‘বড় ভাই আমি, পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করতে পারিস না!’ নববর্ষে সৌমিত্রকে বলেছিলেন উত্তম

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বাঙালির চিরকালীন ভালবাসার দুই নায়ক। উত্তম-সৌমিত্র। দুজনকে নিয়ে বাঙালির দ্বৈরথ আজও অব্যাহত। কিন্তু উত্তম-সৌমিত্রর মধ্যে ছিল কি দ্বৈরথ? দুজনের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ যেমন ছিল, তার সঙ্গে ছিল কিছু চাপা অভিমানও। যে অভিমান একসময় দুজনের মধ্যে মনোমালিন্যের রূপ নেয়। সে এক ঐতিহাসিক বিতর্কিত ঘটনা, যেটা ঘটেছিল এক নববর্ষের দিনেই। কী ছিল সেই ঘটনা?

সে ঘটনা জানতে ফিরে যেতে হবে অতীতের আরও কিছু ঘটনায়।

ইদানীং যেমন টলিউড ইন্ডাস্ট্রি পৃথক মতাদর্শের রঙে বিভক্ত হয়ে গেছে, সেই বিভাজন অতীতেও ছিল। অভিনেত্রী সংঘ আর শিল্পী সংসদ।

৬০-এর দশকের শেষ ভাগে প্রাপ্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না বলে ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল সিনেমার সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের মধ্যে। এঁদের মধ্যে মূল দাবি ছিল টেকনিশিয়ানদেরই। বেশ কিছু দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মঘটের ডাক দেয় ‘‌সিনে টেকনিশিয়ানস ওয়াকার্স ইউনিয়ন’‌। ১৯৬৮ সালে যখন এই ধর্মঘট শুরু হয়, তখন ‘‌অভিনেত্রী সঙ্ঘ’ তা নৈতিক সমর্থন করে। ‘অভিনেত্রী সঙ্ঘ’‌-র তৎকালীন সভাপতি ছিলেন উত্তমকুমার এবং সম্পাদক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

Soumitra Chatterjee and Mahanayok Uttam Kumar | Soumitra chatterjee,  Bollywood photos, Hollywood legends

অন্যদিকে রাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার থাকায় কর্মচারী ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলিরও তখন বেশ জোরালো মনোভাব। সেই সময় আবার গঠিত হয় ‘‌পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি’‌ এবং এই সংগঠনের পুরোভাগে ছিলেন উত্তমকুমারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রযোজক গোষ্ঠী।

এইসময় অভিনেত্রী সঙ্ঘের একাংশ সঙ্ঘের তহবিল থেকে দশ হাজার টাকা ধর্মঘটীদের দিতে চায়। কিন্তু তা নিয়ে মতভেদ দেখা যায় ৷ ভাগ হয়ে যায় দুটো দল। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়রা ছিলেন টাকা দেওয়ার পক্ষে। কিন্তু জহর গাঙ্গুলী, বিকাশ রায়রা ছিলেন টাকা দেওয়ার বিপক্ষে৷ এদিকে উত্তমকুমার ছিলেন প্রযোজক অসিত চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ। সেই কারণে উত্তম প্রযোজকদের প্রতিনিধি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে তখন। এ নিয়ে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয় যে উত্তমকুমার ক্ষুব্ধ হন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর৷

সেই জন্য ভোট করার পদ্ধতি নির্ধারিত হয় এবং ভোটাভুটি হয়। সেই ভোটে জিতে অভিনেত্রী সঙ্ঘের সভাপতি হন সৌমিত্র৷ এর পর যথারীতি সঙ্ঘ ধর্মঘটীদের ১০ হাজার টাকা দেয়৷ কিন্তু এতে আঘাত পান অতীতের সভাপতি পদে থাকা উত্তম কুমার।

On the Master, and his galaxy of stars

উত্তমকুমার ক্ষুব্ধ ও অপমানিত হয়ে অভিনেত্রী সঙ্ঘ ছেড়ে বেরিয়ে এসে তৈরি করেন শিল্পী সংসদ৷ উত্তমের সঙ্গে শিল্পী সংসদে তখন বিকাশ রায় জহর রায়েরা ছিলেন৷ অপরদিকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়েরা অভিনেত্রী সংঘে৷

উত্তমের পক্ষে ছিলেন প্রযোজক অসিত চৌধুরী। উত্তম আর অসিত চৌধুরী আবার সুচিত্রার খুব ঘনিষ্ঠ তাই সুচিত্রা সেন থাকলেন শিল্পী সংসদেই। আর সত্যজিৎ রায় থাকলেন অভিনেত্রী সংঘ সৌমিত্রর পক্ষে।
একটা কথা চালু ছিল, ভাবা হত যে বামপন্থীরা তখন ‘‌অভিনেত্রী সঙ্ঘ’তে এবং কংগ্রেসী সমর্থকরা যোগ দিয়েছেন ‘‌শিল্পী সংসদ’‌-এ।

অনিল চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীকালে কমরেড হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়ে বিধায়ক হলেও তিনি কিন্তু আগে ছিলেন কট্টর কংগ্রেসী। তাই তিনি শিল্পী সংসদেই ছিলেন। যদিও সেই শিল্পীদের অবস্থান এখন দাঁড়িয়ে নির্ধারণ করা যায় না। অনিল চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী-কন্যা যেমন জানিয়েছেন, ‘বাবাকে সব দলের লোক ভালবাসত। কমরেড হয়ে নয়, বাবা বিধায়ক পদে জিতেছিলেন নির্দল প্রার্থী হিসেবে বামফ্রন্টের সমর্থনে।’ সে যাই হোক, বিভাজনে তখন উত্তমের দলেই ছিলেন অনিল।

Soumitra Chatterjee

কিন্তু এই বিভাজনের ফলে তৎকালীন টালিগঞ্জ পাড়ায় দু’পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক বেশ তিক্ত হয়েছিল। সামনাসামনি কেউ কারও প্রতি কুমন্তব্য বা আক্রমণাত্মক ব্যবহার না করলেও সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। আর ঠিক তারই প্রভাব পড়ে সেসময় হওয়া বসুশ্রীর নববর্ষ জলসায়।

আজ হাজরা মোড়ে যে দর্শকহীন বসুশ্রী তালা বন্ধ সেখানেই প্রতিবছর বসত নববর্ষের জলসা।

বসুশ্রীর নববর্ষ অনুষ্ঠানে উত্তম কুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মুখোমুখি হয়েও নাকি দু’জন দু’জনকে চিনতে পারেননি, এমন রটনাই রটে। এই ঘটনার রেশ নাকি স্টুডিও পাড়াতে গিয়েও পড়েছিল। সৌমিত্র এড়িয়ে চলতেন উত্তমকে। খোদ সুপ্রিয়া দেবী একবার বলেছিলেন, “স্টুডিওতে পুলু (সৌমিত্র) সামনে উত্তমকে দেখেও না চেনার ভান করেছিল। তখন উত্তম রেগে গিয়ে বলে, ‘কীরে পুলু, চিনতে পারছিস না?’…”

যদিও বেণুর এ কথা মানতে নারাজ ছিলেন সৌমিত্র। তবে বসুশ্রীতে নববর্ষ বর্ষবরণ উৎসবের ঘটনা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। সে সময়ে বসুশ্রীর মন্টু বসু এবং পরে মন্টু বসুর সঙ্গে তোচন ঘোষ মিলে আয়োজন করতেন নববর্ষ জলসার।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় বসুশ্রীর জলসা নিয়ে জানাচ্ছেন তাঁর লেখায়, “১৯৫৪ সালে হেমন্ত মুখার্জি কলকাতায় আসেন বম্বে থেকে লতা মঙ্গেশকরকে নিয়ে, তাঁকে কলকাতা দেখাতে। হেমন্ত-ভক্ত মন্টু বসু তাঁর ভবানীপুরের বাড়িতে দেখা করতে যান। হেমন্ত তাঁকে বলেন, ‘লতা কলকাতা দেখতে এসেছে, আজ থেকে তুমি ওর গাইড। পরবর্তী ৭ দিন তোমার গাড়ি করে মিউজিয়াম, চিড়িয়াখানা, পরেশনাথের মন্দির দেখাবে।’ মন্টু বসু তাই করলেন। পরে সুযোগ বুঝে মন্টু বসু বললেন, ‘হেমন্তদা, লতা তো আছে, এই ১লা বৈশাখ সকালে বসুশ্রীতে জলসা হতে পারে?’ হেমন্ত মুখার্জি উদ্যোগ নিলেন। সেই আরম্ভ।”

হেমন্ত, সন্ধ্যা, লতা, আশা, শ্যামল– কে না গেয়েছেন সেই বসুশ্রীর জলসায়। একবার তো উত্তম কুমার মঞ্চে উঠে গান ধরলেন নিজের গলায় ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’… সুচিত্রার অংশ গাইতে খোদ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় অডিয়েন্স থেকে ‘লাল্লা লা লা’ করে গেয়ে উঠলেন।

Soumitra Chatterjee: I don't have much faith in awards - Rediff.com movies

কিন্তু এত বড় উৎসবের আঙিনাতেও এসে পড়েছিল ওই শিল্পী সংসদ আর অভিনেত্রী সংঘ বিভাজনের রেশ।

বসুশ্রীতে মন্টু বসুর সেই পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান। সেবার সৌমিত্র ঢুকতে একটু দেরি করে ফেলেছেন। ঢুকে দেখেন, সিনিয়রেরা সবাই এসে গিয়েছেন। ভানুদা, জহরদা, উত্তমদা, হেমন্তদা। তখন বসুশ্রীর ওই অনুষ্ঠানে একটা বাঙালি প্রথা চালু ছিল, যে সিনিয়রদের প্রণাম করে কোলাকুলি করতে হবে। সেই কোলাকুলি ছিল হৃদ্যতার আলিঙ্গন।

সিনিয়রদের পরপর প্রণাম করতে করতে মুখ তুলে দেখছেন সৌমিত্র, এবার উত্তমদাকে প্রণাম করার পালা। তখন পুলুর বুকে প্রচণ্ড অভিমান আর তিক্ততা। উত্তমের হাত দু’টো ধরে সৌমিত্র শুধু বললেন ‘শুভ নববর্ষ।’

ঠিক তার আগে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রণাম করেছেন সৌমিত্র। অথচ প্রণাম করলেন না উত্তমদাকে। উত্তমের ফর্সা মুখটা প্রায় লাল হয়ে গেল। বললেন, ‘‘বড় ভাই আমি। পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করতে পারিস না!’’ এ ঘটনার সাক্ষী উত্তমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হেমন্ত-পুত্র জয়ন্ত মুখোপাধ্যায় এবং ইভেন্ট ম্যানেজার তোচন ঘোষ।

উত্তমের কথায় সৌমিত্রর সব অভিমান মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। সৌমিত্র বসে পড়ে উত্তমের পা দু’টো চেপে ধরে বললেন “দাদা, আমায় ক্ষমা করে দাও। আমার অন্যায় হয়েছে।

May be an image of 2 people and people smiling
সেদিন নববর্ষে উত্তমকে প্রণাম করলেন সৌমিত্র।

সৌমিত্র এ প্রসঙ্গে পরে বলেছিলেন, “আমি নিজের সপক্ষে আজ একটা কথাই বলতে পারি, যে এক সেকেন্ডও নষ্ট করিনি। দ্রুত সারেন্ডার করি। অনেকে ছিল যারা আমার নামে উত্তমদাকে ভুল বোঝাত। বলত, সৌমিত্র তোমায় খুব হিংসে করে। উত্তমদা আবার কানপাতলাও ছিলেন কিছুটা। ভুল বোঝানোয় সময় সময় প্রভাবিত হয়ে পড়তেন। বাঙালি তার স্বভাবসুলভ প্রবণতা অনুযায়ী আমাদের লড়িয়ে দিয়েছিল। কংগ্রেস-সিপিএম, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল, অতএব উত্তম-সৌমিত্র!”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More