গীতা দত্তর হাত ধরেই মালা সিনহার বলিউড জয়

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

গানে রোম্যান্স আর বিচ্ছেদের বেদনা মিলিয়ে মিশিয়ে কণ্ঠে একাকার করে দিতে পেরেছিলেন একমাত্র যে শিল্পী তিনি গীতা দত্ত। গীতা দত্তর গানের সফর বেশিদিন বিস্তৃত হলে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের গানের জগতে পায়ের মাটি শক্ত করা অনেক বেশি কঠিন হতো হয়তো।

গীতা দত্ত আজ বেঁচে থাকলে নব্বই বছর পার করতেন। কিন্তু গীতার জীবন কাহিনি শেষ হয়ে গেছিল অনেক আগেই, মাত্র চল্লিশের কোঠার শুরুতেই। তবু গীতার অশেষ গানগুলি তো আজও গীতা দত্তকে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এবং শ্রোতাদের কাছে। গীতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন বাঙালি কন্যা। বাঙালি মেয়ের এই বলিউড-টলিউড বিজয়িনী হবার কাহিনি তো কম গর্ব করার মতো নয় আমাদের কাছে!

তাঁর আসল নাম গীতা ঘোষ রায়চৌধুরী। ছোট করে গীতা রায়। বাংলাদেশের ফরিদপুরের ধনী জমিদার পরিবারে এমনই এক অঘ্রাণের দিনে ১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন গীতা। নদীপথে মাঝিরা নৌকা বেয়ে যাবার সময় গান গাইতে গাইতে যেত। সেই মাঝিদের গানের সুর গীতা কন্ঠে তুলে তুলে সুরেলা হয়ে উঠলেন। এভাবেই গানের প্রতি ভালোৃবাসা। গীতা রায় নামেই প্রথম দিকে গানের জগতে নাম করেন।

কিন্তু দেশভাগের আগেই জমিদারী ফেলে এপার বাংলায় চলে আসতে হল তাঁদের পরিবারকে। ১৯৪২ সালে তাঁর বাবা মা-র সাথে বম্বে চলে আসেন গীতা। দাদারে একটি অ্যাপার্টমেন্টের এক কামরার ফ্ল্যাটে থাকতে আরম্ভ করেন তাঁরা।

গীতা যখন বারো বছরের কিশোরী তখন সুরকার হনুমান প্রসাদ ঐ আবাসনেই গীতার গানের চর্চা শুনে মুগ্ধ হন এবং তিনি ১৯৪৬ সালে গীতাকে ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’ ছায়াছবিতে প্রথম প্লে ব্যাক করার সুযোগ দেন। এই ছবিতে গীতা কোরাসে মাত্র দুই লাইন গান গেয়েছিলেন, কিন্তু তারমধ্যেই তাঁর কৃতিত্ব ফুটে উঠেছিল। পরের বছরে গীতা নেপথ্য গায়িকা হিসাবে ‘দো ভাই’ ছবিতে কাজ পান এবং এই ছবিতে তাঁর গান বলিউড ছবির দুনিয়ায় প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৫১ সালে শচীন দেববর্মণের সুরে ‘বাজি’ চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া গান বিশাল হিট করে। গানটি ছিল ‘তদ্বির সে বিগড়ি হুয়ি তকদির বনা দে’।

এর পরে আর গীতাকে পিছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। গুরু দত্তের সঙ্গে বিয়ের পর গীতা রায় হলেন গীতা দত্ত।

গীতা বাঙালি হিসেবে নিজে যেমন বোম্বেতে নাম করেন তেমনি তিনি আর এক বাঙালি নায়িকাকে বোম্বেতে বড় ব্যানারে নায়িকা হওয়ার সুযোগও করে দেন। তিনি হলেন মালা সিনহা।

কেমন ছিল সেই কাহিনি? গীতা দত্তর ঋণ যে চিরকাল, আজও তা স্বীকার করেন মালা সিনহা।

নেপালি বংশোদ্ভূত মালা সিনহার মেয়েবেলা কাটে কলকাতায় বাঙালি পরিবেশে। তাই মালাকে বাঙালি বলাই যায়। আকাশবাণীতে গান গাওয়া দিয়ে ছোটবেলায় বিনোদন জগতে মালার যাত্রা শুরু। শিশুশিল্পী হিসেবে কিছু ছবিতেও কাজ করেন। সেই সূত্র ধরে প্রথম যৌবনেই বাংলা ছবির নায়িকা হয়ে ওঠেন মালা। যেমন তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘ঢুলি’।

পাশাপাশি বোম্বেও পাড়ি দেন ছবি করার আশায়। সে সুযোগটাও এসেছিল বাঙালি পরিচালক অমিয় চক্রবর্তীর হাত ধরে। ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনে সদ্য-তরুণী মালার ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে মালাকে বম্বে ডেকে নেন অমিয়বাবু। সাইন করান পরপর তিনটে ছবি। কিন্তু অমিয় বাবুর ‘বাদশা’ ছবিটি যাতে নবাগতা নায়িকা ছিলেন মালা, সেটি চূড়ান্ত ফ্লপ করে। মালার বিপরীতে ছিলেন প্রদীপ কুমার। সব চুক্তি ক্যান্সেল করে দেন অমিয় চক্রবর্তী মালার সঙ্গে।

মালার পরিবর্তে তাঁর ‘সীমা’ ছবিতে নূতন এবং ‘কাঠপুতুলি’তে বৈজয়ন্তীমালাকে নিয়ে নেন অমিয় চক্রবর্তী। আবার মালা আরও দুটি ছবি অন্য পরিচালকের সঙ্গে ঐ সময়েই করেছিলেন ‘হ্যামলেট’ এবং ‘একাদশী’। ‘হ্যামলেট’ এ ওফেলিয়ার রোল করেছিলেন মালা। কিন্তু অত রোগা নায়িকা বলিউড গ্রহণ করেনি।

সেই দুটি ছবিও সুপারফ্লপ করে। চুড়ান্ত আশাহত হয়ে কলকাতা ফিরে আসেন মালা। তবু বোম্বের নায়িকা হবার আশা ছাড়েননি। কলকাতায় ফিরে এসে করলেন উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘পুত্রবধূ’ এবং ‘পৃথিবী আমারে চায়’।  ‘পৃথিবী আমারে চায়’তে মালার লিপে গীতা দত্তর গান সুপার ডুপার হিট করল। গীতা দত্ত মানেই আজও যে গান প্রথমেই মনে পড়ে ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’। অথচ  ‘পৃথিবী আমারে চায়’তেই আর একটি গান মালার লিপে গীতা দত্তের কন্ঠেই ‘তুমি বিনা এ ফাগুন বিফলে যায়’ কী অদ্ভুত সুন্দর। বিরহের পূর্বরাগ যেন পরিমাপ মতো খেলে গেছিল গীতার কন্ঠে। অথচ এই অসাধারণ গানটি ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’র উচ্চতায় হিট করল না।

যাই হোক তখনও মালা বোম্বেতে সেই অর্থে প্রথম নায়িকা হতে পারছেন না। কিন্তু টলিউডে বোম্বে ঘোরা নায়িকা বলে মালার খুব কদর। মালার সঙ্গে গীতার একটা সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল এভাবেই।

তখন বোম্বের ফিল্মিস্তান স্টুডিওর সর্বেসর্বা শশধর মুখোপাধ্যায়ের দুর্গা পুজো বোম্বেতে সবচেয়ে বিখ্যাত স্টার বাঙালির পুজো। গুরু দত্ত স্ত্রী গীতাকে নিয়ে গেছেন শশধর মুখোপাধ্যায়ের পুজোয়। তখন গুরু দত্ত ‘প্যায়াসা’ ছবির চিত্রনাট্য লিখছেন।  মালাও সে বার বোম্বে গেছেন। এবং মালা গীতা একসঙ্গেই রয়েছেন এই পুজোয়। এই মুখার্জীদের পুজোর জমকালো স্টারেদের বিচিত্রানুষ্ঠান ছিল বিখ্যাত। এখানেই একটি নাটকে মালাকে অভিনয় করার অনুরোধ করেন গীতা।

দুজনেই যে বঙ্গকন্যা। গীতার তাই বাঙালী সেন্টিমেন্ট কিছুটা কাজ করেছিল মালার প্রতি। বলিউডে মালা যে ক’টি ছবি করেছিল সেগুলো সব ফ্লপ তাই মালাকে সেভাবে কেউ চিনত না সেখানে। গীতা দিদির ভরসাতেই মঞ্চে ওঠেন মালা এবং নিজেকে উজাড় করে দেন অভিনয়ে।

এই নাটকে শোয়ে উপস্থিত ছিলেন গুরু দত্ত। তিনি মালার নাটকে অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে যান এবং মালাকে  ‘প্যায়াসা’ ছবিতে সাইন করান। যে চরিত্রে কাজ করার কথা ছিল মধুবালার। কিন্তু মধুবালা প্রায়শই হৃদরোগে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তাই মধুর পরিবর্তে এলেন মালা। গীতা দত্ত না থাকলে কোনদিনও এমন একটি বড় প্রোজেক্টে মালা সুযোগ পেতেন না। এই ছবি দিয়েই মালা সিনহা বোম্বেতে প্রথম সারির নায়িকা হয়ে যান। ষাটের দশকে মালার যা পারিশ্রমিক ছিল সেটা পরে বলিউডে এসে রাখী,মৌসুমী,শর্মিলা বঙ্গকন্যারা অতিক্রম করতে পারেননি।

‘প্যায়সা’ তেই ঘটেছিল আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। যা দিয়ে বোঝা যায় গীতার ঋণ ভোলেননি মালা।

‘প্যায়াসা’ ছবির গান গেয়েছিলেন গীতা দত্ত। যে গানগুলি সুপার ডুপার হিট। কিন্তু ছবির আর এক নায়িকা ওয়াহিদা রহমান বলেছিলেন সুরকার শচীন দেব বর্মণকে, গীতা দত্তের গাওয়া ‘রুত ফিরে পর দিন হামারে ফিরে না’ গানটা ছবি থেকে বাদ দিয়ে দিতে। কারণ গানটি অনেক বেশি দীর্ঘ। শচীন কর্তা বলেছিলেন ওয়াহিদাকে ‘তুমি জানো গানটা কত ভাল?’

এসময় থেকেই গীতার ভালোবাসার সংসারে ওয়াহিদার প্রবেশ। এক হাতে তো তালি বাজে না। গুরু দত্ত বলেছিলেন ‘আমি বলেছি তাই গীতার গান বাদ দিতে ওয়াহিদা বলছে।’ সেদিন ছবির আরেক নায়িকা মালা সিনহা গীতার পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁর প্রথম পাওয়া বড় ছবি হওয়া সত্ত্বেও। যদিও যে প্রযোজক তাঁর ইচ্ছাই সব। গুরু দত্ত ছিলেন নায়ক ও প্রযোজক। গানটা ছবির সঙ্গে প্রথম সপ্তাহ চলেছিল। দ্বিতীয় সপ্তাহে ছবি চললেও, চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল গীতার ঐ গান।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More