‘লতার মতো’ হয়েই চিরকাল রয়ে গেলেন সুমন কল্যাণপুর, কদর পেল না কণ্ঠভরা প্রতিভা

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে,
কৃষ্ণচূড়ার বন্যায়, চৈতালী ভেসে গেছে।’

রেডিও থেকে আজও যখন ভেসে আসে এই গান, আমরা ফিরে চলে যাই পঞ্চাশ ষাটের দশকে। যখন ইন্টারনেটের যুগ ছিল না। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইউটিউবের অস্তিত্ব ছিল না। রেডিওই ছিল বাঙালির বঙ্গজীবনের বিনোদন। আর এমন সব গান কানে এলে মনটা হু হু করে উঠত।

যে শিল্পীর গান এটি, তিনি সুমন কল্যাণপুর। যাঁর কণ্ঠে ছিল লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ভীষণ মিল। এটাই তাঁর কেরিয়ারের কাল হয়ে দাঁড়ায়। তাই তিনি এযুগে প্রায় অচেনা। অথচ তাঁর গান আজও এফএমে বাজে। আধুনিক বাংলা গান,বাংলা ছায়াছবির গান অনেক গাইলেও সুমন কল্যাণপুর আদতে বাঙালি নন। কিন্তু তিনি তাঁর কয়েকটি গান দিয়েই বাঙালিদের বড্ড আপন ছিলেন।

তখন আকাশবাণী আর রেকর্ডের যুগ। সুমন কল্যাণপুরের গান বাজলে শ্রোতারা আলাদা করে তাঁর কণ্ঠ চিনতে পারতেন না। ভাবত লতাই গাইছেন। যা সুমন কল্যাণপুরের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাড়ায়। সুমন ও লতার কণ্ঠ নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে কারণ রেডিওয় সুমনের গান বাজানোর পরে বহু সময় তাঁর নামটাই ঘোষণা করা হত না। শুরুর দিকে রেকর্ডেও তাঁর নাম থাকত না। এ কারণেই তাঁকে লতার ছদ্মপরিচয়ে চিরকাল বাঁচতে হয়েছে।

তবে সুমন কল্যাণপুর লতাকে অনুকরণ নয়, অনুসরণ করেই গান গাওয়া শুরু করেন। কলেজ জীবনে সুমন লতার গান গেয়ে আসর জমাতেন। তাঁর হিন্দি, বাংলা, তামিল স্পষ্ট উচ্চারণ, সুরেলা তালিম নেওয়া কণ্ঠ সবই সুনিপুণ ছিল প্লেব্যাকের জন্য। বহু হিন্দি ও বাংলা ছবিতে প্রথম সারির নায়িকার লিপে গেয়েওছেন সুমন কল্যাণপুর। কিন্তু ওই পঞ্চাশ-ষাটের দশক শাসন করতেন লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁসলে। যাঁদের দাপটে সুমন কল্যাণপুর রয়ে যেতেন সংগীত পরিচালকদের থার্ড চয়েস হিসেবে।

যখন কোনও গান রেকর্ডিংয়ে লতা সময় দিতে পারতেন না তখনই ডাক পড়ত সুমনের। আবার যেসব প্রযোজক তাঁদের ছবিতে লতার যা পারিশ্রমিক তা দিতে সক্ষম হতেন না, তাঁরা ডেকে নিতেন সুমন কল্যাণপুরকে।

তবে কিছু সময়ের জন্য সুমন কল্যানপুর মহম্মদ রফির সঙ্গে পরপর ডুয়েট গেয়ে উঠে এসেছিলেন লতা-আশার স্টেটাসে। কারণ ওই সময় রয়্যালটি ইস্যু বিবাদে লতা আর রফির সঙ্গে গান গাইছিলেন না, তাই রফির সঙ্গে ডুয়েটে লতার পরিবর্ত হিসেবে সুমন গাইতেন।

কমপক্ষে ১৪০টি গান একসঙ্গে গেয়েছিলেন সুমন কল্যাণপুর ও মহম্মদ রফি, যা সুমন কল্যাণপুরের কেরিয়ারে ল্যান্ডমার্ক সময়। তাঁদের ডুয়েটের মধ্যে ‘আজকাল তেরে মেরে পেয়ারকে চর্চে’, ‘না না করকে পেয়ার’-এর মতো চিরকালের গান অজস্র। পাশাপাশি তিনি ডুয়েট গেয়েছেন মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

সুমন কল্যাণপুরের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি। জন্ম পদবী হেমাদি। সুমন হেমাদি। জন্ম পূর্ববঙ্গের ঢাকায়। কিন্তু আদতে তাঁরা কর্নাটকের বাসিন্দা। কর্নাটকের উদুপি জেলার কুন্দপুর তালুকের একটা গ্রাম হল হেমাদি। সুমনজির পিতা, শংকর রাও হেমাদি কর্নাটকের ম্যাঙ্গালোর শহরের এক বনেদী সারস্বত ব্রাহ্মণ পরিবারের মানুষ। তিনি ‘সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া’র উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন এবং দীর্ঘদিন চাকরি সূত্রে ঢাকায় ছিলেন। ঢাকাতেই জন্ম সুমন হেমাদির। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবথেকে বড়।

১৯৪৩ সালে শঙ্কর হেমাদি ও তাঁর স্ত্রী সীতা হেমাদি চলে আসেন তৎকালীন বম্বে শহরে। বিভিন্ন ভাষার পরিবেশে সুমনের বেড়ে ওঠা। একদিকে দক্ষিণী ভাষা, অন্যদিকে স্পষ্ট বাংলা এবং হিন্দি উচ্চারণে দক্ষ ছিলেন সুমন কল্যাণপুর। যা তাঁর সঙ্গীতজীবনে উন্নতি ঘটায়।  সুমনের পড়াশোনা ও রাগ সংগীতের তালিম মুম্বাইতেই।

মুম্বইয়ের বিখ্যাত কলম্বিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন। সঙ্গে গানের তালিম। প্রথম দিকে গান ছিল তাঁর নেশা কিন্তু পরে সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নিয়ে পাকাপাকি মুম্বাইতে সঙ্গীতের তালিম ও অনুষ্ঠান করতে থাকেন। আর একটা গুণও ছিল তাঁর, অসম্ভব ভাল আঁকার হাত, তাঁর শ্রোতারা যা অনেকেই জানেন না। পড়াশোনা শেষ করে তিনি ছবি আঁকার পাঠ নিতে স্যর জেজে স্কুল অফ আর্টসে ভর্তি হয়েছিলেন।

কিশোরীবেলায় তাঁর ভাল লাগত নূরজাহানের গান। স্কুলে বা বাড়ির অনুষ্ঠানে গান গাইতেন সুমন। সেরকমই এক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শোনেন প্রখ্যাত মরাঠি সঙ্গীত পরিচালক কেশব রাও ভোলে। তিনি কথা বলেন সুমনের বাবা-মায়ের সঙ্গে। মেয়ের প্রতিভাকে নষ্ট না করার অনুরোধ করেন। নিজেই সুমনকে তালিম দিতে ছাত্রী করে নেন তিনি। কেশব রাও বুঝেছিলেন সুমনের লাইট কণ্ঠ, যাতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চেয়ে আধুনিক বা প্লেব্যাক ভাল ফুটবে। তাই সেইদিকেই সুমনকে এগিয়ে দেন তিনি।

১৯৫৪ সালে, ‘মঙ্গু’ ছবি দিয়েই হিন্দি ছবিতে প্রথম প্লে ব্যাক সুমনের। সে বছরেই ‘দরওয়াজা’ ছবিতে সুমনের সঙ্গে প্লেব্যাক করেন তালাত মামুদ। তালাত মামুদ-সুমন কল্যাণপুর জুটি বেশ কিছু পরপর হিট গান উপহার দেয়। যেসব গান দিয়েই সুমনের জনপ্রিয়তা বাড়ে। ‘বাত এক রাতকি’, ‘দিল এক মন্দির’, ‘নুরজাহান’, ‘দিল হি তো হ্যায়’, ‘জাহান আরা’, ‘পাকিজা— দীর্ঘ হতে থাকে সুমনের সাফল্যের তালিকা। শঙ্কর জয়কিষণ, রোশন, মদনমোহন, শচীনদেব বর্মন, নৌশাদ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সব নামী সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে গান গেয়েছেন সুমন।

কিন্তু গানে খ্যাতি এল তাঁর বিয়ের পর। বিয়ে হয় মুম্বাইয়ের ব্যবসায়ী রামানন্দ কল্যাণপুরের সঙ্গে। তাই সুমন হেমাদি তাঁর আসল নাম হলেও সুমন কল্যাণপুর নামেই তিনি জনপ্রিয় হন। বহু শিল্পীর বিয়ের পর গান আর থাকে না, অশান্তির কারণ হয় মেয়েদের পেশা। কিন্তু এদিক থেকে সুমন কল্যাণপুরের ভাগ্য ছিল অনন্য। তাঁর স্বামী তাঁকে সঙ্গে করে সমস্ত গানের রেকর্ডিংয়ে নিয়ে যেতেন।

তবে শুধু বলিউড গানই নয়। সুমন কল্যাণপুর বড় বেশি বাংলারও। বাংলা গানের শ্রোতারা আজও তাঁর দুটি ল্যান্ডমার্ক আধুনিক গান মনে রেখেছে। ‘আমার স্বপ্ন দেখা দুটি নয়ন’ আর ‘মনে করো আমি নেই বসন্ত এসে গেছে।’ এছাড়াও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় লতার পাশাপাশি বরাবর সুমন কল্যাণপুরকে বাংলা ছবির গানে জায়গা দিয়েছেন। মনে পড়ছে ‘মণিহার’ ছবিতে সেই আইটেম সঙ।

মান্না দের সুরে সুমন কল্যাণপুরের এই গানটিও মনকে নাড়িয়ে দেয়। –‘কাঁদে কেন মন আজ, কেউ জানে না। কোনখানে ব্যথা আছে, কেউ বোঝে না।’

এমন একটা মুগ্ধতা ছিল তাঁর কণ্ঠে, যা শুনলে মনে হয় সত্যি তিনি কতটা ব্রাত্য রয়ে গেছেন সব গুণ থাকা সত্ত্বেও।

‘আকাশ অজানা তবু খাঁচা ভেঙে উড়ে যায় পাখি’, ‘দুলছে রে মন’, ‘তোমার আকাশ থেকে’র মতো অনবদ্য সব গান গেয়েছেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ লতাসদৃশ হওয়ায় তিনি প্রায় অচেনাই রয়ে গেছেন শ্রোতা মহলে।

‘কৃষ্ণ সুদামা’ ছবি আজও বিখ্যাত হয়ে আছে শুধুমাত্র সুমন কল্যানপুরের গান ‘তোরা হাত ধর প্রতিজ্ঞা কর, চিরদিন তোরা বন্ধু হয়েই থাকবি, বন্ধু কথার মর্যাদাটা রাখবি’-র জন্য। আইকনিক ফ্রেন্ডশিপ গান সুমনজির কণ্ঠেই সবাই আজও গুনগুনিয়ে ওঠে।

সুমন কল্যাণপুরের যা ট্যালেন্ট ও কণ্ঠ ছিল, তার পূর্ণ মর্যাদা তিনি পাননি। ইচ্ছে করে লতার কণ্ঠ নকল করেননি। মিলে গেছে সমসাময়িক দুই গায়িকার কণ্ঠ। আশা ভোঁসলে প্রথম যুগে গীতা দত্তকে অনুকরণ করে গাইতেন, লতার থেকে আলাদা হতে। পরে আশা নিজের স্বকীয়তা দেখানোর সুযোগ পান ওপি নাইয়ার, আরডি বর্মণের সহায়তায় এবং তখন ক্যাবারে গানে আশাই একক বিজয়িনী।

সে অর্থে সুমন কল্যাণপুর সুযোগের অভাবে প্রান্তিক এবং লতার পরিবর্ত হিসেবেই রয়ে গেছেন। আজ সুমনজি অশীতিপর বৃদ্ধা। গান তাঁর কাছে সাধনা। কী পাননি সেই নিয়ে তাঁর আর কোনও আফশোস নেই। তাঁর একমাত্র কন্যা চারুল অগ্নি, যিনি বিয়ের পর আমেরিকাবাসী। যদিও চারুলের কন্যা, অর্থাত সুমনজির নাতনি ভারতে ফিরে এসছেন এবং সুখের কথা দিদিমার নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানও খুলেছেন দুঃস্থ মানুষদের সাহায্যার্থে।

সুমন কল্যাণপুরকে লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার ভূষিতা করা হয়েছে। কিন্তু পুরস্কারেও সেই লতা আশ্রয়। লতার যুগেও সুমন নিজের প্রতিভায় বম্বে ও বাংলায় জায়গা করে নিয়েছেন তবু তাঁকে ‘লতার মতো’ শুনেই সারাজীবন বাঁচতে হল। অথচ সুমন কল্যাণপুরের গান ভোলা যায় না।

‘আমার স্বপ্ন দেখার দুটি নয়ন
হারিয়ে গেল কোথায় কখন
কেউ তা জানে না গো কেউ তা জানে না।’
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More