দুরন্ত অভিনেতা একে হাঙ্গল, অর্থাভাবে হয়নি চিকিৎসা, শেষকৃত্যেও মুখ ফিরিয়ে নেন তারকারা

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘ইতনা সান্নাটা কিঁউ হ্যায় ভাই !’

ইমাম সাহেব চরিত্রে একে হাঙ্গলের বিখ্যাত সংলাপ ‘শোলে’ ছবিতে। বলিউড চলচ্চিত্রে যে কোনও আবেগঘন দৃশ্যের আইকনিক বৃদ্ধ পিতা ছিলেন একে হাঙ্গল। মনে পড়ে, ‘আঁধি’ ছবিতে সেই বৃন্দা কাকা চরিত্রটি? যিনি সঞ্জীব কুমার-সুচিত্রা সেনের সংসারের ভৃত্য ছিলেন, কিন্তু অভিভাবকের মতো আগলে রাখতেন। তিনিই আবার সুচিত্রা-সঞ্জীবের ভেঙে যাওয়া সম্পর্কে সেতুবন্ধন করছেন। একে হাঙ্গাল ওরফে বৃন্দা কাকা পায়েস বানিয়ে নিয়ে এসেছেন সুচিত্রা সেন অর্থাৎ জননেত্রী আরতি দেবীর জন্য। কী স্নেহ প্রাক্তন বৌরানির জন্য!

রাজ কাপুর থেকে রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন হয়ে শাহরুখ খান, আমির খানের সঙ্গে কাজ করেছেন একে হাঙ্গল। দীর্ঘ অভিনয় সফর। কিন্তু তাঁর ফিল্মজীবন শুরু হয়েছিল, যখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ বছর। যখন সবাই ইনিংস শেষ করে হাঁফিয়ে যায়, তখন তিনি নতুন উদ্যমে ফিল্ম জগতে চুটিয়ে কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু তার আগে দীর্ঘ লড়াই তাঁর সারা জীবন জুড়ে। বিট্রিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন তিনি।

পুরো নাম অবতার কৃষণ হাঙ্গল।

কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে একে হাঙ্গলের জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৪ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান আজকের পঞ্জাবের শিয়ালকোটে। তাঁর বড় হওয়া পেশোয়ারে। হাঙ্গলের পিতা পন্ডিত হরিকৃষ্ণণ হাঙ্গল ছিলেন থিয়েটার জগতে যুক্ত। তিনি কিশোর হাঙ্গলকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন থিয়েটার দেখতে। সেখান থেকেই হাঙ্গলের থিয়েটার প্রেম, মঞ্চের প্রতি টান। খুব সহজেই তিনি অভিনয় রপ্তও করে নিতে পারতেন। এর পর তাঁর পরিবার করাচিতে চলে যায়।

রাখী-জিনাতের সঙ্গে হাঙ্গাল।

এদিকে আবার জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী কমলা নেহরুর আত্মীয় ছিলেন হাঙ্গল। হাঙ্গলের পূর্বপুরুষরা সবাই বিট্রিশ অধীন সরকারি সংস্থায় কাজ করেছেন। কিন্তু হাঙ্গল মনেপ্রাণে ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী। দেশজ কাপড় দিয়েই ব্রিটিশ বিরোধী পোশাক আন্দোলনে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন এবং দর্জির পেশা বেছে নেন। এই সময় তিনি আইপিটিএ-তেও যুক্ত ছিলেন। মার্ক্সবাদী নাটক, কবিতা লেখার জন্য একে হাঙ্গলকে জেলবন্দিও করা হয়।

ভারত যখন স্বাধীনতা পেল, তখন হাঙ্গল পাকিস্তানে জেলবন্দি। দু’বছর কারাবাস জীবন কাটিয়ে পাকিস্তান ছেড়ে কুড়ি টাকা পকেটে নিয়ে ভারতের টানে মুম্বই চলে এলেন হাঙ্গল। সেখানে দর্জির কাজ নেন এবং সে কাজেও এত জনপ্রিয়তা পেলেন যে তাঁর তৈরি পোশাক পতৌদী নবাবরা এবং বিদেশিরাও পরতেন।

বাসু চ্যাটার্জী, অশোক কুমার, হাঙ্গাল, উৎপল দত্ত।

আবার নতুন করে গণনাট্য আন্দোলনে যুক্ত হলেন একসময়। সেখানেই বলরাজ সাহনি ও কইফি আজমির সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৫ অবধি একের পর এক থিয়েটারে অভিনয় করে গেছেন হাঙ্গল। ৫২ বছর বয়সে শুরু করলেন ফিল্মি কেরিয়ার। ১৯৬৬ সালে প্রথম ছবি বাসু ভট্টাচার্যর পরিচালনায় রাজ কাপুর অভিনীত ‘তিসরি কসম’। ফিল্মে নতুন হলেও হাঙ্গল একবার দেরি করে সেটে আসায় রাজ কাপুরকে  ধমকে ছিলেন। তাঁর সময়ানুবর্তিতায় মুগ্ধ হন রাজ।

বেশিরভাগ ছবিতেই হাঙ্গল নায়ক নায়িকার অভিভাবক, দরদী প্রতিবেশী, স্নেহপ্রবণ ভৃত্য কিংবা জীবনযুদ্ধে শোষিত বৃদ্ধ। তাঁর স্মরণীয় ছবিগুলি হল ‘নমক হারাম’, ‘শোলে’, ‘কোরা কাগজ’, ‘বাবুর্চি’, ‘চিতচোর’, ‘বালিকা বধূ (হিন্দি)’, ‘গুড্ডি’, ‘শরারত’, ‘অবতার’, ‘তেরে মেরে সপনে’, সত্যম শিবম সুন্দরম’, ‘হাম কদম’। ‘মঞ্জিল’ ও ‘প্রেম বন্ধন’ ছবি দু’টিতে তিনি ছিলেন খলনায়কের ভূমিকাতেও। সব জায়গায় দরিদ্র চরিত্র করলেও ‘শওকিন’ ছবিতে ধনী বিজনেসম্যানের রোল করেন চুরুট মুখে, তাতেও অনবদ্য।

‘গল্প হলেও সত্যি’র হিন্দি ‘বার্বুচি’-তে তিন ভাই।

আসলে মঞ্চ থেকে যে অভিনেতারাই এসেছেন তাঁরা চরিত্রভিনেতা হলেও মানুষের মনে রয়ে গেছেন। আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, ‘আইপিটিএ’-তে কেএ হাব্বাস, হেমন্ত মুখার্জী, সলিল চৌধুরী, হাঙ্গল, হাবিব তানভীর, জোহরা সেহগাল সবাই গণনাট্য আন্দোলনে দেশের জন্য নাটক, গান সৃষ্টি করেছেন। কে হিন্দু, কে মুসলিম এই বিভেদ কিন্তু প্রকট হয়নি। যা অনেককিছু শিখিয়ে দেয় আজ। দেশ গড়ার প্রকৃত কাণ্ডারী এঁরাই।

৯৭ বছর বেঁচেছিলেন হাঙ্গল। কিন্তু শেষদিন অবধি জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। কিছু বছর বিরতির পর ‘লগান’ ছবিতে বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এরপর ২০০০ সাল নাগাদ শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে, হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতেন এবং প্রায় ঘরবন্দি জীবন। হাঙ্গল অভিনয় করেছেন প্রায় ২২৫টি ছবিতে। কিন্তু শেষ দিকে তাঁকে কাজ করতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। সংসার খরচ থেকে নিজের খরচ মেটাতে অভিনয় তাঁকে করতেই হত। করতেন প্রাণের টান থেকেও। কিন্তু সত্যি বলতে, নিজের উপার্জনের বাইরে, ওষুধ কেনার টাকাটুকুও তাঁর কাছে ছিল না।

লগান।

অমল পালেকার ছিলেন হাঙ্গলের এককালের সহ-অভিনেতা। অমল পালেকার যখন ‘পহেলি’ ছবির জন্য হাঙ্গলকে অভিনয় করার অফার দেন, অসুস্থ হাঙ্গেল সেই অফার নেন। তাঁর আগে আট মাস বাড়ি থেকে অসুস্থতার কারণে বেরোতে পারেননি কিন্তু অভিনয়ের টানে আবার হুইল চেয়ারে করে বেরোন। দীর্ঘ সাত বছর পর তিনি আবার লাইট-ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান স্টুডিওতে। এটাই ছিল তাঁর শেষ সিনেমা। এর পরে ২০১১ সালে ফ্যাশন শোয়ে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তার পরের বছর, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ডাবিং করেছিলেন ‘কৃষ্ণ অউর কংস’ অ্যানিমেশন ছবিতে, রাজা উগ্রসেনের ভূমিকায়। এটাই ছিল তাঁর শেষ কাজ।

আগ্রার মেয়ে মনোরমা দরকে বিবাহ করেন হাঙ্গল। তাঁদের ছেলে বিজয় ছিলেন পেশায় ফোটোগ্রাফার। তিনিও  আজ বৃদ্ধ। পাকেচক্রে পড়ে দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন কর্মহীন। ফলে হাঙ্গলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। হাঙ্গলের দুরাবস্থার কথা কোনও এক নিউজ চ্যানেলের মাধ্যমে সামনে এলে তৎকালীন সরকারের তরফে দুঃস্থ ও প্রবীন শিল্পী ভাতা চালু করার কথা হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর পরে ইন্ডাস্ট্রির কিছু পরিচালক এবং অভিনেতা-অভিনেত্রী যেমন জয়া বচ্চন-সহ আরও অনেকে হাঙ্গলকে কিছু অর্থ সাহায্য করেছিলেন। পরে ওঁকে ভারত সরকার পদ্মভূষণ সম্মানে পুরস্কৃত করেন।

সত্যম শিবম সুন্দরম ছবিতে পদ্মিনী কোলাপুরীর সঙ্গে।

বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে অর্থকষ্টে। এমনকি দরকারি অস্ত্রপোচারও করানো যায়নি। সাপোর্টিং ট্রিটমেন্টে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি খুব সস্তার বেডে। হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়, ২০১২ সালের ১৬ অগস্ট। এমনকি ‘আশা পারেখ হাসপাতাল’-এর টাকা মেটানো নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয় পরিবারকেও। শোনা যায়, হাঙ্গলের মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বের করে আনার টাকা ছিল না। শেষ অবধি সেটা সম্ভব হলেও, এত বড় লেজেন্ডের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল বলিউডের সমস্ত স্টার। খোঁজ নেয়নি কেউ। হাঙ্গলকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়নি বলিউডের কোনও বিগনেম স্টারকে। অথচ তাঁরা সবাই হাঙ্গলের সঙ্গে এককালে কাজ করেছেন।

রাজা মুরাদ, রাকেশ বেদী, ইলা অরুণের মতো কয়েকজন সেদিন উপস্থিত ছিলেন হাঙ্গলকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। হাঙ্গল যে নিছকই একজন চরিত্রাভিনেতা, স্টার নন, সেটা যেন আরও ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিল নির্দয় বলিউড। কিন্তু চরিত্রাভিনেতার রোলেই আদর্শ সব চরিত্রে দর্শকমনে রয়ে গেছেন একে হাঙ্গল।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More