বয়স হলেই কি প্রেমে ভাটা? বাংলা সিনেমা তা বলছে না, হাস্যরসে হোক বা নির্ভরতায় প্রবীণ প্রেমেরা চিরনবীন

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও ভালবাসার মাধুর্য বেঁচে থাকে। সত্তর বা আশি বসন্ত পার করা যে প্রেমিক তাঁর স্ত্রীর জন্য মাসকাবারি ওষুধগুলো কিনে আনেন নিয়ম করে, স্ত্রীর নামে নমিনি করা ফিক্সড ডিপোজিটগুলো সবসময় আপডেট রাখেন, যে ষাট বা সত্তর পার করা প্রেমিকা তাঁর স্বামীর আনা এঁচড়-মোচা কুটে, চিংড়ি বা নারকেল দিয়ে রাঁধেন, স্বামী বাথরুম করে এলে গন্ধ বেরোলে আবার বাথরুমে ঢুকে জল ঢালেন– তাঁদের এইসব অনুভূতি কি প্রেম নয়? রোজই তো প্রেমদিবস কাটাচ্ছেন এঁরা এঁদের যাপনে। প্রেমের দেখনদারির উদযাপন নেই, কিন্তু নির্ভরতা আছে, যা তাঁরা নিজেরাও জানেন না আলাদা করে।

দুজনের মধ্যে কে আগে পৃথিবী ছেড়ে যাবেন এই চিন্তা নিয়েও তাঁদের পারস্পরিক নির্ভরতা গড়ে ওঠে। এই টান কি অস্বীকার করা যায়! এঁদের জীবনে রোজ ডে, চকোলেট ডে, কিস ডে, ভ্যালেন্টাইন ডে-র আড়ম্বর বা উৎসব পালনের কোনও গুরত্ব নেই। ভালবাসা এঁদের নিত্যদিনের বেঁচে থাকায়, যাতে লোকদেখানো সোশ্যাল মিডিয়া আপডেট বা সেলফি তোলার দরকার নেই। এমন প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া বা বৃদ্ধ দম্পতিরা সারা বছরই ভ্যালেন্টাইনের পূজারী।

বাংলা বা হিন্দি ছায়াছবিতে প্রেমের জুটি বলতে নবীন জুটিকেই চিরকাল প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু প্রবীন জুটিদের ভালবাসা বক্সঅফিস থেকে দর্শক মনে প্রশংসিত হয়েছে বারবার। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এঁদের ছবির চরিত্রাভিনেতা বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে বাংলা ছবিতে এঁদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। প্রেমের দিবসে রইল এমনই কিছু প্রবীণদের ভালোবাসার কথা, যাদের ভালোবাসার রং চিরহরিৎ।

তুলসী-মলিনা, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’

‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে তুলসী চক্রবর্তী একটা মেসের মালিক ছিলেন। প্রতি হপ্তায় শনি-রোববার শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে আসতেন স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে। তাঁর দুদিনের রোম্যান্স বাসনা আর একলা থাকা স্ত্রীর অল্প সময়ের জন্য স্বামীকে কাছে পাওয়ার মধ্যেই লেখা হতো প্রেমের গল্প। আজকাল তো একেই বলে ফ্যামিলি টাইম।

সেখানেও তুলসী চক্রবর্তীর মুখে লা জবাব ডায়লগ মলিনা দেবীর প্রতি, “বউ মানে কী? বউ মানে গাছতলা, মানুষ তেতেপুড়ে এসে গাছতলায় বসে। তা তুমি হচ্ছো আমার খেজুর গাছ। কাঁটা আছে, ছায়া নেই।” মলিনা দেবীর প্রত্যুত্তর, ”তা বেশ তো, ছায়া আছে এমন গাছতলায় গিয়ে বসলেই তো পারো!”

দর্শকদের নিশ্চয়ই আর একটা দৃশ্যর কথা মনে আছে, স্বামীকে ধরে রাখতে মলিনা দেবী প্রতিবেশিনীর কথা শুনে রুজ, পাউডার, লিপস্টিক মেখে, লুচি, মিষ্টি, মন্ডা সাজিয়ে তুলসী চক্রবর্তীকে সোহাগ করছেন। এ দৃশ্যে তুলসী চক্রবর্তী তাঁর চাহনি ও শরীরী ভাষায় যে ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা আর কোনও কমেডিয়ান পারতেন কিনা সন্দেহ।

চিন্ময় রায়, অনুপ কুমার, রবি ঘোষ সবাই গুরু মানতেন তুলসী বাবুকে। তাঁরা অনেকের অভিনয় নকল করলেও কখনও তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় নকল করতে পারেননি। চিন্ময় রায় বলেছিলেন “চার্লি চ্যাপলিন যদি বেঁচে থাকতেন তবে এ ছবিতে তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় দেখে বলতেন, এমন অভিনয় করলে আমি আরও নাম করতে পারব।”

বা সেই শেষ দৃশ্য, যেখানে তুলসী চক্রবর্তীর ফতুয়ার পকেট থেকে প্রেমপত্র পেয়ে মলিনা দেবীর গ্রাম থেকে কলকাতার মেসবাড়িতে ছুটে আসা স্বামী বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন ভেবে! এবং তারপর বন্ধ দরজার ভিতরে মালা নিয়ে দুজনের ধস্তাধস্তি। কমেডির মোড়কে এমন এক রোম্যান্টিক দাপট চিরকালীন হয়ে থেকে গেছে বাংলা চলচ্চিত্রে।

উত্তম-সুচিত্রা দুজনেই বলেছিলেন সাড়ে চুয়াত্তরে লোক আমাদের নবীন জুটিকে দেখতে যায়নি, তুলসীদা আর মলিনাদিকেই দেখতে গেছিল। ওঁরাই ওই ছবির নায়ক-নায়িকা।

রাজলক্ষ্মী দেবী-বিপিন গুপ্ত, ‘লুকোচুরি’

“মেয়েরা যে লাউ গাছের মতো বাড়ছে, বিয়ে দিতে হবে না? পাত্তর কি বোম্বাই আম, যে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে!”– রাজলক্ষ্মী দেবীর বিখ্যাত ডায়লগ উদাসীন বইমুখো কর্তা বিপিন গুপ্তের প্রতি। যখনই ‘লুকোচরি’ ছবিতে রাজলক্ষ্মী ও বিপিন গুপ্ত অবতরণ করেছেন, তখনই তুমুল কমেডি। সেসব সংলাপ আজও নির্মল হাসির।

কিশোর কুমার অভিনীত প্রথম বাংলা ছবি ছিল ‘লুকোচুরি’। দ্বৈত ভূমিকায় কিশোর কুমার এবং বিপরীতে দুই নায়িকা অনিতা গুহ ও মালা সিনহা। কিন্তু ছবির আর একটি মূল আকর্ষণ ছিল মায়ের চরিত্রে রাজলক্ষ্মী দেবী (বড়)। ‘শ্রী’ সিনেমা হলে ছবিটির রজত জয়ন্তী সপ্তাহ উৎসব পালিত হয়েছিল। কিশোর কুমার-সহ হাজির ছিলেন রাজলক্ষ্মী দেবীও। তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রীমতী পদ্মজা নাইডুকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল।

ছবিতে দুটো নবীন কাপলের প্রেম দেখানো হলেও দুই মেয়ের পিতা-মাতার চরিত্রে রাজলক্ষ্মী দেবী ও বিপিন গুপ্তর তুখোড় কমেডি অভিনয় দর্শকের মন জিতে নেয়। ‘লুকোচুরি’ ছবিতে রাজলক্ষ্মী দেবীকে শেষে ‘মাসিমা ভূত’ বলার দৃশ্যও দমফাটা হাসির। কিশোর ম্যাজিক থাকলেও ওই প্রবীণ স্বামী-স্ত্রী রাজলক্ষ্মী-বিপিন জুটির রসায়ন ছাড়া ‘লুকোচুরি’ ছবিটা হত না। বিপিন গুপ্ত বাংলা ছবি বেশি করেননি, তখন অনেক হিন্দি ছবি করতেন উনি।

ভানু-রুমা, ‘আশিতে আসিও না’

অশীতিপর বৃদ্ধ ও সত্তর বয়সী বৃদ্ধা বার্ধক্যের ভার আর বইতে পারেন না। সন্তানদের উপর নির্ভরশীল, খাওয়াও শুধু বার্লি আর শিঙির ঝোল, নেই কোন রোম্যান্স, নেই যৌবনের সেই রক্তের জোর। তাঁরাই একদিন খোঁজ পান, যৌবন ফিরে পাওয়ার পুকুরের। সেখানে ডুব দিলে হারানো যৌবন ফিরে আসবে তাঁদের। তাই করে বৃদ্ধের যৌবন ফিরে আসে সত্যিই। তাই দেখে স্ত্রীকেও সেই পুকুরে ডুব দেওয়ান তিনি। দু’জনেই ফিরে পাv হারানো যৌবনের প্রথম রোম্যান্স। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আর রুমা গুহঠাকুরতার অনবদ্য অভিনয় দেখে বহু বৃদ্ধ বৃদ্ধাই তাঁদের হারানো যৌবন আজও ফিরে পেতে চাইবেন।

সন্ধ্যা-রঞ্জিত, ‘ছোট বউ’ থেকে ‘ মঙ্গলদীপ’

যৌথ পরিবারের সব দায়িত্ব বড় ছেলে আর বউ বৌয়ের। তাঁরা যেন সংসারের লক্ষ্মী-নারায়ণ। ছোট ভাইয়ের প্রতি বড়দার দায়িত্ব বা বড় সংসারের দায়িত্ব পালন করতে ঘরে-বাইরে তাঁদের মুখে রক্ত তুলে খাটতে হয় আর টাকার চিন্তা করতে হয়। সেখানে রোম্যান্স করার সময় তাঁরা আর পান না। কিন্তু তাঁদের জীবনে কি প্রেম নেই? আছে। প্রেমের আর এক নাম বিশ্বাস ও ভরসা। তাই অন্ধ বাবা ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক খেতে চাইলে সেই সাধ পূরণ করতে অফিসের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কিনে দিতে চায় বড় ছেলে। আবার বড় ছেলে কম টাকা রোজগার করে, তাই বড় বউকেই সংসারের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব একা হাতে করতে হয়। বড় ছেলে বউকে নিয়ে আলাদা থাকতেও পারে না, কারণ বড় বউই বলে, অন্ধ শ্বশুরের আশার আলো একমাত্র বড় ছেলে। বিমাতা শাশুড়ির অত্যাচার তাই সহ্য করতে পারবে সে। এই যে সংসারের দোষে-গুণে সবাইকে নিয়ে স্বামীকে ভালবাসা, এ কি ভ্যালেন্টাইন নয়?

লোলা-লুলু বোস, ‘ওগো বধূ সুন্দরী’

“লোলা লুলু কেন তোমার বয়স হয় না ষোলো, আমার নাইন্টিন!”

‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবিতে মহানায়ক থাকলেও লোলা-লুলু জুটিকে আলাদা করে মনে রাখতেই হয়। যে প্রেমের আধুনিক জুটি গানের কথায় অমর হয়ে থাকবে চিরকাল। হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় আর মীনাক্ষী গোস্বামী, যাঁরা সাহেবি কেতায় জীবনকে উপভোগ করেন। তাই তাঁরা প্রেমটাও যেমন বিদেশি ঢংয়ে পার্টি করে উদযাপন করেন, তেমন নিজেদের ডিভোর্সের দিনটাও পার্টি দিয়ে বন্ধুবান্ধবকে আমন্ত্রণ করে স্মরণীয় করে রাখতে চান। ‘লোলা-লুলু’র পার্টিতে সিগারেটের ধোঁয়া আর সুরারসের ফোয়ারায় ‘লাভ লাভ লাভ’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে এ যেন এ অন্যরকম প্রেমের উচ্ছাস। লোলা বোস আর লুলু বোস জুটি সমাজের চেনাছকের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখায়।

অনুরাধা-বোধিসত্ত্ব, ‘উৎসব’

বাড়ির মেজো ছেলে-মেজো বউ। শ্বশুরবাড়ির যৌথ পুজোতে গ্রামের তিন মহলা বাড়িতে এসেছেন। মেজো ছেলে উচ্চপদস্থ বেসরকারি চাকুরে আর মেজো বৌ বড়লোকের বাপের মেয়ে। সবাই নাকি বলে সে বড় লোক বাপের স্পয়েলড চাইল্ড। তাই মেজো বউ সব ব্যাপারে বেশি নাক উঁচু আবার ডাকসাইটে সুন্দরীও। অনুরাধা-বোধিসত্ত্ব জুটি ‘উৎসব’ থেকে ‘প্রতিবিম্ব’ সিরিয়াল সবেতেই বেশ জনপ্রিয় এক মধ্যবয়সী জুটি ছিল। যা রিয়েল লাইফ জুটিদের পর্দায় জমেনি, অনুরাধা দেবরাজের বা বোধিসত্ত্ব অনামিকা সাহার। ‘উৎসব’ ছবিতে এই মেজো ছেলের কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি চলে যায়। সেকথা স্ত্রীকে বলতে পারে না সে। কিন্তু এত বড়লোকের মেয়েও স্বামীর মন পড়তে পারে। অনুরাধা রায়কে একটা সংলাপ দিয়েছিলেন এই দৃশ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষ, যা ভরসার প্রেমে আজও অমর। অনুরাধা বলেছিলেন বোধিসত্ত্বকে, “কারও কাছে হাত পাতা মানেও কিন্তু ডিগনিটি হারানো, তোমার কি ধারণা, তোমার অফিসের খবরটা আমি জানি না? আমার সব গয়নাই কিন্তু রুপোর উপর সোনার জল করা নয়।”

এই আশ্বাস দানকে ভালবাসার সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া যায়?

রজ্জাক-নন্দিনী মালিয়া, ‘বাবা কেন চাকর’

সন্তানদের সুখী জীবনে বাবা-মা বোঝা হয়ে উঠছেন, সন্তানদের অপমান, সংসারের ঝড়-ঝাপটা সামলে বাবা-মা নিজেদের দু’জনকে আঁকড়ে শেষ জীবনে বাঁচছেন। আবেগে, চোখের জলে, প্রাণের টানে বক্সঅফিসে রেকর্ড হিট করেছিল স্বপন সাহার ‘বাবা কেন চাকর’। প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা থাকলেও ছবির নামভূমিকায় রজ্জাক সাহেব এবং রজ্জাক-নন্দিনী বিশাল জনপ্রিয় জুটি হয়ে ওঠে দুই বাংলায়। আজও বাংলাদেশের দর্শক নন্দিনী মালিয়াকে এই ছবি দিয়েই চেনে।

ছবির যে দৃশ্যে স্ত্রী মমতা ওরফে নন্দিনী মারা গেছেন, ভোর হতে স্বামী রাজ্জাক দেখছেন ঘুমন্ত স্ত্রী তাঁর হাত ধরেই শেষ বিদায়ের পথে পাড়ি দিয়েছেন, সেই দৃশ্যে রজ্জাকের কান্নায় ভেঙে পড়া দেখে সিনেমা হলে দর্শকরা কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলে ভাসিয়েছিল।

অপর্ণা-সৌমিত্র, ‘পারমিতার একদিন’

মণিদার লাঠির ঠুকঠুক শব্দ যেন সনকার দমবন্ধ সংসার জীবনে এক মুঠো খোলা জানলা। সনকার মেজো ছেলে যাকে বলে, ‘ওই শ্যামের বাঁশি বেজে গেছে’। সনকা-মণিদার ভালবাসা ছিল বাল্যপ্রেম, যা বিবাহের পরিণতি পায়নি। কিন্তু সনকার শ্বশুরবাড়িতে মণিদার যাতায়াত ছিল। না, সেই অর্থে আর কোনও পরকীয়া নেই, কিন্তু বন্ধুত্ব, ভাললাগার রেশটুকু রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে অনেক না পাওয়ার জ্বালা। তাই সনকা বলে ওঠে, “তোমার সঙ্কোচের জন্য দু’দুটো জীবন নষ্ট হয়েছে মণিদা! ভুলে গেছো সে কথা?”

মণিদার ওষুধের খরচ কিন্তু মণিদার সুনুই দেয়। ওইটুকু অধিকার আজও আছে সনকার। মণিদাও সারাজীবন আর বিয়ে করেননি। বাল্যপ্রেম ব্যর্থপ্রেম হয়ে গেছে আজ, তা নিষিদ্ধ, তবু মণিদা মনে রাখেন সনকার পছন্দ অপছন্দ। এই প্রেমকে কি নাম দেওয়া যায়?

সৌমিত্র-স্বাতীলেখা, ‘বেলা শেষে’ থেকে ‘বেলা শুরু’

‘বেলা শেষে’র পাক ধরা সাদা চুলেই ‘বেলা শুরু’র আশাবরী সুর বাঁধলেন সৌমিত্র-স্বাতীলেখা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই সংলাপ, “তখন তো এত ফেসবুক টেসবুক ছিল না। সাদা কালো ছবি দেখেই সোজা ছাদনাতলায়। ঘটের উপর হাতের উপর হাত। সেই প্রথম স্পর্শ।”

‘বেলা শেষে’ দেখে চোখের জল আটকাতে পারেননি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দর্শক থেকে জেন ওয়াই নতুন প্রজন্মও। সর্বোপরি এই প্রবীণ জুটির অভিনয়ে এই ছবি বক্সঅফিসে রেকর্ড হিট দেয় এবং একই জুটি নিয়ে শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ‘উইনডোজ’ তৈরি করে ফেলে সৌমিত্র-স্বাতীলেখার দ্বিতীয় ইনিংস ‘বেলা শুরু’। ছবিটির মুক্তি আসন্ন।

মনে দাগ কেটে যায় স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর সেই সংলাপ, “তুমি যে স্নান করে ভিজে তোয়ালেটা রেখে দাও, ওই ভিজে তোয়ালেতে আমি চান করি। ওইটাই আমার অভ্যেস। ওইটাই আমার প্রেম। এই সংসার আর তুমি দুটো আলাদা নয়, দুটোই আমার প্রেম।”

সাবিত্রী-মনোজ, আদর্শ ‘দম্পতি’

মনোজ মিত্রর ‘দম্পতি’ নাটক নিয়ে ছবি হয়েছিল ‘ভালবাসা’। প্রধান চরিত্রে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ও মনোজ মিত্র। হাসি, মজায়, খুনসুটিতে, সুখে-দুঃখে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর সংসার করার পরে যখন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার হাতে গড়া বাড়ি বেচে দিতে চায় তাঁদেরই দুই ছেলে তখন কী পরিস্থিতি হয় এই বৃদ্ধ দম্পতির, সেই নিয়েই এই গল্প। তখন বাপ-মা হয়ে যায় ভাগের মা-বাপ। নিজেদের কোনও দিন অশান্তি হয়নি, নিজেরা কখনও আলাদা থাকেননি, অথচ ছেলেদের চাহিদায় শেষ জীবনে অশীতিপর দম্পতিকে দুই দেশে থাকতে হবে। তাঁরা কি করে থাকবেন এতদিনের ভরসা ছেড়ে! গিন্নি যাওয়ার আগেও কর্তার ছেঁড়া মোজাটা সেলাই করে দিয়ে যান, কর্তার যে ঠান্ডা লাগার ধাত!

আবার এই একই জুটিকে রাজা সেন ফিরিয়ে আনলেন তপন সিনহার চিত্রনাট্যে ‘তিনমূর্তি’ ছবিতে। কী অসাধারণ অভিনয় দুজনের। ছবিটা মনে রাখার মতো শুধু কেবল সাবিত্রী-মনোজের অপূর্ব কমেডি অভিনয়ের জন্য। এই কমেডি দরকার সব বৃদ্ধ-বৃদ্ধার জীবনে। অণু পরিবারের একাকীত্বের মধ্যেও নিজেদের ভাল লাগা নিয়ে বেঁচে থাকা, আনন্দ করা, নিজেদের-সহ আরও অনেক দম্পতিকে ভরিয়ে রাখে।

এসব নির্ভরতায়, অভ্যেসে জড়িয়ে আছে ভালবাসা, প্রেম। শরীরী বার্ধক্য ঢেকে যায় হাতের উপর হাত রাখার ভরসায়। এমনই প্রকৃত প্রেমময় হোক বসুন্ধরা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More