শরণার্থী শিবিরে জন্ম, বিশ্বের আকাশ জুড়ে রাজত্ব! প্রথম আফগান মহিলা পাইলটকে চেনেন?

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

সালটা ১৯৮৭। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে ধুন্ধুমার দশা আফগানিস্তান জুড়ে। শয়ে শয়ে মানুষ ঘরহারা হচ্ছেন রোজ। দারিদ্র ও অনাচারের দ্বৈরথে দেশে প্রায় দুর্ভিক্ষের দশা। খাবার নেই, পানীয় জল নেই রোগ-অশুখের বাড়বাড়ন্ত। দলে দলে মানুষ গিয়ে উঠছে আফগান শরণার্থী শিবিরে। এরকমই একটি অস্থিরতম সময়ে মায়ের কোলে এসেছিল ফুটফুটে এক মেয়ে, শায়েস্তা। আর পাঁচটা শিশুর জন্মের মতো আনন্দের হয়ে ওঠেনি শায়েস্তার ভূমিষ্ঠ হওয়া। কী করেই বা হবে। শরণার্থী শিবিরে যার জন্ম, তার ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কি থাকে কিছু? বরং চার পাশের যুদ্ধের বিভীষিকা যেন বলে দিয়েছিল, জীবন-মৃত্যুর নানা ঝুঁকির দড়ির উপর দিয়ে জীবন এগোবে শায়েস্তার। যুদ্ধের আতঙ্ক এড়াতে, ছোট্ট শায়েস্তাকে নিয়ে আমেরিকা চলে যায় ওয়াইজ পরিবার।

কিন্তু কে জানত, ঠিক তিন দশক পরে শায়েস্তা ওয়াইজ আবারও ফিরবেন তাঁর জন্মভূমি আফগানিস্তানে! তা-ও আবার এক জন সফল পাইলট হিসেবে, বিমানে করে উড়ে এসে নামবেন তিনি নিজের দেশের মাটিতে!

অভাব কি আর কখনও স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে!

বহু মানুষেরই জীবনে নানা বিপর্যয় আসে। ওলোটপালোট হয়ে যায় সমস্ত চিন্তাভাবনা। কিন্তু জন্মের পরেপরেই ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ে কোনও হাত থাকে না মানুষের। শায়েস্তা ওয়াইজেরও ছিল না। জ্ঞান হওয়ার আগেই ভিন্ দেশের মাটিতে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু তার। কিন্তু নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমের জোরে যে কোথায় পৌঁছনো যায়, তার উদাহরণ বোধ হয় আফগান পাইলট শায়েস্তা ওয়াইজ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ার পরে, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের রিচমন্ড এলাকায় থাকতে শুরু করে ওযাইজ পরিবার। অভাবের সংসার। বিদেশের মাটিতে হাজারো অসুবিধা। তার মধ্যেই বেড়ে উঠতে থাকে শায়েস্তা। কিন্তু অভাব কি কখনও স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? পারে না। তাই সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে শায়েস্তা স্বপ্ন দেখলেন, পাইলট হওয়ার। তবে কাঁচা বয়সে সকলেই যেমন নানা অ্যাডভেঞ্চারাস স্বপ্ন দেখে, তেমন নয়। পেশাদার পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি।

একলা বিমানে পাড়ি ১৮টি দেশ, ২৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পথ

জান লড়িয়ে দিলেন নিজের স্বপ্ন পূরণে। সফলও হলেন। বিদেশের মাটিতে পাইলট হিসেবে অনুমোদন পেলেন তিনি। তাঁর নিজের দেশ আফগানিস্তান তখনও জানতেও পারেনি, প্রথম আফগান মহিলা পাইট হিসেবে বিমান নিয়ে উড়ান দিয়েছেন শায়েস্তা ওয়াইজ! তবে শুধু নিজে পাইলট হয়েই থামেননি শায়েস্তা ওয়াইজ। ‘ড্রিমস সোয়ার’ নামের একটি অলাভজনক সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়ার এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি তরুণীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিত শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেতে শুরু করেন।

এখানেই হয়তো শেষ হতে পারত, একটি অনুপ্রেরণার গল্প। কিন্তু না, তা হয়নি। সালটা ২০১৭। এক ইঞ্জিনের একটি ছোট বিমান চালিয়ে, আমেরিকা থেকে আফগানিস্তানের কাবুলে এসে নামেন শায়েস্তা ওয়াইজ। মাটির টান অগ্রাহ্য করতে পারেননি। ৩০ বছর বয়সের মধ্যে, তত দিনে ওই বিমানটি নিয়েই পাড়ি দিয়েছেন ১৮টি দেশ আর ২৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পথ। এমনকী, পার করেছেন আটলান্টিক মহাসাগর। ‘বিচক্রাফট বোনানজা এ ৩৬’ বিমান নিয়ে এর আগে কেউ এত দেশ ঘোরেননি। সেই কাজটাই কনিষ্ঠতম পাইলট হিসেবে সেরে ফেলে বিশ্বরেকর্ড ঝুলিতে পুরেছেন তিনি। বাকি ছিল কেবল নিজের দেশটাই। সব শেষে ফিরে এলেন সেখানে।

দেশ ছাড়ার কথা মনে নেই, মনে আছে যে এটাই আমার দেশ

কাবুলে ফিরে আসার পরে শায়েস্তা ওয়াইজ তাঁর বিমান চালানো শেখা এবং শেখার পরে বিমান উড়িয়ে সারা দেশ ঘোরার নানা রকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন সবার সাথে। তিনি বলেন, “তিনটি দশক পেরিয়ে গেছে। আমার কিছুই মনে নেই এই দেশ ছাড়ার কথা। কিন্তু আমি এটা মনে রেখেছি, যে এটা আমার দেশ। আমি চাই, আমার দেশের মানুষ আমায় চিনুক। আমি চাই, আমার সাফল্য এ দেশের মেয়েদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করুক। আর এ জন্যই আমি সম্প্রতি দেশে ফিরেছি একজন  পাইলট হিসেবে। খুব, খুব আনন্দিত আমি।”

নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতাম

আফগানিস্তানে ফিরে একটি ফ্লাইং স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু করেন তিনি। তিনি চান, তাঁর এই স্কুলে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে শিখুক আফগানিস্তানের ছেলেমেয়েরা। কারণ তিনিও স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই পেরেছিলেন। বলছিলেন, “বড় হতে হতেই আমার মধ্যে আকাশ ছুঁয়ে দেখার প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতাম। তখন বিশ্বকে আমি একেবারে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করি। অনেক রকম বই পড়তে শুরু করি। সেগুলো আমাকে স্বপ্নের কাছে নিয়ে যায়।”

পরিশ্রমের বিকল্প নেই

স্কুলের ছেলেমেয়েদের শায়েস্তা রোজ মনে করিয়ে দেন, “ভাল ও অন্য রকম কিছু করতে চাইলে, তা নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হবে সবার আগে। তবে শুধু স্বপ্ন দেখলেই চলবে না, সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সেটিই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  একমাত্র পরিশ্রম করলেই যে কোনও জায়গা বা পরিবেশ থেকে সব বাধা পেরিয়ে সাফল্য পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে জরুরি, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস।”

বদলের পালে হাওয়া লাগাতে চান

শায়েস্তার আক্ষেপ, মেয়েদের আধুনিক শিক্ষা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো– এ সব দিক দিয়ে আফগানিস্তান গোটা বিশ্বের তুলনায় এখনও অনেকটা পিছিয়ে আছে। এ দেশে মেয়ে মানেই যেন ঘরে বন্দি থাকার জন্যই তার জন্ম। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অগণিত আফগান মহিলা এখন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন। অনেকেই পড়াশোনার পরে চাকরি করছেন, কেউ নিজের ব্যবসাও করছেন। এই বদলের পালেই আরও একটু হাওয়া লাগাতে চান শায়েস্তা ওয়াইজ।

‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব উইমেন্স এয়ারলাইন্স পাইলট’-এর পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে এক লাখ ৩০ হাজার এয়ারলাইন্স পাইলটের মধ্যে মহিলা পাইলটের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। আর তাদের মধ্যে অন্যতম বিমানচালক এই আফগান তরুণী, শায়েস্তা ওয়াইজ।

হোঁচট খেলেও থামতে নেই…

তবে শায়েস্তা এখন আর শুধুমাত্র একটি দেশের প্রতিনিধি নন। বরং বিশ্বের দরবারে, তিনি পুরো নারীজাতির অদম্য প্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। আকাশজয়ী শায়েস্তা মনে করেন, আকাশের কোনও সীমানা হয় না। তবে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নের পথে অনেক বাধা থাকে। স্বপ্নের পথে হোঁচট খেলে থামতে নেই, বরং আত্মশক্তিতে বিশ্বাস রেখে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হয় পথ। তবেই আসে বহু প্রতীক্ষিত সাফল্যের ফল, আসে প্রাপ্য সম্মান। আসে পরিশ্রমের মূল্য।– ঠিক যেমনটা পেয়েছেন শায়েস্তা ওয়াইজ।

আরও পড়ুন…

ককপিটে মহিলা! প্রেজুডিস ভেঙে, আকাশ দাপিয়ে, উড়ানের ডাক মেয়েদের

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More