‘শ্রীময়ী’ বন্ধ হোক, আর্জি খোদ অনুরাগীদেরই! গল্পের নেই মাথামুন্ডু, তিতিবিরক্ত দর্শকরা

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সন্ধ্যে সাতটা বাজলেই আর ‘হঠাৎ অন্য হাওয়ায় একটু ভাল লাগায় ইচ্ছে কুড়োয় সুখ’-এর হাওয়া বইছে না শ্রীময়ী-অনুরাগীদের মনে। দিকভ্রষ্ট চিত্রনাট্যে, দিশেহারা গল্পে ‘শ্রীময়ী’র প্রতি বীতশ্রদ্ধ দর্শক। সাতটা বাজলেই তাই টিভি মিউট বা অফ করে দিচ্ছেন মা-মাসিরা। যে আগ্রহ বাড়িয়ে শুরু হয়েছিল সিরিয়াল, এখন শ্রীময়ী দেখার ইচ্ছে তলানিতে। ভাল সিরিয়ালের বিকৃতি দেখতে নারাজ দর্শক মহল। একথা আলোচিত সোশ্যাল মিডিয়ার খোলা প্ল্যাটফর্মেই। কেউ বলছেন দিশাহীন ভাবে এগোচ্ছে গল্পের চরিত্ররা, কেউ বলছেন গল্পের গরু এবার গাছে উঠছে।

শ্রীময়ী সিরিয়ালের শুরুতে ছিল, এক নারীর বিয়ের পরে জীবনভর শ্বশুরবাড়িতে অবহেলা পাওয়া এবং সব বাধা অতিক্রম করে তাঁর উন্নতি। স্বামী, শাশুড়ি, এমনকি ছেলেমেয়ের থেকেও অবহেলা পেয়েছেন তিনি। তিনি সংসারের সব কাজ করেও দোষের ভাগী হতেন। তিনি স্মার্ট নন, নেই তাঁর বহিরঙ্গের চাকচিক্য। তাই স্বামী অনিন্দ্যর কাছে অনেক বেশি রূপে-যোগ্যতায় এগিয়ে থাকতেন প্রেমিকা জুন।

সমাজের বহু গৃহবধূর কথাই যেন উঠে আসছিল শ্রীময়ী সিরিয়ালে। এমনকি যখন শ্রীময়ী ও অনিন্দ্যর ডিভোর্স হয়ে গেল, যখন থেকে শ্রীময়ী নিজের রোজগারে বাঁচতে শিখলেন বিয়ের পঁচিশ বছর পর, তখন শ্রীময়ীর এই উন্নতি দেখে বহু ডিভোর্সী মহিলা বা সিঙ্গেল মাদারও নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা পাচ্ছিলেন।

কিন্তু শ্রীময়ীর অতি ভালমানুষী এবং দিকভ্রষ্ট চিত্রনাট্যের ফলে এই শ্রীময়ী অনুরাগীরাই আর শ্রীময়ী দেখতে চাইছেন না। ফেসবুকে ‘শ্রীময়ী গ্রুপ’, ‘বাংলা সিরিয়াল’ পেজ, স্টার জলসার পেজের কমেন্ট সেকশনে দর্শকরা লিখছেন, ‘অসহ্য বিরক্তিকর শ্রীময়ী বন্ধ করুন।’ বা কেউ লিখছেন ‘গল্পের গরুর গাছে ওঠার মতো একটা কথা প্রচলিত আছে না? শ্রীময়ীতে সেটাই হচ্ছে এখন। কী যে বাজে লাগছে দেখতে।’ আবার কারও মতে, ‘এতগুলো সিরিয়াল টানতে গিয়ে থৈ হারিয়ে ফেলছেন। শ্রীময়ী থেকে সরে এখন দিঠির সংসার তারপর  হয়তো তার ছানাপোনা ডালপালা মেলে এগিয়ে যাবে, এভাবেই যতদিন চালিয়ে নেওয়া যায়।’ আবার কেউ বললেন, ‘আগে শ্রীময়ী দেখার জন্য ছটফট করতাম, খুবই ভালো লাগত। দিন দিন কি যে হয়ে গেল, কোথাকার গল্প কোথায় নিয়ে গেল। এখন না আছে মাথা না আছে মুন্ডু। দিঠিকে নিয়ে যা শুরু করেছে আর সহ্য করা যাচ্ছে না।’ কারও আবার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমি লীনা ম্যাডামের ২টো সিরিয়াল দেখা এবার ছেড়েই দিলাম ১ শ্রীময়ী, ২ মোহর। শ্রীময়ী তো অতি কদর্য, জঘন্য সিরিয়াল আর মোহরও সেই পথেই এগোচ্ছে।’

অথচ এই শ্রীময়ী চিত্রনাট্যেই অনেক নতুন মোড়, বাঁক বদল আনা যেত হয়তো, যা আগ্রহ বাড়াত দর্শকদের। দর্শকরাই আলোচনা করছেন, যেমন অনিন্দ্যর ছোট ভাই তাঁর স্ত্রী-বাচ্চাদের শ্রীময়ীদের বাড়িতে আনানো যেত। অনিন্দ্যর ভাই ও তাঁর পরিবারকে দেখার খুব আগ্রহ ছিল দর্শকদের। শুধু তাঁদের কথাই শোনা গেছে, যাঁরা নাকি শ্রীময়ীর শাশুড়ি পত্রলেখার কুব্যবহারে বাড়িমুখো হন না। তাঁরাই শ্রীময়ীর টানে ফিরতে পারত। অথচ এই প্লটটা ব্যবহার করলেন না লেখিকা লীনা গঙ্গোপাধ্যায়।

এমনি আরও একটা কৌতূহল ছিল, বুনি-উপলের ছেলে-মেয়ে কারা? তাঁদের দাদু-দিদার কাছে মামার বাড়িতে আনাই হল না। এসব নতুন চরিত্র দেখিয়ে নতুন প্রজন্মের জেন ওয়াই দর্শকদেরও আগ্রহ বাড়াতে পারতেন লেখিকা।

তেমনিই আবার কিছু চরিত্র কেনই বা এল কেনই বা গেল বোঝা দায়। যেমন হঠাৎই উবে গেল শ্রীময়ীর বাপের বাড়ির লোকরা। শ্রীময়ী ইন্দ্রাণী হালদার আর তাঁর ছোট ভাই অম্বরীশ ভট্টাচার্যর বন্ডিং ভীষণ ভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল সিরিয়ালে। অথচ সেই অম্বরীশ বাদ পড়ল চিত্রনাট্যে। নতুন পটকা রূপেই স্থান বরাদ্দ হয়ে গেল তাঁর ‘খড়কুটো’ সিরিয়ালে। অথচ শ্রীময়ীর বাপের বাড়ির লোকরা মা অলকানন্দা রায়, ভাই অম্বরীশ, ভাইয়ের স্ত্রী সমতা দাস যে অপমান পেত শ্রীময়ীর শ্বশুরবাড়ি থেকে, তাঁরা শ্রীময়ী নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর সেই জবাবটা দেওয়ার সুযোগ পেল না বেয়াই-বেয়ান বাড়িতে।

কিছু নতুন চরিত্র অবশ্য আনা হয়েছিল, কিন্তু তাতে টিআরপি বাড়েনি। তাই তারা বাদ। যেমন মিঠুদির মেয়ে। কেন যে সে এসেছিল, বুঝতে পারছেন না অনেকেই। শ্রীময়ীর বন্ধু, অন্তরা অনুশ্রী দাসের অমন বোল্ড চরিত্র পরের দিকে কাজে লাগানো হল না।

ইদানীং তো গল্প আরওই ভাল লাগছে না দর্শকদের। দিঠি, যে কিনা এত ব্রিলিয়ান্ট, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা, ডাক্তারি পড়া মেয়ে, সে কিডন্যাপ হয়ে বিয়ের কথা ভাবছে। অন্যের সংসারে ঘুঁটে দিচ্ছে, হাঁড়ি ঠেলছে। শ্রীময়ীও ভাবছে মেয়ের বিয়ে দেবে। এই যে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড় না করিয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া দেখাচ্ছেন লেখিকা, এতেই আরও বীতশ্রদ্ধ দর্শকরা। শ্রীময়ী নিজের জীবনে যে ভুল করেছেন মেয়ের জীবনেও সেই অভিশাপ ডেকে আনছেন।

দর্শকদের রাগ সবচেয়ে বাড়াচ্ছে শ্রীময়ী-অনিন্দ্যর ডিভোর্সের পর মাখোমাখো প্রেম। এক মহিলা দর্শক লিখলেন, ‘আমি নিজে ডির্ভোসড। এক্স হাজবেন্ড নিয়ে আদিখ্যাতা পোষায় না। গল্প প্রপারলি না এগোলে শেষ করে দিক। শ্রীময়ী চরিত্রটা অবাস্তব ও খুব নির্লজ্জ চরিত্র। সব ভোগ করেও বলে সব ছেড়েছি। সব ছাড়ার মানেটা বোঝেন লেখিকা?’

যে অনিন্দ্য একদিন শ্রীময়ীকে বলেছিল তাঁর গা থেকে আঁশটে গন্ধ বেরোয় বলে বউয়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করে না, সেই প্রাক্তন স্বামীকেই শ্রীময়ী নিজের সেবা, জীবন আবার সঁপে দিচ্ছেন। শ্রীময়ী ‘বাংলার মুখ’ প্রতিষ্ঠানে না গেলেও সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করেন। অবাস্তব চিত্রনাট্য ক্রমেই বিরক্তি বাড়াচ্ছে দর্শকের।

জুন গুহ অনেকদিন নেই সিরিয়ালে জেলে যাবার পর। দর্শকের মতে, জুন ছাড়া আলুনি হয়ে গেছে চিত্রনাট্য। কিন্তু জুনও বারংবার একই প্লটে বিপর্যস্ত।

রোহিত সেন এসে কিছুদিন শ্রীময়ীর জীবনে নতুন দিনের আলো এনেছিলেন। কিন্তু দর্শকদের মতে রোহিত সেন চরিত্রটি অবাস্তব। কারণ এমনই চিত্রনাট্য যেখানে রোহিত সেনের অফুরন্ত টাকা এবং হেন লোক নেই যিনি তাঁর বন্ধু নন। পুলিশ কমিশনার, ব্যারিস্টার, উকিল, ডাক্তার, হসপিটাল অথরিটি, বিদেশি সংস্থা, বাংলার মুখ প্রতিষ্ঠান, স্কুল অথরিটি– সব তাঁর হাতের মুঠোয়। তিনি একবার নয়, দুবার নয়, বারবার টাকা ঢালছেন শ্রীময়ীর সারা পরিবারের জন্য। তাঁর ফ্ল্যাটও বিলিয়ে দিচ্ছেন। কোটি কোটি টাকায় শ্রীময়ীর বিক্রি হওয়া বাড়ি ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এই অকল্পনীয় চিত্রনাট্য দর্শক বলছে গাঁজাখুরি।

আসলে হয়তো এই একই প্লট, একই গল্প দেখতে দেখতে দর্শকরা ক্লান্ত। শ্রীময়ীর বাড়ির প্রতিটি সদস্য হসপিটাল, আদালত, জেল ঘুরে ফেলেছে। আর কত নাটকীয়তা? তার উপর বিরক্তি বাড়াচ্ছে একই দৃশ্য পুরো এপিসোড জুড়ে। এমনকি তিন-চার এপিসোড জুড়েও থাকছে একই দৃশ্য। অথচ শ্রীময়ীর হিন্দি রিমেক ‘অনুপমা’ দেখে বাঙালি দর্শকরা খুশি। কিন্তু মূল সিরিয়ালটির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন দর্শকরা।

শুধু তাই নয়, হাসির উদ্রেক করছে প্রতিটি চরিত্রের প্রাক্তন প্রেম খুঁজে আনার চেষ্টায়। এমনকি শ্রীময়ীর শাশুড়ির প্রাক্তন কাজলদাকেও খুঁজতে বেরোচ্ছে শ্রীময়ী। দিশাহীন ভাবে এগোচ্ছে পথভ্রষ্টা লেখিকার কলম। একটু যদি ভাবা যায় তাহলে দেখা যাবে ম্যাজিক মোশনের সব কটি সিরিয়ালেই একই মুখের পুনরাবৃত্তি। তাই কি চরিত্রগুলো আধখাপছাড়া হয়ে পড়ছে সব সিরিয়ালের টানাপড়েনে? কোন চরিত্রই পূর্ণতা পাচ্ছে না?

শ্রীময়ী হতে পারত এক নারীর নিজের জোরে উন্নতির কাহিনি। কোনও রোহিত সেনের বলে ভর করে ওঠা নারী নয়, নিজের শক্তিতে জেতা নারী। যেরকম রোল আগেও অনেক ছবিতে করেছেন ইন্দ্রাণী হালদার। কী করে ভোলা যায় ‘দহন’-এর ঝিনুককে! সেখানে এক মেয়ে হয়ে আর এক মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল। যখন মেট্রো স্টেশনে এক ধর্ষিতাকে বাঁচাতে কোনও পুরুষ এগিয়ে আসেনি, কৃষ্ণ হয়ে এসেছিল এক কৃষ্ণা ইন্দ্রাণী। আবার ‘শ্বেত পাথরের থালা’র কলি, যে বিধবা বৌমণিকে নতুন উদ্যমে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে শেখায়। ‘কুয়াশা যখন’-এর দ্বৈত চরিত্রের ইন্দ্রাণীও কিন্তু আজও রয়ে গেছে দর্শক মনে।

শ্রীময়ীকেও মুছে ফেলা যাবে না ইন্দ্রাণীর অভিনয় জীবন থেকে। কিন্তু এখন যেভাবে চিত্রনাট্য এগোচ্ছে, তাতে ইন্দ্রাণী হালদারের অভিনয় প্রতিভার অপব্যবহার হচ্ছে, যা মেনে নিতে পারছেন না দর্শকরা। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রীও হয়তো বুঝছেন, শ্রীময়ী ক্রমে মর্যাদাহীন হয়ে যাচ্ছেন তাঁর অনুরাগীদের চোখে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More