মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়: যেন মস্ত এক জানলা দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের আলো মেখেছে বাঙালি

সমর্পিতা ঘটক

তিনি কাল চলে গেলেন করোনায় সংক্রামিত হয়ে। তাঁর কথা আজ সর্বত্র আলোচিত। কিন্তু, তাঁর কোন ভূমিকাটার কথা বলব? একাধারে কবি, অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক! তিনি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সব ভূমিকার কথা বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখন নেই। তবে তাঁর জীবন জুড়ে রয়েছে বিশ্বসাহিত্যের তর্জমা। অনুবাদ নয়, তর্জমা শব্দটি ছিল তাঁর পছন্দের।

বাংলা সাহিত্যে অনুবাদ বা তর্জমা যে আগে ছিল না, তা নয়। কিন্তু মানবেন্দ্রবাবুর হাত ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কালজয়ী রচনাগুলো বাংলার পাঠকের সামনে চলে এল একটা মস্ত বড় ক্যানভাসে। অনুবাদ-সাহিত্য ঋদ্ধ করল বাংলার সমগ্র সাহিত্য ভাণ্ডারকে। পণ্ডিত ব্যক্তিরা স্বীকার করবেন যে, অনুবাদ ব্যতীত যে কোনও সাহিত্যই অপূর্ণ থেকে যায়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন যে, তাঁর পরিচিতজনদের মধ্যে বিশিষ্ট পড়ুয়া ছিলেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্যি, দেশবিদেশের সাহিত্যের হালহকিকত ছিল তাঁর নখদর্পণে। বিশ্বসাহিত্যের জানালা খুলে দিয়েছিলেন তিনি আমাদের জন্যে।

কলম্বিয়ার নোবেলবিজয়ী কথাসাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের খবর বাঙালি পাঠক জানার অনেক আগেই তিনি তাঁর লেখা তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তাঁর হৃদয়স্পর্শী অনুবাদে আমরা পাঠ করেছিলাম ‘সরল এরেন্দিরা’ আর তার বিবেকহীন দিদিমার কাহিনি, তিনি অনুবাদ করেছিলেন মার্কেসের অনবদ্য নোবেল বক্তৃতাটিও। এছাড়াও তর্জমা করেন মার্কেসের বিখ্যাত উপন্যাস ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’। এর পরে ক্রমে বাঙালির প্রিয় হয়ে ওঠে লাতিন আমেরিকার কাব্য এবং গদ্যসাহিত্য।

লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে জাদু-বাস্তবতার সার্থক প্রয়োগ করেন আলেহো কার্পেন্তিয়ের, যাঁর গল্প তিনি অনুবাদ করলেন বাঙালি পাঠকদের জন্য। মেক্সিকোর বিশ্বজয়ী সাহিত্যিক হুয়ান রুলফো যিনি মাত্র একটি উপন্যাস ‘পেদ্রো পারামো’ আর কিছু গল্প লিখে বিশ্বের পাঠকের অন্তরে চিরায়ত স্থান অধিকার করেছিলেন, সেই লেখকের সমগ্র রচনাও মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায় বাংলায় অনুবাদ করলেন। ‘পেদ্রো পারামো’ পড়ার পরে আমরা বিহবল হয়ে পড়ি কারণ উপন্যাস রচনার এমন আঙ্গিক এবং বিষয় সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণা ছিল না।

চিলির নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদার জন্মশতবর্ষে (২০০৪) তাঁর কবিতাও বাংলায় তর্জমা করলেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। পাবলো নেরুদার একটি নাটকের তর্জমা তিনি আগেই করেছিলেন, তার শিরোনাম “হোয়াকিম মুরিয়েতার মহিমা ও মৃত্যু।” তিনি আসলেই যে কবি তা তাঁর অনুবাদে সহজেই ধরা যায়। কিন্তু তাঁর কবিসত্ত্বা, মৌলিক রচনার পরিসর বারবার ছাপিয়ে গেছে অনুবাদ সাহিত্যের জনপ্রিয়তা। বাংলায় লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের জনপ্রিয়তার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর পরিধি অনেক ব্যাপ্ত। শিশুসাহিত্য থেকে উপন্যাস, কমিকস থেকে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস– বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে তাঁর অনায়াস যাতায়াত ছিল।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্রাবস্থায় থাকাকালীনই অনুবাদ শুরু করেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের ছাত্র হওয়ায় গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুকে। তাঁর অনুপ্রেরণায় অনুবাদ করেছিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক বোরিস পাস্তেরনাকের “ডক্টর জিভাগো”। এই অনুবাদও বিশেষ ভাবে সমাদৃত হয়েছিল। পোল্যান্ডের নোবেলজয়ী কবি ভিসোয়াভা সিম্বোর্স্কার কবিতাও অনুবাদ করেন তিনি।

আবার শিশুসাহিত্যের অনুবাদেও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এক পথিকৃৎ। জুল ভার্নের রচনা, এডোয়ার্ড লিয়র, হ্যান্স অ্যান্ডারসন এবং গ্রিম ভাইদের রচনা তিনি অনুবাদ করেন। এগুলি ইংরাজি অনুবাদ থেকে তিনি বাংলায় তর্জমা করেন আদতে। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্যে তাঁকে প্রদান করা হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’। মালয়ালম ভাষা থেকেও তিনি অনুবাদ করেন ভৈকম মুহম্মদ বশীরের ছোটগল্প। এই কাজের জন্যই তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমির পুরস্কারও পেয়েছিলেন।

লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে তাঁর মনোগ্রাহী আলোচনা গ্রন্থের নাম ‘বাস্তবের কুহক, কুহকের বাস্তবতা’। এই গ্রন্থটি পাঠ করলে বাংলার পাঠক সমগ্র মহাদেশটির স্মরণীয় সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা গড়ে নিতে পারেন। ‘বাস্তবের কুহক কুহকের বাস্তব’ বইটিতে তিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন যে, ‘লাতিন আমিরিকার অনেক লেখকই কাহিনিকে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে কেমন অবলীলাক্রমে পৌঁছে যান অতীতে: তাঁরা যেটা অবলীলাক্রমে করেন, আমাদের কাছে পড়বার সময় তো মোটেই তা সাবলীল মনে নাও হতে পারে। তাঁরা এসব সৃষ্টির কথা আলোচনা করে করেন না, তাও কেমন সাযুজ্য তৈরি হয়! লেখকদের শৈলী, চিন্তন, সময়কাল আলাদা তবু যেন টান রয়ে যায়’।

অতীত, বর্তমান একই সঙ্গে একই পাঠকের মনের মধ্যে যে অন্তর্ঘাত বুনে দিয়ে যাচ্ছে তার নিদর্শন অনেক। ইতিহাসকে অস্বীকার করে নয়, ভবিষ্যতের নির্মাণকল্পে শিক্ষা নিতে হবে ইতিহাস থেকেই– সে ইতিহাস গড়ে উঠবে বই থেকে নয়, স্মৃতি, প্রকৃতি, জনজাতি, উপকথা, রূপকথা থেকে আর তাই বর্তমানের কথা লিখতে লিখতে লাতিন সাহিত্যে রয়ে যাবে পিছুটান।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বামপন্থী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর অনুদিত গল্প, কবিতা ও নাটকের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যশস্বী অধ্যাপক হিসেবেও তিনি উন্নত দুনিয়ার সাহিত্য অনায়াসে অনুবাদ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যই। তাই আমরা তাঁর অনুবাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী সাহিত্যই বেশি পাই। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সাহিত্যের মধ্যে দিয়েই একটি দেশের প্রতিবাদী স্বর চেনা যায়। মানবেন্দ্রবাবুর অনুদিত হুয়ান রুলফোর ‘জ্বলন্ত প্রান্তর’ বইটিতে এ কথা স্পষ্ট করেই বলা আছে।

মারিও বার্গোস ইয়োসার ‘লা কাসা বের্দে’ বইটির জন্য রোমুলো গাইয়েগোস পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং সে পুরস্কার গ্রহণ করার সময় তিনি বলেছিলেন যে, ‘সাহিত্য হল আগুন’। অনুবাদক এখানে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, সাহিত্য এই কারণেই আগুন যে প্রতি সাহিত্যিকের দু’টি অঙ্গীকার আছে। এক, তাঁর শিল্পের কাছে ও শিল্পীতার কাছে এবং দুই, মানুষের কাছে, সমাজের কাছে, দেশের কাছে। শিল্পের এবং জীবনদর্শনের আগুন রুলফোর লেখাতেও জ্বলে উঠেছিল দপদপ করে। এই চিন্তাধারাই আবর্তিত হয়েছে লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের অঙ্গনে। আমরা এই মর্মেই জেনেছি যে লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ কথাসাহিত্যিকদের মতে, সত্যিকারের লেখক নিছক কোনও উদাসীন, হিমশীতল, নীরক্ত, নাক উঁচু, নন্দনতাত্ত্বিক নন। হোর্হে লুইস বোর্হেস যতই মহান লেখক হন না কেন তাঁর ফ্যাসিস্ত মতবাদের জন্য তিনি অনুবাদকের ভাষায় ‘তাঁর জীবদ্দশাতেই জাদুঘরের সামগ্রী হয়ে উঠেছিলেন।’

জ্বলন্ত প্রান্তরের একটি গল্পের শুরুটাই যেন আমাদের এখনকার জীবনের এক অমোঘ সত্যি। গল্পের নাম- ‘আমরা ভারী গরিব’…

…“এখানে সবকিছুই খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। গত হপ্তায় আমার হাসিন্তা খুড়ি গেলেন, আর শনিবারে, যখন তাঁকে কবর দেওয়া হয়ে গেছে আর আমরা মন খারাপ কাটিয়ে উঠেছি, এমন তুমুল বর্ষা শুরু হল তেমনটি আর কখনো হয়নি। সেটা আমার বাবাকে পুরোপুরি খেপিয়ে দিল কারণ রাইশস্যের পুরো ফসলটাই বাইরে গাদা করে রাখা, রোদে শুকোচ্ছিল…।”

আর একটি গল্প হল, ‘ওরা আমাদের জমি দিয়েছে’। যে গল্প শুরু হচ্ছে এইভাবে– “অত ঘণ্টা ধরে হাঁটছি, সারা পথটায় কোথাও কোনো গাছের ছায়া নেই, নেই কোনো গাছের চারা, কিংবা কোনোরকম শেকড়বাকড়, তারপর এখন আমরা শুনতে পাই কুকুরের ডাক….।
মাঝে মাঝে, এই যে রাস্তাটা যার কোনো কিনারা নেই, মনে হয় ফাটল-ধরা শুকনো নালায় ভরা এই প্রান্তরের শেষে বুঝি আর কিছুই নেই, বুঝি অন্য পাশে গিয়ে কিছুই দেখা যাবে না। কিন্তু আছে তো একটা কিছু। শহর আছে। …
… আমরা সেই ভোর থেকে হাঁটছি। এখন বিকেল চারটে হবে বোধহয়…।”

এ যেন আমাদের পৃথিবীর আজকের প্রতিবিম্ব। এসব গল্প এই দুঃসময়ে মনে পড়েছে নানা কারণে। এইসব দেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের মনে সংযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে একমাত্র সার্থক অনুবাদ সাহিত্য। বহুবিধ অনুবাদে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সাহিত্যবোধকে প্রসারিত করেছেন নিয়ত।

 

(লেখক স্প্যানিশ নাটিকা সঙ্কলনের ও গল্পের অনুবাদক, ওয়েব পত্রিকার নিয়মিত লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের কয়েকটি গ্রন্থের অনুবাদক। সাহিত্য, ভ্রমণ, চলচ্চিত্র, নাটক এবং ভাষা চর্চায় আগ্রহী।)
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More