‘আরাধনা’য় নায়িকার ভূমিকায় অপর্ণার জুতোয় পা গলান শর্মিলা, তাতেই জিতে নেন বলিউডের মাটি

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বর্ধমানের ছেলে শক্তি সামন্ত চেয়েছিলেন নায়ক হবেন নিজে, কিন্তু হয়ে গেলেন পরিচালক। নিজে নায়ক হতে না পারলেও তিনিই ভারতীয় ছবিকে প্রথম সুপারস্টার নায়ক উপহার দিয়েছিলেন। শক্তি সামন্তর ছবির হাত ধরেই তামাম দুনিয়ায় সুপারস্টার নায়কের সম্মান পান রাজেশ খান্না। আর সেই ছবিটি ছিল ‘আরাধনা’।

শক্তি সামন্ত বাংলার ছেলে হলেও তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে দেরাদুনে। তাই বাঙালি হয়েও হিন্দি বলতে ও সুন্দর লিখতে পারতেন তিনি ছোট থেকেই। দেরাদুন থেকে পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা। কলকাতায় এসেই তাঁর জীবনের বাঁকবদল ঘটল। থিয়েটারে যোগ দিলেন। সেখান থেকে অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক। মাঝে অ্যাংলো স্কুলে শিক্ষকতা কিছুদিন। তার পরে পরিচালকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে দেখা হয়ে গেল প্রখ্যাত হিরো অশোক কুমারের সঙ্গে। তাঁর সৌজন্যেই ‘বম্বে টকিজ’-এ অবৈতনিক সহকারী টেকনিশিয়ানের কাজ পেলেন শক্তি। শুধু লাঞ্চটুকু ফ্রি ছিল। তৎকালীন পরিচালক ফণী মজুমদারের বাংলা চিত্রনাট্যটি হিন্দিতে লিখে ফেললেন শক্তি। কারণ দেরাদুনে থাকতে হিন্দি তাঁর রপ্ত ছিল। সেখান থেকেই একদিন তাঁর ভাগ্য খুলে গেল। শক্তি সামন্তর নিজের পরিচালনায় একের পর এক ছবি হিট। ‘বহু’, ‘ইন্সপেক্টর’, ‘হাওড়া ব্রিজ’, ‘ডিটেকটিভ’ থেকে ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’।

শক্তি সামন্তর ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’-এর চিত্রনাট্যকার ছিলেন শচীন ভৌমিক। যিনি অনেক দিন আগেই হলিউড ছবি ‘To Each His Own’ (১৯৪৬) অনুকরণে একটা বাঙালি মেজাজে হিন্দি ছবি করার স্বপ্ন দেখেন। যার কথা শুনিয়েছিলেন তিনি পরিচালক হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়কে। নারীকেন্দ্রিক ছবি। একজন নারীর প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়ে মা হয়ে ওঠার দুরন্ত কাহিনি। সেই ছবি করতেও রাজি হন হৃষীকেশ। কিন্তু নূতন, নার্গিস, মালা সিনহা এমনকি বাংলার সুচিত্রা সেনকে ভেবেও সে ছবির কাজ শুরু করতে পারেননি হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়।

সুচিত্রার তখন বম্বেতে ‘সারহাদ’ ছবি ফ্লপ হওয়ায় পাঁচ বছর আর বম্বে গিয়ে ছবি করতে চাননি। ছবির কাজও আর এগোয়নি। ‘মমতা’ ছবি হিট দিয়ে বম্বেতে প্রত্যাবর্তন করেন সুচিত্রা। তখন আসন্ন ছবিটির স্বপ্ন ভুলে যান হৃষীকেশ, কিন্তু ভুলতে পারেননি শচীন ভৌমিক। তিনি এই হলিউড ছবির ভাবনা শোনান শক্তি সামন্তকে। যে গল্প শুনে শক্তির চোখে জল চলে আসে, কারণ তাঁর মাকে মনে পড়ে যায়। এই গল্পেই পরের ছবি ভেবে ফেলেন শক্তি সামন্ত এবং শচীন ভৌমিক। ছবির নাম ঠিক হয় ‘সুবাহ প্যায়ার কি’। ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’ ছবির ‘রাত কি হামসফর’ গানের কলি থেকেই  ‘সুবাহ প্যায়ার কি’ ছবির নাম ঠিক করেন শক্তি।

‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’-এর প্রচার পুস্তিকার ব্যাক কভারে আসন্ন ছবি ‘সুবাহ প্যায়ার কি’-র বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়।

ছবির বাজেট কম ছিল তাই নায়ক হিসেবে শক্তি সামন্ত বেছে নেন এক প্রায় নবাগতকে। রাজেশ খান্না যে আগে কয়েকটি ছবি করে ফিল্মফেয়ারে নবাগত হিসেবে সম্মান পেয়েছিলেন। রাজেশ খান্না চিত্রনাট্য শুনে দেখেন, নারীকেন্দ্রিক গল্প। কিন্তু তবু তিনি আপত্তি করেননি, কারণ তখন তাঁর হাতে কোনও পরিবর্ত ভাল ছবি ছিল না। তাই নায়ক অরুণ চরিত্রে রাজেশকেই চুক্তিবদ্ধ করেন শক্তি সামন্ত।

আর নায়িকা? শক্তি সামন্ত তখন বেছে নেন সদ্য বম্বে যাওয়া এক বঙ্গকন্যাকে। তিনি তখন নায়িকা হিসেবে জিতেন্দ্রর বিপরীতে ‘বিশ্বাস’ ছবির কাজ করতে গেছেন বম্বেতে। তিনি ছিলেন মিস ক্যালকাটা অপর্ণা সেন। ‘দ্য তাজ’ হোটেলে অপর্ণা সেনকে চিত্রনাট্য শোনান শক্তি সামন্ত। নায়িকা বন্দনা চরিত্রে তখন কিন্তু অপর্ণাকেই ভাবেন শক্তি। কিন্তু অপর্ণা সেনের তখন চিত্রনাট্যের প্লট শুনে মনে হয় এত নাচা-গানার ছবি তাঁর জন্য নয়। বলিউডে অপর্ণার সাফল্যপথ খুব মসৃণ ছিল না, তাই বম্বেতে থাকতেও তিনি চাননি। আর সেই সঙ্গে এই বলিউড ছবির নাচ-গানে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না অপর্ণা সেন। তাই শক্তি সামন্তর সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন অপর্ণা সেন।

তখন শক্তি তাঁর আগের ছবির নায়িকা, সেই চেনা রিঙ্কুর কাছেই যান। শর্মিলা ঠাকুরও মায়ের রোল করতে দ্বিধাবোধ করেন কেরিয়ারের প্রথম দিকে। তাঁকে বৃদ্ধার রোলও করতে হবে, এমনটা ভাল লাগেনি তাঁর। কিন্তু শক্তি সামন্ত শর্মিলাকে বোঝান,বন্দনার রোলটা কতটা চ্যালেঞ্জিং। শেষ অবধি রাজি হন শর্মিলা। তৈরি হয় প্রথম রাজেশ-শর্মিলার হিট জুটি।

এই ছবি অপর্ণা সেন করলে আমরা হয়তো বলিউড ডিভা রূপেও অপর্ণা সেনকে পেতে পারতাম। কিন্তু অপর্ণার জুতোতে পা গলিয়েই শর্মিলা নিজের পায়ের মাটি শক্ত করে ফেলেন বলিউডে। কে জানত, অপর্ণার ছেড়ে দেওয়া রোলেই শর্মিলা আইকনিক হয়ে যাবেন! এমনকি শর্মিলা ‘আরাধনা’ র জন্য প্রথম সেরা অভিনেত্রীর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান।

গানের ব্যাপারে সামন্তর প্রথম পছন্দ ছিলেন শঙ্কর জয়কিষেন, কিন্তু বাজেট অল্প হওয়ায় তাঁকে শচীন দেব বর্মণের দিকে ঝুঁকতে হয়।  ‘সুবাহ প্যায়ার কি’ ছবির প্রথম গান রেকর্ড হয় ‘রূপ তেরা মস্তানা’। কিশোর কুমারের অবিস্মরণীয় কণ্ঠে মাত্র এক টেকে ফাইনাল হয় গানটি।

কিন্তু ছবির নাম  ‘সুবাহ প্যায়ার কি’-তে কোনও বাঙালি বিশেষত্ব নেই বরং উর্দু ঘরানা বেশি। ছবির পাবলিসিটি ডিজাইনার ছিলেন চন্দ্রমোহন গুপ্ত, যিনি পোস্টার ডিজাইন করতে গিয়ে শক্তি সামন্তকে জানালেন উর্দু নাম দিলে ছবি কিন্তু হিট হবে না। গল্প অনুযায়ী নাম দিন। এছাড়াও ছবির চিত্রনাট্যে নায়কের দ্বৈত চরিত্র যোগ হয়। তাই ছবিটির বেশ কিছু পরিবর্তন হয়। শেষ অবধি ছবির নাম রাখা হয় ‘আরাধনা’।

বহু পরিকল্পনার পরে বাজেট প্রিন্ট ঝামেলা মিটিয়ে ১৯৬৯ সালে মুক্তি পায় ‘আরাধনা’। আবার সত্তর দশকে গিয়ে বাংলায় রিলিজ করে ‘আরাধনা’। বাংলায় রাজেশ খান্নার কণ্ঠ ডাব করেছিলেন অভিনেতা মৃণাল মুখোপাধ্যায়। বাংলাতেও আরাধনার গানের লিরিক্সের উন্মাদনা এতটুকু কম নয়। বাঙালিদের কাছে বাংলা আরাধনাই বেশি প্রিয়।

‘অন্তহীন’-এ শেষমেশ দু’জনের একসঙ্গে স্ক্রিনশেয়ার।

সিঙ্গেল মাদারের লড়াই, কাহিনির প্রেক্ষাপটে পঞ্চাশ বছর পার করেও ‘আরাধনা’ ছবির প্রাসঙ্গিকতা আজও কমেনি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More