গীতা বালির সিঁথি লিপস্টিকে রাঙিয়ে বিয়ে করেন শাম্মি কাপুর, দশ বছরের প্রেম ফুরোয় মারণ-অসুখে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘তদবির সে বিগড়ি হুই তকদির বানা লে’…

‘বাজি’ সিনেমায় এই গান যাঁর লিপে, তিনি গীতা বালি। সেই দুষ্টু-মিষ্টি হাসি, বড় বড় চোখ ঘোরানো আর প্রাণবন্ত আবেদন কি ভোলা যায়। তাঁর রূপ-লাস্য-মাদকতার প্রেমে পড়ে পাণিপ্রার্থী হন খোদ শাম্মি কাপুর।

১৯৩০ সালে গীতার জন্ম অমৃতসরে, এক নিম্নবিত্ত শিখ পরিবারে। তাঁর আসল নাম ছিল গুরকীর্তন কউর (বা হরকীর্তন কউর)। গীতার বাবা কর্তার সিংহ ছিলেন পণ্ডিত, দার্শনিক এবং সঙ্গীতসাধক। তিনি অপূর্ব কীর্তন গাইতেন এবং তাঁর কোলে বসে ছোট্ট গীতা কীর্তন শুনতেন। তাই কর্তার সিংহ মেয়ের নাম রাখলেন কীর্তন দিয়ে গুরকীর্তন কউর। শিখ ধর্মের রক্ষণশীলতা ভেঙে মেয়েকে ধ্রুপদী নৃত্য শিখিয়েছিলেন বাবা কর্তার সিংহ। প্রকাশ্য মঞ্চে গীতা ও তাঁর বোন ধ্রুপদী নৃত্য পরিবেশন করায় তাঁদের একঘরেও করা হয়। কিন্তু সেসব উপেক্ষা করে শুধু নাচ নয়, মেয়েদের মার্শাল আর্টস আর ঘোড়ায় চড়াও শেখান তিনি।

কিন্তু সুখের দিন ফুরোল। গীতার বাবা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হলেন। তিনি অন্ধ হয়ে গেলেন এবং মারাও গেলেন। সে সময়ে পিতৃশোকে ভেঙে পড়েন গীতা।

গীতার দাদা দিগ্বিজয় সিংহ বালি ছিলেন ছবির পরিচালক। সেই সূত্রেই শিশুশিল্পী হিসেবে ফিল্ম জগতে হাতেখড়ি গীতা বালির। স্বপ্ন ছিল নায়িকা হওয়ার। সে স্বপ্ন সত্যি হল যখন বিখ্যাত পরিচালক কেদারনাথ শর্মা গীতাকে তাঁর ছবি ‘সুহাগ রাত’-এ লিড হিরোইন করলেন। গীতার বিপরীতে হিরো ছিলেন ভারতভূষণ।

এর পরে পৃথ্বীরাজ কাপুর, রাজ কাপুর থেকে দেব আনন্দ, গুরু দত্ত– সবার বিপরীতে কাজ করেছেন গীতা। তবে দেব আনন্দের সঙ্গে গীতার ছবির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গীতা অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল ‘দুলারি’, ‘বড়ি বহেন’, ‘বাজি’, ‘আলবেলা’, ‘জাল’, ‘বচন’ এবং ‘আনন্দমঠ’। গীতার অভিনীত শেষ ছবি ‘যব সে তুমকো দেখা হ্যায়’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৩ সালে। বেছে বেছে ছবি করতেন গীতা বালি, তাই কুড়ি বছরের ফিল্ম কেরিয়ারে তাঁর ছবির সংখ্যা কমই।

তবে গীতা হিটমেশিন হিরোইন ছিলেন। গীতার লিপে সব গান বিশেষ করে গীতা দত্তর গান সুপারহিট। তাই কম সময়েই প্রচুর অর্থের মালকিন হয়ে যান গীতা। গীতা বালি নিজে ছবি প্রযোজনা করেন এবং ক্যামেরার পিছনে থাকা গুরু দত্তকে নায়ক রূপে গীতা বালিই লঞ্চ করেন তাঁর ছবিতে। গুরু দত্ত বলেছিলেন, “আমি তো ক্যামেরার পেছনে থাকা পরিচালক ছিলাম, কিন্তু গীতা বালির জন্যই আমি হিরো হবার মনের জোর পাই।”  ছবির নাম ছিল ‘বাজ’।

আর গীতার প্রেম? সেখানে ছিল নাটকীয় মোড়। যা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানিয়ে দিতে পারে।

১৯৫৫ সালে গীতা বালি ছিলেন প্রথম সারির হিরোইন আর শাম্মি কাপুরকে তখন বলিউডে নবাগত বলা যেতে পারে। কিন্তু কাপুর বংশের ছেলে শাম্মি। গীতা দত্ত আর শাম্মি কাপুর দু’জনে এক ছবিতে কাজ করছিলেন। ছবির নাম ‘রঙিন রাতে’। বলিউডে নিজের পায়ের তলার মাটি যখন শক্ত করতে চাইছেন শাম্মি, তখন এই ছবিতে হিরোর রোল পান তিনি গীতা বালিরই সুপারিশে। এই ছবির আউটডোর পড়েছিল নৈনিতালের কাছে রানিখেতে। দুজনে আউটডোরে প্রথম একসঙ্গে অনেকটা সময় কাটান এবং যাকে বলে ‘প্রথম দর্শনেই প্রেম’, সেই অবস্থা হয় শাম্মি কাপুরের।

অথচ গীতা বালি শাম্মির থেকে বয়সে এবং স্টারডমে বড়। তবু সাহস সঞ্চয় করে গীতা বালিকে প্রেম নিবেদন করেন শাম্মি। বিয়ে করতে চান। তবে গীতা না বলে দেন। বলেন, তাঁর কাঁধে অনেক দায়িত্ব এখন বিয়ে করা সম্ভব নয়। কিন্তু তবু গীতা শাম্মির প্রেমপ্রস্তাব গ্রহণ করেন। হাল ছাড়লেন না শাম্মি। মাঝেমাঝেই অনুরোধ করতে থাকলেন। কয়েক মাস পরে গীতা আচমকা একদিন শাম্মিকে বলেন, “ওকে, আজই আমাদের বিয়ে হবে।” শাম্মি বলেন “আজই? তাহলে আমাদের বাবা-মার অনুমতি নিয়ে নিই?” গীতা বালি বলেন “না, এখনই এই মুহূর্তেই আমাকে বিয়ে করতে পারলে করো।”

শাম্মি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। তখন দুজনের কমন ফ্রেন্ড জনি ওয়াকার, যিনি ঠিক তার আগের সপ্তাহেই পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। সেই জনি ভাইয়ের কাছে উপস্থিত হন দুজনে। বলেন, তাঁর মতো করেই বিয়ে করতে চান। পথপ্রদর্শক জনি বলেন, “সে ভাল কথা। কিন্তু তোমরা কি পাগল! আমি তো মুসলিম! মসজিদে গিয়ে বিয়ে করেছি। তোমরা মন্দিরে গিয়ে বিয়ে সেরে ফেলো। আমি সঙ্গে আছি।”

কাপুর পরিবার সাধারণ ভাবে মেনে নিত না শাম্মি-গীতার বিবাহ। এর পিছনে ছিল অনেক কারণ। গীতা ছিলেন শাম্মির চেয়ে বয়সে বড়। আবার গীতা বালি তাঁর ভাসুর রাজ কাপুর এবং শ্বশুর পৃথ্বীরাজ কাপুরের নায়িকা রূপে (‘আনন্দমঠ’ ছবিতে) কাজ করেছিলেন। কিন্তু শাম্মি এসব জেনেও পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েই পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবার ও মিডিয়ার চোখ এড়িয়ে তখনকার সুপারস্টার নায়িকা গীতা বালিকে বিয়ে করে ফেলেন শাম্মি।

শাম্মি-গীতার বিয়ে হয়েছিল দক্ষিণ মুম্বাইয়ের বানগঙ্গা মন্দিরে। গভীর রাতে মন্দিরের দরজা যখন বন্ধ তখন বিয়ে করতে উপস্থিত হন লোকচক্ষুর আড়ালে শাম্মি-গীতা। পুরোহিত বলেন, মন্দিরের দ্বার বন্ধ হয়ে গেছে তাই বিয়ে হবে পরের দিন ভোরে। বাড়ি ফিরে যান শাম্মি-গীতা। শেষে পরের দিন ভোর চারটেয় শুভ পরিণয় সম্পন্ন হয়। বিয়েতে মুশকিল হল এক জায়গায়। তাড়াহুড়োতে বিয়ের অপরিহার্য সিঁদুর আনতেই ভুলে যান শাম্মি। পুরোহিত শাম্মিকে বলেন গীতাকে সিঁদুর পরাতে, কিন্তু সিঁদুর তো নেই! তখন মুশকিল আসান গীতা ব্যাগ থেকে লাল লিপস্টিক বার করে সেটাই তাঁর সিঁথিতে পরিয়ে দিতে বলেন শাম্মি কাপুরকে।

কাপুর খানদান যথারীতি মেনে নেয়নি এই বিয়ে। কিন্তু গীতার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে পরে তাঁকে মেনে নেয় কাপুর খানদান।

গীতার জীবনে অবশ্য এর পরে অবধারিত ভাবে এসে উপস্থিত হয় কাপুর বংশের নিয়মের খাঁড়া। মেমসাহেব বলে ছাড় পেয়েছিলেন শশী কাপুরের বউ জেনিফার কেন্ডল কাপুর। তবে জেনিফার অবশ্য গীতা বালির মতো প্রথম সারির নায়িকা ছিলেন না সে সময়। কিন্তু ববিতা, নীতুর থেকে গীতা বালি ছিলেন আলাদা। গীতা বালি কাপুর বিয়ের পরেও ছবি করা বন্ধ করেননি। ছবি প্রযোজনাও করেছেন। সুন্দর ব্যবহার আর সেবা দিয়ে কাপুর পরিবারের সকলের মন জিতে নেন গীতা। আবার গীতার সংস্পর্শে এসেই শাম্মি কাপুরও প্রথম সারির হিরো হয়ে উঠতে পারেন। রাতারাতি হিট ছবিতে স্টার হয়ে যান শাম্মি কাপুর।

কাপুর পরিবারের পরম্পরার বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ের পরও ছবি করতে পেরেছিলেন গীতা বালি। সে জন্য কোন বিবাদ-বিদ্রোহ তাঁকে করতে হয়নি। ভালবাসা দিয়েই সবার মন জয় করেন গীতা। গীতা-শাম্মির দুই সন্তান, পুত্র আদিত্য রাজ কাপুর এবং কন্যা কাঞ্চন।

সুখের সংসার, কেরিয়ার বেশি দিন টিকলনা গীতার জন্য। যে রোগ গীতার বাবাকে কেড়ে নিয়েছিল, সেই গুটিবসন্তেই আক্রান্ত হলেন গীতা। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে গীতা ব্যস্ত ছিলেন ‘রানো’ ছবির শুটিংয়ে। পঞ্জাবি ভাষার এই ছবির প্রযোজক ছিলেন গীতাই। সেই সময় গুটি বসন্তে আক্রান্ত হন গীতা।

ঝলমলে মুখ ঝলসে গেল বসন্তের ক্ষতয়। নিজের মুখ আয়নায় দেখে আঁতকে উঠতেন গীতা। বুঝতেন, তাঁর ফিল্মি জীবন এখানেই শেষ। সুন্দর মুখ নষ্ট হয়ে গেল চিরতরে, সঙ্গে প্রবল জ্বর। শাম্মি তখন ‘তিসরি মঞ্জিল’-এর আউটডোরে। গীতার অসুস্থতার খবর পেয়ে ছুটে এলেন শাম্মি। কিন্তু প্রবল জ্বর গীতার। থার্মোমিটারের পারদ ছুঁয়েছে ১০৭। গীতা আর চিনতে পারলেন না তাঁর শাম্মিকে। ১৯৬৫ সালের ২১ জানুয়ারি মাত্র ৩৪ বছর বয়সে অমৃতলোকে পাড়ি দিলেন গীতা বালি। ‘রানো’ ছবির শ্যুটিং আর করবেন না বলে দেন রাজিন্দর সিং।

শাম্মি কাপুর তাঁর ভালবাসার গীতাকে দাহ করেন সেই বানগঙ্গা মন্দিরেই, যেখানে তাঁদের ভালবাসা শুরু হয়েছিল।

গীতার মৃত্যুর চার বছর পরে ১৯৬৯ সালে শাম্মি কাপুর বিয়ে করেন নীলাদেবী গোহিলকে। নীলা দেবী আগলে রেখেছিলেন শাম্মির সন্তান-সংসার। তবু গীতার সঙ্গে রোম্যান্টিক সেই দশটা বছর আজীবন মনে রেখেছিলেন শাম্মি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More