বাংলার গুড়ের এত বৈচিত্র্য! প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়ে সিলমোহর পাঠিয়েছিলেন খোদ রানি এলিজাবেথ

পাঞ্চালী দত্ত

ছোটবেলায় শীতের সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে বাবা এক টুকরো হলুদ ও গুড় দিতেন খেতে। বলতেন, হলুদ-গুড় খেলে লিভার ভাল থাকে, ত্বকের ঔজ্বল্য বৃদ্ধি পায়। মুখে দিলে মুখটা কেমন যেন কষটে মত লাগত, কিন্তু ওই গুড়ের টুকরো অনেকটাই ব্যালেন্স করে দিত ব্যাপারটা। মনে মনে ভাবতাম, এটাই বোধহয় কারণ হলুদের সঙ্গে গুড়টি দেওয়ার ।

কিন্ত বড় হয়ে যখন গুড়ের গুণাগুণ জানতে পারলাম, তখন বুঝলাম শুধুমাত্র কষটে ভাবকে সমন্বয় করা নয়, ওই দুইটি জিনিস একসঙ্গে খাওয়ার উপকারিতা অসীম। গ্রামবাংলার এধরনের খাবারগুলোই ছিল ওষুধ। দৈনন্দিন আহারের মাধ্যমে এগুলোই শরীর ভাল রাখতে সাহায্য করত। গুড়ে প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ, গ্লুকোজ, পুষ্টিগুণ এবং জলীয় পদার্থ বেশি থাকায় এটাকে প্রাকৃতিক ‘এনার্জি ড্রিংক’-ও বলা হয়। এতে আয়রন বেশি থাকায় হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে। তাই দুর্বল শরীরের জন্য একটুকরো গুড় বা গুড়ের রস খুবই উপকারী।

আখ, খেজুর রস, তালের রস এবং গোল গাছের রস থেকেই মূলত গুড় তৈরি হয় বঙ্গে। রকম অনুযায়ী গুড়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়, ঝোলা (গুড়ের পাতলা রস), ভেলি (গুড় হয়ে যাওয়ার পরে চিনির জন্য দু’বার ফোটালে ঘন কালচে ও সামান্য তিতকুটে যে গুড়), চিটে (আরও বেশি চিনি বের করার জন্য গুড়কে আরও ফোটালে নীচে যে কালো গুড় পড়ে থাকে এবং তার স্বাদ তেতো বলে এই গুড় খাওয়া হয় না), নলেন (খেজুর গাছের রস ফুটিয়ে তরল খয়েরি রঙের গুড়), পাটালি (খেজুর গুড় ফুটিয়ে জমাট বাঁধা অবস্থায়)।

Gud (jaggery) is the only thing that can save your lungs from Delhi's air now - Lifestyle News

এছাড়াও আছে হাজারি গুড়। এক ধরনের সাদা খেজুর গুড় এটি। খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করে ফোটানোর পরে সেই ঘন তরল গুড়কে কাঠির সাহায্যে ক্রমাগত ফেটানোর ফলে সাদা ক্রিমের মত মোলায়েম একটি জিনিস তৈরি হতে থাকে। তার পরে এটাকে মাটির পাত্রে ঢেলে দেওয়ার পরে জমাট বেঁধে যায়। এর স্বাদ পাটালি গুড়ের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা ও সুস্বাদু তো বটেই।

শোনা যায়, রানি এলিজাবেথ এই গুড় খেয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি লন্ডন থেকে একটি হাজারি লেখা ধাতু দিয়ে তৈরি সিলমোহর পাঠিয়েছিলেন সেই পরিবারকে। বর্তমানে বাংলাদেশে এই গুড় তৈরি হয়। সেই পরিবারে এখনও সিলমোহরটি রয়েছে এবং সেই সিলমোহরটির ছাপ গুড়ের মধ্যে বসিয়ে তারপর বাজারে বিক্রির জন্য ছাড়া হয়। এলিজাবেথ যখন খাবার টেবিলে শক্ত সাদা গুড়ের টুকরো দেখে কৌতূহলবশত ধরতে গিয়েছিলেন, গুড় টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে। রানি ভাবতেও পারেননি, এই শক্ত মণ্ডটি এতটাই মোলায়েম হতে পারে। খেয়ে পরিতৃপ্ত হলেন আরও। সেই থেকেই এই গুড়ের নাম হয়ে গেল হাজারি। আর যাঁরা এই গুড় তৈরি করতেন, সেই পরিবারকে হাজারি পরিবার বলে লোকেরা ডাকতে শুরু করে তখন থেকে।

চাপ দিতেই গুঁড়োগুঁড়ো হাজারি গুড় | প্রথম আলো

গুড় নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের পিছু ফিরে দেখতে হয় প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ বছর আগের ইতিহাসের পাতায়। আখ গাছ থেকে প্রথম তৈরি হয় গুড়। ষাঁড় দিয়ে পেষণী (পেষাই করার যন্ত্র) ঘুরিয়ে, নিংড়ে নেওয়া হতো রস। সেই রসকে ছেঁকে বসিয়ে দেওয়া হত আগুনে। আখের ডালপালা দিয়ে আগুন ধরানো হত। ঘন রসকে বলা হত ফনিতা। এই রসকে আরও ফুটিয়ে শুকিয়ে নিলে হত ঘন বাদামি রং, যাকে বলা হত গুড়।

নীহাররঞ্জন রায়ের লেখনীতে আমরা পাই “বরেন্দ্রীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম উপকরণ ছিল সেখানকার ইক্ষু বা আখের ক্ষেত ।… এই পুণ্ড্র-পুঁড়-কোম বোধহয় আখের চাষে খুব দক্ষ ছিল, এবং হয়তো সেইজন্যেই আখের অন্য নামই হইতেছে পুঁড়। আরও একটি লক্ষণীয় নাম গৌড়। গৌড় যে গুড় হইতে উৎপন্ন, তাহার শব্দত্বাত্তিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ সুবিদিত। … আজকাল পৌঁড়িয়া, পুঁড়ি, পোঁড়া প্রভৃতি নামে যে ইক্ষু ভারতের সর্বত্র চাষ হইতে দেখা যায় তাহা এই পৌন্ড্রক ইক্ষু নাম হইতে উদ্ভূত। সুপ্রাচীন কালেই প্রাচ্যদেশের ইক্ষু ও ইক্ষুজাত দ্রব্য– চিনি ও গুড়– দেশে বিদেশে পরিচিতি ছিল।”

খেজুরের খাঁটি গুড় চিনবেন যেভাবে || Somoynews.tv

এবারে চলে আসি বাংলার খেজুর গুড়ের গল্পে। খেজুর শুষ্ক ও মরু অঞ্চলের গাছ। তাই ফল হিসেবে বঙ্গের খেজুর সেভাবে বিশ্বে ম্যাজিক দেখাতে না পারলেও, তার রসের রসধারায় মনকে সিক্ত করে নিয়েছে আপামর ভোজনপ্রেমীদের। এই অমৃতের ভাণ্ডটি যেন ঈশ্বর বুঝেই এখানে সৃষ্টি করেছিলেন। এমন একটি জাতি, যারা তেতো থেকে শুক্তোর মত একটি পদ তৈরি করতে পারে, তাদের হাতে এই ভাণ্ডটি পড়লে তারা কী জাদু যে সৃষ্টি করতে পারে, সে সৃষ্টিকর্তা হয়ত বুঝেছিলেন।

রস সংগ্রহ থেকে শুরু করে গুড় তৈরি অবধি পরতে পরতে শুধু বিজ্ঞান। একটু এদিক থেকে সেদিক হলেই পুরো শ্রম পণ্ড। হেমন্তের শেষে খেজুর গাছ পরিষ্কার করে কাণ্ডের উপরিভাগ চেঁচে দেওয়া হয়। তার পর রস আসতে শুরু করলে সেখানে একটা বাঁশের কঞ্চি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে রস বের হয়ে আসতে সুবিধে হয়। একটা মাটির কলসি সেই কঞ্চির নিচে বেঁধে দেওয়া হয়। ভোর হওয়ার আগে রস নামিয়ে ফেলতে হয়, কারণ সূর্য ওঠার আগে রস জ্বাল না দিলে তার স্বাদ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ উনুন (যার নাম বাইন) তৈরি করে শালতিতে (চ্যাপ্টা পাত্রের নাম শালতি) রস জ্বাল দেওয়া হয়। সেখানেও প্রচুর সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। একটা গাছ থেকে পরপর তিনদিন রস সংগ্রহ করার পর তিনদিন বিশ্রাম বা জিরেন দিতে হয়। এভাবেই রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির পালা চলে অক্টোবরের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

আত্রাইয়ে চলছে খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্তুতি - Bhorer Kagoj

তবে খেজুর গুড়ের সেই অমৃত স্বাদ কিন্তু মেলে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত। গরম পড়তে শুরু করলে রসের আমেজও কমতে থাকে। রস সংগ্রহ থেকে গুড় বানানোর এই প্রক্রিয়ায় যাঁরা দিনরাত খাটেন, তাঁদের বলা হয় শিউলি। শিউলিদের হাতের জাদুতে তৈরি এই রস দিয়ে ময়রারা বানান অমৃত স্বাদের নানা মিষ্টি ও সন্দেশ, যার মুগ্ধতায় আপনি মোহিত হয়ে কাটিয়ে দিতে পারবেন আরও একটি শীত ঋতুর অপেক্ষাকাল।

আজ একটি নলেনগুড়ের সন্দেশের রেসিপি শেয়ার করছি আপনাদের সঙ্গে।

কাজু নলেনের সন্দেশ

উপকরণ: ছানা (২/৩ ঘণ্টা নরম কাপড়ে বেঁধে জল ঝরানো) ৫০০ গ্রাম, কাজু বাটা ৫০ গ্রাম, নলেন গুড় ৪ চামচ।

প্রণালী: ছানা মিক্সিতে বেটে নিন। এবারে একটা বাটিতে ঢেলে তাতে গুড়, কাজুবাটা ভাল করে মিশিয়ে নিন। একটা কড়াইয়ে আধ আঙুল মেপে জল দিন। এর পরে একটা বাটিতে ঘি মাখিয়ে তাতে মিশ্রণটি ঢেলে ট্যাপ করে নিন। জল ফুটে উঠলে তাতে একটা স্ট্যান্ড বসান, তার ওপর মিশ্রণের পাত্রটা বসিয়ে কড়াইতে একটা ঢাকনা দিন। ৪০ মিনিট পরে গ্যাস অফ করুন। মিশ্রণটি ঠান্ডা করে ফ্রিজে এক ঘণ্টা রাখুন। এবারে বরফির আকারে কেটে পরিবেশন করুন।

খেজুর গুড়ের সন্দেশ /Khejur Gurer Sondesh Recipe / Bengali Sweet || - YouTube

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More