চলে গেলেন ‘লাভার বয়’ রাজীব কাপুর, তাঁর লাভস্টোরিতে বারবার ভিলেন হয়েছিলেন বাবা রাজ কাপুর

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিবাহিত রাজ কাপুর তাঁর ছবির নায়িকাদের সঙ্গে বারবার প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন এবং সে কথা আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন তাঁরই ছেলে ঋষি কাপুর। নার্গিস থেকে বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে ছবির কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন রাজ। এমনকি বৈজয়ন্তীমালা-রাজ কাপুর সম্পর্ক এত দূর গড়ায় যে রাজ কাপুরের স্ত্রী কৃষ্ণা রাজ কাপুর সংসার ছেড়ে হোটেলে গিয়ে ওঠেন।

নায়িকার সঙ্গে প্রেমের সেই ধারা বজায় রেখেছেন তাঁর পুত্ররাও। রণধীর কাপুর, ঋষি কাপুর এবং রাজীব কাপুর– রাজ কাপুরের তিন ছেলেই পিতার দেখানো পথে অগ্রসর হন। তবে তফাত একটাই, ছেলেরা বিয়ে করার আগেই নায়িকাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, আর তার প্রতি ক্ষেত্রে ভিলেন হয়ে দাঁড়ান আবার খোদ রাজ কাপুর।

মনমোহন দেশাইয়ের ছবি ‘রামপুর কা লক্ষণ’-এর শ্যুটিংয়ে রেখার সঙ্গে রণধীর কাপুরের প্রেম ছিল তখনকার বড় খবর। আবার ‘ববি’র শ্যুটিংয়েও ঋষি কাপুর-ডিম্পল কাপাডিয়ার প্রেম রিল থেকে রিয়েল লাইফের দিকে মোড় নিতে থাকে। ছোট ছেলে রাজীব কাপুরও ছবির জগতে ঢুকেই দিব্যা রানা এবং পদ্মিনী কোলাপুরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে সেই ধারা বজায় রেখেছিলেন। কম চর্চা হয়নি সেযুগে বলিউড সিনে পত্রিকাগুলিতে, এইসব সম্পর্ক নিয়ে।

ঋষি কাপুরের পরে এবার রাজীব কাপুর প্রয়াত হলেন, যা বড় ক্ষতি কাপুর পরিবারে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজীব কাপুর অসুস্থ হয়ে পড়লে বড়দা রণধীর কাপুর তাঁকে সঙ্গেসঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও, ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও রাজীব কাপুরকে বাঁচাতে পারলেন না। পরপর দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন রণধীর কাপুর। রাজীব কাপুরের মৃত্যুসংবাদ সর্বপ্রথম ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করেন বৌদি নীতু সিং কাপুর।

এই রাজীব কাপুর কেরিয়ার এবং ব্যক্তিগত জীবন– দুয়েতেই সুখী হতে পারেননি। তাই অবসাদ, ক্ষোভ তাঁকে চিরকালই কুরে খেয়েছে। এমনকি ভালোবাসাতেও তিনি বারবার আঘাত পেয়েছেন। একে অন্য ভাইদের এত নাম-যশ, তার উপর নিজে সঠিক ভালবাসাও পাননি রাজীব।

রাজ কাপুর তাঁর তিন ছেলেকে বড় ব্যানারে বলিউড ছবিতে লঞ্চ করেছিলেন। কিন্তু ঋষি কাপুর বাদে রণধীর আর রাজীব কাপুর সেরকম কিছু করতে পারেননি। বিশেষ করে রাজীব কাপুর একেবারেই ফ্লপ তকমায় কাটিয়ে গেলেন জীবন।

১৯৮২ সালে রাজ কাপুরের ‘প্রেম রোগ’ ছবিতে ছবির নায়িকার প্রেমে ভেসে যান রাজীব। তখনও রাজীব অভিনয় জগতে আসেননি। রাজ কাপুরের সহযোগী পরিচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতেন এই ছবিতে। ছবির নায়ক ছিলেন ঋষি কাপুর আর নায়িকা পদ্মিনী কোলাপুরী। পদ্মিনীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রেমে পড়ে যান রাজীব। পদ্মিনীকে শিশুশিল্পী রূপে ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ ছবিতে লঞ্চ করেছিলেন রাজ কাপুর। আবার ‘প্রেম রোগ’ ছবিতে তাঁকেই নায়িকা করেন রাজ। কিন্তু রাজীব যেন পদ্মিনীর জীবনে ভালোবাসার আগুন জ্বালাতে এলেন, যে আগুনে জ্বলে যেতে বসেছিল পদ্মিনীর ফিল্মি কেরিয়ার। কারণ তাঁদের প্রেমে ভিলেন হয়ে দাঁড়ান স্বয়ং রাজ কাপুর।

রাজ কাপুর যখনই রাজীবকে পরিচালনার কাজে ডাকতেন, রাজীবকে পেতেন না। শেষমেষ রাজীবকে পদ্মিনীর মেকআপ রুমে পাওয়া যেত। রাজ কাপুর তাই রাজীবকে আলাদা করে ডেকে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজীব কারও কথা না শুনে পদ্মিনীর সঙ্গে দেখা করতেই থাকেন। তখন  রাশ টানতে রাজ সাব ছোট ছেলে রাজীবকে সেট থেকে বার করে দেন, যাতে পদ্মিনী সেটে এলে রাজীবের সঙ্গে দেখা করতে না পারেন।

পদ্মিনীর কাছে রাজীবের প্রেমে ভেসে রাজ কাপুরের ছবি থেকে হাত ধুয়ে ফেলা কঠিন ছিল। কেরিয়ারকে সামনে রেখে রাজীবকে ভোলার চেষ্টা করেন পদ্মিনী। ইতি হয় রাজীব-পদ্মিনী সম্পর্কের।

১৯৮৩ সালে ‘এক জান হে হাম’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন রাজীব। এই ছবিতে রাজীবের নায়িকা ছিলেন দিব্যা রানা। এছাড়াও ছবিতে ছিলেন রাজীবের কাকা শাম্মি কাপুর এবং তনুজা। এই ছবি ফ্লপ হওয়া রাজীবের কেরিয়ারে উল্লেখযোগ্য কোনও বিষয় নয়, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ছাপ রেখে যায় এই ছবি। ছবির নায়িকা দিব্যা রানার সঙ্গে প্রণয়পাশে জড়িয়ে পড়েন নবাগত নায়ক রাজীব। আরও একটা শাম্মি কাপুর ফ্যাক্টর ছিল রাজীবের। কারণ রাজীব কাপুর নিজে বলেছেন, “আমাকে আমার কাকা শাম্মি কাপুরের মতো দেখতে হওয়ায় বলিউড আমাকে শাম্মি কাপুরের নকল রিমেড বানাতে চেয়েছিল। সেটাই আমার কেরিয়ারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”

এ সময়ে অবশ্য রাজীব-দিব্যা প্রেম নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয় ইন্ডাস্ট্রিতে।

ইতিমধ্যে ১৯৮৫ সালে রাজীব তাঁর বাবার শেষ পরিচালনায় ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’ ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পান। রাজীবের বিপরীতে রাজ কাপুর নেন মন্দাকিনীকে। কিন্তু  ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’-তে দিব্যাও সুযোগ পান রাজীবের সঙ্গে রাজ কাপুরের ছবিতে কাজ করার। রাজ কাপুর তাঁর ছেলেকে নায়কের ভূমিকায় লঞ্চ করলেও তখন রোমিও রাজীব শ্যুটিংয়ে মনযোগ দেওয়ার চেয়ে দিব্যার সঙ্গে প্রেমালাপেই বেশি ব্যস্ত থাকতেন। এই দিব্যা রানা একটি সুপারহিট বাংলা ছবিতে নায়িকাও হন। ভিক্টর ব্যানার্জীর ‘আগুন’ ছবিতে ভিক্টরের বিপরীতে নায়িকা হয়ে কাজ করেছিলেন তিনি।

দিব্যা-রাজীবের খুলামখুল্লা প্রেম চোখেও পড়ে রাজ কাপুরের। ফিল্মের বাইরেও সেটের মধ্যে চলা এই প্রেমকাহিনি দেখে রাজ ছেলের উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। রাজ কাপুরের রাগ গিয়ে পড়ে ছেলের ব্যবহারে। যার ফলে রাজ  ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’র বাণিজ্যিক সফলতার কথা ভেবে চিত্রনাট্যতে মন্দাকিনীর রোল প্রধান করে নায়িকাসর্বস্ব ছবি করে দেন এবং রাজীবের ভূমিকা ছবিতে নাচগানেই সীমাবদ্ধ রাখেন। ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’ সুপারহিট হয়েছিল রাজীব কাপুরের জন্য নয়। ঝর্নার নীচে শ্বেতশুভ্র শাড়িতে স্নাত মন্দাকিনী বক্সঅফিসে আগুন লাগিয়ে দেন। ফিল্ম দেখার পর রাজীব কাপুর যখন বোঝেন তাঁর সঙ্গে বাবা রাজ কাপুর কী খেলা খেলেছেন, তখন রাজীব বাবার উপর অভিমানে রেগে যান। দুজনের মধ্যে দেওয়াল উঠতে শুরু করে। ফলে ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’ হিট হয়েও রাজীব কাপুরের কেরিয়ারে তা কোনও প্রভাব ফেলে না। সব আলো নিয়ে মন্দাকিনী রাতারাতি স্টার হয়ে যান। রাজীব সেই তিমিরেই রয়ে যান।

এর পরেও রাজীব কাপুর বাবার কাছে চেয়েছিলেন ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’র মন্দাকিনীর মতো তাঁকেও আর এক বার ছবি জুড়ে নায়ক করে লঞ্চ করা হোক। কিন্তু রাজ কাপুর ছেলের কথা কানেই তোলেননি। রাজ কাপুরের কথা ছিল, তাঁর ছোট ছেলের কোন প্রতিভা নেই। নেই কোনও কাজের প্রতি নিষ্ঠা। একবার লঞ্চ করে ঠকেছেন। ছেলে প্রেম করতে ব্যস্ত ছবি করতে গিয়ে। রাজ তাঁর এতদিনের আয়, সুনাম ওই ছেলের পেছনে খরচ করতে আর চাননি। রাজ কাপুর বক্সঅফিস ভেবে ছবি বানান, তাই ছবির বাণিজ্যিক দিক তাকে দেখতেই হবে। রাজীবের ট্যালেন্ট থাকলে সে নিজের উদ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিক, পিতার আলোকে নয়। রাজীব আরও কিছু ছবি ‘লাভার বয়’, ‘আসমান’, ‘মেরে সাথী’, ‘জালজালা, ‘হাম তো চালে পারদেস’, ‘নাগিন’– এইসবে কাজ করলেও সেসব ছবি বক্সঅফিসে হিট করেনি। বলিউডে ফ্লপ হিরোর খাতায় নাম লেখান রাজীব।

শেষমেষ রাজ কাপুর যখন ‘আরকে ফিল্মস’ ব্যানারে ‘হেনা’ ছবি করবেন বলে ঠিক করেন, তখন রাজীব ভেবেছিলেন এবার অন্তত বাবা তাঁকে নায়কের রোলটা দেবেন। কিন্তু রাজ ঋষি কাপুরকে ‘হেনা’ ছবির হিরো করেন এবং রাজীবকে ছবির পরিচালক হিসেবে ও রণধীর কাপুরের সহকারী পরিচালক হিসেবে নেন। এই ছবির পরপরই রাজ কাপুরের মৃত্যু হয় এবং রাজীবের সব আশা জলাঞ্জলি যায়।

রাজীব এর পরে ঋষি কাপুর ও মাধুরী দীক্ষিতকে নিয়ে ‘প্রেমগ্রন্থ’ সিনেমা বানান একক পরিচালনায়। ছবির গান, মাধুরীর নাচ বিশাল হিট হয় কিন্তু ছবি বক্সঅফিসে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা কাহিনি বলেই চলেনি, রাজীব বলেছিলেন পরে। পরের কয়েকটি ছবি পরিচালনা করলেও সেগুলি আলোর মুখ দেখেনি। ১৯৯৯ সালে তাঁর প্রযোজিত শেষ ছবি ‘আ অব লট চলে’। যদিও ২৮ বছরের বিরতির পর আবার  কামব্যাক করার কথা ছিল অভিনেতার। আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত ‘টুলসাইডস জুনিয়র’ ছবিতে সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে অভিনয় করার কথা ছিল তাঁর। তবে তার আগেই মাত্র ৫৮ বছরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন রাজীব কাপুর।

রাজীব কাপুর ২০০১ সালে বিয়ে করেছিলেন আর্কিটেক্ট আরতি সভারওয়ালকে। কিন্তু দুবছরও টেকেনি সেই বিয়ে। ‘লাভার বয়’ রাজীব সারাজীবন একটু ভালবাসার জন্য ঘুরেছেন, তাঁর কোনও ভালবাসাই পূর্ণতা পায়নি। শেষমেষ সংসারও হল না। নিঃসন্তান রাজীব একাই ছিলেন বাকি জীবন। তবে কাপুর পরিবারের ভাইবোনরা তাঁকে ঘিরে ছিল সারাজীবন।

শেষমেশ অকালেই ফুরিয়ে গেল রাজীব কাপুরের জীবন।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More