এই হিন্দুতীর্থে লুকিয়ে থাকত ভিয়েতকং গেরিলারা, বোমা ফেলে ইতিহাস মুছে দিয়েছিল আমেরিকা

একসময় সমগ্র এশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ও পবিত্র হিন্দুতীর্থ হিসেবে পরিচিত ছিল ভিয়েতনামের 'মাই সন'।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ফরাসিদের এই আগ্রাসন চলেছিল ১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত। উত্তরে টনকিং, মধ্যে আন্নাম ও দক্ষিণে কোচিনচিনা দখল করে ফরাসিরা জেঁকে বসেছিল ভিয়েতনামের বুকে। ভিয়েতনামের মানুষদের পুঞ্জীভূত ক্রোধ, প্রতিহিংসার আগুন হয়ে জ্বলতে শুরু করেছিল।

ভিয়েতনামের বুক জুড়ে তখন ছিল ঘন অরণ্য। অরণ্য সবচেয়ে ঘন ছিল মধ্য ভিয়েতনামে। ১৮৯৭ সালে ফরাসি সৈন্যের এক বিশাল রেজিমেন্ট, মধ্য ভিয়েতনামের কুয়াং নাম প্রদেশের ডুওয়াই জুয়েন জেলার পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে চলেছিল উত্তর দিকে। পর্বতশ্রেণী দিয়ে ঘেরা, দুই কিলোমিটার লম্বা একটি উপত্যকার অরণ্যে ক্যাম্প পেতেছিল ফরাসি সেনারা। রান্নার জন্য জঙ্গল থেকে কাঠ আনতে গিয়ে কিছু ফরাসি সেনার চোখে পড়েছিল, দুর্গম অরণ্যের ভেতরে থাকা একটি শ্যাওলা ধরা বিশাল পিলার। পাথরের পিলারটির গায়ে খোদাই করা ছিল কোনও লিপি। ক্যাম্পে ফিরে পিলারটির কথা জানিয়েছিল ফরাসি সেনারা।

এরপর সেনাদের বড়সড় একটি দল প্রবেশ করেছিল অরণ্যে। খুঁজে পেয়েছিল লতাপাতায় ঢাকা একটি ইমারত, যেটি পোড়া ইট দিয়ে তৈরি। কিন্তু ফরাসি সেনারা ছিল নিজেদের মিশনে, তাই আরও অনুসন্ধান চালানোর মত সময় তাদের হাতে ছিল না। কিন্তু তারা খবরটি পৌঁছে দিয়েছিল যথাস্থানে।

ভিয়েতনাম থেকে খবর পৌঁছে গিয়েছিল ফ্রান্সে। ফ্রান্স থেকে ভিয়েতনামে চলে এসেছিলেন বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক এম সি প্যারিস। বিশাল একটি দল নিয়ে শুরু করেছিলেন অরণ্য উচ্ছেদের কাজ। ১৮৯৯ সালে এম সি প্যারিসের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন École française d’Extrême-Orient (EFEO) নামে একটি ফরাসি সংস্থার গবেষকরা। প্রায় চার বছর সময় লেগেছিল ১৪২ হেক্টর এলাকা থেকে জঙ্গল ও শ্যাওলা সরাতে। ঘন অরণ্যের জমাট অন্ধকার সরে যেতেই, সূর্যের আলোর মুখ দেখেছিল, পাঁচশো বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা এক ইতিহাস।

১৯০৪ সালে École française d’Extrême-Orient নামক সংস্থাটির প্রাথমিক রিপোর্ট থেকে বিশ্ব জানতে পেরেছিল ‘মাই সন‘-এর কথা। ঘন অরণ্যের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছেড়ে নীল আকাশের নীচে বেরিয়ে এসেছিল হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির পীঠস্থান, মন্দির নগরী ‘মাই সন’। বিশ্ব সেদিন জানতে পেরেছিল, মধ্য ভিয়েতনামে প্রায় এক হাজার বছর ধরে বিজয়কেতন উড়িয়ে চলা এক সমৃদ্ধশালী হিন্দু রাষ্ট্রের কথা।

মধ্য ভিয়েতনামের বুকে ১৯২ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ গড়ে উঠেছিল বিশাল হিন্দু রাষ্ট্র চাম্পাপুরা বা চাম্পাদেশ (সাম্পাদেশা)। এই সাম্রাজ্যের রাজা ও প্রজারা জাতিগতভাবে ভারতীয় না হয়েও আঁকড়ে ধরেছিলেন সুপ্রাচীন হিন্দুধর্মকে। আঁকড়ে ধরেছিলেন এমন এক যুগে, যে যুগে ভিয়েতনামে ছিল মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রভাব। চিনের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, মধ্য ভিয়েতনামের উপকূলভাগে ‘তুওং লাম’ গড়ে তুলেছিলেন এক স্বাধীন হিন্দু রাষ্ট্র।

চাম্পাদেশ ও মাই সন হিন্দুতীর্থের অবস্থান

চাম্পাদেশের অধিবাসীদের বলা হত চাম বা উরাং সাম্পা। ভিয়েতনামের মানুষরা যাদের বলত ‘নগুওই চাম’। অনুমান করা হয়, অস্ট্রোনেশিয়ান চাম’রা বোর্নিও হয়ে খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রবেশ করেছিলেন ভিয়েতনামে। সেই সময় সমগ্র পূর্ব এশিয়াতে সনাতন হিন্দু ধর্মের সুনামি চলছিল। তাই চাম গোষ্ঠীর মানুষরাও আপন করে নিয়েছিলেন হিন্দু ধর্ম। গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী হিন্দু রাষ্ট্র ‘চাম্পা’। যার প্রথম রাজধানী ছিল সিমহাপুরা (ট্রা কিইউ)। পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজাদের আমলে, রাজধানী সিমহাপুরা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিল, ইন্দ্রপুরা, অমরাবতী বিজয়া, কৌথারা ও পাণ্ডুরাঙ্গাতে।

‘মাই সন’ কথাটির অর্থ হল ‘অপরূপ পর্বতশ্রেণী’। দুটি পর্বতশ্রেণী দিয়ে ঘেরা এই দুর্গম উপত্যকায় ‘চাম্পা’ রাজারা গড়ে তুলেছিলেন এক পবিত্র হিন্দু তীর্থ। যার নামও ছিল ‘মাই সন’। উপত্যকার উত্তরে থাকা পাহাড়টির নাম বিড়ালের দাঁত( নুই রাং মেও) এবং দক্ষিণের পাহাড়টিকে কৈলাস বা ‘মহাপর্বত’ বলতেন চামেরা। পাহাড় থেকে নেমে আসা এক  প্রাকৃতিক ঝর্নাকে বলতেন মহানদী বা গঙ্গা। ‘মাই সন’ থেকে কিছু দূরে ছিল সমৃদ্ধশালী নগর ইন্দ্রপুরা।

মাই সন

সিংহাসনে বসার পর চাম্পা’ রাজারা আসতেন ‘মাই সন’ তীর্থে। সেখান থেকে উপহার বিতরণ করতেন জনগণকে। খ্রিস্টিয় চতুর্থ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত, চাম্পা রাজবংশের সমস্ত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হত ‘মাই সন’ তীর্থে। এমনকি চাম্পা রাজা ও চাম্পাদেশের জাতীয় নায়কদের সমাধি দেওয়া হত এই ‘মাই সন’ উপত্যকাতেই।

ধর্মবিশ্বাসে চাম্পা রাজারা ছিলেন শৈব। তাঁরা বিশ্বাস করতেন শিব হলেন চাম্পাদেশের রক্ষাকর্তা। চাম্পা রাজারা তাঁদের রাজত্বে দেশ জুড়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রায় তিনশোটি সুবিশাল মন্দির। এর মধ্যে ৭১টি মন্দির তাঁরা বানিয়েছিলেন, দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মাই সন উপত্যকায়। প্রত্যেক চাম্পা রাজা তাঁর রাজত্বকালে মাই সনে হিন্দু ধর্মের প্রতি নিজের ভালোবাসা ও আস্থা জানিয়ে গিয়েছিলেন, এক একটি মন্দির গুচ্ছ তৈরি করে।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেই ৭১টি মন্দিরকে ভাগ করেছিলেন ১৪টি গ্রুপে। এর মধ্যে ১০টি মুখ্য গ্রুপ, বাকি চারটি গৌণ। গ্রুপগুলির নাম দেওয়া হয়েছিল A, B, C, D, E, F, G এইভাবে। প্রত্যেকটি গ্রুপের অধীনে আছে অসংখ্য মন্দির। একটি গ্রুপের অধীনে থাকা প্রত্যেকটি মন্দিরকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, আলাদা আলাদা ক্রনিক সংখ্যা দিয়ে। যেমন ‘A’ গ্রুপে ছিল ১৩টি মন্দির। এগুলিকে চিহ্নিত করা হয় A-১, A-২, A-৩ থেকে A-১৩ নামে।

চাম্পা রাজত্বে স্থাপত্যশৈলি ছিল নয়নাভিরাম। যে স্থাপত্যশৈলির ওপর প্রভাব ছিল ভারতীয় ও স্থানীয় ‘হো লাই’ এবং ‘ডং ডুওং’ স্থাপত্যশৈলির। মন্দিরগুলি তৈরি করা হয়েছিল পোড়ামাটির ইট দিয়ে। ইটগুলি সম্ভবত গাঁথা হয়েছিল স্থানীয় অরণ্য থেকে পাওয়া রজন দিয়ে। মন্দিরের পিলারগুলি ছিল পাথরের। মন্দিরের দেওয়ালগুলির গায়ে বসিয়ে দেওয়া হত, বেলেপাথরে খোদাই করা নানা দৃশ্যাবলী সম্বলিত ফলক। যে দৃশ্যগুলি নেওয়া হত হিন্দু পুরাণ থেকে।

প্রত্যেকটি মন্দির কমপ্লেক্সে একটি মূল মন্দির বা ‘কালান’ থাকত। মন্দিরগুলি সাধারণত পূর্বমুখী হত। অবশ্য বেশ কিছু মন্দির পাওয়া গিয়েছিল, যেগুলি ছিল পশ্চিমমুখী। সুবিশাল মূল মন্দিরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে থাকত বেশ কয়েকটি ছোট মন্দির। এই মন্দিরগুলি কখনও অষ্টপাল, কখনও নবগ্রহকে উৎসর্গ করা হত। ভারতীয় মন্দিরগুলির মতই মণ্ডপম ও গোপুরম ছিল মন্দিরগুলিতে।

প্রতিটি মন্দির কমপ্লেক্সের নিজস্ব প্রবেশ তোরণ ছিল। প্রত্যেকটি মন্দির কমপ্লেক্সে থাকত একটি পবিত্র কুণ্ড। যেটিতে স্নান করে মন্দিরে পুজো দিতে যেতেন তীর্থযাত্রীরা। এছাড়া প্রতিটি মন্দির কমপ্লেক্সে থাকত দেবতার ভোগ তৈরির রান্নাঘর, তীর্থযাত্রীদের বিশ্রামগৃহ ও ধর্মীয় পাঠাগার। প্রত্যেকটি মন্দির কমপ্লেক্সের কেন্দ্রস্থলে দেখা যেত একটি সুবিশাল প্রস্তর ফলক। যে রাজা সেই মন্দির কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছেন, তাঁর বাণী খোদাই করা থাকত প্রস্তর ফলকটিতে। সংস্কৃত ও চাম ভাষায়।

‘মাই সন’ তীর্থে সকল হিন্দু দেবদেবীর বিগ্রহ থাকলেও, চাম্পা রাজারা ভগবান শিবকে নিবেদন করেছিলেন সমগ্র ‘মাই সন’ উপত্যকা। ‘মাই সন’ উপত্যকায় প্রথম মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল চতুর্থ শতাব্দীতে, রাজা ভদ্রবর্মন বা ফন হুদার রাজত্বকালে। যিনি ৩৮৯ থেকে ৪১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেছিলেন চাম্পাদেশ।

রাজা ভদ্রবর্মন ‘মাই সন’ উপত্যকায় নির্মাণ করেছিলেন তাঁর ইষ্টদেবতা ভগবান শিবের সুবিশাল এক মন্দির। দামি কাঠ দিয়ে তৈরি সেই মন্দিরে ভদ্রবর্মন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজকীয় শিবলিঙ্গ। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে ভদ্রবর্মন শিবলিঙ্গের নাম দিয়েছিলেন ‘ভদ্রেশ্বর’।

ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মাই সনে খুঁজে পেয়েছেন ১১০০ বছরের প্রাচীন এক শিবলিঙ্গ

মন্দির প্রাঙ্গণে স্থাপিত এক প্রস্তর ফলকে খোদাই করাছিল রাজা ভদ্রবর্মনের বাণী। পরবর্তী রাজাদের জন্য তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন কিছু উপদেশ। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, কেউ যেন ভদ্রেশ্বর শিবের মন্দিরটিকে ধ্বংস না করেন। কারণ বিশ্বাস ও কর্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই ‘ভদ্রেশ্বর’ মন্দির। যিনি মন্দিরটি ধ্বংস করবেন তাঁর সমস্ত পুণ্যের ফল পাবেন রাজা ভদ্রবর্মন এবং মন্দির ধ্বংসকারীকে গ্রাস করবে সারাবিশ্বের পাপের বোঝা। যিনি মন্দিরটিকে রক্ষা করবেন, তিনি পাবেন ভদ্রেশ্বর শিবের অমূল্য আশীর্বাদ।

রাজা ভদ্রবর্মনের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনেছিলেন পরবর্তী চাম্পা রাজারা। কিন্তু ভদ্রেশ্বর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার দু’শো বছর পর ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল মন্দিরটি। সেই সময় রাজার আসনে ছিলেন ফাম ফান চি বা শম্ভুবর্মন। তিনি নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন ‘ভদ্রেশ্বর’ মন্দিরটিকে। নতুন মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল পোড়া মাটির ইট ও পাথর দিয়ে।

রাজা শম্ভুবর্মন নতুন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নতুন শিবলিঙ্গ। যে শিবলিঙ্গের নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘শম্ভু-ভদ্রেশ্বর’। মন্দির কমপ্লেক্সটির কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেছিলেন একটি প্রস্তর ফলক, সেটিতে লেখা ছিল, “শম্ভু-ভদ্রেশ্বর হলেন পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ও পাপের বিনাশকারী। তিনিই চাম্পাদেশের সুখ ও সম্বৃদ্ধির আসল কারণ।”

রাজা শম্ভুবর্মন সিংহাসনে ছিলেন ৫৭৭ থেকে ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। তাঁর শাসনকালে, ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে চিনা সেনাধ্যক্ষ লিউ ফাং উত্তর দিক থেকে বিশাল সৈন্যদল নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন চাম্পাদেশ। যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন রাজা শম্ভুবর্মন। মাই সনের প্রচুর মন্দির ধ্বংস করে দিয়েছিল চিনা সৈন্যেরা। চাম্পা থেকে প্রচুর ধন-সম্পদ ও প্রায় এক হাজারের মত বৌদ্ধধর্মের পুঁথি নিয়ে তারা উত্তরে ফেরার পথ ধরেছিল।

কিন্তু ফেরার পথে চৈনিক আক্রমণকারীরা অকল্পনীয়ভাবে এক ভয়ানক মহামারীর কবলে পড়েছিল। হাজার হাজার চিনা সেনার মৃত্যু ঘটেছিল সেই মহামারীতে। মহামারীর বলি হয়েছিলেন চিনের সেনাধ্যক্ষ লিউ ফাং’ও। চাম্পার অধিবাসীরা বলেছিলেন, পবিত্র শৈবতীর্থকে অবমাননা করার জন্য নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছেন ‘ভদ্রেশ্বর‘ শিব।

পরাজিত রাজা শম্ভুবর্মন আবার নতুন করে গড়ে তুলতে শুরু করেছিলেন মন্দিরগুলি। তবে ‘মাই সন’ তীর্থকে তার আগের গরিমায় পৌঁছে দিয়েছিলেন রাজা ‘পো কিয়া ফো পা মো’ বা বিক্রান্তবর্মন। তিনি চাম্পা শাসন করেছিলেন ৬৫৩ থেকে ৬৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। প্রবল পরাক্রমশালী বিক্রান্তবর্মন বিপুল বিস্তার ঘটিয়েছিলেন চাম্পাদেশের।

তবে মাই সনের ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে বিশেষ একটি কারণে। সব চাম্পা রাজাদের মত বিক্রান্তবর্মনও ছিলেন ‘ভদ্রেশ্বর’ শিবের ভক্ত। তবে তিনিই তাঁর শাসনকালে ‘মাই সন’ তীর্থে বানিয়েছিলেন শ্রীবিষ্ণুর প্রথম মন্দিরটি। তাঁর আমলেই সমগ্র এশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ও পবিত্র হিন্দুতীর্থ হিসেবে পরিচিত ছিল মাই সন।

এরপর চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত ভিয়েতনামের বুকে হিন্দু ধর্মের বিজয় পতাকা উড়িয়েছিলেন চাম্পা রাজারা। এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন রাজা প্রথম নরবর্মন। যিনি নবম শতাব্দীর শুরুতে চিনা ও খমের সেনাদের যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছিলেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন, মাই সনের সবচেয়ে সুন্দর মন্দিরগুলি বানানো হয়েছিল দশম শতাব্দীতে। চতুর্থ ইন্দ্রবর্মন ও দ্বিতীয় হরিবর্মনের রাজত্বকালে।

যদিও সেই সময়, প্রায় সারাবছরই আক্রমণকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকতে হত চাম্পা রাজাদের। আক্রমণকারীদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে চাম্পাদেশে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন রাজা চতুর্থ হরিবর্মন। তিনি চাম্পাদেশের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘ডো বান’ এলাকায়।

এহেন সমৃদ্ধশালী চাম্পাদেশের পতন শুরু হয়েছিল কিনহ বা ভিয়েতদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে। ১২৪৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ চাম্পা শাসন করেছিলেন রাজা জয়া পরমেশ্বরবর্মন। তাঁর স্থাপন করা একটি ফলক থেকে জানা গিয়েছিল, চাম্পাদেশের উত্তর অংশ কেড়ে নিয়েছে ভিয়েতরা। ধীরে ধীরে শক্তি হারাতে শুরু করেছিলেন চাম্পা রাজারা। এরপর চতুর্দশ শতাব্দীতে চাম্পাদেশকে যুদ্ধে হারিয়ে ‘চাম্পা’ জয় করে নিয়েছিলেন, ভিয়েতনামের লে রাজবংশের রাজা লে থান টং।

স্বাধীন রাষ্ট্রের তকমা হারিয়ে ‘চাম্পাদেশ’ হয়ে গিয়েছিল ভিয়েতনামের অধীনস্থ একটি স্বশাসিত অঞ্চল। চামদের জমিতে ভিয়েতরা এসে বসতি স্থাপন করেছিল। ভিয়েতনামের স্থানীয় ধর্মের প্রভাবে জনমানস থেকে হারিয়ে গিয়েছিল ‘মাই সন’ হিন্দুতীর্থ ও তার গৌরবময় ইতিহাস। ঘন ও দুর্ভেদ্য অরণ্যের অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল মাই সন।

ফরাসি সৈন্যেরা খুঁজে পাওয়ার পর, মাই সনকে তার আগের রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দশকের পর দশক ধরে চেষ্টা করে চলেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। কিন্তু তাঁদের প্রাণপাত করা পরিশ্রম ব্যর্থ করে দিয়েছিল ১৯৬৫ সালে শুরু হওয়া ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ঘন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া দুর্গম মাই সন মন্দির কমপ্লেক্সকে ১৯৬৬ সাল থেকে ৬৮ সাল অবধি, ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল ভিয়েতকং গেরিলারা। মাই সন তীর্থের চারদিকে পুঁতে রেখেছিল হাজার হাজার ল্যান্ড মাইন।

ভিয়েতকং গেরিলাদের ঘাঁটি ধ্বংস করার জন্য, ১৯৬৯ সালের অগষ্ট মাসে, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ‘মাই সন’-এর ওপর কার্পেট বোম্বিং করেছিল আমেরিকার বি-ফিফটি টু বোম্বার। ধুলোয় মিশে গিয়েছিল সাত দশক ধরে তিলে তিলে রূপ পেতে থাকা ঐতিহাসিক ‘মাই সন’।

ভিয়েতকং যোদ্ধাদের একটি দল

কালের অতল থেকে তুলে আনা হাজার বছরের ইতিহাস, ধূলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল আমেরিকার ফেলা বোমার আঘাতে। আজও ‘মাই সন’ তীর্থে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে আমেরিকার ফেলা বোমার আঘাতে তৈরি হওয়া কয়েকশো গহ্বর। যে গুলি ইচ্ছে করেই ভরাট করেনি ভিয়েতনাম। আজও মাই সনকে ঘিরে থাকা জঙ্গলে শিকারের অপেক্ষায় লুকিয়ে আছে গেরিলাদের পাতা ল্যান্ড মাইন।

আমেরিকার বোমাবর্ষণের পর, মাই সন উপত্যকায় আজ দাঁড়িয়ে আছে মাত্র ১৭টি মন্দির। স্থাপত্যকলা ও গরিমায় যে মন্দিরগুলি কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট, ইন্দোনেশিয়ার বরোবুদুর ও প্রাম্বানান মন্দিরের থেকে কোনও অংশে কম নয়। তাই ১৯৯৯ সালে পূর্ব এশিয়ার হিন্দুদের পবিত্রতম তীর্থস্থান মাই সনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছিল UNESCO

তবে মাই সন হিন্দুতীর্থকে আগের রূপ ফিরিয়ে দিতে ভিয়েতনাম সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে চলছে সংস্কারের কাজ। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে জাপান, ইতালি, ভারত এবং ইউনেস্কো। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের দুঃখ একটাই। মাই সনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কিছুটা তাঁরা উদ্ধার করতে পারলেও, ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে ইতিহাসের বেশিরভাগটাই চিরকালের মত তলিয়ে গেছে কালের অতলে। যে ইতিহাস ভিয়েতনামের বুকে সনাতন হিন্দু ধর্মের বিজয়কেতন উড়িয়েছিল প্রায় একহাজার বছর ধরে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More