‘জীবন এত ছোট কেনে’, অনুভা গুপ্তার জীবনের সঙ্গে মিলে যায় পর্দা, আজও কাটেনি মৃত্যুরহস্যের জট

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

১৪ জানুয়ারি, পৌষ পার্বণের রাত। শুক্রবার। সালটা ১৯৭২। গড়িয়াহাট নার্সিংহোমে অভিনেত্রী অনুভা ঘোষ গুপ্তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হল। বাংলা ছবির লক্ষ্মী চলে গেলেন অনাদরে। শোনা গেল, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ অকালমৃত্যুর কারণ। খবর ছড়িয়ে পড়ার পরেই ৪২ বছরের অনুভার মৃত্যু নিয়ে জল্পনা ছড়াল চারদিকে। কেউ বলল উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদরোগে মৃত্যু। আবার কেউ কেউ রটালেন, অশান্তির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে অনুভা আত্মহত্যা করেন। কোনওটাই আজ আর স্পষ্ট করে বলা যায় না। তবে সে সময়ে একটি শিলনোড়া ঘিরে রহস্য ঘনিয়েছিল। সে আলোচনায় পরে আসা যাবে।

তবে অনেকেরই মনে হয়েছিল, ঠিক যেন ঠাকুরবাড়ির নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর মতো অনুভার মৃত্যুর পর সব কিছুই আড়াল করা হল। সংবাদপত্রে বলা হল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। ১৫ জানুয়ারি শনিবার সারা হল অনুভার শেষকৃত্য। ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশানে উপচে পড়ল জনতার ভিড়। কপালে সিঁদুরের বড় টিপ পরে চিরবিদায় নিলেন নায়িকা। সেদিন বন্ধ ছিল স্টুডিওপাড়া। হাজির ছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়, নীলিমা দাস, মঞ্জু দে-রা। তাঁদের যদিও অনুভার পরিবার থেকে খবর দেওয়া হয়নি।

মৃত্যুর কয়েক দিন আগে কালীঘাটের বাড়ি থেকে অনুভা ফোন করেছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়কে, বলেছিলেন, “মাধবী, কবে নির্মল বাড়ি থাকবে না আমায় জানিও। সেদিন আমি যাব তোমাদের বাড়ি, অনেক কথা বলার আছে গিয়ে বলব।” সেটাই ছিল চিরবান্ধবী ও ভগিনীসম মাধবীর সঙ্গে অনুভার শেষ কথা। ‘অনেক কথা’ বলার সুযোগটা অনুভা পেলেন না। তার আগেই চলে গেলেন। কী বলতে চেয়েছিলেন অনুভা? সেটা আজও জানেন না মাধবী। অনুভা ঘোষ গুপ্তা আর মহুয়া রায়চৌধুরী– এই দু’জন অভিনেত্রীর রহস্য মৃত্যুর কারণ আজও অজানা মাধবীর কাছে। গোটা দুনিয়ার কাছেও বোধ হয় তাই-ই।

বিরাট কোহলি-অনুষ্কা শর্মা বা শর্মিলা ঠাকুর-মনসুর আলি খান পতৌদি, ভিভ রিচার্ডস-নীনা গুপ্তা– খেলোয়াড় আর নায়িকা জুটির প্রেমের পূর্বসুরি হলেন কলকাতা ময়দানের ফুটবলে অনিল-অনুভা। ক্রিকেটের চেয়েও বাঙালির কাছে একসময়ে ফুটবলের উন্মাদনা ছিল বেশি। অনিল দে ও অনুভা গুপ্ত। অনুভা যদিও পদবী লিখতেন গুপ্তা। কিন্তু তিনি বাঙালিই।

অনুভার পদবী নিয়ে ফিল্ম গবেষক ডাঃ জ্যোতিপ্রকাশ গুহ জানাচ্ছেন, “আগে স্ত্রীলোকদের পদবী রাখার অধিকার ছিল না। তখন ব্রাহ্মণ কন্যা, স্ত্রীরা নামের পাশে লিখতেন দেবী, অব্রাহ্মণরা লিখতেন দাসী। কাননবালা দাসী, মলিনা দাসী লিখতেন প্রথম যুগে। অনুভারা যেসময় ফিল্মে আসেন সেসময় দাসী লেখার প্রথা উঠে গেছে। যারা কায়স্থ হতেন তাঁরা স্বামীর পদবী নিয়ে জায়া যুক্ত করতেন। যেমন লেখিকা শৈলবালা ঘোষজায়া। অনুভা ঘোষ জায়া ওল্ড ফ্যাশন হওয়ায় উনি অনুভা গুপ্ত কে গুপ্তা লিখতেন।”

তবে অনুভার পিতার পদবী গুপ্ত। ওঁর স্বামীরা কেউ গুপ্ত ছিলেন না। ওঁদের প্রেম নিয়ে এযুগে আলোচনা হয় কম। কারণ তাঁদের নিয়ে বিশেষ তথ্য মেলে না আর। যেটুকু মেলে, তাও রহস্যে মোড়া।

অথচ কানন দেবী যুগের শেষ এবং সুচিত্রা সেন যুগের প্রারম্ভের মধ্যবর্তীকালে টালিগঞ্জ পাড়ার ‘হিট’ নায়িকা ছিলেন অনুভা গুপ্তা। কানন দেবীর সঙ্গে এবং তাঁর প্রোডাকশনে যেমন অনুভা অভিনয় করেছেন, তেমন সুচিত্রা সেনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও অনুভা মাত করেছেন বাংলা ছায়াছবিতে। অনুভা শুরুর দিকে নায়িকা ও তার পরে সহ-অভিনেত্রী রূপে পজিটিভ, নেগেটিভ, কমেডি সবরকম চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

খেলা পাগল অনুভার অবশ্য অভিনয়ে আসার কোনও স্বপ্ন ছিল না। বরং তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল কলকাতা ময়দান। নিজেও ভাল খেলতেন মহিলা হয়েও। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মোহনবাগানের অধিনায়ক ছিলেন অনিল দে। যাঁর খেলার প্রেমেই শুধু নয়, খেলোয়াড় অনিলের প্রেমেও পরেন অনুভা।

অনুভার মায়ের নাম ছিল আভা গুপ্ত। তিনি ছিলেন একজন কবি। আভা গুপ্ত প্রথমে ছিলেন মোহনবাগানের অনিল দের খেলার ভক্ত। যিনি মেয়েকে নিয়ে যেতেন মোহনবাগান মাঠে। তখন বলা হত ক্যালকাটা মাঠ। মেয়েকে মা আভাই কিছুটা এগিয়ে দেন অনিল দের দিকে। অনিলও পড়ে যান অনুভার প্রেমে। তখন যদিও অনুভা বিখ্যাত নায়িকা নন। কিন্তু এই মোহনবাগান মাঠ থেকেই অনুভা পান ফিল্মে সুযোগ।

তবে এময়ে অনুভা গুপ্তর আসল নাম মৃদুলা গুপ্ত। রবীন চট্টোপাধ্যায় ফুটবল মাঠের গ্যালারিতে মৃদুলাকে দেখে পছন্দ করেন ফিল্মে অভিনয়ের জন্য। রাজিও হয়ে যান অনুভা। মৃদুলা নাম পাল্টে হয়ে যান অনুভা। নামেও মা আভার প্রভাব। আভা থেকে নিজের নাম করে ফেলেন অনুভা।

অনুভা ছিলেন শিক্ষিতা, আভিজাত্যে রাণী রাসমণীর পরিবারের মেয়ে। জন্ম ১৯৩০ সালের ২৭ ডিসেম্বর, অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুর জেলায়। নিজেদের বাড়ি এবং মেয়েবেলা অবশ্য কেটেছে কলকাতায়। পড়াশোনা প্যারীচরণ গার্লস স্কুলে ও তার পরে বাণীপীঠ বিদ্যালয়ে। এর পরে শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে অনুভার বিদ্যাচর্চা। নাচে-গানেও গুণী ছিলেন। সঙ্গীতে ভবাণীচরণ দাসের ছাত্রী। আবার ক্রিকেটেও ছিলেন পারদর্শী। ১৯৫২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রের কলাকুশলীদের স্পোর্টস ম্যাচে অনুভা সর্বাধিক ইভেন্টে জিতেছিলেন এবং মেয়েদের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন। ইন্ডাস্ট্রির দুই নায়িকা মঞ্জু দে এবং অনুভা গুপ্তা ছিলেন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। বহু ছবি ওঁরা একসঙ্গে করেছেন। লাঞ্চ ব্রেকে বা আউটডোরে মঞ্জু আর অনুভা ক্রিকেট খেলতে নেমে পড়তেন রীতিমতো ব্যাটবল নিয়ে।

অনুভার প্রথম ছবি ‘বিশ বছর আগে’। কিন্তু অনুভাকে ‘সমর্পণ’ ছবির জন্য পছন্দ করেছিলেন রবীন চট্টোপাধ্যায়। সেটিও মুক্তিপ্রাপ্ত। তার পর ‘মায়ের ডাক’, ‘অনন্যা’, ‘বামুনের মেয়ে’, ‘কবি’, ‘আনন্দমঠ’, ‘আভিজাত্য’, ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ (এই ছবিটি হল শ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে প্রথম বাংলা ছবি), ‘সুনন্দার বিয়ে’, ‘ঘুমিয়ে আছে গ্রাম’ ইত্যাদি হল অনুভার শুরুর দিকের নামকরা ছবি। কানন দেবী, চন্দ্রাবতী দেবী, মলিনা দেবী, ছায়া দেবী, পদ্মা দেবী,যমুনা বড়ুয়াদের পড়ন্ত বেলায় মঞ্জু দে আর অনুভা গুপ্তই হয়ে ওঠেন টালিগঞ্জের নয়নের মণি। সন্ধ্যারাণী আটপৌরে রোল বেশি করতেন কিন্তু মঞ্জু এবং অনুভা সাহসী চরিত্রে নিজেদের বারবার ভেঙেছেন। সে জন্য ওঁরা দু’জন লাস্যে-যৌবনে এগিয়ে ছিলেন বেশি।

অনুভাকে অভিনেত্রী রূপে যিনি গড়ে দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন পরিচালক আচার্য দেবকী কুমার বসু। দেবকী বোসের ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ ছবিতে কৃষ্ণচন্দ্র দে-র বিপরীতে এক মুখরা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন অনুভা। দেবকী বোসের ‘কবি’ এবং ‘রত্নদীপ’ ছবি দিয়েই অনুভা প্রথম সারির নায়িকার আসনে উঠে আসেন। দু’টি কঠিন চরিত্রে অনুভা যে ভাবে অভিনয় করেছিলেন তা আজও বলতে বলতে বিহ্বল হয়ে পড়েন দেবকী কুমার বোসের পুত্র দেবকুমার বোস। তিনিও জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী পরিচালক। মণিপুর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দেবকুমার বসুর হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল।

সাতাশি বছরের বৃদ্ধ দেবকুমার বাবু সদ্য তাঁর স্ত্রীকে ক্যানসারে হারিয়েছেন। মন ভাল নেই। তবু দেবকী বোসের ছবিতে অনুভা গুপ্তাকে নিয়ে বলতে তিনি আগ্রহী হলেন দুপুরের অবসরে। দেবকুমার বোস জানালেন “দেবকী বোসের একটা বিরাট ক্ষমতা ছিল শিল্পী তৈরি করার। বাবার (দেবকী কুমার বসু) ট্রেনিংয়ে খুব উন্নত হয়েছিল অনুভা গুপ্তার অভিনয় ক্ষমতা। কানন দেবী, ছায়া দেবী থেকে উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চ্যাটার্জী– সবাই বাবার হাতে তৈরি। দেবকী বসু শিক্ষাগুরু ছিলেন বলা যায়। তাই তাঁর হাতের চড়-থাপ্পড় খেয়ে সুচিত্রা, অনুভা, উত্তমের মতো শিল্পী তৈরি হয়েছিল। বাবার ‘কবি’ ছবি করে খুব নাম করেছিলেন অনুভা গুপ্তা।

বাবার সঙ্গে অনুভা দ্বিতীয় ছবি করেন ‘রত্নদীপ’। নায়ক বিকাশ রায়। এটি বাংলা ছবির ইতিহাসে এমন একটি ছবি, যেটি ছিল ত্রিভাষিক। বাংলা, হিন্দি এবং তামিলে ছবিটি তৈরি হয়। ছবিতে কারও ভয়েস কিন্তু অন্য লোকের ভয়েসে ডাবড করা হয়নি। বহুদিন আমাদের বাড়িতে বসে সবাই হিন্দি ও তামিল শেখেন। এই ছবির জন্য অনুভা গুপ্তাকে হিন্দি শিখিয়েছিলেন কিংবদন্তী পাহাড়ি সান্যাল আর তামিল শেখান একজন তামিল পণ্ডিত। তিনটে ভার্সনেই ‘রত্নদীপ’ সুপারহিট করে এবং প্রচুর পুরস্কার পায়।

‘কবি’ ছবিতেও অনুভার ইনভলভমেন্ট কতখানি তার একটা দৃষ্টান্ত আমি দিতে পারি। ঠাকুরঝি চরিত্রে অনুভা যখন দেখল তাঁর প্রেমিক কবিয়াল একজন নটীর সঙ্গে প্রেমে লিপ্ত, তখন সে যে আঘাত পেয়েছে, সেটা ফুটে উঠল অনুভার মুখে। ট্রেনের লাইনের উপর দিয়ে ঘড়া মাথায় অনুভা যাচ্ছেন হঠাৎ ট্রেনলাইনে সে পড়ে যায় এবং ট্রেন আসছে। এত ইনভলভ হয়ে পড়েছিলেন চরিত্রে, যে ট্রেন কাছে চলে এসেছে, তবু বাবা শট কাট বলার পরেও অনুভা রেললাইন থেকে উঠছেন না। ছবিতে ঠাকুরঝি মারা যাচ্ছেন। ছবিটা মিলে যায় অনুভার নিজের জীবনের সাথে।

ছবিতে গান ছিল কবি রবীন মজুমদার গাইছেন, যে গানটা মান্না দে গেয়েছিলেন “এই খেদ মোর মনে/ ভালবেসে মিটল না আশ, কুলালো না এ জীবনে।/ হায়, জীবন এত ছোট কেনে?/ এ ভুবনে?” তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গান। এই গানের কথা কি মিলে যায় না অনুভার সঙ্গে? বাবা দেবকী বোস শিল্পীদের যে দর্শন দিতেন তার জন্য ওঁদের বেদ বেদান্ত, বৈষ্ণব সাহিত্য পড়তে হত। তা থেকেই অনুভার মনটা নরম হয়ে গেল। অনুভার নরম মনের উপর অনেক লোক ছড়ি ঘোরাল। তাঁদের প্রতিরোধ করে মোকাবিলা করার ক্ষমতা অনুভার ছিল না। এটা আমার বাবাকেও বলব, শুধু দর্শন দিলেই তো চলবে না, কুস্তিগীরের মতো শত্রুদের দুটো ঘুষি মারার শক্তিও দিতে হবে। মানসিক ঘুষি। শেষের দিকে অনুভার চেহারাও খুব ভেঙে গেছিল। অনুভা জীবনের বিরাটত্ব জানলেন, কিন্তু যারা তাঁকে আঘাত করল তাঁদের কাছে হেরে গেলেন। প্রথম স্বামী অনিল দে বা তার পরেও যারা যারা তাঁর জীবনে এসেছিল সকলেই কষ্ট দিয়েছেন।

দেবকী কুমার বসু তাঁর আদর্শ, দর্শন নিজের হাতে গড়া শিল্পীদের মধ্যে রোপণ করে দিতেন। কারণ একটা ভেসে যাওয়ার জায়গা থাকে। গ্ল্যামার জগতে টিকে থাকতে গেলে মানুষকে যে সচেতন হতে হয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হয় তা তিনি শিখিয়ে দিতেন। যার সবথেকে বড় উদাহরণ দেবকী বোস শিষ্যা সুচিত্রা সেন। মধ্যগগনে থাকতেই অন্তরাল জীবন তাঁর। অনুভা দেবীকেও সেই শিক্ষা দিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু কেউ পারত কেউ পারত না। অনুভার শেষ জীবন তাই ট্র্যাজেডিতে ঘেরা। মানুষ জীবনে হোঁচট খায়, অনেকে উঠে দাঁড়াতেও পারে, অনেকে পারে না। অনুভার পরিবার, তাঁর অনেক কাছের লোক– অনুভাকে কেউ ভালবাসেনি।”

অনুভা তাঁর মনের কথা যার সঙ্গে ভাগ করতেন তিনি হলেন সুবর্ণলতা মাধবী মুখোপাধ্যায়। মাধবী, মঞ্জু দে আর অনুভা ছিলেন ট্রায়ো। একবার শক্তিগড়ে তিনজনে গেলেন ল্যাংচা খেতে, গাড়ি ড্রাইভ করলেন মঞ্জু দে।

মাধবী তাঁর অনুভাদিকে নিয়ে জানালেন, “অনুভা গুপ্তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় মঞ্জু দে পরিচালিত ‘স্বর্গ হতে বিদায়’ ছবি করতে গিয়ে। তার পর তো একসাথে অনেক ছবি করেছি। কানন দেবী ‘শিল্পীমহল’ নামে একটা মহিলা সংগঠন করেছিলেন। সেই ‘শিল্পীমহল’-এর সদস্য আমরা ছিলাম। এই সংগঠন মহিলাদের যে ফিল্মলাইনে এক্সপ্লয়েট করা হত, সেসবে ঢাল হয়ে দাঁড়াত। ‘শিল্পীমহল’-এর ‘মিশরকুমারী’ নাটকে আমি আর অনুভাদি একসঙ্গে অভিনয় করি। তার পরে আমাদের মহিলাদের ঘরোয়া পার্টি হত। মঞ্জুদি যেহেতু একা থাকতেন, তাই ওঁর বাড়িতেই বেশি হত এসব। মঞ্জু দে সাঙ্ঘাতিক স্মার্ট মহিলা। মঞ্জুদি রান্না করতেন। আমি, অনুভাদি, নীলিমা দাস সবাই যেতাম।

‘দিবারাত্রির কাব্যে’র শ্যুটিংয়ে পুরীতে আমি আর অনুভাদি এক ঘর শেয়ার করেছিলাম। একসঙ্গে ছবি করলে আমি আর অনুভাদি কখনও দল ছাড়িনি। সে শ্যুটিংয়ে আমি আর অনুভাদি কিতকিত খেলতে শুরু করে দিলাম। দুঃখের জীবনেও অনুভাদি আনন্দপিপাসু ছিলেন। পরে প্রতিদিনই প্রায় শোয়ার আগে টেলিফোনে অনুভাদির সঙ্গে কথা হত। গুডনাইট বলে শুতে যেতাম আমরা।

অনুভাদির প্রথম স্বামী অনিল দে-র সঙ্গে তাঁর লিখিত কোনও বিবাহ হয়নি। সামাজিক বিয়েও হয়নি। বলা যায় ওঁরা লিভ-ইন করতেন। সেই ভদ্রলোক ভাল ছিলেন না। অনুভাদির পরে রবি ঘোষের সঙ্গে সম্পর্ক হল। তখন অনুভাদিকে বললাম, ‘দেখো আমাদের সমাজ অত ওপরে ওঠেনি যে লিভ-টুগেদার মেনে নেবে। দ্বিতীয়বার এই ভুলটা কোরো না। রবিবাবুকে পছন্দ হলে ওঁকে বিয়ে করো।’ আমি জোর করাতে ওঁরা বিয়ে করলেন কিন্তু আমার বাড়ি এসে হাজির হলেন অনুভাদির প্রথম স্বামী অনিল দে। তিনি এসে আমায় বলছেন ‘আমার বউকে ফিরিয়ে দিন।’ আমি বললাম ‘দেখুন অনিলবাবু একটা মানুষের দেহ নিয়ে কী করবেন? যদি আসল মনটাই চলে যায়।’ আর অনিলবাবুর অনেক অসুন্দর ঘটনা আছে, অনেক অন্যায় অত্যাচার উনি অনুভাদির উপর করেছেন। পরেও অনিল দে অনুভা-রবির সংসারে ঝামেলা করেছেন।

পরে অনুভাদি পার্শ্বচরিত্র করতেন, নায়িকা নেই আর। টাকাও কমে গেছে, সবটা ছেড়ে বেরিয়ে এসছেন। রবিবাবুর কেরিয়ারের প্রথম দিক তখন। রবিবাবুদের কালীঘাটের পৈতৃক বাড়িতে যৌথ পরিবারে থাকতেন অনুভাদি। পরিবারের সদস্যরা অভিনেত্রী বলে অনুভাদির সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতেন না। দেখতাম, স্টুডিওতে এসে অনুভাদি ব্রেকফার্স্ট করতেন। বলতেন ‘না রে সময় পাইনি খাবার।’ চাপা দিয়ে চলতেন সব।

আমাকে বললেন শেষ কথা ল্যান্ডফোনে, ‘কবে নির্মল (নির্মলকুমার, মাধবীর স্বামী) থাকবে না, যাব তোমার বাড়ি। অনেক কথা বলার আছে।’ তার আগেই অনুভাদি চলে গেলেন। আমার জানা হল না কী বলতে চেয়েছিলেন, কী কারণে চলে গেলেন। মারা যাওয়ার পরে জানতে পেরে যাই। রবিবাবুরা জানাননি আমায়। অথচ আমি অনুভাদির সঙ্গে সবচেয়ে টাচে ছিলাম। তবে রবিবাবু অনুভাদির সবচেয়ে বড় শ্রাদ্ধ, যেটা বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ, সেটা করেছিলেন। রবি ঘোষ লোক ভাল ছিলেন। সেইজন্য রবি ঘোষের সঙ্গে অশান্তি হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু রবি ঘোষের আত্মীয়স্বজনরা এত নিগ্রহ করেছে অনুভাদিকে, যা উনি নিতে পারেননি। অনুভাদি আমার বন্ধুর মতো, দিদির মতো, মায়ের মতো। তবু তাঁর মৃত্যুরহস্য আমার কাছে স্পষ্ট হয়নি। যা হয়নি মহুয়ার বেলাতেও। মহুয়ার স্বামীও লোক ভাল। আত্মীয়-বন্ধুরাই হয়তো কাল হল।”

তপন সিংহর ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ ছবিতে অভিনয় করে অনুভা সেরা সহ-অভিনেত্রীর বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছিলেন। যে ছবিতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেন লিলি চক্রবর্তী। আবার অনুভার শেষ ছবি ‘ছন্দপতন’-এও আউটডোরে একসঙ্গে ছিলেন লিলি। ‘ছন্দপতন’ অনুভার প্রয়াণের দু’বছর পরে রিলিজ করে।

নুসুবালা লিলি চক্রবর্তী জানালেন “তখন আমি একদম নতুন। ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’য় অনুভাদির সঙ্গে প্রথম কাজ করি। দু’বার আউটডোরে গেছিলাম আমরা। প্রথমে সাত দিন, তার পর পনেরো দিন। অনুভাদি খুবই ভালবাসতেন আমাকে। খুব সুন্দর রান্না করতেন। ওঁর বাড়িতেও আমাকে নেমতন্ন করে আদর-যত্ন করে খাইয়েছিলেন। শ্যুটিং স্পটেও অনুভাদির শ্যুটিং না থাকলে আমাদের জন্য রান্না করে পাঠিয়ে দিতেন। ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ ছবির শ্যুটিং-এই অনুভাদির সঙ্গে রবিদার প্রেম শুরু। কাঁকড়া খেয়ে রবিদার সারা গায়ে অ্যালার্জি হয়ে জ্বর এসে যায়, তখন অনুভাদি রবিদাকে খুব যত্ন করে সারিয়ে তোলেন। সেই থেকেই ওঁদের ভাললাগা-ভালবাসা। তার পর তো রবিদা আর অনুভাদির বিয়ে হয়।

অনুভাদির সঙ্গে আরও অনেক ছবি করেছি। ‘মুখুজ্জ্যে পরিবার’-এ আমার মা হয়েছিলেন, ‘জয়া’তে আমার কাকিমা হয়েছিলেন। শেষ পর্ব, ‘ছন্দপতন’। মেয়ে থেকে জায়ের রোলও করেছি ওঁর সঙ্গে। একটা মানসিক অবসাদে তো অনুভাদি ভুগতেন। প্রথম স্বামী অনিল দের থেকে পাওয়া নির্যাতন, পরে রবি ঘোষের যৌথ পরিবারও মেনে নেয়নি অনুভাদির ছবি করা। পরিবারের চাপে রবিদাও হয়তো চাইতেন না। একবার ‘ছন্দপতন’-এর আউটডোরে অনুভাদি উৎফুল্ল হয়ে বললেন ‘আজ আমার রবি আসবে।’ কিন্তু রবিদা সেদিন আর এলেন না। ভেঙে পড়লেন অনুভাদি।

ওই ছবির আউটডোরেই আমি আর অনুভাদি এক রুম শেয়ার করি। রাতের বেলা হঠাৎ দেখি ছাদের উপর ঢিল পড়ছে। দু’দিন দেখার পর অনুভাদি বলল ‘দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।’ অনুভাদি বেরিয়ে স্থানীয় লোকদের চেঁচিয়ে বললেন ‘আমরা আপনাদের পাড়ায় এসেছি আর ঢিল ছুড়ে আমাদের অপমান করছেন।’ পরে জানা গেল ইউনিটের ছেলেরাই আমাদের ভয় দেখাতে এ কাজ করেছিল। তখন অনুভাদি খুব বকুনি দিল ওদের।

যেদিন অনুভাদি মারা গেলেন সেদিন আমি শেষ দেখা দেখতে পারিনি। কারণ সেদিনই আমার বম্বের ফ্লাইট ধরার কথা ছিল। ‘সম্পুরান বিষ্ণুপুরাণ’ ছবির জন্য। সারা পথ আমি কাঁদতে কাঁদতে বম্বে গেছি। যত দূর জানতাম অনুভাদির প্রথম স্বামী ফুটবলার অনিল দে খুব অত্যাচার করতেন, যার জন্য রবিদাকে বিয়ে করেন অনুভাদি। রবিদা প্রথমে বিয়ে করতে চাননি পরে করেন। তবে সেই শ্বশুরবাড়িতেও অনুভাদি খুব অত্যাচারিত হতেন। যৌথ পরিবারে রবিদা কিছু বলতেও পারতেন না। অনুভাদিও মুখে কিছু বলতেন না। দেখাতেন খুব সুখী, কিন্তু আমরা বুঝতে পারতাম। সুস্থ মানুষ কীভাবে অত তাড়াতাড়ি মারা গেলেন, সেটা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। যার যেমন কপাল। রবিদা দুঃখ পেয়েছিলেন। দু’টো বিয়েই দেখেছি রবিদার। আবার রবিদার গল্ফগ্রিনের ফ্ল্যাটেও পরে গেছি, রবিদা নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তখন অনুভাদি নেই। রবিদা পরে বৈশাখীকে বিয়ে করেন। তখন বিজন থিয়েটারে আমরা নাটক করছি। তবে আজকাল তো সেভাবে দেখা হয় না বৈশাখীর সঙ্গে।”

১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে অশান্তির কারণেই মূলত অনুভা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রবি ঘোষের কালীঘাটের বাড়ি থেকে অনুভাকে নিয়ে যাওয়া হয় নার্সিংহোমে। নার্সিংহোম অনুভা গুপ্তাকে মৃত বলে ঘোষনা করে। হসপিটাল রিপোর্টে কী ছিল, তাও কেউ জানতে পারেনি। ইন্ডাস্ট্রির বেশিরভাগ জন মুখ খোলেন না। তবু অনুভার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না বলেই বিশ্বাস অনেকের।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটলেও তা রক্তচাপ থেকে না আঘাত লেগে? বাইরে রক্তপাত হয়নি কারণ মাথায় ব্যান্ডেজ দেখেননি প্রত্যক্ষদর্শীরা। মানসিক চাপ তো ছিলই, খুব অশান্তিতে ছিলেন অনুভা গুপ্তা। গড়িয়াহাট নার্সিংহোমের তৎকালীন স্বাস্থ্যকর্মীরা দাবি করেছিলেন, শিলনোড়ার আঘাতে অনুভার মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ হয়, যা থেকে মৃত্যু। যে আয়ারা অনুভাকে তদারকি করেছিলেন, শেষ মুহূর্তে তাঁরা তেমনটাই বলেন।

ময়নাতদন্ত হয়নি দেহের। তাই কোনও পুলিশি রিপোর্টও নেই। তখন ‘ছদ্মবেশী’, ‘অনিন্দিতা’, ‘পরিণীতা’ এসব ছবিতেও অনুভার ফ্যান-ফলোয়ার কিছু কম ছিল না। সবাই এই আকস্মিকতায় থমকে গেছিল। কদিন পর আবার টালিগঞ্জ পাড়া নিজের ছন্দে ফিরে এল। রবি ঘোষ বহু বছর বিপত্নীক ছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্তরা মিলে রবি ঘোষের সঙ্গে বৈশাখী দেবীর বিবাহ দেন পরে। তবু বৈশাখী এলেও রবি ঘোষ কোনদিন অনুভা গুপ্তাকে ভোলেননি। বৈশাখী দেবী জানিয়েছেন, রবি ঘোষের প্রথমা স্ত্রী মারা যান হঠাৎই সেরিব্রাল অ্যাটাকে।

আত্মজীবনী লিখে সব কথা, সব রটনা পরিষ্কার করে দিয়ে যাবেন, এমনটা চেয়েছিলেন রবি ঘোষ। সে আর হয়নি। তবে অনুভার জীবনের কথা জানলে সেই ‘কবি’ ছবিতে অনুভার উদ্দ্যেশে কবির গান সত্যি মনে হয়। ‘জীবন এত ছোট কেনে’। দাহর ধোঁয়া হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেলেন অনুভা যার চিতা ঢেকে দেওয়া হল কৃষ্ণচূড়া ফুলে ফুলে।

অনুভার লিপেই তো ছিল ‘পলাতক’-এ গীতা দত্তর সেই গান, “শরীরে লাগিলে দাগ মুছিলে তো মোছে, কলঙ্ক লাগিলে মাথে কিছুতে না ঘোচে গো।”

গীতা অনুভা দুজনেই ভালোবেসে সবার কলঙ্কভাগী হলেন এবং অকাল প্রয়াণে হারিয়ে গেলেন চিরতরে।

(কৃতজ্ঞতা: মাধবী মুখোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তী, দেবকুমার বোস এবং ডাঃ জ্যোতিপ্রকাশ গুহ।)
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More