‘মমতা আহমেদকে বলে গেছে ওরা দুটো আসনেই লড়বে…’

শঙ্খদীপ দাস

তারিখটা ঠিক মনে নেই। ২০০৮-এর জুলাই মাসের গোড়ার দিকে কোনও একদিন হবে। রাত তখন সওয়া ১২ টা। প্রণববাবু বললেন, “তুই আর একটু বসে যা। আহমেদ আসবে। ও এলে তার পর যাবি।” এত রাতে?

প্রণববাবুর চোখে মুখে তখন ক্লান্তি। পিঠটা চেয়ারে আর একটু ঠেলে দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ ও তো অনেক দিনই এরকম সময়ে আসে। আমি ওকে বলি নিশাচর।”

আহমেদ পটেল ঢুকলেন রাত প্রায় ১টায়। ওঁর বয়স তখন অনেক কম। ষাটও ছোঁয়নি। বরাবরের মতো সাদা পাজামা কুর্তা পরা। দেখে মনে হবে, এই তো দিন শুরু করলেন। আমায় দেখে বললেন, “আরে তুমি এখনও রয়েছো! বাড়ি যাবে কখন?” আমি বললাম, “এই তো এবার যাব। আপনারই অপেক্ষা চলছিল।”

প্রণব মুখোপাধ্যায় তখন বিদেশমন্ত্রী। সেই সঙ্গে বাম-ইউপিএ সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান। আগের দিনই ওয়াশিংটন সফর সেরে ফিরেছেন। মাত্র আড়াই দিনের মধ্যে দিল্লি থেকে ওয়াশিংটন গিয়ে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির জন্য সই সাবুদ সেরে ফিরে এসেছেন। হ্যারিকেন সফর বললেও কম বলা হয়। একে অত লম্বা সফরের ধকল। তার পর সন্ধ্যাতেই বাড়ি বয়ে এসে প্রকাশ কারাট স্পষ্ট জানিয়ে গিয়েছেন, এর পর ইউপিএ-তে সমর্থন জারি রাখার আর প্রশ্নই নেই।

আহমেদ পটেলের অপারেশন শুরু সেই রাত থেকেই। যেন প্ল্যান বি রেডি করা ছিল। পরের সাত দিনের ঘটনাক্রম ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটা অধ্যায় হয়ে থাকবে তো বটেই। প্রথম ইউপিএ সরকারে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪৫। ৬১টি আসন নিয়ে বামেরা ছিল সমর্থক দল। পরে জেনেছি, সে রাতেই আহমেদের ফোন গিয়েছিল অমর সিংহের কাছে। তখন অমরের পরামর্শেই চলতেন সমাজবাদী পার্টি নেতা মুলায়ম সিং। বামেদের সমর্থন প্রত্যাহারের পর লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব, ইউপিএ-কে সমাজবাদি পার্টির সমর্থন—সবটাই এখন গল্পের মতো।

আহমেদ পটেল ছিলেন এমনই। কংগ্রেসি ঘরানার রাজনীতিতে প্রণববাবুকে যেমন মুশকিল আসান বলা হয়, তেমনই সংকটের মুহূর্তে নিঃশব্দে এমনই সব অপারেশনের জন্য পরিচিত ছিলেন আহমেদ পটেল—‘ব্যাকরুম বয়’, ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’।

গুজরাতের ভারুচে জন্ম আহমেদের। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে সেখান থেকেই পর পর তিনবার লোকসভা ভোটে জিতেছিলেন। পরে ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর সংসদীয় সচিব হয়েছিলেন তিনি। গান্ধী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সম্ভবত তখন থেকেই শুরু। পরে ৯৮ সালে সনিয়া গান্ধী যখন কংগ্রেসের সভানেত্রী হন, তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন আহমেদ। অপরিসীম আনুগত্য নিয়ে প্রায় দু’দশক ধরে সে কাজটাই করে গিয়েছেন তিনি। এমনকী শেষ দিকে রাহুলের সঙ্গে বনিবনার অভাব হলেও সনিয়ার প্রতি আনুগত্য থেকে সরে যাননি।

এ হেন ‘আহমেদ ভাই’ কংগ্রেসে সবার কাছে যে খুব প্রিয় ছিলেন তাও নয়। তা হওয়ার কথাও নয়। বহু বৈচিত্র্য নিয়ে যেমন ভারতে সামগ্রিক ঐক্য রয়েছে। কংগ্রেস পার্টিও তাই। মিনি ভারতবর্ষ। বৈচিত্রে ভরা। বিচিত্র সব লোকজন, তাদের বিচিত্র সব দাবিদাওয়া, ইন্টারেস্ট। সে সব থেকে সনিয়া গান্ধীকে আগলে রাখা, তাঁকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া ছোটখাটো কাজ নয়। ফলে সবাইকে খুশি করে চলাও ছিল মুশকিল।

একটা সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন মুকুল রায়, সনিয়ার কাছে আহমেদ পটেলও ছিলেন সেই রকম। পাঁচিলের মতো। বিশেষ করে ইউপিএ জমানায় তাঁকে এড়িয়ে সনিয়া গান্ধীর কাছে পৌঁছনোই যেত না। অনেকেই বলতেন, দল এবং সরকার দুটোই চালান আহমেদ ভাই। কেউ কেউ ঈর্ষা ও রাগে বলতেন, গান্ধী ফ্যামিলির গেটকিপার! দেশের যে কোনও রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, যে কোনও বড় শিল্পপতি যেন তাঁর একটা ফোন দূরে। এতোটাই প্রতাপ ছিল তাঁর। কংগ্রেসের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে তাঁর অনুগামীদের নিয়ে কোটারিই ছিল অমিত শক্তিশালী।

অথচ এই মানুষটাকে কেউ কখনও রাগতে দেখেননি। কাউকে ঝাঁঝিয়ে দু’কথা বলেননি। কাউকে ফেরাতেনও না। বিকেলে টেক্সট মেসেজ করলে রাত ১১টা বা পর দিন জবাব পাওয়া যেত ঠিকই। কিন্তু স্মিত হাসি বরাবর লেগে থাকত মুখে। ঘণ্টাখানেক ধরে আড্ডা মারলেও পেট খবর বেরোত না, অথবা সেটুকুই বেরোত যে খবরটা উনি নিজেই দিতে চাইতেন।

বাংলার কংগ্রেসি নেতারা আহমেদ পটেলকে যে খুব পছন্দ করতেন তা নয়। তার একটা ভিন্ন কারণ ছিল। প্রণববাবুর সঙ্গে আহমেদের সম্পর্ক ছিল একেবারেই কাজের। সরকার চালাতে ট্রাবলশ্যুটারের ভূমিকা ছিল প্রণববাবুর। আর সেই সব শরিক সম্পর্ক রক্ষায় ও ক্রাইসিস ম্যানেজ করতে যোগ্য সঙ্গত দিতেন আহমেদ পটেল। কিন্তু আহমেদ পটেলের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করতেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। বাজপেয়ী জমানায় লোকসভায় কংগ্রেসের মুখ্য সচেতক ছিলেন প্রিয়বাবু। পরে সংসদ বিষয়ক ও তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রী হয়েছিলেন। আহমেদ যেহেতু সনিয়ার রাজনৈতিক সচিব ও উপদেষ্টা ছিলেন তাই তাঁর সঙ্গে তালমিল রেখেই চলতে হত প্রিয়বাবুকে।

তবে তাঁরা ছাড়া বাংলার বাকি নেতারা যে আহমেদ খুব পছন্দ করতেন তা নয়। কারণ একটাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৮৪ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক আহমেদ পটেলের। মমতা তখন প্রথমবার সাংসদ হয়েছেন। রাজনৈতিক বুদ্ধিতে তীক্ষ্ণ আহমেদ পটেল হয়তো বুঝতেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে যে সম্ভাবনা রয়েছে বাকিদের তা নেই। তাই বরাবরই মমতাকে গুরুত্ব দিতেন পটেল। ব্যক্তিগত ভাবে সনিয়াও পছন্দ করতেন মমতাকে। আর কংগ্রেসিরা বলতেন, দলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যদি কেউ ভাল বন্ধু থাকে তিনি আহমেদ পটেল।

২০০৯ সালে কংগ্রেস-তৃণমূল জোটের অন্যতম কারিগর ছিলেন আহমেদ পটেল। মমতারও যখনই রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে বনিবনার অভাব হত, তখনই সটান ফোন করতে আহমেদকেই। যেমন ২০০৯ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হবে তৃণমূলের। আসন সমঝোতা নিয়ে মমতার সঙ্গে টানাপড়েন চলছে রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের। কংগ্রেস অন্তত ১৬ থেকে ১৮টা আসনে লড়তে চাইছে। জানা যায়, শেষমেশ আহমেদ পটেলের সঙ্গে কথা বলেই মমতা রফা করে ফেলেন। ১৪টি আসনে লড়েছিল কংগ্রেস।

আবার ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটে মানস ভুইঞাঁরা যখন বলছেন, ৯০ টি আসন কংগ্রেসকে না ছাড়লে জোট হবে না, প্রণববাবু বলছেন সম্মানজনক শর্তে জোট হবে, তখনও মমতার অনুকূলেই রায় দিয়েছিলেন আহমেদ পটেল।

শুধু কি তাই! ২০০৯ সালে লোকসভা ভোটের পর কলকাতায় দুটি বিধানসভা আসনে উপ নির্বাচন হওয়ার কথা। বৌবাজার আর শিয়ালদহ। রাজ্য নেতাদের চাপে প্রণব মুখোপাধ্যায় অনড় অবস্থান নিয়েছেন, একটি আসনে লড়বে তৃণমূল, অন্যটিতে কংগ্রেস। কেশব রাও তখন এআইসিসি-র তরফে বাংলার পর্যবেক্ষক। বিকেলেও সংসদে প্রণববাবু, কেশব রাও সাংবাদিকদের বলেছেন, রফা হয়ে গিয়েছে। ১:১-ই হবে। কিন্তু কোথায় কী! রাতে প্রণববাবুকে ফোন করলে বলেন, “না রে, কলকাতায় ফেরার আগে মমতা আহমেদকে বলে গেছে, ওরা দুটো আসনেই লড়বে। আহমেদ (পড়ুন সনিয়া) মেনেও নিয়েছে।”

তৃণমূল বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে সনিয়ার যে ধরনের সফ্ট কর্নার ছিল, তা রাহুলের নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও আহমেদ পটেলের সঙ্গে মমতা তথা তৃণমূলের অনেক সাংসদের বন্ধু সম্পর্ক ছিল অটুট।

একটা কথা এখানে না বললেই নয়। জাতীয় রাজনীতিতে এক সময়ে অনেকে বলতেন, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের নাকি খুব কাছের বন্ধু ছিলেন আহমেদ পটেল। তলায় তলায় তাঁদের বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু ঘটনা হল, তা যদি সত্যি হয়েও থাকে তবে তার কোনও বাহ্যিক প্রকাশ কখনও দেখা যায়নি। বরং বছর দুয়েক আগে দেখা গিয়েছে, রাজ্যসভা ভোটে আহমেদ পটেলকে হারাতে মোদী-শাহ জুটি কীভাবে ঘোড়া কেনাবেচা শুরু করেছিলেন। রুদ্ধশ্বাস ভোটাভুটিতে জিতেছিলেন আহমেদ পটেল।

তাঁর মৃত্যুর পর সনিয়া গান্ধী আজ লিখেছেন, “আমি একজন কমরেডকে হারালাম, তাঁর স্থান আর কেউ নিতে পারবেন না।”

ষোল আনা ঠিক কথাই বলেছেন কংগ্রেস সভানেত্রী। আহমেদ পটেলের কংগ্রেসের জন্য দুঃসংবাদই বটে। কখনও কোনও সরকারি পদে না থেকেও কংগ্রেসের মধ্যে নিজেই যেন একটা প্রতিষ্ঠান ছিলেন আহমেদভাই মহম্মদভাই পটেল।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More