একটা দুঃখের কথা বলার পরের মুহূর্তেই হাসিয়ে দিতে ম্যাজিশিয়ান হতে হয় না, ইরফান খান হলেই চলে

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়

অভিনয় সবাই করে। কেউ মঞ্চে, কেউ পর্দায়, কেউ বা বাস্তবজীবনেও। কিন্তু ক্রিকেটার হতে হতেও এক রাজস্থানী যুবকের অভিনয়ে চলে আসাটা যে নিছক কোনও সমাপতন নয়, এ এক প্রাপ্তিও বটে– তা আমরা টের পাই অনেক পরে। ন্যাশনাল স্কুল ড্রামার স্কলারশিপ হাতে পাওয়া ভারতবর্ষের বুকে দাঁড়ানো এক ক্রিকেট পাগল ছেলের সিদ্ধান্ত নিতে দু’বার ভাবার না কারণ হিসেবে যদিও সেই চিরাচরিত শব্দটাই উঠে আসে আবার। সারভাইভাল! বেঁচে থাকার তাগিদ! ইরফান খানের অভিনয় জগতে আসাটা ছিল সেটারই প্রতিফলন।

এর পরে চন্দ্রকান্তা, স্পর্শ, সালাম বোম্বে পেরিয়ে জল অনেক দূর গড়িয়ে যায়। গড়িয়ে যায় হলিউডের দরজা পর্যন্ত। তবে সে জল আর ভাল করে স্পর্শ করা হয় না ইরফান খানের। তার আগেই, মাত্র ৫৪-তে ফুরোল জীবন।

‘ইরফান’ শব্দের অর্থ জ্ঞান বা Wisdom. এ কথা ভারতবর্ষের বহু সিনেপ্রেমী দর্শকই জেনে যায় ততদিনে। তবে ইরফান খান বলতেই আমার দ্যা লাঞ্চবক্স কিংবা নেমসেক মনে পড়ে না। মাথায় ভাসে না লাইফ অফ পাই কিংবা মাদারির কথাও। আমি তো তাঁকে ভোডাফোনের সামান্য বিজ্ঞাপন দিয়ে চিনে যাই। ‘পাস হো ইয়া দূর, দিদি তো দিদি হ্যায়’। একটা লাইন অথচ কী ভীষণ আপন করার ক্ষমতা তাঁর মধ্যে! বলার ভঙ্গিমায় কী ভীষণ রকম টান, যা থেকে নিজেকে আলাদা করা যায় না কখনও!

ইরফান খান আমার কাছে তাই। এক টুকরো জীবন। জল। চোখ। যে চোখ দিয়ে জীবনের গল্প দেখা যায়।

‘লোগোঁকো হক জমানা আতা হ্যায়, রিস্তা নিভানা নেহি।’ এমন একটা বাক্য বলার পরের মুহূর্তেই হাসিয়ে দিতে ম্যাজিশিয়ান হতে হয় না, ইরফান খান হলেই চলে। এসব দেখে, ভাবতে ভাবতে যখন চোখ ভিজিয়ে ফেলছি তখন ইউটিউবে হঠাৎই একটা সাক্ষাৎকার চোখে পড়ে যায়।

সাফল্য কী? ছোটোবেলা। জুরাসিক পার্ক। টাকার অভাবে টিকিট কাটতে না পারা সেদিনের একটা ছেলে আজ ২২ বছর পার করে জুরাসিক ওয়ার্ল্ডে সেই পার্কেরই মালিকের ভূমিকায়। তাঁর কথায়, “Success is that you should be able to choose the life you want to live.”

ইরফানের যখন ক্যানসার ধরা পড়ল, তখন ব্ল্যাকমেলের শুটিং চলছে। জীবন এবং সিনেমাকে একসঙ্গে মিলে যাচ্ছে আবারও! তবে ক্রিস্টোফার নোলান না বলা লোকটা জানত, ভুল ট্রেনটাই হয়তো তাঁকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে একদিন।

ইংরেজি মিডিয়ামের রিলিজের আগে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটা শুনছিলাম। “যব সচমে জিন্দেগী আপকে হাতমে নিম্বু থামাতি হ্যায় না তো শিকাঞ্জি বানানা বহত মুশকিল হো যাতা হ্যায়”– এর পর একটা আলতো হাসি। যে হাসিতে মৃত্যুভয় নেই। ভালোবাসার অঙ্গীকার আছে। যে হাসিতে হারিয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা না থাকলেও অমরত্বের প্রত্যাশার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যায়।

মা চলে গেলেন তিন দিন আগে। দেখতে যেতে পারেননি। “বেড়িয়াঁ জিতনিহি জাদা মজবুত হো উড়নেকা নেশা উতনাহি জাদা হোতা হ্যায়।” এক পুত্রহারা পিতার মুখে এই সংলাপ বলেছিলেন। এক মাতৃহারা পুত্র হিসেবে হয়তো ওড়ার নেশাকে আর থামিয়ে রাখতে পারলেন না শেষমেশ।

আসলে যেমন রুহুদার বলেছিলো, “ম্যায়ঁ থা, ম্যায়ঁ হুঁ, ম্যায়ঁ হি রহুঙ্গা”– তেমনই তিনিও থাকবেন। জেদ কিংবা ঘৃণার গল্পে নয়। ভালবাসার রূপকথায়। চিরকাল…

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More