রিউম্যাটোলজি: পরীক্ষা-ওষুধের একমুখী চিকিৎসা নয়, অভিজ্ঞতা আর অনুসন্ধানের মেলবন্ধনই পথ দেখাচ্ছে আধুনিক গবেষণায়

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

বয়স যাই হোক, পেশা যাই হোক, শরীরের নানা রকম ব্যথা নিয়ে সমস্যায় পড়েন না, এমন মানুষ ইদানীং কমই রয়েছেন। শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা হোক, বা বিশেষ কোনও কারণে হাড়ের ব্যথা– নানা রকম অসুবিধা নিয়ে নাজেহাল সব বয়সের বহু মানুষ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘রিউম্যাটোলজি’ অধ্যায়ের পর্দা যত খুলছে, ততই সামনে আসছে এই নানারকম ব্যথার কারণ ও ফলাফল। বাতের ব্যথা ধরা পড়ছে প্রায় মহামারীর মতো। বাত হওয়ার জন্য এখন আর জরুরি নয় কোনও বয়স, কোনও কারণ। যে কোনও মানুষই এর শিকার হয়ে উঠতে পারেন যে কোনও সময়। কিন্তু আসল সমস্যা বোধহয় কেবল ব্যথা নয়, এই ব্যথাকে বোঝা, তার কারণ অনুসন্ধান করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা। যেটা কিনা খুব একটা সহজ ও একমুখী নয়। কারণ রিউম্যাটোলজিক্যাল যে কোনও অসুখই নানারকম উপসর্গ নিয়ে, নানারকম সমস্যা নিয়ে আসতে পারে। তাকে বধ করতে যতটা না দরকার পরীক্ষা ও চিকিৎসা, তার চেয়ে অনেক বেশি দরকার অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানের মেলবন্ধন।

Rheumatoid Arthritis (RA): Early Signs, Symptoms, Causes, Treatment & Diet

গোটা বিষয়টি নিয়েই বিস্তারিত আলোচনায় নারায়ণ মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসক, বিশিষ্ট রিউম্যাটোলজিস্ট, ডক্টর অর্ঘ্য চট্টোপাধ্যায়।

রিউম্যাটোলজি ব্যাপারটা আসলে কী

সাধারণ বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে হলে, একে আমরা বলি, এটি একটি ‘অটো ইমিউনড ডিজিজ’। অর্থাৎ, শরীরের ভিতরে নিজে থেকেই নিজের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করছে, ফলে এই অসুখ হচ্ছে।

আরও সহজ করে বললে, প্রতিটা দেশের সীমান্ত ঘিরে রাখেন সে দেশের রক্ষীরা। মানুষের বডিতেও এরকমই একটা নিরাপত্তা সিস্টেম আছে। এই নিরাপত্তা সিস্টেমকে শরীর ট্রেনিং দিয়ে রাখে, কোন কোন শত্রুকে চিনতে হবে, চিনে কীভাবে বাধা দিতে হবে। কোনও ক্ষতিকর বাইরের জিনিস শরীরে ঢুকতে দেওয়া আটকাতে হবে।

এখন, বর্ডারে যদি বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে চায়, সেই লোকটা কে, কেন ঢুকতে চাইছে, তার ঢুকতে চাওয়ার পেছনে কী মতলব রয়েছে– এই বিষয়টা ছানবিন করে দেখেন রক্ষীরা। তার পরেই সিদ্ধান্ত নেন, তাকে গুলি করে মেরে দেওয়া হবে নাকি ঢুকতে দেওয়া হবে। শরীরও ঠিক তাই। তার রক্ষীকোষগুলিও ফরেনবডির প্যাটার্ন চেনার চেষ্টা করে।

Autoimmune Disorders Explained: An Inside Story

অনেক সময়ে এই চেনায় ভুল হয়ে যায়। এমন হতে পারে, যে ঢুকতে চাইছে সে হয়তো এমনিতে ভালমানুষ, কিন্তু ওই সময়ে তার আচরণ সন্দেহজনক। আবার এমনও হতে পারে, বডিরই কোনও অচেনা প্রোটিনকে ফরেন প্রোটিন বলে মনে করছে শরীরের রক্ষীরা। তখনই তৈরি হয় অ্যান্টিবডি, তৈরি হয় অটো ইমিউনড ডিজিজ। শরীরের যে কোনও প্রান্তে যে কোনও রকম সিম্পটম নিয়ে এই অসুখ হতে পারে।

এর মধ্যে কী কী রোগ আসে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসুখের সংখ্যাও বাড়ছে। সাধারণ ভাবে যে কোনও আর্থ্রারাইটিসকেই এই রিউম্যাটোলজির আওতায় ফেলা যায়। এর অনেক রকম ধরন রয়েছে।

যেমন জয়েন্টের ইনফ্লেমেশনের পাশাপাশি রক্তকোষও আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত হতে পারে মাসেল। এগুলির উপসর্গ আবার নানা রকম হতে পারে। পায়ে ছোপছোপ দাগ হওয়াটাও কিন্তু আর্থ্রাইটিসের উপসর্গ হতে পারে। অস্টিওআর্থ্রাইটিস এখন অনেকেরই পরিচিত অসুখ, তাও আসে রিউম্যাটোলজির আওতায়। ইউরিক অ্যাসিড বাড়ার সমস্যাও এর মধ্যেই পড়ে।

Gout in big toe: How to identify, causes, and treatment

কোন কোন জয়েন্টগুলো মূলত প্রভাবিত হয়

বলতে গেলে যে কোনও জয়েন্টেই আক্রমণ করতে পারে অসুখ। কোনও জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, ব্যথা হওয়া, যাকে বলে প্রদাহ– এই ধরনের উপসর্গগুলো থাকলে তাকে ইনফ্ল্যামেটরি আর্থ্রাইটিস বলে। হাড়ের ক্ষয় বেশি হয়, যার ফলে ব্যথা হয়। যে কোনও জয়েন্টেই তরুণাস্থি নষ্ট হয়ে গেলে হাড়গুলি পরস্পরের সঙ্গে ঘষা খেতে থাকে। শুধু হাঁটু বা কোমর নয়, শিরদাঁড়ার প্রতিটি জয়েন্টেও এই ঘর্ষণ হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে হাড়গুলির ঘনত্ব কমে যায়। দুর্বল হয়ে পড়ে হাড়। সেই সমস্যাকে অস্টিওপোরোসিস বলে চিহ্নিত করা হয়।

শুধুই হাড়ের জয়েন্টে সমস্যা নয় কিন্তু

বলতে গেলে, শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই রিউম্যাটোলজির শিকার হতে পারে। ব্রেন থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত কিছুই বাদ নয়। স্ট্রোক রিউম্যাটোলজির একটা অন্যতম উপসর্গ। এশিয়ান দেশগুলিতে খুবই কমন এই অসুস্থতা। শরীরের বিভিন্ন শিরা-উপশিরায় বন্ধ হয়ে যায় রক্ত চলাচল।

চোখের যে আইরাইটিস হয়, তার সঙ্গে রিউম্যাটোলজির জোরদার সম্পর্ক রয়েছে। ফুসফুসের অসুখও এর কারণ হতে পারে। শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা বহু রোগীর রিউম্যাটোলজি ধরা পড়ে অনুসন্ধানে। হার্টের শিরায় বাধা তৈরি হয়ে হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। এমনকি পেটের ভেতরে থাকার সময়েও শিশুর হার্ট আক্রান্ত হতে পারে রিউম্যাটোলজিক্যাল রোগের কারণে। অনেক রোগীর দাঁতের সমস্যা হয়, মুখের লালা শুকিয়ে যায়। পেটের ভিতরে লিভার আক্রান্ত হতে পারে রিউম্যাটোলজিক্যাল ডিজিজে।

Rare cause of red eye in scleroderma | BMJ Case Reports

ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হল কিডনি। কিডনি খুব দ্রুত খারাপ হয় রিউম্যাটোলজির কবলে পড়লে। ট্রান্সপ্লান্টের পর্যায়েও পৌঁছে যায় অনেক সময়ে। এখন সচেতনতা ও গবেষণা বাড়ার পরে এই সমস্যা খানিকটা কমেছে।

সতর্ক থাকতে হবে সবরকম ভাবে

ইনফ্ল্যামেটরি আর্থ্রাইটিস চিহ্নিত করা তুলনামূলক ভাবে সহজ। শরীরের জয়েন্টগুলো স্টিফ হয়ে থাকলে তা রিউম্যাটোলজির একটা অন্যতম উপসর্গ। এমনটা হলে অবহেলা করা যাবে না। এছাড়াও যে হেতু সব অঙ্গই এর শিকার হতে পারে, তাই এমন যে কোনও সমস্যা, যার পরীক্ষানিরীক্ষায় কিছু ধরা পড়ছে না, তাকে রিউম্যাটোলজির আতসকাচের তলায় আনা যেতে পারে।

Rheumatic diseases

প্রাথমিক ভাবে জেনারেল মেডিসিনের ডাক্তারই প্রথম সন্দেহ করেন, রিউম্যাটোলজিক্যাল সমস্যা আছে কিনা। এখনও পর্যন্ত মানুষের যা ট্রেন্ড, তাতে এই জায়গায় পৌঁছে মূলত জয়েন্ট পেই নিয়েই আলোচনা করেন রোগীরা। অন্য সমস্যা এড়িয়ে যান। কিন্তু তা করলে হবে না। রিউম্যাটোলজির চিকিৎসা করাতে গেলে ডাক্তারের কাছে সবটা খুলে বলাটা খুবই জরুরি। তবেই অনুসন্ধান সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়। রক্তপরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষায় একটা আন্দাজ পাওয়া গেলেও, তা সবসময় একশো শতাংশ ঠিক ডায়াগনসিস করে না রিউম্যাটোলজিক্যাল সমস্যার ক্ষেত্রে।

চিকিৎসাও বহুমুখী

রিউম্যাটোলজির প্রতিটা রোগেরই চিকিৎসা আলাদা। যে ধরনের ওষুধ এই চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়, সেগুলি সবই ‘ইমিউনোমডিউলেটর’। তাদের সাইড এফেক্টও আছে। এই চিকিৎসাটা দাঁড়িয়ে আছে, কোনও ওষুধে রোগীর কতটা লাভ হবে এবং কতটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে সেই ব্যালেন্সের উপর। এবং এটা এখনও গবেষণা-ভিত্তিক।

রিউম্যাটোলজির চিকিৎসা চললে রক্তের নানা পরীক্ষা ও কিডনি-লিভারের ফাংশন পরীক্ষা করতে হবে। কারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকটি খুব জরুরি। ওষুধও খেতে হবে সেই টেস্ট রিপোর্টগুলি মনিটর করার মাধ্যমেই। কেবল জয়েন্টের ক্ষেত্রে চিকিৎসা একরকম, যাঁদের হার্ট-লাংস-কিডনি রিউম্যাটোলজিক্যাল সমস্যায় আক্রান্ত, তাঁদের চিকিৎসা আবার আর এক রকম।

Understanding & managing Chronic Kidney Disease

এ প্রসঙ্গে ইউরিক অ্যাসিডের কথা না বললেই নয়। কারণ এই সমস্যাতেও ব্যথার ধরন প্রায় একই। এখন অনেক রোগীই ইউরিক অ্যাসিড পরীক্ষা করে নিয়ে ওষুধ খেতে শুরু করেন, ব্যথা হয়তো প্রাথমিক ভাবে কমেও। কিন্তু রিউম্যাটোলজিক্যাল সমস্যাটা থেকেই যায়। পরে সেই ব্যথা হয়তো এত বাড়াবাড়ি করে, যে রোগী বিছানায় শুয়ে থাকতে বাধ্য হন। ইউরিক অ্যাসিড শরীরের একটা জরুরি উপাদান। তার ব্যালেন্স জরুরি। তাকে সামান্য ডায়েটের মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সহজেই। ওষুধ খেয়ে, ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমিয়ে রিউম্যাটোলজি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না।

শিশুরাও এর শিকার হতে পারে

যা যা বয়স্ক মানুষদের হচ্ছে, তার প্রায় সবটাই একটা শিশু শরীরেও দেখা যেতে পারে। বাচ্চাদের বাত হতে পারে– এই ধারণাটা একেবারেই না থাকার জন্য অনেক সময়েই দেখা যায় তাদের ডায়াগনসিস পরে হচ্ছে। যত পরে ডায়াগনসিস, তত ড্যামেজ বেড়ে যায়, যা নিরাময় করা মুশকিল হয়ে যায়।

Tell us: share your experiences of epidurals during childbirth | Childbirth  | The Guardian

শুধু তাই নয়, বহু বাচ্চার ক্ষেত্রেই রিউম্যাটোলজি খুব আক্রমণাত্মক থাবা বসায়। এর ফলাফল মারাত্মক। হাড় বা জয়েন্ট ড্যামেজ হয়ে যাওয়া মানে তারা সারা জীবনের জন্য একটা অসুবিধা তৈরি হওয়া। কমবয়সিদের ক্ষেত্রে রিপ্লেসমেন্টও অত সহজ নয়। ফলে বিপদ অনেকটাই বেশি।

মহিলাদের, বিশেষ করে কমবয়সি মহিলাদের বেশি হয় রিউম্যাটোলজিক্যাল অসুখ

একেবারে সরাসরি এর কারণ খুঁজে পাওয়া না গেলেও, বংশগতি ও হরমোনের ভারসাম্যের কারণেই এই সমস্যা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। গবেষণা সেটাই বলছে। বিশেষ করে মেয়েদের যে বয়সটায় রিপ্রোডাক্টিভিটি থাকে, সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, সেই সময়টাতেই দেখা যাচ্ছে মহিলারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

Female Spine Hurt and Neck Stock Footage Video (100% Royalty-free) 17159254  | Shutterstock

পুরোপুরি সারা কঠিন

এটা সকলেরই প্রশ্ন, কতদিন ওষুধ খেতে হবে বা কতদিন সমস্যা থাকবে। আসলে এই রকম অসুখ পুরোপুরি সারা কঠিন। বহু ক্ষেত্রেই সারাজীবন ওষুধ খেয়ে তবেই ভাল থাকেন রোগী। এটা মেনে নিতে হবে। কারও কারও ক্ষেত্রে ওষুধ বন্ধ করা গেলেও, পরবর্তী কালে অসুখ ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রতি মুহূর্তে মনিটর করতে হয়। সুগার-প্রেশর-থাইরয়েডের ওষুধ যেমন নিয়মিত খেলে ভাল থাকা যায়, তেমনই এই সমস্যার ক্ষেত্রেও সেটাই মেনে নেওয়া ভাল।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More