সত্যিই কি প্রেমে পড়ার অপরাধে খুন করা হয়েছিল সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে চারপাশে এত যে উত্তেজনা, হইহই, প্রিয়জনকে উপহার কিনে দেওয়ার ধুম, কিন্তু জানেন কি, এই প্রেমের দিনের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিচ্ছেদ, কান্না আর কষ্টমেশানো এক আশ্চর্য প্রেমগাথা। ক্যালেন্ডারে ভালোবাসার দিন হিসাবে নির্দিষ্ট এই তারিখটির পেছনে রয়েছে একজন রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজকের নাম ও তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিহাসের এক আশ্চর্য উপাখ্যান।

কে ছিলেন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন? সে কথা জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় ১৮০০ বছর আগে, ২২৬ খ্রিস্টাব্দে। সেসময় ইউরোপে রোম সাম্রাজ্যের শাসনভার ছিল দুর্বিনীত,অত্যাচারী রাজা দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের হাতে। ক্লডিয়াসের রাজত্বে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা ছিলো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি খ্রিস্টানদের সঙ্গে মেলামেশা করার জন্যও শাস্তি দেওয়া হত প্রজাদের। সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এমনিতেও কথায় কথায় এর ওর গর্দান নিতেন সম্রাট। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যেও চালু করেছিলেন এক আশ্চর্য নিয়ম।

কথায় কথায় গর্দান নিতেন সম্রাট

সম্রাট ক্লডিয়াস মনে করতেন, বিয়ে ব্যাপারটা সৈনিক জীবনের জন্য একেবারেই আদর্শ নয়। রোমান সেনাবাহিনীকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলা যাবে, যদি সৈন্যদের অবিবাহিত রাখা যায়। তাই তিনি ঘোষণা করলেন রাজার সেনাবাহিনীতে কেউ বিয়ে করতে পারবে না। এই চিরকুমার ব্রত যে মানবে না তার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে ভয়ংকর শাস্তি। সম্রাটের ভয়ে বাধ্য হয়ে এই অমানবিক নিয়ম মেনে নিতে হয়েছিল সেনাদের।

এই আইনের অমানবিক চেহারাটা বুঝতে দেরি হয়নি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এই শর্ত অনেক তরুণ প্রেমিকের কষ্ট আর বিচ্ছেদের কারণ হচ্ছিল। সম্রাটের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গোপনে সেইসব তরুণ সৈনিকদের বিয়ে দেন তিনি। প্রচার করেন খ্রিষ্টের প্রেম আর করুণার বাণী।

রাজাদেশ অমান্য করে প্রেমিক সৈনিকদের বিয়ে

যতই চুপচাপ বিয়ে দেওয়া হোক না কেন, কথাটা সম্রাটের কানে পৌঁছতে বেশি সময় নেয়নি। একে খ্রিস্টধর্ম প্রচার, তার উপর আবার রাজাদেশ অমান্য করে সৈনিকদের বিয়ে দেওয়া! রাগে অন্ধ হয়ে রাজা দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তক্ষুণি হুকুম দেন, ভ্যালেন্টাইনকে বন্দি করে নিয়ে আসার। রাজার সামনে যখন হাজির করা হয়, তখনও ভ্যালেন্টাইনের মুখে লেগে আছে দেবদূতের হাসি। নিজের কাজকর্মের জন্য একফোঁটাও অনুতপ্ত নন তিনি। উপরন্তু সম্রাট ক্লডিয়াসকে তিনি বলেন যিশুর স্মরণ নিতে, বোঝান খ্রীষ্টধর্মের অপার মহিমার কথা। এতটা ধৃষ্টতা সম্রাট ক্লডিয়াস যেন ভাবতেই পারেননি। রাগে কাঁপতে কাঁপতে আদেশ দেন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে তক্ষুনি কালকুঠুরিতে ছুঁড়ে ফেলার।

খ্রিষ্টান ধর্মযাজকের পাশাপাশি সন্ত ভ্যালেন্টাইন ছিলেন চিকিৎসকও। নানা রোগের টোটকা দাওয়াই জানতেন তিনি। সম্ভবত জানতেন নানারকম ভেষজ ওষুধও। শোনা যায়, কারাগারে বন্দি অবস্থাতেও কোনও এক অলৌকিক উপায়ে তিনি সেই কারাগারের এক প্রহরীর অন্ধ মেয়ের চিকিৎসা করেন। ভ্যালেন্টাইনের দেওয়া ওষুধে দৃষ্টি ফিরে পায় সেই মেয়েটি৷ এমন আশ্চর্য ঘটনা দেখে কারারক্ষীদের অনেকেই সন্ত ভ্যালেন্টাইনের অনুগামী হয়ে পড়ে। তাঁর প্রচারিত খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিতে এগিয়ে আসেন দলে দলে।

কারারক্ষীদের অনেকেই সন্ত ভ্যালেন্টাইনের অনুগামী হয়ে পড়ে

দেশে রাজার উপস্থিতিতে একজন যাজকের এতটা জনপ্রিয়তা কে-ই বা ভালো চোখে নেবে! সম্রাট ক্লডিয়াসও প্রমাদ গুনলেন। ভ্যালেন্টাইনের ক্রমাগত বেড়ে চলা জনপ্রিয়তা যে তাঁর সিংহাসন-কাঁটা হতে চলেছে, সেটা বুঝতে পেরেই ক্লডিয়াস তক্ষুণি ভ্যালেন্টাইনের শিরশ্ছেদের ঘোষণা করেন।

এদিকে জেলারের অন্ধ সেই মেয়েটিকে ততদিনে ভালোবেসে ফেলেছেন ভ্যালেন্টাইন। ডাক্তারির হাতযশেই হোক, বা ভ্যালেন্টাইনের মোহময় ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে, সম্ভবত প্রেমে পড়েছে সেই মেয়েটিও৷ মৃত্যু আসন্ন বুঝে সেই অন্ধকার জেলকুঠুরিতে বসেই প্রেমিকাকে শেষ চিঠি লিখলেন ভ্যালেন্টাইন। আর চিঠির শেষে দস্তখত করতেন ‘ইতি, তোমার ভ্যালেন্টাইন’

হ্যাঁ, প্রতিবছর এই দিনে প্রেমিকেরা যে কথাটা নানা রঙে লিখে দেন তাদের ভ্যালেন্টাইন কার্ডের গায়ে, আজ থেকে প্রায় ১৮০০ বছর আগে কোনও এক অন্ধকার কারাগারে বসে সে কথাটা প্রথম লিখেছিলেন এক তরুণ ধর্মযাজক। লিখেছিলেন মৃত্যুর আগের রাতে তাঁর প্রেমিকাকে লেখা শেষ চিঠিতে।

আর একটা গল্পে বলা হয়েছে, খ্রিষ্ট-বিরোধী ক্লডিয়াস তাঁর কারাগারে খ্রিস্টানদের বন্দি করে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালাত। মারধোর থেকে প্রাণনাশ কিছুই বাদ যেত না। সন্ত ভ্যালেন্টাইন না কি সেই রক্তাক্ত রোমান কারাগার থেকে বন্দি খ্রিস্টানদের পালাতে সাহায্য করেন। যদিও সেই চেষ্টা ধরা পড়ে যায়। আর রাজদ্রোহের অপরাধে খুন করা হয় সেই যাজককে।

ঐতিহাসিকেরা বলেন, সন্ত ভ্যালেন্টাইনের শিরশ্ছেদ কার্যকর করা হয় ২৭০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি নাগাদ তাঁকে মেরে ফেলা হয়, বা সমাধিস্থ করা হয়। সেই দিনটিকে স্মরণ করেই ১৪ ফেব্রুয়ারির এই প্রেমদিবস।

আবার কারও কারও মতে, খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের ফিস্ট ডে ছিল এই ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি কোনও এক দিন। কৃষিকাজের রোমান দেবতা লুপার্কাস বা রোমের দুই আদি পুরুষ রোমুলাস এবং রেমাসকে উৎসর্গ করে সেসময় ‘লুপার্কালিয়া’ নামক একটা অনুষ্ঠান হত মধ্য ফেব্রুয়ারিতে, যা আসলে ছিল আমাদের নবান্নের মতো ফসল উৎসব। সেদিন ছিল অবাধ প্রেম আর যৌনতার দিন। ঘটনা যাই হোক, আজও বিশ্বজুড়ে ফেব্রুয়ারির ঠিক মাঝের দিনটিকেই আলাদা করা হয়েছে, সেই মানুষটার সম্মানে, যিনি মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে শুনিয়েছিলেন শান্তি আর প্রেমের বাণী। যিনি হার মানেননি কখনও। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও গেয়ে গেছেন ভালোবাসার জয়গান। এ ভালোবাসা শুধু নারী-পুরুষের প্রণয় নয়, এ ভালোবাসা আসলে মানবপ্রেম, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার রূপ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More