ভাগ্যশ্রীর কেরিয়ার মুখ থুবড়ে পড়ে অসময়ের বিয়েতে, তবে তাঁর জীবনের মন্ত্রই ছিল ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘দিল দিওয়ানা বিন সজনাকে মানে না’… নব্বই দশকে সব বাড়ির রেডিও বা টেপ রেকর্ডার থেকে এই গান ভেসে আসত। ১৯৮৯ সালের ব্লকব্লাস্টার সুপারডুপার হিট ছবি ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’। ছবির নায়িকা ভাগ্যশ্রী প্রথম ছবিতেই সুপারহিট। ভাগ্যশ্রীর ঠোঁটে লতা মঙ্গেশকরের গান, সঙ্গে ভাগ্যশ্রীর চোখ ঝলসানো রূপ পাগল করে দিল তামাম ভারতবর্ষকে। ছবির নায়কও তখন নবাগত সলমন খান। সলমন আগে মাত্র একটি ছবি করেছেন সহ-অভিনেতা রূপে, ‘বিবি হো তো অ্যায়সি।’ রেখা নামভূমিকায়। ওই ছবিতে সলমনের নিজের কণ্ঠও ব্যবহার করা হয়নি।

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ দিয়েই নায়ক রূপে সলমন খানের অভিষেক। সঙ্গে সলমন-ভাগ্যশ্রী জুটি রেকর্ড সুপারহিট বলিউড ছবির ইতিহাসে। ‘শোলে’কেও পার করেছিল ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র বক্সঅফিস সাফল্য।

কিন্তু সলমন-ভাগ্যশ্রী জুটি ওই একটি ছবি দিয়েই প্রথম ও শেষ জুটি হয়ে রইল। ভাগ্যশ্রীও ‘ওয়ান ফিল্ম ওয়ান্ডার’ নায়িকা। এক ছবিতে স্টারডম পেয়েও অল্প বয়সেই স্বামী-সংসারকে ধ্যানজ্ঞান করে ফেললেন ভাগ্যশ্রী। কিছু ছবি, সিরিয়াল করলেও  সেগুলো হিটের মুখ দেখেনি।

পুরো নাম শ্রীমান্ত রাজকুমারি ভাগ্যশ্রী রাজে পাটবর্ধন। রাজার মেয়ে ভাগ্যশ্রী। নামের সঙ্গে মিলে যায় তাঁর ভাগ্য। আর পাঁচটা মেয়ে যেমন বাপের অগাধ সম্পত্তি, স্বামীর ভালবাসা, বড়লোক স্বামী, সুখী সংসার, সুন্দর পুত্রসন্তানের স্বপ্ন দেখে ভাগ্যশ্রীও এই নিরাপত্তা চিরকাল চেয়েছেন এবং পেয়েছেন। অবশ্যই কিছু মেয়ের চাহিদা আলাদা থাকে, অন্তত আজকের যুগের মেয়েরা নিজের সত্ত্বায় বাঁচতে চায়। কিন্তু ভাগ্যশ্রী পুরুষতন্ত্রের শিকার হন ছোট থেকেই। আবার সেই পুরুষতন্ত্রকে তিনি ভেঙেও ফেলেন, কিন্তু ফের নতুন আর এক পুরুষতন্ত্রের শেকলে বন্দি হন সুন্দরী নায়িকা। যদিও তাতে তাঁর কোনও আফশোস নেই। সংসারটাকেই ভালবেসে বহু মেয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে, তার উদাহরণ ভাগ্যশ্রী।

১৯৬৯ সালে সাংলির পাটবর্ধন রাজপরিবারে সোনার চামচ মুখে করে জন্ম ভাগ্যশ্রীর। মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটেই থাকতেন তাঁরা। ভাগ্যশ্রীর পিতা রাজা বিজয় সিংহরাও মাধবরাও পাটবর্ধন। ছোটবেলায় যখন স্কুলের বন্ধুরা পুতুল নিয়ে খেলত বা বাড়িতে কুকুর বেড়াল পোষ্য করত তখন বালিকা ভাগ্যশ্রী হাতি কিনবেন বলে বায়না করতেন। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকা ঠাঁটবাটে বেড়ে উঠছিল কিশোরীবেলা। পিতা ছিলেন রক্ষণশীল। তিনি কড়া শাসনে মেয়েদের বড় করেন। কিন্তু ভাগ্যশ্রীর অভিনয়ের সুপ্ত বাসনা ছিল।

ভাগ্যশ্রীদের প্রতিবেশী ছিলেন বিখ্যাত নায়ক অমল পালেকার। অমল পালেকারের কন্যার খেলার সাথী ছিলেন ভাগ্যশ্রী। তো সেখান থেকেই ভাগ্যশ্রীকে পছন্দ হয় অমল পালেকারের। পিতার অনুমতি ভাগ্যবলে পেয়ে ভাগ্যশ্রীর প্রথম অভিনয় অমল পালেকরের পরিচালনায় দূরদর্শনের ‘কাচ্চি ধূপ’ সিরিয়ালে।

সিরিয়ালে ভাগ্যশ্রী চান্স পেলে তাঁর প্রচুর ফোটোশ্যুটও হয় বিভিন্ন সিনে পত্রিকায়। এইসময় পরিচালক সূরজ বরজাতিয়া ‘রাজশ্রী ফিল্মস’-এর ব্যানারে তাঁর নতুন ছবি ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র নায়িকা খুঁজছিলেন। ভেবে রাখা ছিল যশ চোপড়া প্রোডাকশনস ও অনিল কাপুরের নায়িকা শ্রীদেবী বা রাজশ্রীর আগের ফিল্মে কাজ করা মাধুরীর নাম।

কিন্তু সব হিসেব বদলে দিল একটা ম্যাগাজিনের কভার গার্ল। ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে পরিচালক সূরজ বরজাতিয়ার চোখ পড়ে কভার গার্লের দিকে। খুঁজে বার করেন সিরিয়ালে অভিনয় করা মেয়েটিকে এবং সিনেমায় অফার।  ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ প্রথমে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে করতে চাননি ভাগ্যশ্রী। শেষ অবধি পিতা মত দেন, তবে শর্তাও দেন সঙ্গে। এমন দৃশ্য যেন মেয়ে না করে, যাতে পিতার মুখ পোড়ে।

ভাগ্যশ্রীর বাবা মেয়েকে কোনও দিন স্কার্ট, জিন্স পরতেই দেননি। তাঁর রাজ পরিবারে ওইসব পোশাক ছিল দৃষ্টিকটু অশ্লীল।  ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’তে ভাগ্যশ্রীর দৃশ্য ছিল অনেকগুলো স্কার্ট-টিশার্ট পরে এমনকি ওয়ান পিস পরেও। এইসব দৃশ্য বাবাকে না জানিয়েই শ্যুটিং করেন ভাগ্যশ্রী। রিলিজের আগে ছবির প্রথম স্ক্রিনিংয়ে ভাগ্যশ্রীর সঙ্গে গেছিলেন তাঁর বাবা। ভাগ্যশ্রীর ওইসব পোশাকের দৃশ্য দেখে তার দিকে কটমট করে তাকিয়েছিলেন রাগান্বিত পিতা। সেদিন ভাগ্যশ্রী হলের সিটের সঙ্গে লেপ্টে গেছিলেন লজ্জায়-ভয়ে।

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ প্রথম দিকে অল্পসংখ্যক হলে মুক্তি পায়। কারণ তার আগে রাজশ্রীর ছবি গুলো ফ্লপ হচ্ছিল। কিন্তু ক’দিনেই সুপারহিট হয়ে যায়   ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র ছবি ও ছবির গান। ফের সব হাউসে চলতে থাকে সারা দেশে এই ছবি।   ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ কতটা সুপারহিট করেছিল সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ ছবি সলমন খানকেও স্টারের আসনে বসিয়ে দিল। তখন সব ছেলেরাই সলমনকে নকল করে সাজছেন বা সলমন ঢংয়ে কথা বলছেন। কিন্তু নায়িকা ভাগ্যশ্রীর কেরিয়ার আর সুদূরপ্রসারী হল না। কারণ তিনি কেরিয়ারের চেয়েও প্রেমকে জীবনে মুখ্য করে তোলেন।

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র শ্যুটিংয়ে সলমন কয়েকবার রিল লাইফ নায়িকা ভাগ্যশ্রীর সঙ্গে ফ্লার্ট করলে ভাগ্যশ্রী সলমনকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি হিমালয়ের বাগদত্তা। যে হিমালয়কে ভাগ্যশ্রী স্কুলজীবন থেকে ভালোবাসেন।

কথায় আছে, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো। ভাগ্যশ্রীর পিতার ক্ষেত্রেও ঠিক এটাই ঘটেছিল। তিনি শেকল পরিয়ে মেয়েকে মানুষ করেছিলেন, যেন মেয়ে চোখ তুলে না তাকায় কোনও ছেলের দিকে। অথচ মেয়ে স্কুলজীবন থেকেই প্রেম করে বসল। স্বভাবতই ভাগ্যশ্রীর পরিবার মেনে নেয় না হিমালয়কে। হিমালয়ের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা বলাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হিমালয় দাসানি ছিলেন উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারের আমেরিকা ফেরত ছেলে। কিন্তু ওঁদের প্রেম স্কুল জীবন থেকেই। পরে ভাগ্যশ্রী তাঁর পরিবারকে না জানিয়েই পালিয়ে বিয়ে করেন হিমালয়কে।  ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র শ্যুটিং চলাকালীনই বিয়ে করে নেন তাঁরা। ছবিতে ‘মেহন্দি’র যে দৃশ্য ছিল, তার দু’দিন পরই বিয়ে হয় ভাগ্যশ্রীর। ভাগ্যশ্রী-হিমালয়ের বিয়েতে প্রধান সাক্ষী ছিলেন সলমন খান। সলমন কি সেদিন থেকেই চিরকুমার ব্রতধারী হয়ে ওঠেন। কে জানে সলমনের নীল নয়নের রহস্যভেদ করা যে দুঃসাধ্য!

ভাগ্যশ্রীর ফ্যানরা এই বিয়েকে ভাগ্যশ্রীর পতনের কারণ বলে মনে করেন। কারণ স্ত্রীর খ্যাতি অনেক স্বামীই মেনে নেন না। বহু নায়িকা এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে ডিভোর্স ফাইল করেছেন বা সেপারেশনে থেকেছেন, কিন্তু ভাগ্যশ্রী তাঁর কেরিয়ারের চেয়েও স্বামী হিমালয়কে বেশি ভালবেসেছেন। তিনি স্বামীর আদেশ মাথা পেতে নেন। এমনকি ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’তেও সলমনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যগুলি ভাগ্যশ্রী করতেন হিমালয়ের থেকে সবুজ সংকেত পেলেই।

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ সুপারহিট হতে রাতারাতি ভাগ্যশ্রীর পারিশ্রমিক, ছবির অফার সব বেড়ে যায়। কিন্তু হিমালয়ের দাসানি পরিবার চায়নি ভাগ্যশ্রী আর ফিল্ম লাইনে থাকুক। তাই সে পরিবারের ডানা-ছাঁটা বহু হয়ে গেলেন ভাগ্যশ্রী। এমনকি অমিতাভ বচ্চনের নায়িকা হওয়ার অফারও হেলায় ছেড়ে দেন ভাগ্যশ্রী।

শেষ অবধি হিমালয় বলেন, তাঁকে যদি হিরো করা হয় তবেই স্ত্রী অভিনয় করতে পারবে। ভাগ্যশ্রী তখন এতটাই সুপারহিট যে, তাঁর প্রস্তাবে রাজি হয়ে প্রযোজকরা হিমালয়কে নায়ক হিসেবে সুযোগ দেন। স্বামী বাদে অন্য পুরুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গ দৃশ্য করতেও আপত্তি ছিল ভাগ্যশ্রীর। স্বামীর সঙ্গে জুটি বেঁধে ভাগ্যশ্রী তিনটি ছবি করেছিলেন, ‘কয়েদ মেঁ হ্যায় বুলবুল’, ‘ত্যাগী’ এবং ‘পায়েল’। সব কটা ছবিই সুপারফ্লপ হয় বক্সঅফিসে।

সলমন খান, আমির খান থেকে অমিতাভ বচ্চন যাঁর হিরো হতে চেয়েছিলেন, তাঁর পরিণতি সত্যিই পীড়াদায়ক। কিন্তু ভাগ্যশ্রী ফ্লপের পরোয়া করেননি। তিনি স্বামীকে জড়িয়ে পতিব্রতা স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, তাই হয়েছেন। যদিও মাঝে কিছুদিন সেপারেশানেও ছিলেন দাসানি দম্পতি। একবার ভাগ্যশ্রী বলেও ফেলেছিলেন, অন্য পুরুষকে বিয়ে করলে হয়তো ভাল হত।

কিন্তু বর্তমানে সুখী ভাগ্যশ্রী। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। আজও পঞ্চাশ পেরোনো ভাগ্যশ্রী নিজেকে সুন্দর রেখেছেন। সিরিয়ালে কামব্যাক করলেও অবশ্য হিটের মুখ দেখেননি। ভাগ্যশ্রী কয়েকটি বাংলা ছবিও করেন, যেমন ‘সতী বেহুলা’, ‘শত্রু ধ্বংস’ প্রভৃতি।

কিছু রিয়্যালিটি শো-ও করেন ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’র স্টারডম ভাঙিয়ে, কিন্তু সব শো ফ্লপ। তবু আজও ভাগ্যশ্রী স্থিরযৌবনা। ভাগ্যশ্রী শুধু সংসার নয়, বিলাসিতা, নিরাপত্তা, সম্পত্তি, বিদেশ ভ্রমণ— এগুলোও চেয়েছিলেন। হয়তো তাঁর দিক থেকে ঠিক, ফিল্ম লাইনও তো ছবি ফ্লপ হলে ছুড়ে ফেলে দেয়। তাই একাকীত্বে জীবন কাটাতে চাননি ভাগ্যশ্রী, সংসারেই থাকতে চেয়েছেন। কাজ আর সংসারে ব্যালেন্স করতে তিনি চাননি।

হিমালয় এবং ভাগ্যশ্রীর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। ছেলে অভিমন্যু দাসানিও এখন অভিনেতা। দেখতেও নায়কোচিত। গত বছর ‘মর্দ কো দর্দ নেহি হোতা’ ছবি দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয় তাঁর। মা ছেলে দুজনেই তাঁদের প্রথম ছবিতে পেয়েছেন ফিল্মফেয়ার সেরা ডেবিউ অভিনেতা পুরস্কার। ভাগ্যশ্রী জানিয়েছিলেন, নিজের সিদ্ধান্তে তাঁর কোনও অনুতাপ নেই। তাঁর কাছে স্বামী ও সংসার আগে। কাজ পরে।

ছেলের সঙ্গে ভাগ্যশ্রী।

এই প্রজন্মের অনেকের মনে হবে, কী পরিণতি ভাগ্যশ্রীর, তিনি পুরুষতন্ত্রের শিকার। কিন্তু এটাই ভালবেসেছেন ভাগ্যশ্রী। ছোটবেলায় পিতার শাসনে পায়ে শেকল পড়া টিয়া হয়েছিলেন। সেই খাঁচা ভেঙে শেকল কেটে উড়তে পারলেও গিয়ে বসলেন ভাগ্যশ্রী আর এক পুরুষের খাঁচায়। সেখানেও স্বামী শ্বশুরবাড়ির অঙ্গুলিনির্দেশে চলেছেন অভিনেত্রী। ভাগ্যশ্রী নিজেও পুরুষতন্ত্রকে লালন করেছেন। তিনি শুধু পুরুষতন্ত্রের শিকার নন, অংশীদারও। কারণ তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি ছিলাম রাজ পরিবারের মেয়ে, সিনেমায় নামতে গিয়ে আর পাঁচটা এই লাইনের মেয়েদের মতো  পরিচালক প্রযোজকের কোলে বসা পড়া স্বভাব আমার ছিল না। স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে লিপলক সিন বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য করার আমার ইচ্ছেও ছিল না। আমি সংসারী, আমার আভিজাত্য আমার ঐশ্বর্য।”

ভাগ্যশ্রী অনেক সুপারহিট ছবির সফল নায়িকা না হতে পারেন, কিন্তু ভাগ্যশ্রী তাঁর জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More