‘একাই থাকি, তবে একাকীত্বে নয়’, বই-রান্না-টেলিভিশন নিয়ে দিব্যি সংসার করছেন মাধবী

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

“মন নিয়ে কাছাকাছি,
তুমি আছো আমি আছি
পাশাপাশি, ঘুরে আসি।
আরও দূরে, চলো যাই।”

আশা ভোঁসলের কণ্ঠে মাধবীর লিপে ‘ছদ্মবেশী’ ছবির এই গান কলার টিউনে বেজে ওঠে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের ফোনে। নাতনিরাই করে দিয়েছে দিদিমার ফোনে উত্তম-মাধবী জুটির চিরদিনের গানের কলার টিউন। মাধবী স্মার্টফোনে হোয়াটঅ্যাপ, ফেসবুক এসব পারেন না বলে হেসে ফেলেন। মাধবীর আজও সঙ্গী বই। বই তাঁর বন্ধু, একলাযাপনের সাথী, বই তাঁর পার্টনার।

মাধবী মুখোপাধ্যায় শুধু একজন নায়িকা বা অভিনেত্রী নন। তিনি একজন প্রাজ্ঞ নারী, বিদূষী। না, পুঁথিগত ডিগ্রিলাভ তাঁর দুর্বিপাকে সম্ভব হয়নি। কিন্তু সব ধরনের বই পড়ার অভ্যেস মাধবীর ছোট থেকেই। সে স্বভাব ইচ্ছে আজও তাঁর বর্তমান। মাধবী মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমি যা বই পাই তাই বই পড়ি। ছাগলের মতো বই খাই। ছাগল যেমন যেখানেই ঘাস দেখে খেতে শুরু করে। তেমনি আমিও যা বই দেখি তাই পড়তে শুরু করি।”

আজ, জন্মদিনে সপরিবার।

মাধবী শুধু যে ফিল্ম সংক্রান্ত বই তিনি পড়েন, তা কিন্তু নয়। সব ধরনের বই-ই তাঁর প্রিয়। মাধবীর জ্যোতিষ জ্ঞানও কিন্তু প্রবল। কারণ ওই জ্যোতিষ বই সব পড়েই তিনি আয়ত্ত করে ফেলেছেন শনি থেকে বৃহস্পতি গ্রহের কারসাজি। সেই জ্ঞান থেকেই মাধবী বলেন, “সৌমিত্রবাবু এই যে এত কাজ করে গেলেন, এত কাজ করতে পারলেন কী করে বলুন তো? সৌমিত্র বাবুর কর্কট রাশি, কর্কট গণ। এই কম্বিনেশনের লোকেরা চুপ  করে বসে থাকতে পারে না। কিছু না কিছু করবেই। সৌমিত্রবাবুকে বলেওছিলাম সে কথা। উনি আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মাধবী আমি কাজ করতে করতে চলে যেতে পারব তো? অসুস্থ হয়ে দীর্ঘ বছর শয্যাশায়ী থাকতে হবে না তো? আমার অনেক দায়িত্ব।’ আমি বলেছিলাম ‘পারবেন। কাজ করতে করতেই আপনি যাবেন। যদিও তা আমরা কেউ ই চাই না।… আর দেখুন তাই হল।”

মাধবী মুখোপাধ্যায় লকডাউনে দীর্ঘ কয়েকমাস ঘরবন্দি ছিলেন ২০২০ সালে। সৌমিত্র চট্যোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তীরা কাজ করতে বেরোন, করোনা আক্রান্তও হন। কিন্তু মাধবী বেরোননি এক পাও। এ প্রসঙ্গে মাধবী বললেন “আমাদের শিল্পীদের দেখে তো ভিতরটা পড়তে পারেন না দর্শকরা। কারও জীবন সমস্যাবিহীন নয়। আর ঘরে দীর্ঘদিন বসেও থাকা যায় না। টাকাটাও একটা ফ্যাক্টর। আমরা মেয়েরা আমাকে বেরোতে দেয়নি। বলেছে, ‘আমরা তো আছি।’ এই যে ‘আমি আছি’, ‘আমরা আছি’ বলার লোক কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সব মানুষের থাকে না। আমার দুই মেয়ে আমায় সেই জায়গাটা, সেই আশ্বাসটা দিয়েছে। এত দিন একাই থাকতাম ফ্ল্যাটে। সম্প্রতি হাইসুগার হয়েছে আমার, তাই আমার মেয়ে একজন সর্বক্ষণের মেয়েকে রেখেছে আমার দেখভাল করতে। তবে একা থাকতে কোনও সমস্যাই আমার হয় না। আর বাজার-দোকান সব ড্রাইভারকে দিয়ে করিয়ে নিই। বাইরের খাবারও খাইনি। নিজেই সারা লকডাউন রান্না করেছি। বাকি সময় বই পড়ে, নিউজ দেখে, গান শুনে কাটিয়েছি। আমার কিন্তু লকডাউন কাটাতে খুব কষ্ট হয়নি। সারাজীবন এত ছবি, থিয়েটার, সিরিয়াল করেছি অনেক দিন পরে নিজের জন্য সময় পেলাম। তবে আনন্দ করার মানসিকতাও ছিল না। এত সহকর্মীদের,আত্মীয়দের মৃত্যু এ বছর। যার জন্য বই পড়তে, লিখতেও ইদানীং কালে ভাল লাগছে না। মেয়েদেরও তো নিজেদের সংসার আছে। এক মেয়ে ঝুমি থাকে দুবাইতে। তার পক্ষে আসা এখানে সম্ভব না। আর এক মেয়ে মিমি কাছেই থাকে। ওই আমার খেয়াল রাখে। তবে সবার বাড়ি তো আলাদা, তাই করোনা আবহে দুরত্ব রেখে চলতে হচ্ছে। এবার পুজো, বড়দিনও  বাড়ি বসেই কাটিয়েছি।”

কথায়-কথায় মাধবীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর ছোটবেলার কথা। শিশুবেলা থেকেই তাঁর লড়াইয়ের জীবন। ছেচল্লিশের দাঙ্গার সেই দিন গুলো এখনও ভাবলে মাধবীর মন খারাপ করে। পথে এবার নামো সাথী, পথেই হবে এ পথ চেনা। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় মাধবীরা পথ নামলেন, পথে বসলেন। ভাগ্য বিড়ম্বিত হয়ে সেই পথ চলা শুরু।

কিন্তু এই দাঙ্গার মাঝেও সেই শিশুকালে পেয়েছিলেন অনেক শিক্ষা। যেমন মাধবীর মা বলতেন “আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।” মাধবী বলেন, “দাঙ্গা, মারামারি, রক্তপাত আমার ভীষণ ভীষণ অপছন্দের। ভাল লাগে না। ঈশ্বরকে ডেকে তাই বলি ‘হে বীণাবাদিনী মা, কর বরদান। আমাকে মানুষ বলে কর প্রমাণ। আর কৃষ্ণকে বলি তুমি তো সব কিছুর উদ্ধার করেছ যুগেযুগে, এই করোনা মহামারী থেকে আমাদের উদ্ধার করো।”

মাধবীর মা লীলা মুখোপাধ্যায় ছিলেন সিঙ্গেল মাদার। মাধবীর বাবা শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কোনও দিনই বনিবনা হয়নি। মতেও মিলত না দুজনের। শৈলেন্দ্রনাথ ছিলেন আত্মকেন্দ্রিক ও বইপাগল। এই বই পড়ার নেশা মাধবী হয়তো বাবার থেকেই পেয়েছেন। কিন্তু মাধবীর কিশোরীবেলায় তাঁর কাছে বাবা ছিলেন ভিলেন-সম। পরে অভিনেত্রী হওয়ার পরে অবশ্য বাবা-মেয়ের সংঘাত মিটে যায়। বাবার চিকিৎসার ভার নেন মাধবী। মাধবী হসপিটালে দেখতে যান, তাঁর মা দিদি যাননি। কোথাও যেন ওই লোকটাকে করুণা করেছিলেন মাধবী। যে বাবা তাঁদের দুই বোনের দায়িত্ব নেননি, তাঁরা কীভাবে বড় হবে ভাবেননি। ফেলে চলে যান স্ত্রী, সংসার। আবার বিয়েও করেন। সে ভিলেন ছাড়া আর কী?

এমএ পাশ আইনজীবি লোক ছিলেন মাধবীর বাবা। অঢেল পয়সাওয়ালা বাড়ির মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। মাধবীর বাবা চাইতেন, স্ত্রী হবেন এমন একজন যিনি ঘর সংসার দেখবেন, ছেলে-মেয়ে মানুষ করবেন, বাইরের জগৎ বলে কিছু থাকবে না। কিন্তু মাধবীর মা সংসারে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে চাননি, তিনি ছিলেন আধুনিকমনস্কা, সময়ের থেকে এগিয়ে। আর সেভাবেই নাচ,গান শিখে বড় হয়েছিলেন বাপের বাড়িতে। মতের অমিলে ভেঙে গেল সংসার।

ছেচল্লিশের দাঙ্গার আগে আগেই মাধবীর বাবা স্ত্রী-কন্যাদের পরিত্যাগ করেন। যদিও কখনও দু’জনের ডিভোর্স হয়নি। তখন বহু বিবাহের চল ছিল। হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট তখনও পাশ হয়নি। তাই মাধবীর বাবা আবার বিয়ে করেন। তবে মাধবীর মাও দ্বিতীয় সম্পর্কে ছিলেন। কিন্তু সেই মানুষটিও মঞ্চে, গানে, রেডিওতে নিজে ও মাধবীকে নিয়ে আসেন দুবেলা খাবার তাগিদেই। বড় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করেন বাদ-বাকি পয়সায়।

মাধবীর জন্ম তাঁর দিদিমার বাড়িতে। কিন্তু বিবাহিতা মেয়ে বাবার অন্ন ভোগ করতে চাননি। তাই ছিন্নমূল হয়ে মা-মেয়েরা নেমে পড়লেন মঞ্চে। বিয়ের পর লীলা দেবী, মাধবীর মা, ছবিতে অফার পেয়েও স্বামীর আদেশে ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরে একটামাত্র ছবি করেন এবং মঞ্চ, নাটকে পেশাদার থিয়েটারের অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন। দিদি স্কুলে যেত আর মায়ের সঙ্গে মাধবী থিয়েটারে। একদিন একজন শিশুশিল্পী আসেননি, তার জায়গায় মাধবীকে নামানো হল। ব্যস সেই শুরু অভিনয়ের। বালক সেজে অভিনয় যেমন করেছেন, তেমন বালিকার রোলও। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমায় সুচিত্রা সেনের কিশোরীবেলা করার কথা ছিল মাধবীর। সে এগোয়নি। পরে যেটা শিখা বাগ করেন।

অভাবের সংসারেও মেয়েদের জন্মদিন মা করতেন। মেয়ে বলেই তারা ফেলনা এটা কোনও দিনও বুঝতে দেননি লীলা দেবী।

মাধবী মুখোপাধ্যায় তাঁর নিজের জন্মদিন ছোটবেলায় কেমন করে হত সে প্রসঙ্গে বললেন, “আমাদের আধুনিকমনস্কা মা যুগের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন। আজ জন্মদিনে মা’কে খুব মনে পড়ছে। তখনকার দিনে কন্যাসন্তানের জন্মদিন পালনের সেরকম চল ছিল না। কিন্তু আমার মা ছিলেন মুক্তমনা। আমার জন্মদিন করতেন ঘটা করে। তৈরি করতেন পায়েস আর লেডিকেনি মিষ্টি। মনে আছে, গামলা-ভর্তি লেডিকেনি তৈরি হত বাড়িতে। যে আসত তাকেই মা ওই মিষ্টি খাওয়াতেন। এই কাজটি মা আমৃত্যু করেছেন। হয়তো নিজে ভাল নেই, তবু আমার জন্মদিনে মুখে পায়েস তুলে দিয়েছেন।”

আরও মনে পড়ছে, মনে পড়ে না, কোনও দিন আমাদের দুই বোনকে মা নিজে হাতে চুল বেঁধে দিয়েছেন বা জামা পরিয়ে দিয়েছেন। বলতেন, ‘সব নিজে করো, না হলে সাবলম্বী হবে না।’ তাই হয়তো অনেক ছোট থেকেই নিজের জামাকাপড় কেচে ইস্তিরি করতে শিখে গিয়েছিলাম। তাই আজ একা থাকলেও নিজের সব কাজ নিজে করতে পারি এই বয়সেও সারা লকডাউন তো করলাম। কাজের লোকের মুখাপেক্ষী হইনি।”

মাধবীর মেয়ের বিয়েতে সৌমিত্র।

মাধবী মুখোপাধ্যায় মানেই ‘চারুলতা’, ‘মহানগর’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘শঙ্খবেলা’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘সুবর্ণলতা’। কিন্তু মাধবীর ফ্ল্যাটে গেলে বোঝা যায় তিনি কতটা বাহ্যিক জীবনে নিরাভরণ। সাধারণ গেরস্থের মতো সাজানো তাঁর ফ্ল্যাট। নেই কোনও বিলাসিতা প্রদর্শনের ছটা। অথচ সেই ফ্ল্যাটের কর্ত্রীর মুখের ছবি আজও থাকে বার্লিন থেকে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। যাঁর নাম জাতীয় পুরস্কার বিজয়িনী বাঙালি অভিনেত্রী রূপে প্রথম। কিন্তু মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কাছে গিয়ে বসলে মনে হয় কোনও মা-মাসি-পিসির কাছে গল্প শুনতে বসেছে কেউ।

স্বর্ণযুগের আদি শিল্পীদের গল্পের ঝাঁপি খোলেন মাধবী, সে সব গল্প হয়তো এ যুগের কেউই প্রায় জানেন না। কারণ মাধবী প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিল্পীদের সঙ্গে অভিনয় করেছেন সেই শিশু বয়স থেকে। আজও তিনি অভিনয়ে। কানন দেবী, সরজুবালা দেবী, অহীন চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, ছায়া দেবী থেকে উত্তম কুমার, তুলসী চক্রবর্তী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে প্রসেনজিৎ, তাপস, চিরঞ্জিৎ, মহুয়া, দেবশ্রী থেকে এ যুগের সিরিয়ালের সমস্ত অভিনেতার সঙ্গেই কাজ করেছেন মাধবী।

আবার তিনিই একমাত্র অভিনেত্রী, যিনি সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক-তপন-ঋতুপর্ণর ছবিতে কাজ করেছেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকায়। বাদ যায়নি অঞ্জন চৌধুরী থেকে প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যরা। তাঁর ঘরে থরেথরে পুরস্কার। শো কেসে সব ধরছে না, তাই খাটের তলায় ট্রাঙ্কের ভিতর রাখতে হয়েছে। আর বইয়ের পাহাড়।

বড় কন্যা মিমির বিয়েতে মাধবী।

কিন্তু মাধবী কেন একা? এ প্রশ্ন আজও সবার মনে।

মাধুরী থেকে নাম পাল্টে ছবিতে নায়িকা রূপে হলেন মাধবী। বহু প্রেম প্রস্তাব, প্রলোভন, বিতর্ক পেরিয়ে মাধবী ভেবেছিলেন বিয়েই করবেন না। তবু শেষমেষ বিয়ে করেন সুদর্শন অভিনেতা নির্মল কুমারকে। তখন মাধবী পদবী লিখতেন চক্রবর্তী। অনেক ছবিতেই আছে তাই লেখা। বিবাহিত জীবনে দুটি কন্যা সন্তান মিমি আর ঝুমি। দুজনেই সুপ্রতিষ্ঠিত, একজন স্কুলশিক্ষিকা আর এক জন কলেজের অধ্যাপিকা। নির্মল-মাধবী পঁচিশ বছর বিবাহিত জীবন একসঙ্গে কাটিয়ে সেপারেশানে থাকতে শুরু করেন। সেটাও দুই মেয়ের বিয়ের পরে। মাধবী ছিলেন তাঁর মায়ের আদর্শে বিশ্বাসী। সম্মানের জন্য অনেক দূর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মতের অমিল হওয়ায় সসম্মানে দুই বিখ্যাত স্টার তাই আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ওঁদের ডিভোর্স হয়নি। মাধবী আজও সিঁদুর পরেন। শুধু তাই নয়, একলাই সংসার করেন। সবার মঙ্গলার্থে আজও প্রতি বৃহস্পতিবার পাঁচালি পড়ে লক্ষ্মী পুজো করেন মাধবী।

সম্প্রতি ডিসেম্বরে নির্মল কুমারের বিরানব্বইতম জন্মদিন করতে মাধবী গেছিলেন স্বামীর কাছে, বড় সিঁদুরের টিপ পরে। মেয়ে আর নাতনির আবদারে দাদু দিদা এক হন কেক আর নলেন গুড়ের সন্দেশ সহযোগে। লকডাউনে দীর্ঘ কয়েকমাস ঘরবন্দি থাকার পরে এটাই ছিল মাধবীর প্রথম বাইরে বেরোনো। জন্মদিন কাটিয়ে আবার নিজের লেক গার্ডেন্সের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন মাধবী। মাঝে-মধ্যে মেয়ের পরিবারের সঙ্গে তাঁরা দু’জনে সাউথ সিটিতে জামাইষষ্ঠীতে জামাইকে খাওয়াতেও যান। নির্মল কুমার অসুস্থ হলে খোঁজ খবরও রাখেন মাধবী। অবশ্য আজকাল আর বয়সের কারণে পেরে ওঠেন না সবসময় যেতে।

মাধবী একা থাকেন, ভয় লাগে না? বললেন, “ভয় করলে হয়! এত বছর তো একাই আছি। আমার আবাসনের লোকরা খুব সাহায্য করেন সবেতে। আর আমার পাশেই একজন ডাক্তার থাকেন। তিনি বলেছেন অসুস্থ বোধ হলে দরজা খোলা রাখবেন। ওঁরা ভীষনই খেয়াল রাখেন আমার। ড্রাইভার আছেন, তিনি বাইরের কাজগুলো করে দেন। সারাদিনই টিভি, রেডিও কিছু না কিছু চলছে আমার ঘরে। তাই কোনও সময় নিজেকে একা মনে হয় না।”

মাধবীর মেয়ের বিয়েতে দিদিমা লীলা মুখোপাধ্যায়।

সারাদিন কীভাবে কাটান মাধবী মুখোপাধ্যায়? সকালে চা খেতে খেতে খবরের কাগজে চোখ বোলান। যদিও করোনা আবহে সেও বন্ধ করেছিলেন। তারপর যেহেতু সব কাজের লোক গত বছর ছাড়িয়ে দিতে বাধ্য হন, তাই নিজেই সব করেন। সকালবেলা রাঁধাবাড়ায় ব্যস্ত, তাই ফোন সুইচ অফ। তখন শুধু নিজের সময়। সকালের জলখাবার সেরে, নিজের জন্যই রান্নার জোগাড় করতে রান্নাঘরে ঢুকে যান। রান্না সেরে, স্নান সেরে পুজোয় বসেন। ঠাকুরকে বৃহস্পতিবার দেন মিষ্টি। এখন নিজের হাই সুগার। তাই ঠাকুরের জন্যও বাতাসা বরাদ্দ করেছেন। লক্ষ্মীপুজো থাকলে সময় বেশি লাগে। তার পর লাঞ্চ। লাঞ্চ সেরে বই পড়ার অভ্যাস। বই পড়তে পড়তে একটু দিবানিদ্রা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হলে নিউজ চ্যানেল খুলে খবর দেখতে বসে পড়েন। রাজনৈতিক খবর শোনা তাঁর একটা নেশা। রাজনৈতিক মতামত মাধবীর চিরকালই ছিল। একবার তো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কেন্দ্রে কংগ্রেসের হয়ে মাধবী মুখোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে ছিলেন বিধানসভা নির্বাচনে। যদিও মাধবী হেরে যান। কিন্তু ঐ সময় দুঃস্থ অভিনেতা অভিনেত্রীর জন্য মাধবী অনেক কিছু করেছিলেন। তাঁদের আর্থিক সাহায্য, সুযোগ সুবিধে দেওয়া ইত্যাদি। এরপর মিডিয়া থেকে ফোন এলে সাক্ষাৎকার দেওয়া। রাতেও বই পড়ার অভ্যাস চিরকালের। শ্যুটিং থাকলে তো বেশি সময়টাই কেটে যেত বাড়ির বাইরে। এখন সে চাপটা নেই। লকডাউনে ঘরবন্দি থাকলেও তাই একলা বোধ কখনওই করেননি মাধবী। পায়ে একটু অসুবিধা আছে, লাঠি লাগে। তাই নতুন কাজের মেয়ে বরাদ্দ হওয়ায় এখন একটু স্বস্তি মিলেছে। তবু কাজের মেয়ের সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকা মাধবীর ধাতে সয় না। মুক্ত জীবনে মাধবী বিশ্বাসী।

শাশুড়ি মাধবী। জামাই, নাতনির সঙ্গে আড্ডা।

মাধবী মুখোপাধ্যায় বলেন “একা মানেই একলা নয়। একাকীত্ব একটা সাধনা। একবার ঘর ছাড়লে আর স্বামীর ঘরে ফেরা যায় না। একজন মহিলা এমনি-এমনি ঘর ছাড়ে না। তাই বলে স্বামীর প্রতি অসম্মান নেই। অনেকের মধ্যে থেকেও মানুষ একা হয়ে যেতে পারে। আবার একলা থাকা মানেই একাকীত্বের অবসাদ নয়। এটা বুঝতে হবে সবাইকে। শিল্পীদের স্পেস দরকার।”

মাধবী তাই সামনেই চলেন। কখনও পিছনে ফিরে তাকান না। মাধবী চলছেন, মাধবী চলবেন।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More