ধূলিকণায় ধুঁকছে ফুসফুস, আয়ু নিভছে দ্রুত! সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য আইন যেন পরিহাস

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

‘ওরা কাজ করে নগরে প্রান্তরে।’ আর ‘ওদের’ বুকের খাঁচা ক্রমেই শুকিয়ে যায়। খাঁচার ভিতরের দুই ফুসফুস বোঝাই হয়ে যায় সূক্ষ্ম ধূলিকণায়। শ্বাস নিভে আসে দ্রুত। শরীর জুড়ে বাসা বাঁধে ক্ষয়। একটা সমীক্ষা বলছে, ‘ওদের’ গড় আয়ু ৩৩-৩৫ বছর।

ওরা সিলিকোসিস অসুখে আক্রান্ত শ্রমিকের দল। এ অসুখকে বলা হয়, ‘পেশাগত রোগ’। কারণ উপার্জনের জন্য বাধ্য হয়ে বেছে নেওয়া পেশাই এই অসুখ উপহার দেয় মানুষগুলিকে। পাথর খাদানে দীর্ঘদিন কাজ করলে, পাথরের গুঁড়োর কণা ক্রমাগত শ্বাসের সঙ্গে ঢুকে ফুসফুসকে বিকল করে বাঁধায় সিলিকোসিস। তার পরে সেই অসুখের থাবায় হারিয়ে যায় তাঁর উপার্জনের ক্ষমতা। আর উপার্জনক্ষম মানুষটির চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায় বহু পরিবার। এ কালচক্র ঘুরেই চলেছে বছরের পর বছর ধরে।

এই শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়েই সক্রিয় আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে লড়ে চলেছে ‘সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রামী শ্রমিক কমিটি’।

জানা যায়, ১৯৩২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ সম্মেলন থেকে একে পেশাগত অসুখ আখ্যা দেওয়া হয়। পরে ১৯৫১ সালে ভারতেও শ্রম আইনে উল্লেখ করা হয়, সিলিকোসিস হল একটি ‘নোটিফায়েবল ডিজিজ’। কিন্তু এ সবই খাতায়-কলমে রয়ে গেছে বলেই অভিযোগ শ্রমিকদের। কার্যত, বিশ্বের নানা দেশে এই শ্রমিকদের জন্য বেশ কিছু সুরক্ষা নীতি গ্রহণ করা হলেও, নতুন নতুন যন্ত্রের কাজ শুরু হলেও, এ দেশে এখনও তার কিছুই নেই বলে অভিযোগ। নেই পর্যাপ্ত সচেতনতাও। ফলে খাদানে কাজ শুরু করার ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যেই তরতাজা শ্রমিকরা আক্রান্ত হতে শুরু করেন সিলিকোসিসে। এ অসুখ একবার হলে আর সারে না। বলতে গেলে, গোটা জীবনটাই শেষ হয়ে যায় অসুখের কবলে। উদ্বৃত্ত ও অসুস্থ শ্রমিক হিসেবে, সামাজিক ভাবে প্রান্তিক এক শ্রেণির মানুষ হিসেবে শেষ কয়েকটা দিন কাটানোই যেন ভবিতব্য হয়ে ওঠে।

তথ্য বলছে, দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে এ অসুখের প্রকোপ গত কয়েক বছর ধরে বেড়েই চলেছে। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বীরভূম, আসানসোল, পশ্চিম মেদিনীপুর– একাধিক জেলার বেশ কিছু জায়গায় পাথর খাদানে কাজে করতে গিয়ে এই মারণ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বহু শ্রমিক। কেউ হয়তো কোনও রকমে চিকিৎসা চালাচ্ছেন, কেউ অকালেই মারা গিয়েছেন।

বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, জ্বর দিয়ে শুরু হয় অসুখের উপসর্গ। শেষ দিকে শরীর নীলাভ হয়ে যেতে থাকে। এক সময়ে হাত-পা শুকিয়ে যেতে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, সিলিকা অর্থাৎ পাথরের ক্ষুদ্র কণাগুলি ফুসফুসের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধকারী কোষের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে ফেলে। যার ফলে ফুসফুসে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে যায়। অনেকটা যক্ষ্মার মতোই প্রভাব পরে শরীরে।

এই পরিস্থিতির জন্য, ‘সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রামী শ্রমিক কমিটি’র তরফে শ্রমিকনেতারা পরোক্ষে দায়ী করছেন ভারত সরকারের কৃষিনীতিকেই। তাঁদের অভিযোগ, কৃষিকাজ অলাভজনক হয়ে যাওয়া এই অসুখের একটা পরোক্ষ কারণ হয়ে উঠেছে। বেআইনিভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে বহু গরিব চাষির জমি। ফলে রাজ্যজুড়ে বহু দরিদ্র পরিবার থেকে কৃষিকাজের উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসতে হচ্ছে যুবকদের। নিজের রাজ্যে বা রাজ্যের বাইরে পাথর খাদানে কাজ করতে যেতে হয় তাঁদের। বস্তত, খনি থেকে পাথর তুলে, তার পরে সেগুলো ছোট করে ভেঙে, গুঁড়িয়ে নানা কাজে ব্যবহার হয়। বলাই বাহুল্য, বিশ্বজুড়ে বিপুল নির্মাণকাজে এই শ্রমটির ভূমিকা অপরিসীম।

কিন্তু শ্রমের ভূমিকা যতটা বেশি, অধিকার ঠিক ততটাই ক্ষুণ্ণ। একে তো অপরিসীম দারিদ্র্যের শিকার প্রায় প্রতিটি পরিবার, তার উপর সরকারি কাগজপত্র বা পরিচয়পত্রও নেই অনেকের। এমনকি অভিযোগ, কাজের হিসেবও প্রায়ই মেলে না, যেহেতু অনেক ‘বেআইনি’ খাদান চলছে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায়। সরকারি খাতায় যে খাদানের অস্তিত্বই নেই, তার শ্রমিকেরই বা কী অস্তিত্ব সরকারের কাছে!

সম্প্রতি মানবাধিকার কমিশন মিনাখাঁর সিলিকোসিস আক্রান্ত ২৯ জন শ্রমিককে ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বলে রায় দিয়েছে। শ্রমিক কমিটির মুখপাত্র জানালেন, লাগাতার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে এই রায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি কলকাতা হাইকোর্ট তার রিহ‍্যাবিলিটেশন পলিসি তৈরি করারও নির্দেশ দিয়েছে। তবে এমন রায় ও নির্দেশের নজির আগেও রয়েছে বলে জানালেন তিনি। দুঃখের বিষয় হল, এই আইনি রায় বা নির্দেশের ফল খাতায়-কলম থেকে শ্রমিকের জীবন পর্যন্ত কখনওই এসে পৌঁছয় না। অজস্র লালফিতের ফাঁসে একই জায়গায় আটকে থাকে তাঁদের দুরবস্থা। তদুপরি, একটা মামলার একটা রায় কখনওই এত বড় সমস্যার সমাধান নয়। কমিটির দাবি, আইনের দ্বারা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার চেয়েও জরুরি, সামগ্রিক পরিকাঠামোর বদল, যাতে এরকম ঝুঁকির পেশায় কাউকে বাধ্য হয়ে যেতে না হয় অথবা গেলেও ন্যূনতম সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে সরকার। তার আগে পর্যন্ত আদালতের রায়ের কোনও মূল্যই নেই বলে দাবি তাঁদের।

তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে ৭০০-র ওপর শ্রমিক আক্রান্ত হয়েছেন সিলিকোসিসে। মারা গিয়েছেন ৫০ জনের বেশি। আর খাদানে কাজ করা শ্রমিকের সংখ্যা কত, সে হিসেব তো কার্যত অসম্ভব একটা সংখ্যা। ফলে এতগুলি মানুষের ভবিতব্য যে এখনও ধূলিকণার ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More