২১ বার বন্দেমাতরম গান রেকর্ডিং করতে হয় লতা মঙ্গেশকরকে! জানুন অজানা কাহিনি

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সঙ্গীতের সরস্বতী লতা মঙ্গেশকরকে বাংলা গানের জগতে এনেছিলেন আর এক কিংবদন্তী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সে জন্য আমরা বাঙালিরা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে চিরঋণী। কিন্তু কীভাবে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আলাপ হয়েছিল? সে গল্প জানেন না অনেকেই।হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের শতবর্ষে এ কাহিনি প্রাসঙ্গিক বৈকী।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে বম্বেতে গান গাইতে ডেকে নিয়ে গেছিলেন হেমেন গুপ্ত। ফিল্মিস্তান স্টুডিওয় ‘আনন্দমঠ’ ছবির পরিচালক তিনি। খুব ইচ্ছে, সেই ছবিতে হেমন্ত সুর দেন। ১৯৫১ সালের মার্চে হেমন্ত চলে গেলেন বম্বেতে, তুলারাম জালানের ফিল্মিস্তান স্টুডিওয়। যদিও জালান নামেই মালিক। ফিল্মিস্তানের আসল সর্বময় কর্তা শশধর মুখোপাধ্যায়।

শোনা যায়, সে সময়ে শশধর মুখোপাধ্যায় হেমন্তকে খানিক অপমান সুরেই বলেছিলেন, “তুমি তো ভাড়াখাটা মিউজিক ডিরেক্টর। ফুরনের কাজ করে এসেছো। ফিল্মিস্তানের নিয়ম কিন্তু একটু অন্যরকম। আমরা বাঁধা লোক রাখি। বাঁধা মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করবে। তার জন্য মাসে মাসে মাইনে পাবে। হাজিরাও দিতে হবে আপিসের মতো। এগারোটা থেকে পাঁচটা। তার পরে ছুটি।”

এই শশধর মুখোপাধ্যায়ের পুজোই এখন কাজল-রানি মুখার্জীদের দুর্গা পুজো। সেখানে হেমন্তর পুত্রবধূ মৌসুমী চ্যাটার্জী থেকে হেমন্তের গোটা পরিবারই যান বহুদিন ধরেই। কিন্তু হেমন্তকে প্রথমে এই ভাড়া খাটা মিউজিক ডিরেক্টর বলে অপমান করেন শশধর মুখোপাধ্যায়ই। পরে হেমন্তই বম্বের স্টার হয়ে যান।

হেমেন গুপ্তর অনুরোধে হেমন্ত রাজি হন ফিল্মিস্তানে চাকরি নিতে। আপিসের মতো রোজ যেতেন স্টুডিওয়। তখন বাংলায় হেমন্তর বেশ নামডাক, কিন্তু বম্বেতে প্রথমদিকে সংসার চালাতে অর্ধেক ডিম খেয়েও থাকতে হয়েছে হেমন্ত মুখার্জীকে।

সে যাই হোক, তখন শশধর মুখোপাধ্যায়ের ফিল্মিস্তানের সঙ্গে আবার লতা মঙ্গেশকরের ঝগড়া চলছে। কিন্তু হেমন্তর ইচ্ছে ‘আনন্দমঠ’ ছবিতে লতাকে দিয়েই গাওয়ানোর। কথাটা হেমন্ত বললেন শশধর মুখোপাধ্যায়কে। শশধরবাবু বললেন, “লতা ফিল্মিস্তানে আসবে না। ও অনেক ব্যাপার।”

হেমন্ত বললেন, “আমি যদি লতাকে আনতে পারি?” শশধর মুখোপাধ্যায় বললেন “আমাদের তরফ থেকে কোনও আপত্তি নেই। বরং ও এলে ভালই হয়। কিন্তু আমি তোমায় বলছি, ও আসবে না।”

তখন লতা নানাচকে একটা একতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন। হেমন্ত সোজা চলে গেলেন লতার কাছে। খুব আদর-আপ্যায়ন করলেন লতা। হেমন্ত লতার আপ্যায়ন দেখে পরে বলেছিলেন “ছোট্ট এইটুকু একটা মেয়ে, কী অসাধারণ নাম করেছে! মুগ্ধ হলাম। আরও মুগ্ধ হলাম লতার ব্যবহারে। প্রথম আলাপেই খুব অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলাম আমরা। তার পরে আমার প্রস্তাব পেশ করলাম ‘বন্দেমাতরম’ গান গাওয়ার জন্য।”

লতা শুনে বললেন, “যদিও ফিল্মিস্তানের সঙ্গে আমার ঝগড়া, আমি ওখানে গাইব না ঠিক করেছি, কিন্তু শুধু আপনার জন্যেই গাইব হেমন্তদা।” হেমন্ত জিজ্ঞেস করলেন “কত টাকা বলব?” লতা বললেন, “শুধু আপনার জন্যে গাইছি। পয়সার জন্যে নয়। সুতরাং ফিল্মিস্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনও কথা বলার দরকার নেই।”

লতা রাজি হলেন একমাত্র তাঁর হেমন্তদার অনুরোধে, অবাক হয়ে যান শশধর মুখোপাধ্যায়। আর সেই আনন্দমঠেই প্রথম একসঙ্গে কাজ করেন লতা মঙ্গেশকর আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সে ছবিতে লতাজির গাওয়া ‘বন্দেমাতরম’ গান আজও স্বদেশি গানের তালিকায় প্রথম।

কিন্তু এ গান রেকর্ডিংয়ের কাহিনি বেশ করুণ। শোনা যায়, ‘বন্দেমাতরম’ গান গাইতে গিয়ে রীতিমতো ধরাশায়ী হয়ে যান লতাজি।  যতবারই রের্কড করেন, কোনও বারই পরিচালক হেমেন গুপ্তর পছন্দ হয় না। প্রতিটি টেকে খুব ভাল গাইছেন লতা, কিন্তু হেমেন গুপ্ত বলছেন, প্রাণ পাচ্ছি না গানে।

অন্য জায়গায় বম্বের নিয়মে সাধারণত মিউজিক ডিরেক্টররা লতার গানের ব্যাপারে কোনও কথা বলেন না। ছবির পরিচালকরাও লতাকেই বিচারকের আসনে বসিয়ে রায় শোনার জন্য কান খাড়া করে থাকেন। আর সেই লতাকেই নস্যাৎ করে দিচ্ছেন হেমেন বাবু। শেষে একুশ বার রেকর্ডিং-এর পরে লতা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন। হেমন্ত ভাবছেন এত সেধে লতাকে নিয়ে এলাম ফিল্মিস্থানে, হেমেনদার ব্যবহারে এখন  রেগেমেগে না চলে যায়। শেষ অবধি মিউজিক ডিরেক্টর হেমন্তই বললেন “লতার গানে আমি সন্তুষ্ট। আর গাওয়ার দরকার পড়বে না লতার।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও হেমেন গুপ্ত মেনে নিলেন কথাটা। সেই প্রথম ও শেষবার লতা মঙ্গেশকর কোনও গান একুশ বার রের্কডিং করেন। তবে গানটি ঐতিহাসিক হিট। এতবার গান রেকর্ডের ঘটনা তাও আবার লতা মঙ্গেশকরের ক্ষেত্রে! কিন্তু হেমন্তর জন্যই লতা সব মেনে নেন পারফেকশন আনতে।

তার পরে তো বন্দেমাতরমের আরও কত ভার্সন হল কিন্তু হেমন্ত-লতা ভার্সনের বন্দেমাতরম আজও আদি ও অকৃত্রিম।

এর পরে হেমন্তকেই লতা বলেছিলেন “সব ভাষায় গান গেয়েছি কিন্তু বাংলা ভাষায় গান গাইনি, বাংলা ভাষা আলাদা জিনিস, আলাদা প্রাণের টান। বাংলা গান গাইতে চাই।” হেমন্ত বলেছিলেন, “বাংলা গানই যখন গাইবে, রবি ঠাকুরের গান দিয়েই শুরু করো।” হেমন্ত-লতার নন-ফিল্ম রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডও তুমুল হিট করে এবং তার পরে তো লতা-হেমন্ত জুটি ভারতীয় সঙ্গীতে ও বাংলা গানে একটা যুগ, একটা ইতিহাস।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More