসে পাসের প্রবন্ধ ও নিবন্ধ।
  • হিস্পানিক দুনিয়ায় রবীন্দ্রনাথের পদিচিহ্ন- বেয়াত্রিস লেদেসমা।

(লেখক  অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরীর সম্পাদনায় বৈদ্যুতিন রবীন্দ্র-রচনা সম্ভারঃ ‘বিচিত্রা’য় গবেষণা কাজে সহকারী, প্রকাশিত স্প্যানিশ নাটিকা সঙ্কলনের ও গল্পের অনুবাদক, ওয়েব পত্রিকার নিয়মিত লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের কয়েকটি গ্রন্থের অনুবাদক। সাহিত্য, ভ্রমণ, চলচ্চিত্র, নাটক এবং ভাষা চর্চায় আগ্রহী।)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More