যাঁরা উত্তম-রক্ষিতা বলেন সুপ্রিয়া দেবীকে, তাঁরাই আবার বেণুদির রেসিপি রেঁধে সংসার সুখে রাখেন

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

থার্ড ওম্যান, রক্ষিতা, অবৈধ, উত্তমসঙ্গিনী… বাড়তি।

এই শব্দগুলো ব্যবহার করে বাঙালি চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের একাংশ এক দেবীকে অপমান ও লাঞ্ছনা করে আসছে সেই কবে থেকে। তিনি সুপ্রিয়া দেবী। তবে বিশেষ কিছু বাঙালি ওঁকে দেবী বলে সম্বোধন করলেও, দেবীর লেশমাত্র সম্মান বা ভালবাসা ওঁকে দেয়নি।

তবু তিনি তো দেবী, তাই হাজার অপমান, অশ্রদ্ধা তাঁর গায়ে লাগেনি। তিনি পরচর্চার পাঁকে পদ্ম হয়েই ফুটে রয়েছেন।

আসলে বাঙালি সমাজে পরচর্চার কেন্দ্রবিন্দু তিনি বহুদিন ধরেই। সমাজ তাঁকে থার্ড ওম্যান বলেছে। অথচ এভাবে তাঁকে তৃতীয় নারী বলার কোনও জায়গাই নেই। ছিল না কখনও। কিন্তু আমাদের সমাজের অলিখিত নিয়ম, কোনও বৈবাহিক সম্পর্কে নারী প্রবেশ করা মানেই সমাজের চোখে সব দোষের ভাগী সেই ‘দুসরি অউরত’ বা তৃতীয় নারীটি। কিন্তু এক হাতে কি তালি বাজে?

সুপ্রিয়া কারও সংসার ভাঙেননি। যতই মধ্যবিত্ত মানসিকতার মহিলারা সে কথা বলুন না কেন, আসলে উত্তমই এসেছিলেন সুপ্রিয়ার কাছে। সে রাতটা ছিল ১৯৬৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন উত্তমের প্রথমা স্ত্রী গৌরী দেবীর জন্মদিন। ভবানীপুরের বাড়িতে আনন্দ-উৎসব হচ্ছিল। হঠাৎ অশান্তির ঝড় উঠল। সন্দেহপ্রবণ গৌরীর কুকথা সহ্যের সীমা ছাড়াল উত্তমের। তখনই এক জামাকাপড়ে রাত সাড়ে দশটা-এগারোটায় উত্তম বেরিয়ে গেলেন বাড়ি ছেড়ে, গাড়ি নিয়ে। সেদিন সারারাত পথেই কেটেছিল তাঁর। সে রাতই মহানায়কের জীবনে নতুন অঙ্কের সূচনাপট।

উত্তম পরে লিখেছেন, “দর্শক, প্রযোজক, পরিবেশক মহল আমার কাছে অনেক প্রত্যাশা করেন। তাই প্রথমেই আমি চাইলাম মানসিক প্রশান্তি। যা পেলে আমি কাজ করতে পারি। মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে হাজির হয়েছিলাম ময়রা স্ট্রিটে। বেণুকে বলেছিলাম, তুমি ময়রা স্ট্রিটে ফ্ল্যাট নেওয়ার পর থেকে অনেকদিন আমাকে আসতে বলেছিলে। আজ এসেছি, তুমি আমাকে আশ্রয় দেবে? তৎক্ষণাৎ একা মহিলা হয়েও বেণু বিস্ময় ও মমতা দুই নিয়ে হাসি মুখে দরজা খুলে আমায় আশ্রয় দিয়েছিল। সেই থেকে ময়রা স্ট্রিটে আমি সতেরোটি বছর। যা ছিল তখন আমার মানসিক শান্তির তুলনাহীন তীর্থ। তবে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি মা, গৌরীর সঙ্গে।”

১৯৬৩ সালের পৌষ মাসে শালগ্রাম শিলাকে সাক্ষী রেখে উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর বিবাহ হয়। পৌষ মাসে বিয়ে হয় না, কিন্তু ওঁদের হয়েছিল। সুপ্রিয়ার বাবা গোপাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয়ার বড় জামাইবাবু বনফুল, সাহিত্যিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সুপ্রিয়াকে সিঁদুর পরিয়ে ছোট গিন্নির সম্মান দেন উত্তম।

তবে সুপ্রিয়া কখনওই গৌরীদেবীর সংসার দখল করার বা অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি করেননি। বরং অসুস্থ গৌরীদেবীকে রান্না করে পাঠাতেন সুপ্রিয়াই। কিন্তু আবেগ ও স্নেহের বশে সুপ্রিয়া যে ভুল করেছিলেন, সুচিত্রা সেন সেই ভুল করেননি। হয়তো তাই সুচিত্রা ‘দেবী’ হয়ে রয়ে গেলেন জনমানসে, আর সুপ্রিয়া ‘দেবী’ হয়েও তা রইলেন না।

সুচিত্রা উত্তমকে ফিরিয়ে দিলেও, সুপ্রিয়া কিন্তু তাঁর কেরিয়ারের পূর্ণবিকাশের শ্রেষ্ঠ সময়টা দিয়ে দিলেন উত্তম কুমারকে। উত্তমকে আশ্রয় দিয়ে তাঁর জীবনে হয়ে উঠলেন উত্তমময়ী। আবেগের তোড়ে ভেসে গেলেন সুপ্রিয়া। তাঁর নিজের আমিত্ব হারালেন, উত্তুঙ্গ ফিল্মি কেরিয়ার জলাঞ্জলি দিলেন। সঙ্গে সমাজের চোখে রক্ষিতা ও সঙ্গিনী হয়ে উঠলেন।

যে বেণু ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা করেছেন, ‘কোমল গান্ধার’ করেছেন, ‘স্বরলিপি’, ‘স্বয়ম্বরা’ করেছেন, কিশোর কুমার ও ধর্মেন্দ্রর নায়িকা, সাহসী আম্রপালী করে ঝড় তুলেছেন, তিনি কেন উত্তমমাটির উপর নিজের জীবন দাঁড় করালেন! যেসব ছবিতে সুপ্রিয়া নায়িকা নন, উত্তমের সেসব ছবির আউটডোরেও তিনি যেতেন, ভাল ভাল রান্না করতেন ও সবাইকে খাওয়াতেন। উত্তমের জন্য রাঁধতেন হালকা, সুস্বাদু রান্না। হয়তো কিছুটা উত্তমের উপর নিজের অধিকার বজায় রাখতেও যেতেন।

কিন্তু সে যাই হোক, উত্তমের সেবিকা হওয়া ছাড়াও নিজের অভিনয় দাপট কেন জলাঞ্জলি দিলেন সুপ্রিয়া? নিজের যোগ্যতায় নিজের মাটি রাখার ক্ষমতা তাঁর ছিল। যে অসীম সময় তিনি উত্তম আবেগে ভাসিয়ে দিয়েছেন সেই সময় একটু নিজেকে দিতে পারতেন। ছবি করতে পারতেন আরও। তাঁর ন্যাচারাল অ্যাক্টিং ক্ষমতা ছিল, ক্লাসিকাল নৃত্যের তালিম ছিল। বার্মার প্রধানমন্ত্রী থাকিন নু বেণুকে রুপোর চামচ দিয়েছিলেন পুরস্কার নৃত্যকলায় প্রথম হওয়ায়। বাংলা সিনেমায় হলিউড স্টাইল আনেন বেণুই। এই সবই উত্তম আলোকে ঢাকা পড়ে গেল। মেঘে ঢাকা পড়ে গেলেন ‘আম্রপালী’ তারা।

সে সময়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ বছর বছর সন্তান উৎপাদন করত, শাশুড়ি-বউমা একসঙ্গে সুতিকাগৃহে থাকত, একসঙ্গে দুজনের সন্তান প্রসব হত। আর সেই সমাজেই আবার সুপ্রিয়ার সমালোচনা চলত। সুপ্রিয়া অবশ্ সমাজের মুখে পরপর বুড়ো আঙুল দেখান। তবে সুপ্রিয়া উত্তমের ঘর ভেঙেছে এইটা যতটা রটে, ততটা আলোচনা হয় না চলচ্চিত্রে সুপ্রিয়ার অবদান নিয়ে।

সুপ্রিয়া সেই সমাজে আরও এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটান। তাঁর প্রথম স্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরী দ্বিতীয় বিয়ের পর দিল্লি থেকে কলকাতা কাজে এসে, একবার এলেন বেণুর কাছে। বললেন হোটেল পাননি। সুপ্রিয়া বলেছিলেন ‘কোথায় যাবে আমার ফ্ল্যাটেই থাকো। সোমা খুশি হবে।’ তখন উত্তম প্রয়াত। কিন্তু তবু সমাজ যেন ভাবতেই পারে না এ উদারতা। যদিও সে সাময়িক, তখন যে নতুন করে বিশ্বনাথবাবুর প্রতি সুপ্রিয়ার কোনও অনুভূতি জন্মেছিল তা একেবারেই নয়।

শ্রী তারাশংকর ‘আম্রপালী’ করার সময়ে যাঁকে ছাড়া তাঁর নায়িকা ভাবতে পারেননি, তিনি সুপ্রিয়া। তিনি ডাকনামে বেণু। তিনি শ্রী তারাশংকর কে বলেছিলেন “আমি আম্রপালী-র চরিত্র করতে কোনারকের পোশাক পরব।” সেদিন সাহসিনী সুপ্রিয়ার সেই কথা শুনে সবাই বলেছিলেন “তাহলে সিনেমা হলে ঢিল পরবে। অমন দুঃসাহস দেখিও না বেণু।” বেণুর জবাব ছিল, “তাহলে এই চরিত্র নিয়ে ছবি করবেন ভেবেছেন কেন? যদি সাহসী পোশাক পরাতেই না পারেন!”

শেষ অবধি “আম্রপালী”তে কাঁচুলি পরিহিতা সুপ্রিয়া রুপোলি পর্দায় সামনে আসেন। বেণু বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে যৌনতাকে পৌঁছে দেন সৃজনশীলতার সঙ্গে। এক ছবিতেই বেণু আম্রপালী রূপে সব পত্রিকার হেডলাইন হয়ে যান। সুচিত্রা, সাবিত্রী, অরুন্ধতী– এসব প্রতিমা মুখ নায়িকাদের জমানায় এক আগুন সুপ্রিয়া জ্বলে ওঠেন। যেন বাৎস্যায়নের কামসূত্র থেকে আগত যৌবন সরসী তিনি।

তাঁর মুখে বিখ্যাত ডায়লগ “দাদা আমি বাঁচতে চাই”। সত্যিই ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন থেকেই তাঁর একার লড়াই শুরু। অনটনের সংসারে বছর বছর কন্যাসন্তান যেন শনির ছায়া তখন। সূতিকাগৃহে অষ্টম কন্যাসন্তান হয়ে জন্ম নিলেন সুপ্রিয়া। শ্রীকৃষ্ণর নারীসত্ত্বা যেন তিনি, নাম হল কৃষ্ণা। কিন্তু ১৯৩৩ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা সংসার বলে উঠেছিল, “আবার মাইয়া”! নিদারুন হতাশায় সে শিশুকন্যাকে তাঁর মা পা দিয়ে ঠেলে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণা আঁতুরঘরে রাখা আগুনের মালসায় পড়তে পড়তে বেঁচে গেল।

ঠিক সেদিন থেকেই কৃষ্ণার লড়াই শুরু। কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় যাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম, সেই বেণু সেই সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া নাম তাঁকে দেন পিতৃতুল্য অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল। এরপর যুদ্ধের পর যুদ্ধ। বর্মা থেকে দু’মাস পায়ে হেঁটে এসেছিল সে কলকাতা। সে আসা ছিল অতি দুর্গম। ক্লান্ত পথে রাতে ঘুমিয়ে পড়ল বেণু। সকালে ঘুম ভেঙে দেখে একটা গরুকে জড়িয়ে শুয়েছিল সে। হাসবে না কাঁদবে বুঝে পেল না। কিশোরীবেলায় সব ঐশ্বর্য ছেড়ে তাকে ঝাঁপ দিতে হয়েছিল জীবনের আগুনে। শুধু খালি পায়ে ক্রোশ ক্রোশ পথ হেঁটে আসা নয়, পরনের পোশাকটুকুও ছিঁড়ে যায়। পথে ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে ছিল না কোনও কৃষ্ণ। সেদিন কিশোরী বেণু কাদা মেখে নিজের শরীর ঢেকে সারা পথ হেঁটে এসেছিল লোলুপ মানুষের দাঁত-নখ এড়িয়ে।জলের তেষ্টায় বুক ফেটে যেত। ছোট ভাইবোনদের মুখের দিকে চেয়ে নিজে জল না খেয়ে তাদের জল খাওয়াত “সিস্টার”।

সেই পিপাসার্ত অবস্থা এত ভয়ানক যে পরেও বেণুর মনে হতো জলের তৃষ্ণা এখনও মেটেনি। তৃষ্ণা তো মেটেইনি। একটু সম্মানের তৃষ্ণা। তাঁকে বারবার বস্ত্রহরণ করেছে সমাজ। কুলটা, উত্তম-সঙ্গিনী, বাজারি, বেশ্যা, রক্ষিতা– কোন তকমা না জোটেনি কপালে! বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় আজীবন অশ্লীলতার দায় বয়ে গেছেন ‘বিষ কন্যা’ সুপ্রিয়া।

অথচ বাঙালির প্রাণপ্রিয় উত্তমকুমারকে সুপ্রিয়া যে উজাড় করা ভালোবাসা দিয়েছিলেন, সেটাই কিন্তু মহানায়ককে বাঁচিয়ে রেখেছিল। যখন তিনি মহানায়ক, তখন সুপ্রিয়া তাঁর ছায়াসঙ্গিনী ছিলেন। সমাজ সুপ্রিয়াকে সঙ্গিনী, এক্সট্রা এসব অপবাদ দিলেও, এটা ভেবে দেখেনি কেউ, যে উত্তমের সেসময় যোগ্য সঙ্গিনী সুপ্রিয়া। যে উজাড় করা নিখাদ ভালোবাসা ও সেবা সুপ্রিয়া উত্তমকে দেন, তা কম নয়। সবচেয়ে বড় কথা, তখন সুপ্রিয়া নিজেও কেরিয়ারের মধ্যগগনে। তিনি ঋত্বিক ঘটকের “মেঘে ঢাকা তারা”, “কোমল গান্ধার” করে ফেলেছেন। নারীকেন্দ্রিক সিনেমা মেঘে ঢাকা তারাই বাংলা ছবিতে প্রথম। তার আগে রামের সুমতি,বিন্দুর ছেলে হলেও নারীকে ভেবে চিত্রনাট্য এই প্রথম যা লিখলেন ঋত্বিক ঘটক শুধু সুপ্রিয়ার জন্য।

Tribute - Telegraph India

তবু নিজের ভালবাসাকে বড় করে দেখেছিলেন সেদিন সুপ্রিয়া। আজও সুপ্রিয়ার নাতি-নাতনির বয়সিরা তাঁকে নিয়ে বিদ্রুপ করে। সমাজ যেন বেণুকে চোখরাঙিয়ে বুঝিয়ে দেয়, সে সবসমই ‘বাড়তি’। যেমন নারীসুলভ পুরুষ মানেই সে ঋতুপর্ণর মতো, তেমনই কারও সংসারে থার্ড ওম্যান মানেই সে সুপ্রিয়ার মতো। কিন্তু সবার সঙ্গেই একটা ‘মতো’ জুড়তে হয়। তারা কেউ সুপ্রিয়া বা ঋতুপর্ণ হয়ে যায় না।

সুপ্রিয়াও বুঝতেন সমাজের এই বিদ্রুপ। তাই তিনি ভদ্র মুখোশধারী সমাজের মুখের উপর এমন স্টাইল, পোশাক, মেকআপ করতেন যে তাকে নিয়ে গসিপ করা সমাজও চমকে যেত। খোলা চওড়া পিঠ, নগ্নহাতা ব্লাউজ, সরু কোমরে কোমরবন্ধনী, সঙ্গে তুলে নিতেন জমকালো বেনারসী বা শিফন।

চলচ্চিত্রেও তাঁকে দেখি আমরা নতুন নতুন আঙ্গিকে। কখনও “সবরমতী”, “চিরদিনের” লাউড লুক মোটা ঠোঁট একে গাঢ় লিপস্টিক, নিত্য নতুন হেয়ারকাট। বাংলা ছবির দর্শক আগে দেখেনি এত কিছু। “কাল তুমি আলেয়া”র ডঃ লাবণ্য সরকার, “ছিন্নপত্র”র ভ্যাম্পিস চরিত্র, “মন নিয়ে”তে দুই বোনের চরিত্রে সাইকোলোজিকাল রোল, বনপলাশিণী শ্রাবণধারার মতো রূপলাবণী যাঁর অঙ্গ থেকে পড়ে ঝরি, কিংবা দিলীপ মুখার্জীর সঙ্গে রাজেন তরফদারের ছবি “আকাশ ছোঁয়া”। আবার “চৌরঙ্গী”র করবী গুহর উঁচু করে বুফো খোঁপা, বড় করে চোখ আঁকা। বারবার ট্র্যাডিশন ব্রেক করেছেন সুপ্রিয়া দেবী। ড্রেস ক্যারি করায় আজও তিনি প্রথমা। বাঙালিকে আধুনিক কালচার শিখিয়েছেন সুপ্রিয়াই।

উত্তমকুমার বলতেন, তিনি চারটে জিনিস খেতে ভালবাসতেন। চা, চিংড়ি, চুমু, আর বিশেষ একজনের হাতের রান্না। এই বলে বেণুর দিকে তাকিয়ে চোখটা স্লাইট মেরে দিতেন উত্তমভঙ্গিতে। আসলে, প্রথম দেখাতেই যেন দুজনের ভালবাসা হবে, ঈশ্বর জানতেন। বর্মা থেকে কলকাতায় এসে উত্তমকুমারের পাড়ায় গিরিশ মুখার্জি রোডে ‘জয় হিন্দ’ নামের একটা বাড়ির একতলায় ভাড়া বাড়িতে উঠেছিল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। উত্তমের বয়স তখন ১৮, বেণুর ১১। সাত বছরের তফাত।

উত্তম বেণুদের বাড়ির লনে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসতেন। আর ওপরে চার তলায় নিজের ঘরে উত্তম হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন তখনকার দিনের বিখ্যাত গান, ‘পি লে, পি লে, হরিনাম কা প্যায়ালা’। একদিন অমন গান করছেন উত্তম, আর পাড়ার সব মেয়ে জানলার পিছনে ভিড় করে লুকিয়ে শুনছে সে গান, গান শেষ হতেই সবাই হাওয়া। উত্তম সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন। এগারোর বেণু উত্তমের সামনে দাঁড়িয়ে চার্জ করেছিল, ‘তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে গান করো কেন? পাড়ার মেয়েরা ভাল করে শুনতে পায় না। এ বার থেকে বাইরে সবার সামনে গান করবে…।’ হতভম্ব হয়ে গেছিলেন উত্তম। পরে বাড়িওয়ালার মেয়েকে বলেছিলেন উত্তম, ‘মেয়েটা কে রে? পটপট করে কথা বলে।’

তারপর দুজনের একসঙ্গে ছবি “বসু পরিবার”। আবার অনেকদিন গ্যাপ, এর পরে “সোনার হরিণ”, “লাল পাথর”, “উত্তরায়ণ”। উত্তরায়ণের মেকআপ রুমে মেকআপ করছেন তন্বী সুপ্রিয়া। হঠাৎ পেছনে একটা ছায়া… উত্তম… প্রথম চুম্বন। “আমায় চিরদিনের সেই গান বলে দাও, আমায় চিরদিনের সেই সুর বলে দাও”…রচিত হল। সমাজের রক্ষনশীলতা ভেঙে বারবার সুপ্রিয়া ভালবাসার গল্প শুনিয়েছেন, যা সমাজ পেটে খিদে মুখে লাজ নিয়ে গিলেছে।

উত্তম-সুচিত্রা-সুপ্রিয়া…এই ত্রয়ী একসঙ্গে কোনও ছবি করলে সে ছবি লেজেন্ডারি ক্লাসিক হত। কিন্তু বাঙালি এঁদের সবসময় নিজের ছকে ফেলত। বাঙালির ফ্যান্টাসিতে আসত উত্তম-সুচিত্রা স্বামী স্ত্রী। আর তাঁদের সংসারে সর্বনাশ করতে অবতীর্ণা হচ্ছেন সুপ্রিয়া। ফিল্মি ম্যাগাজিন ‘উল্টোরথ’, ‘প্রসাদ’রাও সেভাবেই যেন খবর করত।

একবার সুচিত্রা ফোন করেছেন উত্তমকে। সুপ্রিয়া ফোন ধরেছেন। সুচিত্রা তখন সুপ্রিয়াকে বলেন “উতুকে ফোনটা দে তো বেণু, উতুকে খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।” সুপ্রিয়া জানতেন রমাদি তাকে রাগাচ্ছে। আর এক বার চাঁদিপুরে ‘হার মানা হার’ ছবির শুটিং। উত্তম, সুপ্রিয়া সবাই সেখানে দুপুরের আগেই পৌঁছে গেলেন। যদিও ‘হার মানা হার’ ছবিতে অভিনয় করেননি বেণুদি, উত্তমের সঙ্গে এমনিই গিয়েছিলেন যেমন যেতেন। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা চলছে। উত্তম বায়না ধরলেন চাইনিজ খাবেন। চাইনিজ রান্নার ভার পড়ল যথারীতি বেনুর উপর। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে বিশ্রাম। ধীরে ধীরে বেলা পড়ে এল।

ঠিক তখনই সুচিত্রা সেন এলেন। তিনি সোজা দোতলায় উঠে গেলেন। বেশ খানিকক্ষণ পর বেণু দোতলায় গেলেন। দেখলেন, চা-পানের বিশাল আয়োজন। গান-টান হচ্ছে। উত্তম আর সুচিত্রা একসঙ্গে নাচ করতে লাগলেন। সুচিত্রা নাচতে নাচতেই বেণুকে বললেন, “কীরে উত্তমের সঙ্গে আমাকে এই অবস্থায় দেখে তোর হিংসে করছে না তো?” সুচিত্রার কথা শুনে সুপ্রিয়া দেবী হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, “বহুদিন থেকেই তোমাদের দেখছি। তোমাদের প্রেম, তোমাদের ভালেবাসা, তোমাদের বিরহ, তোমাদের নাচ-গান, তোমাদের পরস্পরের কাছাকাছি আসা সিনেমার পর্দায় সব দেখে আমার চোখ সয়ে গেছে। আমার মনে হয় সুচিত্রা-উত্তমের পর্দার কেমিস্ট্রি সমস্ত জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে।”

মহানায়কের প্রয়াণের পরে ৯ বছর কাজ করেননি সুপ্রিয়া।মহানায়কের মৃত্যুর জন্য তাঁকে দায়ী করা হত। ঘর থেকে বেরোননি সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া জানতেনও তাঁর এই ভাগ্যলিখন। তাই তিনি উত্তমকে বলেওছিলেন, “আমি তোমায় যতই ভালবাসি, তবুও আমি তোমার জীবনে খলনায়িকা হয়েই রয়ে যাব।”

১৯৮৯ সালে রুপোলি পর্দায় মামণি রূপে ফিরলেন সুপ্রিয়া দেবী। বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের “কড়ি দিয়ে কিনলাম”। তার আগে নিজের প্রোডাকশনে একটি ছবি করেন, “উত্তর মেলেনি”। দীপঙ্কর দে ও সুপ্রিয়ার জুটি। অসম জুটি হলেও এক নারীর এক মায়ের লড়াইয়ের গল্প বলেন সুপ্রিয়া। এর পরে সোনার মামণি। উত্তমকে হারিয়ে যে কষ্ট অপবাদ পান, সাদা থান পরিহিতা এলোচুলের দাপটে আবহে তবলার মিউজিকে যখন প্রাসাদোপম দালান দিয়ে মামণি হেঁটে যান, বাংলা ছবি বুঝে যায় মায়ের রোলে সমান দাপট দেখাতে সক্ষম সুপ্রিয়া। কিন্তু যৌবন তখনও অটুট।

আর একটা ছবি, ‘নট ও নটী’। ইন্দ্রাণী হালদার ও সুপ্রিয়া দেবী অভিনয় করেন। কী দাপট দেখিয়েছিলেন সুপ্রিয়া মায়ের রোলে, এলোচুলে জমকালো সাজে। তিনকড়ি বালা দাসীকে নিয়ে ছবিটি। এর পরে দজ্জাল শাশুড়ি হয়ে উঠলেন ‘জননী’ সুপ্রিয়া। যখন টেলিভিশনে শুধু ধারাবাহিক যুগ, তখন লাল কাতান সিল্ক পরে সুপ্রিয়া এসে বলেন “এবার আসছে বাংলার প্রথম মেগা সিরিয়াল ‘জননী’।” বাঙালিকে মেগা শব্দের সঙ্গে পরিচয় করান সুপ্রিয়াই। ঘিয়ে গরদ শাড়ি, ঘিয়ে কেশের খোঁপায় জননী সুপ্রিয়াকে দেখতে রাস্তাঘাট দুপুরবেলা ফাঁকা হয়ে যেত। ঘরে-ঘরে ভাতের থালা হাতে মহিলারা বসে পড়তেন ভাগের মা অনুপমা দেবীর সংসার ও তাঁর দাপট দেখতে। জননীর রোলে অন্য কোনও অভিনেত্রীকেই ভাবা যায় না।

ইন্দ্রাণী সেনের কণ্ঠে সেই টাইটেল সং, “যে হাসি মুখে সবই সয়, জগতের সেই তো জননী”…বাঙালি ভুলবে না। সুপ্রিয়া মানেই যেমন সেক্স সিম্বল, সুপ্রিয়া মানে যেমন ঢাকাই শাড়ি কপালে বড় সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর, সোনায় মোড়া গা, বড় নাকছাবি, আঁচলে চাবির গোছা, তেমনই সুপ্রিয়া মানে জননীর মতো এক বিধবার দাপটও। যেন এক কমপ্লিট ওম্যান সুপ্রিয়া। সিরিয়াল, যাত্রা, থিয়েটার যেটাই করেছেন, সুপ্রিয়া নিজের স্টারভ্যালু বজায় রেখেছেন এভাবেই।

এর পর সুপ্রিয়া-সাবিত্রী-মাধবীদের নিয়ে বিষ্ণুপাল চৌধুরী বানালেন ‘শান্তিনিকেতন’ মেগা। শ্যুটিং ব্রেকে সাবু-মাধুদের জন্য রেঁধে নিয়ে যেতেন সুপ্রিয়া। কখনও সাবিত্রী-মাধবীরা খাবেন না বললে সুপ্রিয়া বলতেন ‘আজ সোমা রেঁধেছে তাও তোরা খাবি না।’ খাবার ব্যাপারে বাকি অভিনেত্রীদের রীতিমতো শাসন করতেন সুপ্রিয়া। ২০০৯ সালেও নিজের স্টারভ্যালু এতটুকু কমেনি তাঁর। সে বছর “শ্রীচরণেষু বড়মা” মেগা সিরিয়ালের পোস্টারে সারা কলকাতা শহরের দেওয়াল ছেয়ে গেছিল, যার নামভূমিকায় ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। বিশাল পোস্টার জুড়ে ছিল সুপ্রিয়া দেবীর মুখ।

সুপ্রিয়া দেবী হয়তো অনেকের ছোটোবেলার নিষিদ্ধ রমণী, তবে একইসঙ্গে তিনি বড় আদরের, বড় প্রিয় নস্টালজিয়া। যাঁর কথা বলে উল্টোরথ থেকে আনন্দলোক পাতার পর পাতার ভরিয়ে ফেলত, সেগুলো আজও হটকেক। ঠিক যেমন যে বউমারা তাঁকে রক্ষিতা বলেন, সেই বউমারাই সুপ্রিয়ার রেসিপি শিখে রান্না করে সংসারের ভাল বউ হন। সব বউমাদের তিনি তাঁর রান্নার টপ সিক্রেট রেসিপি শিখিয়ে গেছেন। সে বউমারা নিজেরাই হয়তো আজ শাশুড়ি। বেণুদির রান্নার রেসিপি তাঁদের মধ্যে দিয়ে পরম্পরায় চলছে।

২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ভোরে এসব থেকে চিরনিষ্কৃতি পেলেন সুপ্রিয়া। জীবনভর কর্তব্যের পাট চুকিয়ে দিলেন। আর কেউ বলার রইল না, “আপনাদের দাদা এইটা খেতে ভালোবাসত”, “আপনাদের দাদা ওইটা পরতে ভালোবাসত”। প্রাণের মানুষের সঙ্গে আবার দেখা হল বেণুর।

সুপ্রিয়ার প্রয়াণে উত্তম যুগ শেষ হওয়ার মতোই শেষ হল দেবী যুগও। কানন দেবী, ছায়া দেবী, চন্দ্রাবতী দেবী, অরুন্ধতী দেবীদের উত্তরসূরী ছিলেন একমাত্র সুপ্রিয়া দেবী। সেই সুপ্রিয়া দেবী চলে যাওয়ায় শেষ দেবী চলে গেলেন। দেবী যুগ শেষ হয়ে গেল চিরতরে। এখনকার কোনও নায়িকার আর দেবীতে উত্তরণ ঘটেনি।

সুচিত্রাকে উত্তমের শ্রেষ্ঠ জুটি ভাবা হলেও, সুচিত্রা উত্তমকে কতটা ধারণ করতেন তা জানা নেই। কিন্তু সুপ্রিয়া দেবী এই তিন দশকের বেশি সব লেখায়, সব ইন্টারভিউতে উত্তমকুমারের কথা বলেছেন। উত্তমের প্রয়াণের পরে তিন উত্তম নায়িকা সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, মাধবী যেন তিন বোন হয়ে গেছিলেন। সুপ্রিয়া যখন আর কাজ করতেন না, তখনও দুই বোনকে ফোন করে বলতেন “সাবু মাধু আয় আমার কাছে। সারাদিন থাকবি আমি রান্না করে খাওয়াবো”। কিন্তু তিনি কী করে রান্না করবেন, এতটাই অসুস্থ! তবু আন্তরিকতায় খামতি নেই। তাঁকে লোকে কু-তকমা দিলেও তিনি সবাইকে তাঁর রান্না খাইয়ে খুশি করে দিতেন নিজেও খুশি হতেন। সুপ্রিয়া নিজে যত না নিয়েছেন তার বেশি লোককে দিয়ে গেলেন।

আরও এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ ঘটেছিল সুপ্রিয়া মৃত্যুতে, সুচিত্রা ও সুপ্রিয়ার কন্যা দুই বোন হয়ে উঠল। মুনমুন সোমাকে দিলেন বড়দির মতো ভরসা। তাই সুপ্রিয়া প্রস্থানে আজ আর কোনও রাগ নয়, শুধু অনুরাগ। মধুময় হোক বেণুদির আগামী জন্ম ও জীবন। ভালবাসা ভরা থাক, নিন্দায় নয়।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More