সেই রাতে জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল অভিশপ্ত ‘কুলধারা’, গ্রামবাসীদের খোঁজ মেলেনি দুশো বছর পরেও

প্রশ্নগুলির উত্তর আজও কেন রয়ে গিয়েছে অজানার অন্ধকারে!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

রাজস্থানের মরুশহর জয়সলমীর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বয়ে চলেছে মরসুমি নদী কাকনি। আরাবল্লি পর্বত থেকে সৃষ্টি হয়ে একশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে চুরু জেলার উত্তর-পশ্চিমে হারিয়ে গিয়েছে এই নদী। সারা বছর শুকিয়ে থাকা কাকনি মূলত বর্ষাকালেই নদীর আকার ধারণ করে। গেরুয়া জল নিয়ে দ্রুতগতিতে বইতে থাকে তখন। ছুটতে থাকে উচ্ছল বালিকার মত। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই কাকনি নদীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছিল এক বর্ধিষ্ণু জনপদ। জনপদটির নাম ছিল কুলধারা

কুলধারার ধ্বংসাবশেষ

ইতিহাসবিদ লক্ষ্ণী চাঁদের ১৮৯৯ সালে লেখা বই “তারিখ-ই-জয়সলমের‘ থেকে জানা যায়, কাধান নামে এক ধনী ব্রাহ্মণ গড়ে তুলেছিলেন এই জনপদ। কাধান এসেছিলেন যোধপুর থেকে সত্তর কিলোমিটার দূরে থাকা পালি নামক এলাকা থেকে। তাই তাঁকে ও তাঁর সঙ্গে আসা ব্রাহ্মণ নরনারীকে স্থানীয় গ্রামবাসীরা বলতেন পালিওয়াল ব্রাহ্মণ। পালিওয়াল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষরা সম্ভবত ছিলেন কুলধর বা কালধর গোত্রের। তাই জনপদটির নাম হয়েছিল ‘কুলধারা’। শত শত বছর ধরে গ্রামটি আয়তনে বৃদ্ধি পেতে পেতে একটি ছোটখাটো নগরের চেহারা নিয়েছিল।

দৈর্ঘে ২৯০০ ফুট ও প্রস্থে ১০০০ ফুট এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছিল আয়তক্ষেত্রাকার ‘কুলধারা’। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কুলধারা গ্রামের ৪১০ টি বাড়িতে বাস করতেন প্রায় ১৫৮৮ জন মানুষ। গ্রামটিকে ঘিরে ছিল লাল পাথরের উঁচু প্রাচীর। কুলধারা গ্রামে ঢোকার আগে ছিল পাথরের তৈরি প্রধান ফটক। গ্রামের মাঝখানে ছিল সুবিশাল এক মন্দির।

কুলধারা গ্রামের প্রধান মন্দির

পালিওয়াল ব্রাহ্মণরা ছিলেন বৈষ্ণব। তাই গ্রামের মূল মন্দিরটিতে ছিল শ্রীবিষ্ণুর বিগ্রহ। এছাড়াও গ্রামে ছিল দেবী দুর্গার মন্দির। প্রত্যেকটি বাড়ির দরজার ওপরে খোদাই করা থাকত গণেশের মূর্তি। শ্রীবিষ্ণু, মা দুর্গা, গণেশ ছাড়াও, কুলধারার মানুষরা ষাঁড় ও এক ঘোড়সওয়ার লৌকিক দেবতার পুজো করতেন।

অসম্ভব সুদর্শন ছিলেন কুলধারার অধিবাসীরা। পুরুষরা শেরওয়ানি পড়তেন, মাথায় বাঁধতেন পাগড়ি। গলায় থাকত সোনা বা পাথরের হার। ছেলেরা মুখে দাড়ি রাখতেন। কোমরবন্ধে গোঁজা থাকত ছুরি। কুলধারার অসামান্য রুপসী মেয়েরা পরতেন লেহঙ্গা-চোলি। তাঁদের সর্বাঙ্গে শোভা পেত নানা অলঙ্কার। কুলধারাবাসীর জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল শৌখিনতার ছাপ।

সরকারি প্রচেষ্টায় আগের রূপ ফিরে পাওয়া কিছু বাড়ি

কৃষিকাজ ও কৃষিজ পণ্যের বাণিজ্যই ছিল তাঁদের মূল পেশা। যদিও এলাকাটি চাষবাসের পক্ষে আদর্শ ছিল না। গ্রামটি পত্তনের সময় একটি বিশাল পুষ্করিণী খনন করেছিলেন কাধান। নাম দিয়েছিলেন উধানসর। তাই কাকনি নদীর জল, গ্রামে থাকা অজস্র কুয়ো ও পুষ্করিণীর জল পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহার করে কুলধারার অধিবাসীরা সবুজ করে তুলেছিলেন রুক্ষ প্রান্তরের বুক। বন্ধ্যা জমিকে প্রাণ দিয়েছিলেন নতুন করে। শত শত বছরের প্রাণপাত পরিশ্রমে কুলধারা হয়ে উঠেছিল শেখাবতী এলাকার সব থেকে সম্পদশালী গ্রাম।

সরকারি প্রচেষ্টায় আগের রূপ ফিরে পাওয়া আরও কিছু বাড়ি

কিন্তু ১৮২৫ সালে, এক রাতের মধ্যে সম্পুর্ণ জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল সম্পদশালী কুলধারা। জমিজমা বাড়িঘর ফেলে, অস্থাবর সম্পদ নিয়ে গ্রামবাসীরা কুলধারা ছেড়ে পালিয়েছিলেন রাতের অন্ধকারে। আশ্চর্যের বিষয়, এত মানুষের একসঙ্গে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাটির টের পায়নি কাকপক্ষীতেও। কুলধারা গ্রাম যে রাতের অন্ধকারে খালি হয়ে গিয়েছে তা পরদিন বিকেলের আগে জানতেই পারেননি স্থানীয় গ্রামগুলির বাসিন্দারাও।

নিজেদের জমি বাড়ি ফেলে, এক বস্ত্রে পালিয়ে যাওয়া গ্রামবাসীরা কোথায় গিয়ে উঠেছিলেন তা আজও অজানা। দুশো বছর অতিক্রান্ত হলেও পাওয়া যায়নি তাঁদের খোঁজ। কোনও কোনও গবেষক অনুমান করেছিলেন, পালিওয়াল ব্রাহ্মণরা ফিরে গিয়েছিলেন যোধপুরের পালিতেই। কিন্তু পালির ইতিহাস এরকম কোনও ঘটনার সপক্ষে প্রমাণ দিতে পারেনি। প্রায় ভোজবাজির মতোই কালের গর্ভে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন কুলধারার অধিবাসীরা। রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে তিলে তিলে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধশালী কুলধারাও পরিত্যক্ত ও জনবর্জিত হয়ে গিয়েছিল চিরতরে।

এক রাতের মধ্যে জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল কুলধারা

কিন্তু কেন কুলধারা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা? সে বিষয়ে স্থানীয় লোকগাথা শোনায় এক কাহিনি। যা মনকে বিষণ্ণ করে দেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে কুলধারা গ্রাম ছিল উন্নতি ও সম্পদের শিখরে। গ্রামটির ওপর নজর পড়েছিল জয়সলমীর স্টেটের দেওয়ান বা প্রধানমন্ত্রী সালিম সিংয়ের।

ভয়ঙ্কর অত্যাচারী ও নারীলোলুপ সালিম সিংয়ের ভয়ে তখন কাঁপত মরুশহর। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে চড়া হারে খাজনা আদায় করতেন সালিম সিং। খাজনা দিতে না পারলেই জুটত নৃশংস অত্যাচার। কারও প্রাণ নিতে দু’বার ভাবতেন না সালিম সিং। রোজ রাতে স্থানীয় গ্রামগুলি থেকে সুন্দরী অবিবাহিতা মেয়েদের জোর করে হাভেলিতে নিয়ে আসত তাঁর সেনাবাহিনী। সালিম সিংয়ের ভয়ে সুন্দরী মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দূরে পাঠিয়ে দিতেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা।

গ্রামের সম্পদ ও নারীর সৌন্দর্য বিপদ ডেকে এনেছিল কুলধারার। সালিম সিং কুলধারার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন অবিশ্বাস্য অঙ্কের খাজনা। প্রতিবাদ করেছিলেন কুলধারা গ্রামের সরপঞ্চ বা প্রধান। তাঁর ছিল এক অসামান্য সুন্দরী কন্যা। তখনও বিয়ে হয়নি তার। সালিমের কুনজর পড়েছিল সরপঞ্চের কিশোরী মেয়ের ওপর।

সালিম সিংয়ের তৈলচিত্র

মেয়েটিকে পাওয়ার জন্য একটি কৌশল নিয়েছিলেন সালিম। গ্রামবাসীদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সরপঞ্চের কিশোরী কন্যাটিকে তাঁর হাতে স্বেচ্ছায় তুলে দিলে খাজনার অঙ্ক কমে যাবে। না হলে দ্বিগুণ খাজনা তো দিতেই হবে, সাথে সরপঞ্চের মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে সালিম সিংয়ের সেনা। কুলধারার বাসিন্দাদের ভাবার জন্য একদিন সময় দিয়েছিলেন সালিম সিং।

কিন্তু ফুলের মত নিষ্পাপ পালিওয়াল ব্রাহ্মণ কিশোরীকে কীভাবে একজন অত্যাচারী প্রৌঢ় লম্পটের হাতে তুলে দিতে পারে কুলধারা! নারীকে যে কুলধারা গ্রামে দেবী দুর্গার চোখে দেখা হয়। নির্ধারিত সময়ে পেরিয়ে যাওয়ার পর সরপঞ্চের কিশোরী কন্যাটিকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছিল সালিম সিংয়ের সেনা। কুলধারার অধিবাসীরা বলেছিলেন, বিকেল হয়ে গিয়েছে, তাই তাঁরা কন্যাকে বিদায় দিতে পারবেন না। পরের দিন সকালেই তাঁরা হাভেলিতে পৌঁছে দেবেন কিশোরীকে।

সেই রাতেই বাড়ির দরজা খোলা রেখে, জমিজমা ও ইষ্টদেবতার মন্দির ফেলে রেখে, গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিলেন কুলধারার বাসিন্দারা। এতটাই নিঃশব্দে পালিয়েছিলেন, টের পায়নি গ্রামের বাইরে তাঁবু ফেলে ভোরের অপেক্ষায় থাকা সালিম সিংয়ের সেনারাও। পরের দিন সকালে গ্রামে ফিরে এসেছিল সেনারা। কুলধারা তখন জনশূন্য, নিস্তব্ধ। ক্রুদ্ধ সালিম সিং তল্লাশি চালিয়েছিলেন বিশাল এলাকা জুড়ে। কিন্তু খোঁজ মেলেনি কুলধারার একজন গ্রামবাসীরও।

লোকগাথা থেকে জানা যায়, অশ্রুসজল চোখে কুলধারা ছাড়ার আগে গ্রামবাসীরা অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিলেন। কেউ কোনওদিন কুলধারা গ্রামে বসবাস করতে পারবে না। কেউ জোর করে তাঁদের সম্পদ দখল করলেও প্রাণে বাঁচবে না। আজও তাই কুলধারা পরিত্যক্ত। স্থানীয় মানুষরা গল্প করতে করতে পর্যটকদের জানান। পরবর্তীকালে যাঁরাই পরিত্যক্ত কুলধারায় বসবাস করতে গিয়েছেন, কোনও না কোনও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। প্রাণও হারিয়েছেন অনেকে।

পরিত্যক্ত কুলধারার রহস্যময় ইতিহাস আকর্ষণ করেছিল অলৌকিক তত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষজনকে। ২০১০ সালে দিল্লির ইন্ডিয়ান প্যারানরম্যাল সোসাইটির প্রধান গৌরব তেওয়ারি, ১৮ জনের দল নিয়ে রাত কাটিয়েছিলেন কুলধারা গ্রামে। সঙ্গে ছিলেন ১২ জন স্থানীয় মানুষও। সারা রাত ধরে তাঁরা নাকি প্রত্যক্ষ করেছিলেন নানান ভৌতিক কাণ্ডকারখানা। ছায়ামূর্তির সরে যাওয়া, ধুলোর ওপর শিশুদের সদ্য ফেলা পায়ের ছাপ, গাড়ির বনেটের ধুলোয় অদ্ভুত কিছু হাতের ছাপ দেখেছিলেন তাঁরা। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ঘোস্ট-বক্সে রেকর্ডিং করেছিলেন এমন কিছু আওয়াজ যা নাকি মানুষের নয়।

কিন্তু বিজ্ঞানমনষ্ক ও যুক্তিবাদী মানুষরা সঙ্গত কারণেই নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান প্যারানরম্যাল সোসাইটির করা দাবিগুলি। তা সত্ত্বেও হানাবাড়ির গ্রাম হিসেবে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল কুলধারা। আজও নাকি সন্ধ্যের আগে বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেন স্থানীয় গ্রামগুলির বাসিন্দারা। কোনও এক অজানা আতঙ্কে।

পরবর্তীকালে অনেক গবেষক কুলধারা নিয়ে গবেষনা করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়েছেন কুলধারা গ্রামের আনাচে কানাচে। তাঁদের অনুসন্ধান থেকে জানা গিয়েছিল, জলের অভাবে গ্রামের জনসংখ্যা ক্রমশ কমতে শুরু করেছিল। প্রবল জলাভাব ও খাজনার বৃদ্ধির কারণেই সম্ভবত গ্রাম ছেড়েছিলেন বাসিন্দারা। কালের নিয়মে কুলধারা আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত। ২০১৭ সালে জানা গিয়েছিল প্রবল ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে কুলধারা।

কুলধারায় পর্যটকেদের ক্রমবর্ধমান আনাগোনা দেখে, রাজস্থান সরকার কুলধারাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করে। ২০১৫ সাল থেকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে মান্যতা পেয়েছে কুলধারা। কটেজ তৈরি হয়েছে রাত্রিবাস করার জন্য। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ঘোষিত হেরিটেজ সাইট কুলধারা গ্রামটিকে আজ ‘অভিশপ্ত’ ও ‘প্রেতাত্মার গ্রাম’ হিসেবে চেনেন পর্যটকরা।

কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেলেন কুলধারার পালিওয়াল ব্রাহ্মণরা! কেন তাঁদের কোনও খোঁজই আজ অবধি পাওয়া গেল না! কেন আজও খুঁজে বের করা গেল না তাঁদের বংশধরদের! কীভাবে নিঃশব্দে একরাতের মধ্যে গ্রাম ছেড়েছিলেন তাঁরা! লোকগাথায় বলা কাহিনিটি তাহলে অসত্য। তাহলে কেন যুগ যুগ ধরে সেটি বলে আসছে স্থানীয় গ্রামগুলির বাসিন্দারা!

আজও জয়সলমীরে আছে রক্তলোলুপ প্রধানমন্ত্রী সালিম সিংয়ের হাভেলি। সেখানকার মানুষদের মুখে আজও শোনা যায় তাঁর অত্যাচারের নানা কাহিনি। তাই হয়ত কুলধারা জনশূন্য হওয়ার আধুনিক ব্যাখ্যা পেয়েও, সন্তুষ্ট নন অনেকে। কারণ আসল প্রশ্নগুলির উত্তর আজও যে রয়ে গিয়েছে অজানার অন্ধকারে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More