‘কবিদের তো এমনটাই হওয়া উচিত’

বুদ্ধদেব গুহ

শঙ্খদার চলে যাওয়াটা একটা মহীরূহ পতন। কাব্যজগতে আর তো কেউ ওঁর স্থান পূরণ করার মতো রইলেন না। উনি বড়ই মিতভাষী অথচ স্পষ্টবাদী মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত মানুষ ছিলেন। শঙ্খদা কোনও প্রচার, প্রসারে কোনও দিন বিশ্বাস করেননি, বিশ্বাস করেননি দলবাজিতে। কবিদের যেমনটি হওয়া উচিত, অন্তর্মুখী, মিতভাষী— ঠিক তেমনটাই ছিলেন উনি।

আমি কলেজে পড়ার সময় থেকে পড়ছি ওঁর লেখা। আমার খুবই প্রিয় কবি উনি। ওঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হল, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’। এ বইটি আমার এত ভাল লাগে, আমার মনে হয় এ কাব্যগ্রন্থ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য।

আমার গানের খুব ভক্ত ছিলেন। একবার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে উনি একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন। তাতে কেবল আমায় গান গাইতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আর কেউ গান গাইবে না কেবল বুদ্ধদেব গান গাইবে।’ উনি আমায় খুবই স্নেহ করতেন। এমনিতে কথা তো কম বলতেন, তবে দেখা হলেই বড় আন্তরিক ভাবে গায়ে হাত দিয়ে কথা বলতেন।

একটা মজার কথা বলি। উনি একবার আমায় একটা চিঠি লিখেছিলেন। তাতে লিখেছিলেন, উনি তদন্ত করে দেখেছিলেন, ঋতুর সূত্রে আমি ওঁর মেসোমশাই হই। ওঁদের বাড়ি তো বরিশালে ছিল, আর ঋতুরা তো বানারীপাড়ার গুহঠাকুরতা, সেই সূত্রে এই আত্মীয়তা বেরিয়েছিল।

শঙ্খদা আমায় লিখেছিলেন, “ঋতু যে বলেছেন তাঁর সঙ্গে আমার একরকমের আত্মীয়তা আছে, সেকথা ঠিকই। আমার মায়ের একরকমের বোন উনি। অর্থাৎ সেদিক থেকে আমি আপনাকে মেসোমশাইও বলে ফেলতে পারি। কখনো যদি রাগ করি তাহলে বলব।”

শেষের দিকে তো আর কথা বলতে পারতেন না শঙ্খদা, চুপ করে বসে থাকতেন। কখনও গেলেই আমায় বলতেন গান গাইতে। আমার গান শুনতে ভালবাসতেন। আমি একজন প্রকৃত অনুরাগীও হারালাম আজ। নবনীতাও (দেবসেন) আমার গানের খুব ভক্ত ছিল। যখন অসুস্থ হয়ে পড়ল, খালি ফোন করে বলত গান শোনাতে। আর এমনটি ছিলেন মহাশ্বেতা দেবীও। কোনও অনুষ্ঠানে গেলেই আমায় বলতেন, ‘অ্যাই, তোকে বক্তৃতা দিতে হবে না। গান গা তো!’

শঙ্খদা অবশ্য অনুষ্ঠান বা সভাসমিতিতে যাওয়া-আসা বিশেষ পছন্দ করতেন না। আগেই বললাম, খুবই ঘরোয়া, অন্তর্মুখী মানুষ ছিলেন। এমন অনাড়ম্বর মানুষ দেখা যায় না। যখন উনি কথা বলতে পারতেন, ওঁর বাড়িতে রবিবার করে একটা কবিতা আড্ডার আসর হতো। অনেকদিন আমায় ডেকেছিলেন, ‘আয়, তোর গান শুনব।’ আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

কবিদের তো এমনটাই তো হওয়া উচিত। কবি আর ইনশিওরেন্স দালালের তো তফাত থাকবে। এমন কবি, এমন স্বভাবকবি খুব কমই দেখা যায়। সকাল থেকে খবরটা শুনেই খুবই মর্মাহত হয়ে রয়েছি। এ সময় বড়ই শূন্যতার, বেদনার।

এটা খুবই বড় একটা ক্ষতি, যাকে বলে ‘গ্রেট লস’। কবি তো কতই হয়েছে বাংলায়। তাঁদের মধ্যে কতজন দলবাজি করেছেন, তাঁদের হাবভাব দেখে কবি বলে মনে হতো না। কিন্তু শঙ্খদা সত্যিকারের একজন কবি ছিলেন। এত বড় শূন্যতা শিগ্গিরি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যেখানেই যান, উনি যেন ভাল থাকেন, ওঁর আত্মা যেন শান্তি পায়।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More